ভবঘুরে কথা
বেণীবাধব ব্রহ্মচারী

-শ্রী সুভাষ চন্দ্র বর্মণ

এই আট প্রকার ব্রতানুষ্ঠানে উপবাসকালে গুরু প্রদত্ত নিয়মানুসারে চলতে হতো। গুরুদেব জানতেন কখন কি করতে হবে। এই আট প্রকার ব্রতপালনে পূর্বোক্ত ব্রতটি সম্পূর্ণরূপে অভ্যস্ত ও আয়ত্ত না হওয়া পর্যন্ত পরেরটিতে যাওয়ার অধিকার নেই। এই আট প্রকার ব্রত সুষ্ঠুভাবে পালন করে সম্পন্ন করতে ব্রহ্মচারী লোকনাথ ও বেণীমাধবের প্রায় চল্লিশ বছরকাল কেটে গেল। সেই সময় শিষ্যদের বয়স পঞ্চাশ আর গুরুদেবের বয়স শতোর্ধ।

এই সকল ব্রত বিশেষ করে মাসাহব্রত উদযাপনকালে যাতে শিষ্যদের যোগাভ্যাসে কোনো প্রকার বিঘ্ন না ঘটে সে দিকে গুরু ভগবান গাঙ্গুলী বিশেষ দৃষ্টি রাখেন। লোক সমাজের নানা প্রকার আচার-ব্যবহার দর্শনে যোগ সাধনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, এই আশঙ্ক্ষায় তিনি শিষ্যদিগকে ব্রহ্মচর্য পালনের সময় লোকালয়ে যেতে দিতেন না। তাঁদের যোগসাধনা বা ধ্যান যাতে ভঙ্গ না হয়, সেজন্য গুরু তাঁদের সর্বপ্রকার পরিচর্যা এমনকি মল-মূত্র অপসারণ ও শৌচ ক্রিয়াদি পর্যন্ত নিজ হস্তে সমাধা করে দিতেন। এমন পরম দয়াল গুরু পৃথিবীতে সত্যিই বিরল।

সুদীর্ঘকাল গভীর বন-জঙ্গলে কঠোর ব্রহ্মচর্য ও তজ্জনিত আনুষ্ঠানিক ব্রতনিয়মাদি পালন করে গুরু ভগবান গাঙ্গুলী, লোকনাথ ব্রহ্মচারী ও বেণীমাধবের দেহ ও মন পরবর্তী আরও কঠোর কাজের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে লাগলেন। গুরুদেবের আদেশক্রমে লোকনাথ ও বেণীমাধব উভয়ই দ্বিতীয় বারের মতো ‘মাসাহব্রত’ আরম্ভ করলেন। এই কঠিন ব্রতানুষ্ঠানকালে গুরুদেব ভীষণ চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। গুরুদেব শিষ্যদের মুখপানে তাকিয়ে থাকতেন আর তিনি ইষ্টদেবতার কাছে দু’হাত তুলে শিষ্যদের জন্য প্রার্থনা জানাতেন। এবারের পরীক্ষায় লোকনাথ উত্তীর্ণ হলেন আর বেণীমাধব অল্প কিছুকাল বাকী ছিল। বছরের পর বছর হিমালয়ে প্রশান্ত নির্জনতায় গুরুর নির্দেশ মতো লোকনাথ ও বেণীমাধবের সাধন নিয়মিতভাবে চলতে লাগলো।

একদিন গুরু ভগবানের আপ্রাণ চেষ্টা অপর দিকে গুরুবাক্যে শিষ্যের সুদৃঢ় প্রত্যয়। এইরূপে আরও পঞ্চাশ বছর স্তরের পর স্তর অষ্টাঙ্গ যোগের কঠোর সাধনা সমাপ্ত করেন। এইভাবেই লোকনাথ ও বেণীমাধবের আশা পূর্ণ হলো। সমাধি অবস্থায় উভয়েই স্বীয় আত্মায় ‘ব্রহ্ম দর্শন’ করলেন এবং তাঁদের ‘ব্রহ্মজ্ঞান’ লাভ হলো। ব্রহ্ম দর্শন ও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ পূর্ণানন্দ অবস্থাস্বরূপ। এই অবস্থায় জীবাত্মা অনন্ত আনন্দ সাগরে ডুবে থাকেন।

