‘বাবাজী’ আধুনিক ভারতের মহাযোগী

‘বাবাজী’ আধুনিক ভারতের মহাযোগী

বদরীনারায়ণের কাছে উত্তর হিমাচলপ্রদেশের শৈলশিখর লাহিড়ী মহাশয়ের গুরু বাবাজী মহারাজের দিব্য উপস্থিতিতে এখনও এক পুণ্যস্থান। নিঃসঙ্গ মহাগুরু তাঁর নশ্বরদেহ শতাব্দীর পর শতাব্দী, হয়তোবা যুগযুগান্ত ধরে রক্ষা করে আসছেন। মরণজয়ী বাবাজী একজন ‘অবতার’। এই সংস্কৃত শব্দটির অর্থ হলো- ‘অবতরণ’। ‘অব’ (নীচে) এবং ‘তৃ’-এই ধাতুদ্বয় থেকে শব্দটির উৎপত্তি। হিন্দুশাস্ত্রে অবতার কথার মানে হ’ল- দেবগণের শরীরিরূপে মর্ত্যে আগমন।

শ্রীযুক্তেশ্বরজী একদিন আমায় আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন, ‘বাবাজীর আধ্যাত্মিক অবস্থা মানবকল্পনারও অতীত। মানুষের ক্ষুদ্রদৃষ্টি তাঁর অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক জ্যোতিঃ ভেদ করতে অক্ষম। এই অবতারের যোগৈশ্বর্য কল্পনাই করা যায় না। এ একেবারে ধারণার অতীত।’ ‘উপনিষদে’ আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতিটি অবস্থার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে। ‘সিদ্ধ’ মহাপুরুষগণ ‘জীবন্মুক্ত’ অবস্থায় ( জীবিত অবস্থায় মুক্তিলাভ ) উন্নীত হবার পর ‘পরামুক্ত’ অবস্থা (পূর্ণ মুক্তিলাভ ঘটে, মরণের অতীত হওয়া) লাভ হয়; এই পরামুক্তি যাঁর ঘটেছে, তিনি মায়ার নাগপাশ ছেদন আর জন্ম-মৃত্যুর হাত সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছেন।

কাজেই পরামুক্ত যিনি, তিনি কদাচিৎ নশ্বরদেহে প্রত্যাবর্তন করেন; আর যদিই বা করেন, তা অবতার হবার জন্য, সংসারের উপর দেবতার আশীর্বাদ বর্ষণ করতে তিনি ঈশ্বরপ্রেরিত মহাপুরুষ হয়েই এ জগতে আগমন করেন। অবতার কখনও প্রকৃতবিধির অধীন হন না। তাঁর শুদ্ধদেহ, যা কেবল আলোকনির্মিত প্রতিমূর্তির মতই পরিদৃশ্যমান, তার উপর প্রকৃতির কোনই আধিপত্য থাকে না‌। বাহ্যিক দৃষ্টিতে অবতারের আকৃতিতে কোনই বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয় না; কিন্তু সময়বিশেষে এর কোন ছায়া বা পদচিহ্ন মাটির উপর পরতে দেখা যায় না। মায়ান্ধকার আর জড়বন্ধনের হাত হতে অন্তর যে মুক্ত- এইসব লক্ষণগুলিই হচ্ছে তাদের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

এরূপ পরম ভাগবতেরাই কেবল জীবনমৃত্যুর আপেক্ষিক সম্বন্ধের পিছনে আসল সত্যকে অবগত আছেন। ওমর খৈয়াম, যার কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবসম্বন্ধে অনেকেরই ভ্রান্ত ধারণা, তিনি তাঁর অমর কবিতা ‘রুবায়েতে’, এইরূপ মহাপুরুষ সম্বন্ধে বলে গেছেন-

‘‘অন্তরে মোর আনন্দেরি রাকাশশীর হাসির মাঝ
এই গগনের উজলকিরণ চাঁদের উদয় আবার আজ;
বৃথাই আমার খোঁজের তরে, উদয়পথে চলার কাল
এই বাগিচার কুঞ্জমাঝে, মেলবে সে তাঁর দৃষ্টিজাল।’’

এই ‘আনন্দের রাকাশশী’ হচ্ছেন ঈশ্বর- সেই চিরন্তন ধ্রুবতারা, কালের বুকে যিনি অটল স্থির। আর “এই গগনের চাঁদ” হচ্ছে বাইরের বিশ্বজগৎ, যা সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়ের নিয়মাধীন। পারস্যের এই দ্রষ্টাকবি তাঁর আত্মোপলব্ধিবলে “এই বাগিচা” অর্থাৎ এই পৃথিবীতে প্রকৃতি বা মায়ার বশবর্তী হয়ে পুনঃ পুনঃ ফিরে আসার হাত থেকে চিরতরে মুক্তিলাভ করেছেন।

“বৃথাই আমার খোঁজার তরে, মেলবে সে তার দৃষ্টিজাল”
-চিরমুক্তির জন্য ঘূর্ণায়মান বিশ্বের কি নিষ্ফল অনুসন্ধান!

