শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক

-গৌতম মিত্র

ভারতবর্ষে যখন সামাজিক বৈষম্য চরমে। জাত-পাতের ভেদাভেদের নির্যাতনে যখন মানুষ জর্জরিত। সেসময় শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল গৌতম বুদ্ধের মতবাদ। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষই নয় ভারতবর্ষে বহু রাজা-মহারাজারাও এই শান্তির পতাকা তলে একত্রিত হয়েছিল। গ্রহণ করেছিল বৌদ্ধ মত-পথ।

বৌদ্ধ মতবাদ যতই ছড়িয়ে পরছিল ততই কোণঠাসা হয়ে উঠছিল তৎকালীন অসাম্য ও অত্যাচারের প্রতীক ছিল তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারক ও বাহকরা। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠে। ষড়যন্ত্রে নামে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্মকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে। অহিংস বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে তারা সফলকামও হয় অল্পদিনেই।

তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদীদের এই আগ্রাসনে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সাধারণ মানুষরা অসহায় ধর্মহীন হয়ে পরে। এই ধর্মহীন মানুষদের একটি অংশ সনাতন ধর্মালম্বীদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। তাঁরা হিন্দুধর্মের চতুর্থ বর্ণ অর্থাৎ শুদ্রবর্ণে স্থান পেয়ে যায়।

কিন্তু যারা বশ্যতা মেনে নিতে অস্বীকার করে তারা চক্রান্তের স্বীকার হয়ে সমাজ বর্হিভূত পতিত অর্থাৎ ধর্মহীন অস্পৃশ্য ঘৃণিত মানবগোষ্ঠীতে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছিল।এক্ষেত্রে বলা যায় যে অস্পৃশ্যদের ধর্ম এবং যারা তাদের অস্পৃশ্য বানিয়েছে, তাদের ধর্ম কখনওই এক হতে পারে না।

রাজর্ষি শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছিলেন, “হিন্দু পরিচয় শুধু গণনায়, অহিন্দু সকল খানে।” ব্রিটিশ শাসনকালে জমিদারদের অত্যাচারে বাংলায় মূলনিবাসীদের যত সংখ্যক মানুষ ধর্মান্তকরণ করে মুসলমান হয়েছিল, ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনেও তত হয় নি।

উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার ও সমাজপতিরা নমঃশূদ্রদের কোনোদিনই হিন্দু হিসাবে স্বীকার করে নি। অথচ বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র অনুসারে নমঃশূদ্রদের সামাজিক পীড়নে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। এই সামাজিক ও ধর্মীয় পীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তথাকথিত সেই অতীত বিস্মৃত ধর্মহীন মানুষরা দলে দলে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করে।

ঠিক সেই মুহূর্তে মতুয়ামতের প্রবর্তক শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের আর্বিভাবে (১৮১২ সালে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার সফলাডাঙ্গা গ্রামে) স্থানীয়দের মাঝে ধর্মান্তরকরণের প্রবণতা অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলার এই সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতিতে এখানকার চির অবদমিত চণ্ডাল জাতি হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রবর্তিত মতুয়া মতের পতাকা তলে আশ্রয় নেয়।

তারা তাঁর আর্বিভাবে আশার আলো দেখতে পায়। ওই সময় হরিচাঁদ ঠাকুরের আর্বিভাব না হলে তথাকথিত সেই চণ্ডাল জাতির সিংহভাগই হয়তো ধর্মান্তরিত হয়ে যেত।

ঊনবিংশ শতকের আশির দশক থেকেই পূর্ব ভারতে তথা বাঙ্গলার অস্পৃশ্যতা গণতান্ত্রিকতার পথে পা বাড়িয়ে শাসন ও প্রশাসনযন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব করার আন্দোলন তথা সবল সংগ্রাম চালায়। এই সার্থক গণতান্ত্রিকতার পথে মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক বাঙ্গলার প্রাতঃস্মরণীয় শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর।

পলাসীর প্রান্তরে, অস্পৃশ্য পূর্বপুরুষদের রক্তঢালা যে গণতন্ত্রের ধ্বজা প্রথিত হয়েছিল তা অর্নিবায ফসল ফলাতে শুরু করল শতবর্ষ পর। গুরুচাঁদ ঠাকুর বহুজন সমাজকে রাজা হবার আর তাজা হবার স্বপ্ন দেখালেন। শেখালেন-

“যে জাতির দল নাই, সে জাতি তাজা নাই।”