ধন্য গুরু ভগবান। তুমি বড় আশা করে কচি শিশু লোকনাথ ও বেণীমাধবকে নিয়ে গৃহত্যাগ করেছিলে। আজ তোমার মনের আশা পূর্ণ হলো। ধন্য তোমার শিষ্য বাৎসল্য। পৃথিবী যতদিন থাকে ততদিন স্মৃতি হয়ে থাকবে তোমার শিষ্যপ্রীতি ও অনন্য ত্যাগের ইতিহাস!

লোকনাথ ব্রহ্মচারী ও বেণীমাধব ব্রহ্মচারী দ্বিতীয় মাসাহব্রত সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে একটি সত্য যুগের আবির্ভাব হলো। সমাধি ভঙ্গের পর যোগী লোকনাথ চক্ষুরুন্মীলন করে সম্মুখে গুরু ভগবানকে দেখলেন এবং তাঁকে দর্শন মাত্রই বাস্প রুদ্ধকণ্ঠে বলতে লাগলেন, তুমি যেমন ছিলে, তেমনই রয়ে গেলে। তোমার এ অবস্থা আমাদের বড় কষ্ট হচ্ছে। তোমার যে কবে মুক্তিলাভ হবে, তা ভেবে আমরা বড়ই আকুল হচ্ছি।

শিষ্যদের এইরূপ আকুলতা দেখে মহাজ্ঞানী গুরু ভগবান বললেন, ‘বাবা লোকনাথ, বেণীমাধক, আমি চিরদিনই জ্ঞানযোগাবলম্বী। কর্মযোগে এইরূপ সিদ্ধিলাভের জন্য আমি নিজে যত্ন করতে পরিনি। তোমাদের কর্মপথে চালিয়ে আমি এই শিক্ষালাভ করলাম যে, নিষ্কাম কর্মসাধনই জীবের মুক্তি লাভের শ্রেষ্ঠ পন্থা।’

ব্রহ্মচারীদ্বয় গুরুকৃপা পরিচালিত হয়ে মুক্ত হয়েছেন আর স্বয়ং গুরু ভগবান রয়ে গেলেন, এই হৃদয়ে বিদারক ভাবটি শিষ্য লোকনাথের গভীর মনোবেদনার কারণ হলো জ্ঞানবৃদ্ধ গুরু ভগবান তখন তাঁদেরকে প্রবোধ বাক্যে বললেন- ‘লোকনাথ আমি শীঘ্রই এই দেহপাত করে পুনরায় জন্মগ্রহণ করবো। তখন তুমি হবে আমার গুরু এবং তুমি আমাকে তোমার পথে পরিচালিত করবে।’ লোকনাথ গুরুর এই আশ্বাস বাক্য শ্রবণ করে শিষ্যসুলভ কাতর কণ্ঠে বলতে লাগলেন- ‘গুরু তুমি তোমার এই সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যা-বুদ্ধি নিয়ে পুনরায় জন্মগ্রহণ করবে এবং আমার শিষ্য হবে। আমি কীরূপে তোমার সংস্কার পরিবর্তন করে তোমাকে কর্মপথে প্রবৃত্ত করবো?’