যীশুখ্রীষ্ট তাঁর মুক্তিসম্বন্ধে আর এক উপায়ে বর্ণনা করে গেছেন- ‘তারপর জনৈক লিপিকর এসে তাঁকে বলল, প্রভু! আপনি যেখানেই যান না কেন, আমি আপনাকে অনুসরণ করব। তখন যীশু তাকে বললেন, শেয়ালদের গর্ত আছে, আকাশের পাখিদেরও নীড় আছে, কিন্তু মানবপুত্রের মাথা রাখবার ঠাঁই নাই।’

সর্বব্যাপিত্বের দ্বারা দিকদিগন্ত বিস্তৃত যীশুখ্রীষ্টকে সত্যই কি কোথাও অনুসরণ করা যায়- কেবল সেই সর্বব্যাপী পরমাত্মার ভিতর ছাড়া ?

শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্র, বুদ্ধদেব, পতঞ্জলি- এঁরাই হচ্ছেন প্রাচীন ভারতীয় অবতার। অগস্ত্য নামে দক্ষিণ ভারতের এক অবতারের নামে তামিল ভাষায় বহু কাব্যসাহিত্য রচিত হয়েছে। খ্রিস্টিয় যুগের পূর্বে এবং পরে বহু শতাব্দী ধরে তিনি নানা অলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। কথিত আছে যে, অদ্যাবধি তিনি নশ্বরদেহে বর্তমান।

ভারতবর্ষের বাবাজীর জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভাববাদীদের বিশেষ কর্তব্য পালনে সহায়তা করা। শাস্ত্রীয় লক্ষণানুসারে তিনি ‘মহাবতার’ পদবাচ্য। তিনি বলেছেন যে, তিনি স্বামী সম্প্রদায়ের পুনর্গঠক জগৎগুরু শঙ্করাচার্য, (ইতিহাসপ্রসিদ্ধ গোবিন্দ যতীর শিষ্য শঙ্করাচার্য কাশীতে বাবাজী মহারাজের কাছ থেকে ক্রিয়াযোগে দীক্ষা প্রাপ্ত হন। লাহিড়ী মহাশয় এবং স্বামী কেবলানন্দজীকে এই কাহিনী বলবার সময় বাবাজী সেই জগদ্বরেণ্য অদ্বৈতবাদী শঙ্করাচার্যের সহিত সাক্ষাতের হৃদয়গ্রাহী ব্যাপারও বর্ণনা করেছিলেন)।

আর মধ্যযুগের মহাগুরু সন্ত কবীরকে যোগদীক্ষা দেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁর প্রধান শিষ্য হচ্ছেন, লুপ্ত ক্রিয়াযোগের পুনরুদ্ধারক লাহিড়ী মহাশয়। মহাবতার সর্বদা খ্রিষ্টের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে রয়েছেন; সর্বদাই তাঁরা যুক্তভাবে মুক্তির স্পন্দন প্রেরণ করছেন আর বর্তমান যুগে মুক্তির জন্য আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ারও ব্যবস্থা করেছেন। এই দুই পূর্ণজ্ঞানী মহাগুরুদের একজন শরীরী আর অন্যজন অশরীরী।

এঁদের কাজ হচ্ছে যুদ্ধ, জাতিবৈষম্য, ধর্মের গোঁড়ামি আর জড়বাদের অশুভ প্রতিক্রিয়া- এ সকল পরিত্যাগ করবার জন্য সকল জাতিকে উদ্বুদ্ধ করা। বাবাজী আধুনিককালের গতিপ্রকৃতি বেশ ভালরকমই জানেন, বিশেষতঃ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব আর তার জটিলতা প্রসঙ্গে; এবং সেই সঙ্গে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে আত্মোন্নতিবিধায়ক যোগের ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজনীয়তাও তিনি উপলব্ধি করেন।

বাবাজীর সম্বন্ধে যে কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় না, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। এর কারণ- কোন শতাব্দীতেই মহাগুরু কখনও প্রকাশ্যে আবির্ভূত হন নি। তাঁর যে যুগযুগান্তব্যাপী কর্মপ্রচেষ্টা, তাতে প্রচার কার্যের চিত্রবিভ্রমকারী আলোর ধাঁধা লাগাবার কোন স্থানই নেই। একমাত্র নীরব মহাশক্তিমান বিশ্বস্রষ্টারই মত বাবাজী দীন আত্মগোপনের মাধ্যমে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন।

