ভবঘুরে কথা
দিলীপ কুমার রায়

বাংলা ছেড়ে দূরে গিয়েছিলেন, তাইকি তাঁকেও দূরেই রাখল বাঙালি? বাংলা গান-গাওয়ার ঘরানায় তিনি এক নতুন ঘরানার পথিকৃত। একেবারে বিলেত থেকে শিখে এসেছেন গান গাওয়ার রীত-রেওয়াজ।

তিনি দিলীপকুমার রায়। তিনি ব্যক্তি-পরিচয়ে বাংলার অগ্রণী নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র, তিনি শিল্পী-পরিচয়ে বাংলা গানের অন্যতম পথিকৃত্, অগ্রণী লেখক আর তিনিই সাধন-পরিচয়ে ঋষি অরবিন্দের অন্যতম প্রিয় শিষ্য। গান নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিতর্ক হয়েছে তাঁর।

রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের মনে আছে, একবার যখন রবীন্দ্রনাথের গানগুলি গাওয়ার সময়ে শিল্পীকে তাত্ক্ষণিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষে তিনি গুরুদেবের কাছে সওয়াল করেছিলেন, তার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ এই সঙ্গীতগুণীর সঙ্গে গান নিয়ে যে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন, তা দিলীপকুমারের সঙ্গীতভাবনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভরসাস্থলটিকে যেমন উজ্জ্বল করে, তেমনই উন্মোচিত করে দিলীপকুমারের প্রতি কবির স্নেহও।

বাংলা গান-গাওয়ার ঘরানায় তিনি এক নতুন ঘরানার পথিকৃত্। একেবারে বিলেত থেকে শিখে এসেছেন গান গাওয়ার রীত-রেওয়াজ। বাংলা গানে কী ভাবে সেই নতুন উদ্যম কাজে লাগানো যায়, তার পরীক্ষাও নিজের গানে করেছেন তিনি।

তবু তিনি তাঁর জন্মের একশো কুড়ি বছর পরে সাধারণ বাঙালির কাছে আজও উপেক্ষিত। তাই তাঁর একশো কুড়ির জন্মদিনের প্রাক্কালে একটি বই প্রকাশিত হয়, সরাসরি যার নাম দেওয়া যায় ‘দিলীপকুমার রায় : এক উপেক্ষিত বাঙালি’। গ্রন্থের সুচারু সম্পাদনা করেছেন সুধীর চক্রবর্তী।

অদ্ভুত বিষয় হল, সুধীরবাবু দিলীপকুমারের জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে তাঁর বিখ্যাত ‘ধ্রুবপদ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটিই তৈরি করেছিলেন এই দিলীপকুমার রায়কে কেন্দ্রে রেখে। জন্মশতবর্ষে সেই পত্রিকায় প্রকাশিত দিলীপকুমার-বিষয়ক রচনাগুলি যখন ১৯৯৭-এ (অর্থাৎ শিল্পীর শতবর্ষে) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল, তখন সুধীরবাবু তাঁর সেই বইয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘দিলীপকুমার রায় : স্মৃতি-বিস্মৃতির শতবর্ষ’।

সেই বইতেও শিল্পী সম্পর্কে বলতে হয়েছিল ‘বিস্মৃতি’-র কথা আর এই এখনও সেই সংগীতগুণীকে নিয়ে বই তৈরি করতে গিয়ে বলতে হয় এ এক উপেক্ষিত বাঙালির পুনর্মূল্যায়ন। এর মাঝখানে ২০০৩-এ সুধীরবাবু পরম যত্নে প্রস্তুত করেছিলেন বরণমালিকা নামে একটি সংকলন।

মনে আছে, সেই সংকলনের সম্পাদনা আর বিন্যাস করবার সময়ে সুধীরবাবুর সঙ্গে কাজ করতে বসে খুব কাছ থেকে শুনেছিলাম দিলীপকুমারের দুই গুণমুগ্ধ প্রবীণ অগ্রজের কথোপকথন।