শিক্ষাহীন মানুষ অন্ধসম। শাসন ও প্রশাসন কাঠামোর স্ব-শক্তিতে প্রবেশের জন্য, স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য, রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য সভা-সমাবেশ করলেন। প্রশাসনে ভাগীদারীর ব্যবস্থা করে রাজা বানালেন। ১৯৩৭ এ মুকুন্দ বিহারী মল্লিক, অস্পৃশ্য কৃষকদের সন্তান বঙ্গের মন্ত্রী হল। শাসন-প্রসাশনে, গুরুচাঁদ ঠাকুরের এই ভাগীদারীর দাবীই মানব নির্মিত সাংবিধানিক সংরক্ষণের পদযাত্রার সবুজ বাতি।

ব্রাক্ষণ্যবাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হরিচাঁদ ঠাকুর নমশুদ্রদের নতুন পথ দেখাতে ‘মতুয়া’ আন্দোলনের জন্ম দেন। নমশুদ্রদের তখন ডাকা হতো চণ্ডাল বলে। এই অপমান ঘোঁচাতে তিনি নমশুদ্রদের শিক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

হরিচাঁদ ঠাকুরের মনবতার এই বারতা বয়ে নিয়ে চললেন তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর। ইতিহাসের অদৃশ্য প্রেরণায় আর অমোঘ ধাক্কায় গুরুচাঁদ ঠাকুর শুরু করেছিলেন কাজ। সে সময় ওড়াকান্দির বিল অঞ্চলের প্রায় নিরক্ষর কৃষক, লক্ষ সংখ্যায় চণ্ডাল। আর্য সংস্কৃত ধর্মশাস্ত্র মতে এরা অস্পৃশ্য।

এদের মাঝে নতুন ধর্মকর্ম করতে করতে শুরু করলেন বিদ্যাশিক্ষার বিস্তারের আন্দোলন। ১৮৮০ সালে নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় খুললেন বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টি ১৯০৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। দত্তডাঙ্গা ঈশ্বর গাইনের মাতৃশ্রাদ্ধ আসরকেই বানিয়ে নিয়েছিলেন সমাজ রাজনৈতিক আন্দোলনের গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম।

১৮৮১ সালের এই সভা হল নমঃশূদ্রের ম্যাগনাকার্টা। এই সভাই হল প্রথম মহাসম্মেলন। সর্ব শিক্ষা আন্দোলন। এই মহাসম্মেলনে সভাপতির ভাষণে শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছিলেন-

“বাঁচি কিবা মরি তাতে ক্ষতি নাই,
গ্রামে গ্রামে পাঠশালা গড়ে যেতে চাই।।”

একই বছর তাঁর নেতৃত্বে ঈশ্বর গাইনের দেওয়া জমিতে দ্বিতীয় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে গুরুচাঁদ ঠাকুর একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে থাকেন। তা দেখে চতুর্দিকে বিদ্যালয় গড়ার হিড়িক পরে যায়।

ভারতবর্ষে উচ্চবর্ণের বহু মনীষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করছিলেন শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে। সেই বিদ্যালয়গুলো প্রধানতঃ শহরকেন্দ্রিক ছিল। সেখানে পড়ালেখা করার সুযোগ পেত শুধু উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সমাজ বদলাতে যাদের মুখে দিতে হবে ভাষা, ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা, তারা সেখানে ছিল অনুপস্থিত।

অথচ শিক্ষা ছিল তাদেরই একান্ত প্রয়োজন। বিদ্যালয় পরিমণ্ডলের কাছে বা দূরে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও বাণীর বেদিতলে স্থান করে নিতে পারে নি; এই অন্ত্যজ সমাজের শিশুরা। যারা সমাজের মঙ্গল চাইতেন তারা এই অসাম্য ব্যবস্থার জন্য নীরবে অশ্রুপাত করতেন।

সেই কান্না পৌঁছেছিল গুরুচাঁদ ঠাকুরের অন্তরে। তিনি দেশময় ছুটে বেড়িয়েছিলেন বৈষম্যের এই ব্যথা বুকে নিয়ে। জানা যায়, ১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি ১৮১২টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি একমাত্র, যিনি একজন ধর্মপ্রচারক হয়েও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষানুরাগী সমাজ সংস্কারক ছিলেন।

পৃথিবীতে এমন কোন ধর্মগুরু আছেন কি যিনি অন্ত্যজ বাংলার মুক্তিদাতা গুরুচাঁদ ঠাকুরের মত বলতে পারেন, বিদ্যাই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে? একমাত্র বিদ্যাই মানুষকে চিরসুখী করতে পারে? ধর্ম মানুষের ক্ষুধা মিটাতে পারে ঠিকই কিন্তু ধর্ম কখন ও মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারে না?

(চলবে…)

……………………………
আরো পড়ুন:
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

……………………………
তথ্যসূত্র:
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত।
শিক্ষা আন্দোলনে গুরুচাঁদ ঠাকুর।
সরকারি চাকুরীতে গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান।
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!