শ্রীকৃষ্ণ বা যীশুখ্রিস্টের মত বিরাট ভাববাদীরা এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন বিশেষ লীলাপ্রদর্শনের জন্য, এবং তা শেষ হলেই তাঁরা অন্তর্ধান করেন। কিন্তু বাবাজী মহারাজের মত অন্যান্য অবতাররা ইতিহাসে কোন একটি বিশেষ আর প্রধান ঘটনা সৃষ্টি করা অপেক্ষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবজাতির ক্রমোন্নতি সাধিত করবার ব্যাপারেই নিযুক্ত থাকেন। এইরূপ মহাগুরুগণ জনতার স্থূলদৃষ্টি থেকে সর্বদাই আত্নগোপন করে থাকেন, আর ইচ্ছেমাত্র অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের থাকে।

এইসব কারণে আর যেহেতু তাঁরা নিজেদের শিষ্যবর্গকে তাঁদের সম্বন্ধে নীরবতা অবলম্বন করার উপদেশ দেন সেইজন্যও, বহু বিরাট বিরাট আধ্যাত্মিক মহাপুরুষরা জগতের কাছে অপরিচিত হয়েই থাকেন। এই বইয়ের কয়েকটি পাতায় আমি বাবাজীর জীবন সম্বন্ধে একটু আভাসমাত্র দেব। কেবলমাত্র সেই ঘটনাগুলিই উল্লেখ করবো, যা তিনি সাধারণের উপকারের জন্য প্রকাশ্যে বিবৃত করবার উপযুক্ত বলে বিবেচনা করেন।

বাবাজীর জন্মস্থান বা তাঁর পরিবারবর্গ বা সে সম্বন্ধে ঐতিহাসিকের কৌতূহলনিবারক কোনও ক্ষুদ্র তথ্যও এতাবৎ আবিষ্কৃত হয় নি। সাধারনতঃ যদিও তিনি হিন্দীতে কথাবার্তা বলেন, তবুও তিনি যে কোন ভাষায় অবলীলাক্রমে আলাপ করতে পারেন।

তিনি নিজে ‘বাবাজী’ এই অত্যন্ত সাদাসিধে নামটি গ্রহণ করেছেন। লাহিড়ী মহাশয়ের শিষ্যেরা আরও যেসব সম্মানজনক উপাধিসংযোগে তাঁকে অভিহিত করেন, সেগুলো হলো- মহামুনি বাবাজী মহারাজ, মহাযোগী, ত্র্যম্বকবাবা, শিববাবা (সবই শিবাবতারের নাম)। পরামুক্ত, জন্মমৃত্যুবন্ধনের অতীত এই মহাগুরুর সংসারজীবনের কোন নাম আমাদের জানা নেই বলে কি কিছু আসে যায়?

লাহিড়ী মহাশয় বলতেন, ‘যখনই কেউ ভক্তিভরে বাবাজীর নাম উচ্চারণ করে, সঙ্গে সঙ্গে সেই ভক্তের উপর বাবাজীর আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ বর্ষিত হয়।’

অমর মহাগুরুর দেহে বয়সের কোন চিহ্নই পরিলক্ষিত হয় না। দেখলে তাঁকে পঁচিশ বছরের এক যুবা ছাড়া আর কিছুই বোধ হয় না। উজ্জ্বলবর্ণ, মধ্যমাকৃতি, বাবাজীর অনিন্দ্যসুন্দর বলিষ্ঠ দেহ হতে একটা অপূর্ব জ্যোতিঃ বিনির্গত হচ্ছে। চক্ষু দু’টি ঘন কৃষ্ণবর্ণ, শান্ত, স্নিগ্ধোজ্জ্বল। তাঁর সুদীর্ঘ উজ্জ্বল কেশপাশ তাম্রবর্ণ। কখনও কখনও লাহিড়ী মহাশয়ের মুখের সঙ্গে বাবাজীর মুখের নিকট সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। সময় বিশেষে এই সাদৃশ্য এত অদ্ভুত হয় যে, পরবর্তীকালে লাহিড়ী মহাশয়, যুবকের মত দেখতে বাবাজী মহারাজের পিতা বলে অনায়াসে পরিচিত হতে পারেন।

আমার সাধুপ্রকৃতি সংস্কৃতের শিক্ষক মহাশয় স্বামী কেবলানন্দজী, বাবাজী মহারাজের সঙ্গে হিমালয়ে কিছুদিন ছুটি কাটিয়েছিলেন। কেবলানন্দজী আমায় বলেছিলেন, “সেই অদ্বিতীয় মহাগুরু হিমালয়ে তাঁর দলবল নিয়ে স্থান হতে স্থানান্তরে পরিভ্রমণ করেন। তাঁর ছোট্ট দলটির মধ্যে খুব উচ্চকোটির আধ্যাত্মিক অবস্থাসম্পন্ন দু’জন আমেরিকান শিষ্যও আছেন।

