ভবঘুরে কথা
রবীন্দ্রনাথা ঠাকুর

যৌবনই ভোগের কাল বার্ধক্য স্মৃতিচারণের।

সময়ের সমুদ্রে আছি, কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই।

তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শক্তি।

কী পাইনি তারই হিসাব মেলাতে মন মোর নহে রাজি।

নিজের দুর্বলতার জন্যের অন্যের শক্তিকে হীন করো না।

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।

কেউ বা মরে কথা বলে, আবার কেউ বা মরে কথা না বলে। 

আগুনকে যে ভয় পায়, সে আগুনকে ব্যবহার করতে পারে না।

প্রেমের আনন্দ থাকে স্বল্পক্ষণ কিন্তু বেদনা থাকে সারা জীবন।

আগুনকে যে ভয় পায়, সে আগুনকে ব্যবহার করতে পারে না।

যাহারা নিজে বিশ্বাস নষ্ট করে না তাহারাই অন্যকে বিশ্বাস করে।

উপার্জনে আমাদের সুযোগ কম বলেই আসক্তি সঞ্চয়ে ভিতু আমরা।

নিজের অজ্ঞতা সম্বন্ধে অজ্ঞানতার মতো অজ্ঞান আর তো কিছু নাই।

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।

ভয়ের তাড়া খেলেই ধর্মের মূঢ়তার পিছনে মানুষ লুকাতে চেষ্টা করে।

যে ধর্মের নামে বিদ্বেষ সঞ্চিত করে, ঈশ্বরের অর্ঘ্য হতে সে হয় বঞ্চিত।

মনেরে আজ কহ যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক/সত্যেরে লও সহজে।

অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার ধরিয়া রাখার মত বিড়ম্বনা আর হয় না।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তবে ঘৃণা তারে যেস তৃণসম দহে।

কত বড়ো আমি’ কহে নকল হীরাটি। তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।

সংসারেতে ঘটিতে ক্ষতি লভিলে শুধু বঞ্চনা নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়। 

ছেঁড়া পাপড়ির মধ্যে আপনি ফুলের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন না।

চন্দ্রের যে কলঙ্ক সেটা কেবল মুখের উপরে, তার জ্যোৎস্নায় কোন দাগ পড়ে না।

সংসারে সাধু-অসাধুর মধ্যে প্রভেদ এই যে, সাধুরা কপট আর অসাধুরা অকপট।

যে মরিতে জানে সুখের অধিকার তাহারই। যে জয় করতে ভোগ করা তাহাকেই সাজে।

যে খ্যাতির সম্বল অল্প তার সমারোহ যতই বেশি হয়, ততই তার দেউলে হওয়া দ্রুত ঘটে।

আনন্দকে ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি হচ্ছে প্রেম।

আমরা বন্ধুর কাছ থেকে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই ও সেই জন্যই বন্ধুকে চাই।

পাশে দাঁড়িয়ে অথবা পানির দিকে তাকিয়ে আপনি কখনোই সমুদ্র অতিক্রম করতে পারবেন না।

নিন্দা করতে গেলে বাইরে থেকে করা যায়, কিন্তু বিচার করতে গেলে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়।

এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি – রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

যায় যদি লুপ্ত হয়ে থাকে শুধু থাক এক বিন্দু নয়নের জল কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল।

আমার এই আমির মধ্যে যদি ব্যর্থতা থাকে তবে অন্য কোনো আমিত্ব লাভ করিয়া তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাইব না।

সামনে একটা পাথর পড়লে যে লোক ঘুরে না গিয়ে সেটা ডিঙ্গিয়ে পথ সংক্ষেপ করতে চায়-বিলম্ব তারই অদৃষ্টে আছে।

যে লোক পরের দুঃখকে কিছুই মনে করে না তাহার সুখের জন্য ভগবান ঘরের মধ্যে এত স্নেহের আয়োজন কেন রাখিবেন।

নিজের গুণহীনতার বিষয়ে অনভিজ্ঞ এমন নির্গুণ শতকরা নিরেনব্বই জন, কিন্তু নিজের গুণ একেবারে জানে না এমন গুণী কোথায়? 

