রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

-প্রণয় সেন

প্রশ্ন: ভগবান শ্রেষ্ঠ ভক্তের অধীন?
উত্তর: প্রেম-রজ্জু দ্বারা ভক্ত তাঁর পা বেঁধে রেখেছেন। তাঁর পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়, তিনি ভক্তাধীন। ভগবানের ভক্তের প্রতি প্রেম! এই প্রেম তাঁর পক্ষেও প্রযোজ্য। ভক্ত ভাববে আমার মন যেন তাঁর থেকে বিচ্যুত না হয়, আর ভগবান ভাবছেন আমিও যেন তাকে না ভুলি। এরমধ্যে বিরোধ কোথায়?

‘ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।
শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।’-[গীতা, ১২/২]

শ্রীভগবান বললেন, পরমেশ্বরের ভজন দ্বারাই জীবের উদ্ধার হয়-এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যাঁরা আমার বিশ্বরূপে মনোনিবেশ করে মচ্চিত্ত হয়ে অহোরাত্র অতিবাহিত করেন, তাঁরাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ যোগী। ভক্তশ্রেষ্ঠ সে, যে ভক্ত আমার ভজনা করে আমি তার দাসের দাস। দাসস্য দাসস্য দাসস্য দাসস্য দাস-তিনি বলেছেন। স্বতন্ত্র হয়েও ভগবান ভক্তদের কাছে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিলিয়ে দিয়েছেন।

প্রশ্ন: ত্যাগ করার অর্থ কি?
উত্তর: ত্যাগ মানে মন থেকে ছাড়া।

প্রশ্ন: কিভাবে কর্মফল ত্যাগ করব?
উত্তর: ভগবানকে অর্পণ করবে। তার মানে ভাববে আমি কর্তা নই, তিনি।

প্রশ্ন: কুসংস্কার ত্যাগ করব কি করে?
উত্তর: বিপরীত সংস্কার অর্থাৎ সুসংস্কার দিয়ে কুসংস্কার ত্যাগ করা যায়।

প্রশ্ন: আমি যেন ত্যাগ করতে পারি, আপনি কৃপা করুন মহারাজ!
উত্তর: আমি কৃপা করে সংসারটা ত্যাগ করিয়ে দেব নাকি?

প্রশ্ন: অসুখ করলে ঠিকমতো ভগবানকে ডাকতে পারি না কেন?
উত্তর: মনের ওপর জোর থাকে না বলে। অসুস্থ হলে ঐদিকে মন চলে যায়, তাই ভগবানকে ডাকতে পারি না।

প্রশ্ন: কি করলে কল্যাণ হয়?
উত্তর: আমার ‘আমি’ যখন তাঁতে সমর্পণ করে দেব তখন আমারও কল্যাণ, অকল্যাণ আর কিছু থাকবে না।

প্রশ্ন: তার মানে শরণাগতি?
উত্তর: হ্যাঁ, তা তো বটেই।

প্রশ্ন: আমাদের চেষ্টায় কি হবে?
উত্তর: তোমাদের চেষ্টার দ্বারা তাঁর কৃপার যোগ্য হতে পার।

প্রশ্ন: কিভাবে চলতে হবে মহারাজ?
উত্তর: মনে একটা আদর্শ রাখতে হবে। সেই আদর্শকে লক্ষ্য রেখে এক পা এক পা করে চলতে হবে। তাতে মন শুদ্ধ হয়। চেষ্টা করতে হয়। সত্যের জন্য মূল্য দিতে হবে। আমরা আমাদের জীবনে সর্বদা সত্য, অহিংসা এ সবের সঙ্গে আপস করছি। পুরাণে আছে যে, সত্য রক্ষার জন্য মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। তাকে আমরা বড় বলি, আদর্শ বলি, কিন্তু নিজেরা এই আদর্শ পালন করি না। দাম না দিলে দামি জিনিস পাওয়া যায় না; বিনামূল্যে কিছু পাওয়া যায় না। দামি জিনিস পেতে হলে তার জন্য দাম দিতে হবে।

প্রশ্ন: শ্রীকৃষ্ণ খুব ভক্তবৎসল ছিলেন?
উত্তর: গোপীরা শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন, ‘তুমি কেবল গোপীদেরই আনন্দদায়ক নও, তুমি সমস্ত জগতের রক্ষক ও আনন্দদায়ক।’ মা যশোদাও একজন গোপী।শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত বৎসল; ভক্তদের মধ্যেই তিনি অবস্থান করেন। তিনি নারদকে বলছেন,

‘নাহং বসামি বৈকুণ্ঠে যোগিনাং হৃদয়ে ন চ।
মদ্ভক্তাঃ যত্র গায়ন্তী তত্র তিষ্ঠামি নারদঃ।’

রাখাল ছেলেরা শ্রীকৃষ্ণের কাঁধে উঠছে, তাঁর সঙ্গে খেলা করছে, গাছে উঠে ফল পারছে, তাঁর সঙ্গে মাঠে গরু চরাতে যাচ্ছে সবই করছে। আবার বিপদে পড়লে শ্রীকৃষ্ণকেই ডাকছে ‘রক্ষা কর’ বলে। এ সবই লীলা খেলার অন্তর্গত।

প্রশ্ন: ভাল দিন আর খারাপ দিন কোন্‌টি?
উত্তর:

‘যদচ্যুতকথালাপরসপীযূষবর্জিতম্‌।
তদ্দিনং দুর্দিনং মন্যে মেঘাচ্ছন্নৎ ন দুর্দিনম্‌।।’ -(শ্রীমদ্‌ভাগবতম্‌)