কোন জায়গায় কিছুকাল থাকবার পরই বাবাজী বলেন, ‘ডেরা ডাণ্ডা উঠাও!’ তিনি হচ্ছেন দণ্ডধারী। তাঁর এই কথাগুলোই হচ্ছে দলবল সমেত তৎক্ষণাৎ স্থানান্তর গমনের নির্দেশ। সর্বদাই যে তিনি এইরূপ সূক্ষ্মভাবে পরিভ্রমণ করেন তা নয়, কখনও কখনও শিখর হতে শিখরান্তরে তিনি পদব্রজেই গমনাগমন করে থাকেন।

“তিনি ইচ্ছা করলে তবেই কেউ তাঁকে দেখতে বা চিনতে পারে, তা না হলে নয়। জানা গেছে যে, তিনি ঈষৎ পরিবর্তিত বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে তাঁর নানা শিষ্যদের সম্মুখে উপস্থিত হতেন- কখনও শ্মশ্রুগুম্ফ বিশিষ্ট, কখনও বা শ্মশ্রুগুম্ফবিহীন। তাঁর অক্ষয়দেহ পোষণের জন্য কোন প্রকার আহারের প্রয়োজন হয় না বলে তিনি কদাচিৎ কোনও খাদ্য গ্রহণ করেন। শিষ্যদের দর্শনদানের সময় লৌকিকতা হিসাবে কখনও কখনও তিনি ফল, পায়েস বা ঘৃতান্ন গ্রহণ করেন।”

কেবলানন্দজী বলতে লাগলেন, “বাবাজীর জীবনের দু’টি অতি আশ্চর্য ঘটনা আমার জানা আছে। পবিত্র বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য এক রাতে প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড রচনা করা হয়েছে, তার চারপাশ ঘিরে শিষ্যেরা সব বসে আছে। মহাগুরু হঠাৎ একটা জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড গ্ৰহণ করে অগ্নিকুণ্ডের নিকটে উপবিষ্ট জনৈক শিষ্যের স্কন্ধে মৃদু আঘাত করলেন।

লাহিড়ী মহাশয় তখন সেখানে উপস্থিত। তিনি প্রতিবাদে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এ কি মশায়, কি নিষ্ঠুর আপনি!’ বাবাজী বললেন ‘ওর প্রাক্তন কর্মফলে ওকে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে হয়। চোখের সামনে তুমি কি তাই দেখতে চাও?’

“কথাগুলো বলেই তিনি তাঁর পদ্মহস্ত সেই চেলাটির ক্ষতবিক্ষত কাঁধের উপর বুলিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘আজ রাতে আমি তোমাকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি দিলাম। সামান্য একটু আগুনে পোড়া থেকেই তোমার কর্মফল খণ্ডন হয়ে গেল।’

“আর একবার- বাবাজীর সঙ্গেকার সেই সাধুসঙঘকে জনৈক অপরিচিতের আগমনে বিশেষ বিব্রত হতে হয়েছিল। গুরুর আস্তানার কাছে, পাহাড়ের একটা দুর্গম পাড় বেয়ে লোকটা সে সময় আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে সেই জায়গায় উঠে পড়েছিল।”

“অপরিসীম ভক্তিতে উজ্জ্বলবদন আগন্তুক বাবাজীকে দেখেই বলে উঠল, ‘প্রভু! আপনি নিশ্চয়ই মহাগুরু বাবাজী !
এইসব দুর্গম পাহাড়ে পর্বতে কতমাস ধরে যে আমি আপনাকে অবিরাম সন্ধান করে ফিরেছি, তা আর কি বলব। আপনার পায়ে পড়ি, দয়া করে আমায় আপনার শিষ্য করে নিন।”

“গুরুজী কোনই উত্তর দিলেন না দেখে লোকটি পায়ের নীচে এক গভীর পাহাড়ের খাদ দেখিয়ে বলল, ‘যদি আপনি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আমি এই পাহাড় থেকে লাফিয়ে পরব। ভগবানকে লাভ করতে গেলে আপনার মত লোকের কাছ থেকেই যদি না উপদেশ পেলাম তবে আর আমার জীবনের মূল্য রইল কি?”

