ভবঘুরে কথা
ফকির সামসুল সাঁইজি

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

মাই ডিভাইন জার্নি : দশ

এই তো সেদিনের কথা, ফকির সামসুল সাঁইজির আখড়া বাড়ির সাধুসঙ্গে গেছি। তখন এপ্রিল মাস চলছে, শীত পেরিয়ে গ্রীষ্মে প্রবেশ করেছে ঋতুচক্র। আখড়ার উদ্দেশ্যে ভোরে রওনা দিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মধ্যদুপুর। তখনো রাজশাহীতে ধোয়া ওঠা গরম পরেনি; তারপরও ঘামে ভিজতে ভিজতে পৌঁছালাম ন’হাটা বাজারে। দুপুর দুপুর সময়টাতে গ্রামের এই ছোট্ট বাজারে রিক্সাভ্যান পাওয়া বড়ই মুশকিল। একটা দোকান পর্যন্ত খোলা নেই। বাকিটা পথটা কিভাবে যাবো? ফোন করতেই কয়েক মিনিটের মাথায় মোটর সাইকেল নিয়ে হাজির উজ্জ্বল সাধু। বাকিটা পথ ঐ মোটর সাইকেলে চেপেই সাঁই সাঁই করে পারি দিয়ে দিলাম। গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে আখড়ার প্রবেশ মুখেই দেখা মিললো পরচিত বেশকিছু মুখ। দর্শন পাওয়া গেল সামসুল সাঁইজির।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। পথের পাশে ফাঁকা অংশটায় টুকটুক করে দোকানপাট বসতে বসতে ছোটখাটো মেলায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগলো না। টিমটিমে আলোর জায়গায় যখন ডেকোরেটরের বাতিগুলো একে একে জ্বলতে শুরু করলো ততক্ষণ ছোটদের ঈদ শুরু হয়ে গেছে। বড়রাও গুটিগুটি পায়ে আসতে শুরু করেছে। সাধুগুরুরা অবশ্য বিকেলের আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই জমায়েত হয়েছেন। আসন নিয়েছেন। আমি ঘুরে ঘুরে মেলা দেখছি। চা-বাদাম-তেলেভাজা-পেয়ারা-শশা এমনকি তরমুজও খাওয়া শেষ; তাও যেন মন ভরছে না। নাম ভুলে যাওয়া সামসুল সাঁইজির এক ভক্ত কিছুতেই কোনো দোকানে টাকা দিতে দিচ্ছেন না। আমি খাচ্ছি আর উনি সমানে বিল মিটিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টা অল্প সময়কাল অস্বস্তি দিলেও তার সরল ভক্তি আমাকে মুগ্ধ করে নিলো। আলাপ অবশ্য খুব এগুলো না তবে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম ছোট্ট মেলার পরিসরে; একসময় সাথে আরো অনেকেই জুড়ে গেলো। সকলের সাথে ঘুরে বেড়ালেও আমি মনে মনে যেন বার বার অনেকটা দূরে চলে যাচ্ছিলাম। আসলে প্রকৃতির মাঝে গেলেই সন্ধ্যার এই সময়টা আমাকে বড় বেশি আচ্ছন্ন করে ফেল।

ফকির সামসুল সাঁইজি

সন্ধ্যার এই সময়টা কিন্তু সত্যই দিনের অন্য সকল সময় থেকে বেশ খানিকটা আলাদা এবং অনেক বেশি বিষন্ন। সাধকের জন্য ‘প্রভাত’ আর ‘সন্ধ্যা’ এ দুইটা সময় দিনের যে কোনো সময় থেকে ভিন্ন এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এর প্রথমটা রাত থেকে দিনের দিকে যাত্রাকালের সন্ধিক্ষণ; অন্যটা দিন থেকে রাতের দিকে যাত্রাকালের সন্ধিক্ষণ। রাত যখন দিনের দিকে যাত্রা করতে করতে ক্রান্তিকালে এসে পৌঁছায় সেই সময়টাতে সর্বত্র এক ধরনের জাগরণের ফুল ফুটতে শুরু করে। মন উজ্জীবিত হতে থাকে। প্রাণশক্তি ছড়িয়ে পরে সর্বত্র। সজীবতা পাখা মেলে। তেমনি যখন আবার দিন ফুরাতে ফুরাতে রাতের দিকে হাঁটা দেয় তখন প্রকৃতিতে ঘটে তার বিপরীত চিত্র। সে সময় একটা থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয় চারপাশে। প্রাণশক্তি এই ক্রান্তিকালের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে মগ্ন হতে শুরু করে আপন বলয়ে। মনের মাঝে মেঘ জমতে শুরু করে; মন অন্তর্মুখি হতে থাকে। অবশ্য এই সময়টা খুব একটা দীর্ঘ হয় না। আবার প্রকৃতির মাঝে না থাকলে এই সময়টা টেরও পাওয়া যায় না। নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার এই সময়টা প্রত্যেক সাধকের কাছেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দিনের অষ্টপ্রহরের মধ্যে সাধকদের জন্য যে কয়টা মুর্হূত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ; তারমধ্যে সন্ধ্যাবেলা অন্যতম। কারণ এইসময়ই সাধক তার সাধন দিনের ভিত রচনা করে। আলো যখন অন্ধকারে যাত্রা শুরু করে তখনই শুরু হয় সাধকের দিবস। কারণ সাধকের কাজই অন্ধকারে আলোর রচনা করা। সাধকের এই সাধন দিবসের সূচনাটা প্রতিদিন ছন্দময় করতে এসময় সাধকরা নিজেকে পরিপাটি-পবিত্র করে, আখড়াবাড়ি পরিচ্ছন্ন করে, ধুপধোয়া দিয়ে সন্ধ্যাবাতি করে সমবেত হয়ে আরাধনায় বসে। লালন সাধকরা এ সময় গ্রহণ করে চাল-জল। তারপর সমবেত ভক্তি দিয়ে একে একে করে গুরুকে ভক্তি। এরপর একটু জল-খাবার সেবা। তারপর যার যার রীতি অনুযায়ী চলে সাধন-ভজন গান-বাজনা।

বিস্তারিত পড়ুন…


নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

২ Comments

  • শামীম , বুধবার অক্টোবর ২, ২০১৯ @ ৮:১৮ অপরাহ্ন

    আরো নতুন কিছু জানার অপেক্ষায় রইলাম,,,,,

  • uzzal , রবিবার নভেম্বর ৩, ২০১৯ @ ৭:৪৬ অপরাহ্ন

    allek shai,,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!