অর্থাৎ যে দিন ভগবানের কথা হলো না সেই দিনই খারাপ দিন। সাধারণত যেদিন মেঘ-জল-ঝড় হয় সেদিনকে আমরা খারাপ দিন বলি। আসলে যেদিন হরি কথা না হয় খারাপ দিন, আর যেদিন হয় সেদিন ভালো দিন।

প্রশ্ন: ভগবান সম্বন্ধে কি বিভিন্ন মতবাদ আছে?
উত্তর: বৈচিত্র্য আছে বল! বহুরূপী যেমন। এখানে গিরগিটির দৃষ্টান্ত-একই গিরগিটি, কখনো নীল, কখনো হলুদ, কখনো বা সবুজ এইরকম। ঠাকুরের গল্পে আছে- ‘কতকগুলো কানা একটা হাতির কাছে এসে পরেছিল। একজন লোক বলে দিলে, এ জানোয়ারটির নাম হাতি। তখন কানাদের জিজ্ঞাসা করা হলো হাতিটা কি রকম? তারা হাতির গা স্পর্শ করতে লাগল। একজন বললে, ‘হাতি একটা থামের মতো!’ সে কানাটি কেবল হাতির পা স্পর্শ করেছিল। আর একজন বললে, ‘হাতিটা একটা কুলোর মতো।’ সে কেবল একটা কানে হাত দিয়ে দেখেছিল। এইরকম যারা শুঁড়ে কি পেটে হাত দিয়ে দেখেছিল তারা নানা প্রকার বলতে লাগল। তেমনি ঈশ্বর সম্বন্ধে যে যতটুকু দেখেছে সে মনে করেছে, ঈশ্বর এমনি, আর কিছু নয়।’

প্রশ্ন: গাছের নিচে যে বসে আছে সে তো গিরগিটির সব রঙ দেখেছে?
উত্তর: হ্যাঁ, দেখেছে। তফাত বুঝলে? হাতির দৃষ্টান্তে অন্ধের দৃষ্টিটা অসম্পূর্ণ, কিন্তু গিরগিটির দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ, গিরগিটির মধ্যে বৈচিত্র্য আছে। গিরগিটি ভিন্ন ভিন্ন রং নেয় কেন? বৈচিত্র্যের জন্য। তেমনি ভগবান হলেন বিচিত্রতাময়। ঠাকুর বলছেন, ‘‘একজন বাহ্যে গিছিল-দেখলে, গাছের উপর একটি সুন্দর জানোয়ার রয়েছে। সে ক্রমে আর একজনকে বললে, ‘ভাই! অমুক গাছে আমি একটি লাল রঙের জানোয়ার দেখে এলুম।’ সে লোকটি বললে, ‘আমিও দেখেছি, তা সে লাল রঙ হতে যাবে কেন? সে যে সবুজ রঙ।’ আর একজন বললে, না না; সে সবুজ হতে যাবে কেন, কালো ইত্যাদি। শেষে ঝগড়া। তখন তারা গাছতলায় গিয়ে দেখে একজন লোক বসে। জিজ্ঞাসা করায়, সে বললে, আমি এই গাছতলায় থাকি, আমি সে জানোয়ারটিকে বেশ জানি। তোমরা যা যা বলছ সব সত্য, সে কখনও লাল, কখনও সবুজ, কখনও হলদে, কখনও নীল, আরও সব কত কি হয়। আবার কখনও দেখি কোন রঙই নাই!’ ‘যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ঈশ্বরচিন্তা করে, সেই জানতে পারে, তাঁর স্বরূপ কি। সে ব্যক্তিই জানে যে ঈশ্বর নানারূপে দেখা দেন।’

প্রশ্ন: যিনি ব্যাখ্যা করছেন তাঁর ভাবটাই প্রধান?
উত্তর: প্রধান-অপ্রধান কেন বলছ?
তিনি সেইভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করেছেন। উপলব্ধি ভিন্ন ভিন্ন। ঠাকুর বলছেন-আমি ঝোলে অম্বলে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মাছ খাব।

প্রশ্ন: ভগবানকে ভিন্ন দেখছেন?
উত্তর: দেখছেন মানে, ভগবান তাঁকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা দিচ্ছেন। সেই দেখাতে কোন সন্দেহ থাকবে না। তিনি শুদ্ধ মনের গোচর। যিনি দেখছেন, তাঁর মন যদি শুদ্ধ হয় তাহলে অসন্দিগ্ধভাবে ভগবানকে দেখতে পাবেন।

প্রশ্ন: প্রতি মন্বন্তরে অবতার আসেন কি?
উত্তর: হ্যাঁ, ভগবানের একজন অবতার আসেন।

প্রশ্ন: কুন্তী ভগবানকে সাক্ষাৎভাবে কাছে পেয়েও দুঃখ চেয়েছিলেন কেন?
উত্তর: দুঃখের পরম্পরার ভিতর দিয়ে কুন্তীকে যেতে হয়েছে। কুন্তীর প্রার্থনা, ‘হে ভগবান, দুঃখের সময় তোমাকে মনে হয়, সুখের সময় তোমাকে ভুলে যাই, তাই তুমি আমাকে দুঃখের পরম্পরা দাও যেন তোমাকে সর্বদা মনে থাকে।’ কুন্তী হলেন ভক্তের ভাবের দৃষ্টান্ত।

……………………………………………..………..
ঋণস্বীকার : বর্তমান পত্রিকা,
স্বামী ভূতেশানন্দজীর কথোপকথন ‘অমৃত সন্ধানের কথা’ থেকে।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!