“বাবাজী ভাবলেশহীন মুখে শুধুমাত্র বললেন, ‘পর তা হলে লাফিয়ে। তোমার এখনকার অবস্থায় আমি তোমায় গ্রহণ করতে পারি না।’

“লোকটি তৎক্ষণাৎ সেই পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে পরল। সেখানে উপস্থিত সাধুদের তো ভয়ে বিস্ময়ে বাকশক্তি লোপ পেল। বাবাজী তাঁর হতবাক শিষ্যদের সেই অপরিচিতের দেহটি কুড়িয়ে আনতে বললেন। তাঁরা যখন ক্ষতবিক্ষত পিণ্ডাকার দেহটি নিয়ে উপরে উঠে এলেন তখন সেই মহাগুরু আবার তাঁর দৈবহস্ত ঐ মৃতদেহের উপর বুলিয়ে দিলেন। আশ্চর্য! লোকটি চোখ দু’টি মেলে সেই সর্বশক্তিমান গুরুর পদতলে গভীর ভক্তির সঙ্গে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

“বাবাজী মহারাজ তখন তাঁর পুনরুজ্জীবিত চেলাটির প্রতি সস্নেহে দৃষ্টিপাত করে বললেন, ‘এখন তুমি শিষ্য হবার জন্যে উপযুক্ত হলে। তুমি খুব একটা কঠিন পরীক্ষা অতি সাহসের সঙ্গেই উৎরে গেছ। (পরীক্ষাটি আনুগত্যের। যখন মহাজ্ঞানী গুরুমহারাজ বললেন, ‘পর লাফিয়ে’, লোকটি তৎক্ষণাৎ তা পালন করল। যদি সে বিন্দুমাত্রও ইতস্ততঃ করত তা হলে সে যে বাবাজীর নির্দেশ বিনা তার জীবন বৃথাই বলে মনে করে, তার এই দৃঢ় উক্তি প্রমাণিত হত না।

যদি সে ইতস্ততঃ করত, তাহলে এটাই প্রকাশ পেত যে কখনই গুরুর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস তার নেই। কাজেই ব্যাপারটা অসাধারণ আর অতি কঠিন হলেও, এরূপ ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি একটি আদর্শ পরীক্ষা)।

মৃত্যু আর তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না; এখন তুমি আমাদের এই অমর সাধুসঙেঘর একজন হলে।’ তারপরেই তাঁর সেই সোজা কথা, ‘ডেরা ডাণ্ডা উঠাও’, আর সমগ্র দলটিও সঙ্গে সঙ্গে সেই পাহাড় থেকে অন্তর্ধান করল। অবতার সর্বব্যাপী পরমাত্মাতেই অবস্থান করেন; তাঁর জন্য কোন দূরত্বেরই কোন পরিমাপ নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাবাজীর ভৌতদেহ ধারণ করবার একটি মাত্রই কারণ থাকতে পারে এবং তা হচ্ছে- মানবজাতিকে তার ভবিষ্যসম্ভাবনার প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেওয়া।

মানুষ যদি রক্তমাংসের শরীরে দেবত্বের ক্ষণিক আভাসেরও আশা না পায়, তাহলে কখনও সে মরণ অতিক্রম করতে পারবে না- মায়ার এই গুরুতর ভ্রান্তির বশবর্তী হয়েই চিরকাল কাটিয়ে দিতে হবে।

‌যীশুখ্রিস্ট পূর্ব হতেই তাঁর জীবনধারার বিষয় অবগত ছিলেন। যে সব ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটেছে, তার প্রত্যেকটার ভিতর দিয়ে তিনি তাঁর নিজের জন্য বা কর্মফলজনিত কারণে নয়- সবকিছু সহ্য করেছেন কেবলমাত্র চিন্তাশীল মানবজাতির উদ্ধাল্যুক আর জন- তাঁর অমর নাট্যলীলা আগামী দিনের মানুষের উপকারের জন্যই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বাবাজীর কাছেও অতীত, বর্তমান, আর ভবিষ্যৎ বলে কোন আপেক্ষিকতার ছেদ নেই; আদিকাল থেকেই তাঁর জীবনের সর্বাবস্থার কথা তিনি জানতেন।

তবু মানবের সীমাবদ্ধ বোধশক্তির গ্রহণযোগ্য করে, তিনি এক বা একাধিক সাক্ষীরের জন্যে। তাঁর বাণীপ্রচারক চারজন শিষ্য ম্যাথ্যু ,মার্ক, র সম্মুখে, তাঁর দৈবজীবনের বহুলীলা প্রকটিত করেছেন।

এইরূপ একটা ব্যাপার ঘটেছিল যখন বাবাজী মহারাজ তাঁর নশ্বর দেহের অমরত্বের সম্ভাবনা ঘোষণা করবার পক্ষে সময় উপস্থিত হয়েছে বলে বিবেচনা করলেন। সে সময় লাহিড়ী মহাশয়ের একজন শিষ্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই প্রতিশ্রুতি রামগোপাল মজুমদারের সমক্ষে করেছিলেন, যাতে করে ঘটনাটি অবশেষে সুবিদিত হয়ে অনুসন্ধিৎসু মনে অনুপ্রেরণা জাগায়।