তখন গুরু ভগবানের বয়স দেড়শ বছরের কাছাকাছি আর শিষ্য গুরুর নিকট প্রায় শত বছরের বালকমাত্র। কী মধুর গুরুস্নেহ! আর কী একনিষ্ঠ গুরুভক্তি! এই পরিস্থিতি দেখে বেণীমাধব নীরবে চোখের জলে ভাসছে। তিনি চাইছেন গুরুকে সেই পথেই উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বিধির বিধান পূর্ব নির্ধারিত। বাবা লোকনাথ গুরুর উদ্ধার করে জগতে সত্যযুগের পুনরাবৃত্তি করবে। আর ভক্তের মাঝে লীলা করে যাবে লীলাময় বাবা লোকনাথ।

হিমালয় হতে লোকনাথ ও বেণীমাধবসহ অবতরণ করতে করতে লোকহিতার্থে তিনি দীর্ঘকাল পর পুনরায় ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এসে উপস্থিত হলেন। এখানে এসে তাঁরা কাবুলের পথ ধরলেন। গুরুর উদ্দেশ্য কোরান শাস্ত্র পাঠ করে ইসলাম ধর্মের সারতত্ত্ব গ্রহণ করা। কাবুল মুসলমানদের রাজ্য। সেখানে তখন মোল্লা সাদী বাস করতেন। তাঁর জন্ম ১১৭৪ বঙ্গাব্দ এবং মৃত্যু ১২৯২ বঙ্গাব্দ। শেষ সাদী সুবিখ্যাত পারস্যদেশীয় সাধক কবি। গুরু ভগবান, লোকনাথ ও বেণীমাধব কাবুলে পৌঁছে মোল্লা সাদীর গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং যথা সময়ে তাঁর নিকট আরবি ভাষা শিক্ষা ও কোরান শাস্ত্র পাঠ করে ইসলাম ধর্মের মূলতত্ত্ব সংগ্রহ করে নিলেন।

কাবুল পরিত্যাগ করে তাঁরা কালীধামের অভিমুখে যাত্রা করলেন। পথে হিতলাল মিশ্র নামে এক মহাপুষের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটে। এই হিতলাল মিশ্রই কাশীধামের খ্যাতনামা মহাপুরুষ তৈলঙ্গ স্বামী। তাঁর জন্ম ১০১৪ বঙ্গাব্দ, তিরোধান ১২৯৮ বঙ্গাব্দ।

গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর দিনগুলিএকটি একটি করে কমে আসছে। শিষ্যদের জন্য আকুল তাঁর প্রাণ। তিনি বালকদ্বয়ের মাতা, পিতা ও গুরু। তিনি চলে যাবেন কিন্তু সন্তান দুইটিকে কার কাছে রেখে যাবেন- এই তাঁর ভাবনা। হায়রে গুরুর প্রাণ! গুরু ভগবান হিতলাল মিশ্রকে নির্ভরযোগ্য জেনে তাঁর হাতে লোকনাথ ও বেণীমাধবকে সমর্পণ করে স্নেহার্দ্রকণ্ঠে বললেন- ‘মিশ্র ঠাকুর’ আমার এই বালক দুইটিকে আমি তোমার হাতে অর্পণ করলাম, তুমি তাদের ভার গ্রহণ কর।’ মিশ্র ঠাকুর লোকনাথ ও বেণীমাধবের ভার গ্রহণ করলেন এবং গুরু ভগবান গাঙ্গুলী ভাবনামুক্ত হলেন। তখন বালক দুটির অর্থাৎ লোকনাথ ও বেণীমাধবের বয়স একশ বছর।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে গুরু ভগবানের ইহকালের শেষ রজণী প্রভাত হলো। শিষ্যদ্বয়কে বললেন, ‘আমি গঙ্গাস্নানে চললাম, স্নানান্তে কিছুকাল জপ করবো- বাসনা। এরূপ বাক্য কোনদিন রেখে গঙ্গায় যাননি। তিনি গঙ্গায় যেয়ে স্নানাদি সমর্পন শেষে মণিমার্ণিকার ঘাটে জপে আসনে বসে দেহত্যাগ করলেন। শাস্ত্রের বিধান অনুসারে গুরু ভগবানের পাঞ্চভৌতিক দেহের দাহ-ক্রিয়া মণিকার্ণিকার ঘাটে সম্পন্ন করেন। দেড়শত বছরের বয়:ক্রমকালে গুরু ভগবান তাঁর গুরুলীলা সাঙ্গ করলেন। ১২৩৫ বঙ্গাব্দে গুরু ভগবান গাঙ্গুলী দেহত্যাগ করেন। গুরুকে তুলে নেবার ভার শিষ্যরূপী গুরুর উপর থেকেই গেল।