অপর ব্যক্তির কোলে পিঠে চড়িয়া অগ্রসর হওয়ার কোন মাহাত্ম্য নাই, কারণ চলিবার শক্তিলাভই যথার্থ লাভ, অগ্রসর হওয়া মাত্র লাভ নহে।

অতীতকাল যত বড় কালই হোক নিজের সম্বন্ধে বর্তমান কালের একটা স্পর্ধা থাকা উচিত। মনে থাকা উচিত তার মধ্যে জয় করবার শক্তি আছে।

প্রত্যেকের সাধ্যমতো যে ভালো সেই তাহার সর্বোত্তম ভালো, তাহার চেয়ে ভালো আর হইতে পারে না-অন্যের ভালোর প্রতি লোভ করা বৃথা।

অতিদূর পরপারে গাঢ় নীল রেখার মতো বিদেশের আভাস দেখা যায়– সেখান হইতে রাগ-দ্বেষের দ্বন্দ্বকোলাহল সমুদ্র পার হইয়া আসিতে পারে না।

কলস যত বড়ই হউক না, সামান্য ফুটা হইলেই তাহার দ্বারা আর কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তখন যাহা তোমাকে ভাসাইয়া রাখে তাহাই তোমাকে ডুবায়।

ভালোবাসা হলো একমাত্র বাস্তবতা, এটি শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত নয়। এটি হলো একটি চিরন্তন সত্য যা যেই হৃদয়ে সৃষ্টি হয়, সেই হৃদয়ে থাকে।

যে ছেলে চাবামাত্রই পায়, চাবার পূর্বেই যার অভাব মোচন হতে থাকে; সে নিতান্ত দুর্ভাগা। ইচ্ছা দমন করতে না শিখে কেউ কোনকালে সুখী হতে পারেনা।

বিনয় একটা অভাবাত্মক গুণ। আমার যে অহংকারের বিষয় আছে এইটে না মনে থাকাই বিনয়, আমাকে যে বিনয় প্রকাশ করিতে হইবে এইটে মনে থাকার নাম বিনয় নহে।

হঠাৎ একদিন পূর্ণিমার রাত্রে জীবনে যখন জোয়ার আসে, তখন যে একটা বৃহৎ প্রতিজ্ঞা করিয়া বসে জীবনের সুদীর্ঘ ভাটার সময় সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে তাহার সমস্ত প্রাণে টান পড়ে।

হাল ছাড়ব না, কিন্তু কোন দিক বাগে হাল চালাতে হবে সেটা যদি না ভাবি ও বুদ্ধিসংগত তার একটা জবাব না দিই তবে, মুখে যতই আস্ফালন করি, ভাষান্তরে তাকেই বলে হাল ছেড়ে দেওয়া।

পৃথিবীতে সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস আমরা যাহা কিছু পাই তাহা বিনামূল্যেই পাইয়া থাকি , তাহার জন্য দরদস্তুর করিতে হয় না। মূল্য চুকাইতে হয় না বলিয়াই জিনিসটা যে কত বড়ো তাহা আমরা সম্পূর্ণ বুঝিতেই পারি না। 

সংসারে সেরা লোকেরাই কুড়ে এবং বেকার লোকেরাই ধন্য। উভয়রে সম্মিলন হলেই মণি কাঞ্চন যোগ। এই কুঁড়ে বেকারে মিলনের জন্যইতো সন্ধ্যেবেলাটার সৃষ্টি হয়েছে।যোগীদরে জন্য সকালবেলা রোগীেদের জন্য রাত্রি কাজের লোকদের জন্য দশটা-চারটে।

আমরা সকলেই পৃথিবীতে কাহাকেও না কাহাকেও ভালোবাসি, কিন্তু ভালোবাসিলেও বন্ধু হইবার শক্তি আমাদের সকলের নাই। বন্ধু হইতে গেলে সঙ্গদান করিতে হয়। অন্যান্য সকল দানের মতো এ দানেরও একটা তহবিল দরকার, কেবলমাত্র ইচ্ছাই যথেষ্ট নহে।

সত্যকে যখন অন্তরের মধ্যে মানি তখনই তাহা আনন্দ, বাহিরে যখন মানি তখনই তাহা দুঃখ। অন্তরে সত্যকে মানিবার শক্তি যখন না থাকে তখনই বাহিরে তাহার শাসন প্রবল হইয়া উঠে। সেজন্য যেন বাহিরকেই ধিক্কার দিয়া নিজেকে অপরাধ হইতে নিষ্কৃতি দিবার চেষ্টা না করি।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!