বড় বড় মহাত্মারা তাঁদের বাণী প্রদান করেও আপাতদৃশ্য স্বাভাবিক ঘটনার ধারাই অবলম্বন করেন- একমাত্র মানুষের মঙ্গলের কারণে। যীশুখ্রিষ্টও ঐ কথাই বলেছেন, “পিতা! আমি জানি যে তুমি আমার কথা সর্বদায় শুনে থাক; কিন্তু এই যে সব লোক চারিদিকে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্যেই এ কথা বললাম, যাতে করে এরা বিশ্বাস করতে পারে যে তুমিই আমায় প্রেরণ করেছ।

রনবাজপুরের সেই ‘বিনিদ্র সাধু’ রামগোপাল বাবুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি বাবাজীর প্রথম দর্শনলাভের অদ্ভূত ঘটনাটি বর্ণনা করেছিলেন। রামগোপালবাবু বলেছিলেন, “কখনও কখনও আমি নির্জন গুহা পরিত্যাগ করে কাশীতে লাহিড়ী মহাশয়ের চরণপ্রান্তে এসে উপস্থিত হতাম। একদিন গভীররাত্রে তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে নীরবে ধ্যানে বসেছি, গুরুদেব আমায় এক অদ্ভুত আদেশ করলেন, ‘রামগোপাল, এক্ষুনি তুমি দশাশ্বমেধ ঘাটে চলে যাও।’

“অতিদ্রুত সেই নির্জন স্থানে গিয়ে পৌঁছালাম‌। উজ্জ্বল নক্ষত্র আর চন্দ্রালোকে রাত তখন হাসছে। খুব ধৈর্য ধরে চুপ করে অনেকক্ষণ বসে আছি, হঠাৎ পায়ের কাছেই একটা প্রকাণ্ড প্রস্তরখণ্ডের দিকে আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হল। ধীরে ধীরে পাথরটা উপরে উঠতে লাগল, নীচে দেখা গেল মাটির তলায় একটি গুহা।

কোন এক অজ্ঞাত উপায়ে পাথরটি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর একটি সুসজ্জিতা অপরূপ রূপলাবণ্যবতী সুন্দরী রমনীমূর্তি সেই গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে উচ্চে শূন্যে এসে দাঁড়ালেন। মূর্তিটির চতুর্দিকে একটি মৃদুস্নিগ্ধ জ্যোতির্মণ্ডল বেষ্টিত। ধীরে ধীরে তিনি অবতরণ করে আমার সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন- অন্তর গভীর ব্রহ্মানন্দে নিমগ্ন। অবশেষে একটু নড়েচড়ে আমায় অতি ধীর শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি মাতাজী, (মাতাজীও বহু শতাব্দী ধরে জীবিতা আছেন।

তিনি প্রায় তাঁর ভ্রাতার মতই আধ্যাত্মিক উচ্চাবস্থাসম্পন্না। তিনি কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটের নিকট মাটির নীচে এক গুপ্ত গুহার মধ্যে ব্রহ্মানন্দে মগ্ন হয়ে অবস্থান করেন)।

বাবাজী মহারাজের ভগিনী। আমি তাঁকে আর লাহিড়ী মহাশয়কেও আজ রাত্রে আমার এই গুহায় আসতে বলেছি একটি গুরুতর বিষয় আলোচনা করবার জন্যে।’

“বলা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে নীহারিকাপুঞ্জের মত যেন একটা আলোকপিণ্ড অতি দ্রুতবেগে গঙ্গাবক্ষের উপর দিয়ে ভেসে আসছে দেখা গেল। সে অপূর্ব জ্যোতিঃ গঙ্গার অস্বচ্ছ জলের উপর প্রতিফলিত হচ্ছিল। ক্রমশঃই সেটা নিকট হতে নিকটতর হতে লাগল, এবং অবশেষে নয়নান্ধকারী বিদ্যুৎস্ফূরণের মত একটা জ্যোতিবিকাশে সেটা মাতাজীর পার্শ্বে এসে উপস্থিত হওয়ামাত্র তৎক্ষণাৎ তা ঘনীভূত হয়ে লাহিড়ী মহাশয়ের মানবমূর্তিতে পরিণত হল। তিনি সেই মহাযোগিনী সাধ্বীর পদপ্রান্তে ভক্তিভরে প্রণাম নিবেদন করলেন।

“এই অভূতপূর্ব বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম যে, রহস্যময় একটি চক্রাকার আলোকপিণ্ড আকাশপথে পরিভ্রমণ করছে। সেই ঘূর্ণায়মান জ্বলন্ত অগ্নিপুঞ্জ আমাদের দলটির কাছে দ্রুতবেগে নেমে এসে একটি সুন্দর যুবকের দেহে পরিণত হল। দেখে তখনিই বুঝতে পারলাম যে ইনিই বাবাজী মহারাজ। দেখতে ঠিক লাহিড়ী মহাশয়েরই মত- একমাত্র পার্থক্য এই যে, বাবাজী মহারাজ দেখতে আরও অল্পবয়স্ক আর তাঁর ছিল উজ্জ্বল, সুদীর্ঘ কেশপাশ।