মহাপুরুষ লোকনাথ ও বেণীমাধব ব্রহ্মদর্শন লাভ করেছেন। এখন ব্রহ্ম সৃষ্টির অংশবিশেষ এই পৃথিবীর যথাসম্ভব কতকাংশ পর্যটন করে দেখার ইচ্ছা হলো। আরও আছেন মুক্ত পরিব্রাজক গুরুস্থানীয় হিতলাল মিশ্র ঠাকুর। বেণীমাধবসহ লোকনাথ যথাক্রমে পশ্চিম-উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ভূ-দর্শনে যাত্রা করবেন। সাধুর দেশ ভ্রমণে কম্বল আর কমণ্ডলুই যথেষ্ট। বেণীমাধব লোকনাথের নেতৃত্ব সব সময়েই মেনে নিতেন। প্রতিশ্রুতি ছিল প্রয়োজনকালে হিতলাল মিশ্র নিজেই তাঁদেরকে খোঁজ করে নেবেন। যথা সময়ে বেণীমাধবকে নিয়ে লোকনাথ পদব্রজে পশ্চিমাঞ্চল অভিমুখে রওনা হলেন। আফগানিস্তান ও পারস্য দেশ অতিক্রম করে তাঁরা আরবদেশে উপনীত হলেন, মুসলমানদের তীর্থস্থান মক্কা ও মদিনা নগরী দর্শন করা তাঁদের উদ্দেশ্যে। মক্কায় হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জন্মস্থান, আর মদিনায় তিনি ইহলীলা সম্বরণ করেন। দীর্ঘ মরুপথ অতিক্রম করে প্রথমে তাঁরা মক্কায় উপস্থিত হন।

আরব দেশ হতে স্থলপতে লোকনাথ ও বেণীমাধব এশিয়া মাইনর, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি ও সুইজারল্যান্ড অতিক্রম করে ফ্রান্স দেশে উপস্থিত হলেন। ইউরোপ হতে পুন: স্থলপথেই লোকনাথ ও বেণীমাধব ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তন করতে হলো। এবার বরফের দেশ উত্তরাঞ্চলের পালা। লোকনাথ বেণীমাধবকে নিয়ে হিমালয়ের বদরিকা আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। অতি প্রাচীনকালে এখানে মহামুনি ব্যাসদেবের আশ্রম ছিল। এখানে বদরীনারায়ণ নামে বিষ্ণু মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। এই অঞ্চলে হরিদ্বার, কেদারনাথ ও গাঙ্গোত্রী প্রভৃতি কয়েকটি তীর্থস্থান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পুত-সলিলা গঙ্গা মানস সরোবরের নিকট গঙ্গোত্রী হতে উৎপত্তি হয়ে এই সকল স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্নভূমিতে নেমে আসেন। পূর্ণ কুম্ভযোগ উপলক্ষে প্রয়োগাদি তীর্থস্থানসমূহ সাধু-সন্ন্যাসীর মহাসম্মেলনের নাম কুম্ভমেলা। হরিদ্বার কুম্ভমেলার অন্যতম তীর্থক্ষেত্র।

…………………………………………………………..
গ্রন্থসূত্র:
১. শ্রীশ্রীলোকনাথ মাহাত্ম্য -শ্রী কেদারেশ্বর সেনগুপ্ত।
২. শিবকল্প মহাযোগী শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী -শ্রীমৎ শুদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!