একজন সুধীরবাবু অন্যজন মিলন সেন। ভবানীপুরে নেতাজি ভবনের ঠিক উল্টোদিকে বিখ্যাত জাহাজবাড়ি-র বৈঠকখানায় দিলীপকুমারকে নিয়ে দুইটি মানুষের আগ্রহ আর তাঁর অজস্র কাগজপত্রের মধ্য থেকে তাঁকে সন্ধান করার চেষ্টায় তাঁদের আন্তরিকতা আর পরিশ্রমের শরিক ছিলাম ২০০২-০৩ সালের দিনগুলিতে।

দিলীপকুমার সম্পর্কে যে কোনও কাজ করতে হলে মিলন সেন মশাইয়ের সুরকাব্য ট্রাস্টের অবদান কোনও দিনই ভুলে যাওয়ার নয়। তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁর উত্তরাধিকারীরাও পরম যত্নে এই ট্রাস্টের কাজ করে চলেছেন বলে শুনেছি। নামী প্রকাশনালয় থেকে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হয়ে চলেছে দিলীপকুমারের রচনাবলী, ফলে তাঁর রচনাগুলি এখন আর দুর্লভ নয়, বিভিন্ন মিউজিক স্টোরে দেখেছি দিলীপকুমারের গানগুলি এখনও ততখানি দুর্লভ হয়ে যায়নি।

তবুও এই শিল্পী সাধারণ বাঙালি তো বটেই এমনকী রুচিশীল উত্তরকালের বাঙালি মননের কাছেও রয়ে গেলেন উপেক্ষিত। যে চর্চা আর যে অধ্যয়ন তাঁকে কেন্দ্র করে হতেই পারত, সম্পন্ন হল না তার কণামাত্রও। ক্যালেন্ডারের হিসেবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে জন্মেছিলেন দুই বন্ধু, ১৮৯৭-এর ২২ জানুয়ারি দিলীপকুমার রায়ের জন্ম আর সুভাষচন্দ্র বসু ওই সালেরই ২৩ জানুয়ারি।

দু’জনের সাধনার পথ ভিন্ন এমনকী উত্তরকালে দু’জনের মূল্যায়নও হল ভিন্ন। একজন হয়ে উঠলেন বাঙালি জীবনের এক নতুন আদর্শ, অন্য জনকে তাঁর প্রতিভার সমস্ত সম্ভাবনা সত্ত্বেও ভুলে রইল বাঙালি।

দিলীপকুমার সম্পর্কে উত্তরকালের বাঙালির এই বিস্মরণের কারণ কী? হতেই পারে তাঁর গানে সুরের নিরীক্ষা জটিলতর, জনপ্রিয় হওয়ার অনুকূল নয় অথবা এমনও হতে পারে উত্তরকালে তাঁর অরবিন্দ-সান্নিধ্য আর পণ্ডিচেরি-বাস তাঁকে দূরতর করেছিল কলকাতার জনপরিসর থেকে।

এমনকী ঋষি অরবিন্দের প্রয়াণের পরে দিলীপকুমার সুদূর পুনেতে স্থাপন করলেন তাঁর সাধনভজন ক্ষেত্র হরিকৃষ্ণ মন্দির। তিনি সেভাবে যুক্ত হলেন না বাঙালির কার্যক্ষেত্রের সীমানাতে। ফলে তাঁর সন্ন্যাসগ্রহণ তাঁর সাধকপরিচয়কে যত উজ্জ্বল করেছে, সেই অনুপাতেই সাধারণের মননে আর জনমানসে ক্রমশ প্রচ্ছন্ন করেছে তাঁর অন্যতর সত্তা।

এই বিস্মৃতপ্রায় বঙ্গমনীষাকে ফিরে দেখারই একটি সাম্প্রতিক শোভনসুন্দর উপায় তৈরি করে দিয়েছেন সুধীরবাবু এই বইটিতে। সেই জন্য তাঁকে আর এই বইয়ের সাহসী প্রকাশককে ধন্যবাদ।