“লাহিড়ী মহাশয়, মাতাজী ও আমি সেই মহাগুরুর পুণ্য পাদপদ্মে নতজানু হয়ে প্রণাম নিবেদন করলাম। তাঁর সেই দৈবীতনু স্পর্শ করা মাত্র অবর্ণনীয় আনন্দগরিমার একটা স্বর্গীয়ানুভূতি আমার সকল সত্তা পরিপ্লাবিত করে তার প্রতি অনুপরমানুকে পুলকাঞ্চিত করে তুললো।

“বাবাজী বললেন, ‘কল্যাণীয়া ভগিনী, আমি আমার এ দেহ বিসর্জন দিয়ে পরব্রহ্মসাগরে বিলীন হতে মনস্থ করেছি।’ “সেই মহিমময়ী মিনতীভরা নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পূজ্যপাদ গুরুমহারাজ, আমি আপনার অভিপ্রায়ের আভাস ইতিমধ্যেই পেয়েছি‌। সেই জন্যেই আজ রাত্রে আমি আপনার সঙ্গে এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে চাই। দেহত্যাগ করবেন কেন বলুন তো?’

“পরব্রহ্মসাগরে আমার আত্মার তরঙ্গ দৃশ্যই হোক আর অদৃশ্যই হোক- তাতে প্রভেদ কতটুকু?” “মাতাজী এবার অপরূপ চতুরতার সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘মরণজয়ী গুরুদেব! যদি কোন প্রভেদ নাই থাকে, তবে দয়া করে আপনি আর কখনো দেহত্যাগ করবেন না।” (এই ঘটনা থেলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জগদ্বিখ্যাত গ্ৰীক দার্শনিক এই কথাই বলেছিলেন যে, জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

একজন সমালোচক জিজ্ঞাসা করেছিল, “তা হলে আপনি মরেন না কেন?” তাতে থেলস উত্তর দেন, “কারণও একই কথা, তাতেও কো পার্থক্য নেই)” “বাবাজী গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, ‘তবে তাই হোক্। আমি কখনও আমার এ জড়দেহ আর পরিত্যাগ করব না। এই দেহ পৃথিবীতে, অনন্তঃ জনকতকের কাছেও সর্বদায়ই দৃশ্য হয়ে থাকবে। পরমেশ্বর তোমার মুখ দিয়েই তাঁর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন।’

পরম শ্রদ্ধাস্পদ এই তিন ব্যক্তির কথোপকথন যখন সভয়ভক্তির সঙ্গে শুনছিলাম, সেই মহাগুরু তখন আমার দিকে ফিরে প্রসন্নভাবে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না রামগোপাল, এই অমর প্রতিজ্ঞার দৃশ্যে সাক্ষী হতে পেরে তুমি সত্যিই ভাগ্যবান।’

“বাবাজীর মধুর কন্ঠস্বরের ঝঙ্কার শেষ হতে না হতেই তাঁর আর লাহিড়ী মহাশয়ের মূর্তি ধীরে ধীরে শূন্যে ভেসে উঠে দুলতে দুলতে গঙ্গার উপর দিয়ে আবার পিছু হটে চলল। নিশাকাশে তাঁদের দেহ অদৃশ্য হবার সময় অত্যুজ্জ্বল আলোকের একটা ছটা তাঁদের সমস্ত শরীর আচ্ছাদিত করে রেখেছিল। মাতাজীর দেহও শূন্যে উঠে ভাসতে ভাসতে গুহার কাছে গিয়ে তার মধ্যে অবতরণ করল, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডটিও নেমে এসে গুহা মুখটি আচ্ছাদিত করল- যেন কোন অদৃশ্য হস্তেরই এ কাজ।

“অপরিসীম অনুপ্রাণিত হয়ে আমি লাহিড়ী মহাশয়ের বাড়ির দিকে ধীরে ধীরে ফিরে চললাম। পৌঁছালাম যখন, তখন সবেমাত্র ভোর হয়েছে; তাঁর সামনে গিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াতে তিনি সমস্তই বুঝে আমার দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘রামগোপাল, আমি তোমার জন্যে আনন্দিতই হয়েছি। বাবাজী আর মাতাজীকে দর্শনের অভিলাষ যা তুমি আমার কাছে ব্যক্ত করতে, অবশেষে তার একটা অত্যাশ্চর্য পরিণতি ঘটল।’