মোট চারটি পর্বে বিন্যস্ত এই বইয়ের প্রথম পর্বে রয়েছে আশ্রমিক দিলীপকুমারের কথা, দ্বিতীয় পর্বে সংকলিত সাহিত্যিক দিলীপকুমারের মূল্যায়ন। তৃতীয় পর্বে সুরকার আর গায়ক দিলীপকুমারের শিল্পী-প্রতিভাকে স্পর্শ করে চতুর্থ পর্বে সংকলিত তাঁর সংক্ষিন্ত জীবনপঞ্জি (বর্তমান বইতে অনুল্লিখিত, কিন্ত্ত বরণমালিকা-র সম্পাদনাসূত্রে মনে আছে এই পঞ্জিটিও সুধীরবাবুরই প্রস্তুতি) আর সেখানেই স্বপন সোম মশাই প্রস্তুত করেছেন গ্রামোফোন রেকর্ডে শিল্পীর গাওয়া গানের একটি তালিকা।

দিলীপকুমারের আশ্রমজীবনের কথা উঠে এসেছে তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ শিষ্যা সাহানা দেবী আর ইন্দিরা দেবী এবং তাঁর ভ্রাতৃপ্রতিম স্নেহভাজন নীরদবরণের স্মৃতিকথনে। সাহিত্যিক দিলীপকুমারের কথা শুনিয়েছেন অন্নদাশংকর রায়, অশোক মিত্র, অলোক রায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। সাহিত্য আলোচনার মধ্যেই ফিরে ফিরে এসেছে এই সব আলোচকদের সঙ্গে দিলীপকুমারের ব্যক্তিগত নানা মুহূর্তের স্মৃতিও।

তাঁর উপন্যাসাবলি থেকে তাঁর লেখা বিভিন্ন স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ যেমন আলোচিত তেমনই তাঁর ছান্দসিক-সত্তার মধ্যে যে যুক্তিক্রম আর বিষয়বুদ্ধির প্রকাশ তাঁর ভিতরের কথাগুলি শুনিয়েছেন প্রখ্যাত ছন্দবিজ্ঞানী নীলরতন সেন। গানের লিপিবদ্ধ সুর কী ভাবে দিলীপকুমারের ভাবনায় শিল্পীর কণ্ঠে সুরবিহার হয়ে ওঠে তার দিকে পাঠক-শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন শঙ্খ ঘোষ।

দিলীপকুমার গানের ভিতর সন্ধান করতেন এক ব্যক্তিস্বরূপ। শঙ্খবাবু বলেছেন, ‘গানের সেই ব্যক্তিস্বরূপটা তৈরি হবে কোথায়? দিলীপকুমার ভেবেছিলেন সেটা তৈরি হবে রূপকারের গলায় আর রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন সেটা তৈরি হয়ে আছে সুরকারের সৃষ্টিতে। যে-কাঠামো গড়ে দিয়েছেন সুরকার, তারই মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে যে ব্যক্তি-স্বরূপ, রূপকার তাকে শুধু প্রাণ দেন তাঁর স্বরের মধ্যে।’

এরই সঙ্গে অন্বিত বিশিষ্ট সংগীততাত্ত্বিক গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের লেখাতে উদ্ধৃত দিলীপকুমারের একটি কথা। ১৯২৪ সালে পিতা দ্বিজেন্দ্রলালের গানের স্বরলিপি প্রকাশ করে তার ভূমিকায় দিলীপকুমার লিখেছিলেন : ‘স্বরলিপি দেখে গান শিক্ষা সম্বন্ধে আমার একটা কথা বলবার আছে। সেটা এই, যে কোনো গানের মধ্যে রসসঞ্চার করতে হলে শুষ্ক হুবহু অনুকরণে হয় না।

কোনো গানকে প্রাণে মূর্ত করে তুলতে হলে তাকে নিজের সৌন্দর্য অনুভূতি অনুসারে একটু আধটু বদলে নিতেই হয়।’ গায়কের এই স্বাধীনতার বিষয় বা সুরবিহারের ধারণাটি দিলীপকুমারের এক অন্তর্গত জিজ্ঞাসা, তাঁর সংগীত ভাবনার এক মূল ভরকেন্দ্র। গায়কের পক্ষাবলম্বী এহেন দিলীপকুমারের নিজের গানের সুরারোপের প্রকৃতিটি কেমন তা সুরের কারিগরি-ভাষায় উন্মোচন করেছেন সুমন চট্টোপাধ্যায় (এটি যখন লেখা তখনও তিনি কবীর সুমন হননি )।

সুমন লিখেছেন, ‘দুরূহ প্রায় অসম্ভব তাঁর গায়নভঙ্গি। তাঁর সেই নিজস্বতা এমনভাবে গ্রাস করে রাখতে চায় তাঁর সুরগুলিকে যে, সুরের সারল্যটুকুও কণ্ঠের পরিশীলন, দক্ষতা এবং উচ্চারণের স্পষ্টতার দাবি জানায়। এ ব্যাপারে দিলীপকুমারের সুর আপোসহীন।’ দিলীপকুমারের সুরের মধ্যে সুমন সুরকার হিসেবে লক্ষ্য করেছেন এক ‘ডানপিটে গতিবিধি’।

চকিতে মনে পড়ে যাবে, সুমনই তো গানে লিখেছিলেন, ‘ছিল দিলীপকুমার রায়ের কণ্ঠ/ সমস্ত সুর হন্তদন্ত।’ গানের ওই একটি চরণেরই বিস্তারিত এক টীকাভাষ্য যেন সুমনের এই নিবন্ধটি।

দিলীপকুমার রায়ের জন্মশতবর্ষে সুধীরবাবু সম্পাদিত ‘দিলীপকুমার রায় : স্মৃতি বিস্মৃতির শতবর্ষ’ বইটি এখন সহজলভ্য নয় বাজারে, তাই সেখান থেকে এই বইটির প্রায় সমস্ত প্রবন্ধ এখানে সংকলিত হওয়ায় এই বইটিই এখন দিলীপকুমার চর্চায় একটি অন্যতম আকরগ্রন্থ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রসঙ্গত ওই পূর্ববর্তী বই থেকে কেবল উজ্জ্বলকুমার মজুমদার আর বিশ্বজিত্ গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনা দু’টি এই বইতে নতুন। কিন্ত্ত অন্য দিকে সুরকাব্য ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত দিলীপকুমার রায় সম্পর্কিত ‘বরণমালিকা’ গ্রন্থটি বহুলপ্রচারের জন্য আদৌ প্রকাশিত হয়নি। ফলে সেই বই থেকে এই বইয়ে সুধীরবাবু আরও কিছু দরকারি প্রবন্ধ এখানে সংকলিত করলে ভালো হত।

যেমন বুদ্ধদেব বসু আর প্রতিভা বসুর দু’টি প্রবন্ধে ছিল গুণগ্রাহী দিলীপকুমারের অন্তরঙ্গ ছবি। মনে আছে বুদ্ধদেব সেখানে লিখেছিলেন, ‘প্রায় চল্লিশ বছর আগে, আমি যখন বাংলা সাহিত্যে নবাগত আর সমালোচকরা আমার নিন্দায় পঞ্চমুখ, সেই সময়ে দিলীপকুমার ছিলেন আমার উত্সাহদাতাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।’ বু.ব. মনে পড়িয়ে দিয়েছিলেন, নিজে সুদূর পণ্ডিচেরিতে থেকেও কীভাবে দিলীপকুমার এখানকার গুণী চিন্তাশীল মানুষদের মধ্যে যোগসূত্র রচনা করতেন চিঠির মাধ্যমে।

শুধু নিজে যুক্ত হতেন না, এখানকার মানুষদের মধ্যেও যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতেন নানাভাবে। তিনিই এখানকার সমধর্মী বা সমরুচিসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে সেতুবন্ধন করিয়ে দিতেন প্রয়োজনে। এই লেখাটির সঙ্গে সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ‘বরণমালিকা’ থেকে দিলীপকুমারের সঙ্গে বিভিন্ন গুণিজনের পত্রাবলির এক নির্বাচিত অংশ আর দিলীপকুমারের সংগীতভাবনা-বিষয়ক প্রসিদ্ধ ‘পণ্ডিচেরী অভিভাষণ’টি পুনর্মুদ্রিত হলে বইটি হয়তো সম্পূর্ণতর হত।

বইটির পরবর্তী সংস্করণে সম্পাদক এই সংযোজনের কথাটি মনে রাখতে পারেন। কারণ, স্মৃতিতে নির্বাসিত এই বিস্মৃত-প্রতিভার সঙ্গে উত্তরকালের সংযোজনের সেতু তো এখন একমাত্র এই গ্রন্থটিই!

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!