“আমার গুরুভাইয়েরা আমায় জানালেন যে, মধ্যরাত্রিতে আমি চলে যাবার পর থেকে লাহিড়ী মহাশয় তাঁর আসন থেকে বিন্দুমাত্রও নড়েন নি। “একটি চেলা বললেন, আপনার দশাশ্বমেধ ঘাটে চলে যাবার পর তিনি অমরত্ব সম্বন্ধে একটি অপূর্ব ব্যাখ্যা প্রদান করলেন।’ শাস্ত্রে লেখা সেই সত্য তখন সর্বপ্রথম পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম যে, পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান যার লাভ হয়েছে, তিনি একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে দুই বা ততোধিক শরীরে আবির্ভূত হতে পারেন।

রামগোপালবাবু তাঁর কাহিনীর সমাপ্তিতে বললেন, “লাহিড়ী মহাশয় পরে এই জগৎসংসার সম্বন্ধে গূঢ় দৈবপরিকল্পনার বহু দার্শনিক তথ্য আমায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। আমাদের এই জগৎসংসারের অবস্থিতিকাল পর্যন্ত বাবাজী স্বদেহে অবস্থান করবেন, এইটাই ভগবানের অভিপ্রায়। যুগযুগান্তর আসবে, আবার চলেও যাবে – কিন্তু আমাদের মরণজয়ী মহাগুরু শতাব্দীর পর শতাব্দী নাট্যাভিনয় দেখাবার জন্য এই সংসার-নাট্যমঞ্চ উপস্থিত থাকবেন।

“সত্যসত্যই আমি তোমাদিগকে বলছি যে, কেউ যদি আমার বাক্য পালন করে (কূটস্থচৈতন্যে অখণ্ডভাবে অবস্থান করে), তাহলে তার কখনও মৃত্যুর সাক্ষাৎকার লাভ হবে না ”

এই কথাগুলিতে যীশুখ্রিষ্ট জড়দেহে অমরজীবন লাভের কথা বলেছেন না- যে একঘেয়ে জীবনের কারাবাসের শাস্তি পাপীদের দেওয়া যায় না, সাধুদের তো দূরের কথা! যীশুখ্রিষ্ট যার কথা বলছেন তিনি হচ্ছেন আত্মোপলব্ধ সেই লোক, যিনি অজ্ঞানের মহানিদ্রা হতে অনন্ত জীবনে উত্থিত হয়েছেন। মানুষের আসল প্রকৃতি হচ্ছে সর্বব্যাপী অরূপ আত্মা। বাধ্য হয়ে বা কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জড়দেহ ধারণ করা হচ্ছে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার ফল। হিন্দুশাস্ত্র শিক্ষা দেয় যে, জন্ম ও মৃত্যু মায়ারই লীলা বা প্রকাশ। জন্ম ও মৃত্যুর অর্থ কেবল আপেক্ষিক জগতেই সীমাবদ্ধ। বাবাজী কোন জড়শরীরে বা মর্ত্যলোকে কোন বিশেষরূপে আবদ্ধ নন। তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে এ পৃথিবীতে কোন এক বিশেষ উদ্দেশ্যসাধনে নিযুক্ত আছেন।

স্বামী প্রণবানন্দজীর মত সদগুরুগণ, যাঁরা নব্যকলেবর ধারণ করে এই পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তাঁরা নিজেরাই তার কারণ জানেন, অপর কেউ নয়। এ জগতে তাঁদের আবির্ভাব কর্মফলপ্রসূত নয়। এরূপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনকে ‘ব্যুত্থান’ অর্থাৎ মায়াপাশ ছেদ করে পার্থিব জীবনে প্রবেশ করা বোঝায়। সাধারণ কি অসাধারণ- যেরূপ ভাবেই তাঁর দেহত্যাগ হোক না কেন, পূর্ণজ্ঞানী সদগুরু নুতনদেহ ধারণ করে জগৎবাসীদের চক্ষের সম্মুখে পুনরায় আবির্ভূত হতে পারেন। মহান সৃষ্টিকর্তা, যার সৌরমণ্ডলীর সংখ্যা গণনা করা যায় না, সেই পরমেশ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে জড়শরীর ধারণে অনুপরমানুদের আকার দানে তাঁর শক্তির অপচয় ঘটে না।

যীশুখ্রিষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আমি আপন প্রাণ সমর্পন করি, যাতে করে পুনরায় আমি তা গ্রহণ করতে পারি। কোন মানুষ আমার কাছ থেকে তা গ্রহণ করে না- আমি নিজেই তা সমর্পন করি। আমার তা সমর্পণ করবার ক্ষমতা আছে এবং তা পুনরায় গ্রহণ করারও ক্ষমতা আমার আছে।

…………………………….
যোগী-কথামৃত
( Autobiography of a Yogi ) শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত

পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত ।

মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -পরমহংস যোগানন্দ

পুণঃপ্রচারে বিনীত : প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!