সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য ব্রহ্মাণ্ড জগৎ মহাজগত মহাবিশ্ব

আদম (আ) পৃথিবীর আদি মানব

হযরত আদম (আ) যে পৃথিবীর আদি মানব এবং সমগ্র মানব জাতির আদি পিতা তাহা কুরআন করীমের বিভিন্ন আয়াত ও মহানবী (স)-এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। যেমন আল্লাহ্ তাআলা বলেন-

“আল্লাহর নিকট নিশ্চয়ই ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, ‘হও, ফলে সে হইয়া গেল।” (৩:৫৯)

অর্থাৎ আদম (আ) পিতা ও মাতা ব্যতীতই আল্লাহর কুদরতে সৃষ্ট, সরাসরি মাটি হইতে। আল্লাহ্ তাআলা আরও বলেন।

“তিনিই তোমাদেরকে এক বক্তি হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন ও উহা হইতে তাহার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যাহাতে সে তাহার নিকট শান্তি পায়।” (৭:১৮৯)

অন্য আয়াতে তাঁহার স্ত্রী হাওয়াকেও তাঁহারই দেহ হইতে সৃষ্টির উল্লেখ করিয়া আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হইতেই সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি তাহা হইতে তাহার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নরনারী ছড়াইয়া দেন।” (৪:১)

উক্ত আয়াতের পাদটীকায় তাফসীর উছমানীতে বলা হইয়াছে- হযরত আদম (আ) হইতে প্রথমে হযরত হাওয়াকে তাঁহার বাম পাঁজর হইতে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁহাদের দুইজন হইতে সমস্ত নরনারী সৃষ্টি করিয়া বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া দেন। ফলে মূলত এক অভিন্ন প্রাণ ও ব্যক্তি হইতেই আল্লাহ্ তাআলা সমস্ত মানবজাতিকে সৃষ্টি করিয়াছেন (তাফসীরে উছমানী, পৃ. ৫৮)

মানব সৃষ্টি আর আদম (আ)-এর সৃষ্টির কথা আল-কুরআনের বর্ণনায় মূলত এক ও অভিন্ন ব্যাপার। কেননা, কুরআন তথা আসমানী সমস্ত কিতাবের বক্তব্য অনুযায়ী হযরত আদম (আ)-ই হইতেছেন প্রথম মানব। কুরআন শরীফের পঁচিশটি স্থানে আদম শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে।

প্রায় ঐ একইরূপ বক্তব্য আসিয়াছে অন্য আয়াতে?

“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছি এক পুরুষ ও এক নারী হইতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করিয়াছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাহাতে তোমরা একে অপরের সহিত পরিচিত হইতে পার।” (৪৯ ও ১৩)

সুতরাং পৃথিবীর তাবৎ মানবই যে একই ব্যক্তি ও এক অভিন্ন দম্পতি হইতে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করিয়াছে এবং তাহাদের আদি পিতা আদম (আ), তাহা কুরআন শরীফের বর্ণনা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ্ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে মানবজাতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বনী আদম বা আদম-সন্তান বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন (দ্র. ৭:২৭, ৩১, ৩৫, ৩৬ ও ৬০-৬১)

শাফাআত সংক্রান্ত হাদীছে রহিয়াছে, কিয়ামতের দিন সমবেত মানবমণ্ডলী আদম (আ)-এর নিকট গিয়া আবেদন করিবে?

“হে আদম! আপনি মানবজাতির আদি পিতা। আল্লাহ্ তাআলা আপনাকে স্বহস্তে সৃষ্টি করিয়াছেন। তাঁহার পক্ষ হইতে ‘রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকিয়া দেন। তাঁহার ফেরেশতাকূল দিয়া আপনাকে সিজদা করাইয়াছেন। তাঁহার জান্নাতে আপনাকে বাস করিতে দিয়াছেন।

আমরা কী মহাসংকটে রহিয়াছি তাহা কি আপনি লক্ষ্য করিতেছেন না? আপনি কি আপনার প্রতিপালকের দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করিবেন না?।” (বুখারী, ১খ, পৃ. ৪৭০, পারা-১৩, কিতাবুল আম্বিয়া, আদম ও তদীয় বংশধরগণের সৃষ্টি সংক্রান্ত অধ্যায়)

মানব সৃষ্টি আর আদম (আ)-এর সৃষ্টির কথা আল-কুরআনের বর্ণনায় মূলত এক ও অভিন্ন ব্যাপার। কেননা, কুরআন তথা আসমানী সমস্ত কিতাবের বক্তব্য অনুযায়ী হযরত আদম (আ)-ই হইতেছেন প্রথম মানব। কুরআন শরীফের পঁচিশটি স্থানে আদম শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে।

যেমন ৪ ২:৩১, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৭; ৩:৩৩, ৫৯; ৫:২৭; ৭:১১, ১৯, ২৬, ৩১, ৩৫ ও ১৭২; ১৭:৬১ ও ৭০; ১৮৫০; ৯:৫৮; ২০:১১৫, ১১৬, ১১৭, ১২০ ও ১২১; ৩৬:৬০।

আদিপুস্তক

উক্ত আয়াতসমূহে তাহার সৃষ্টির বিবরণ, সৃষ্টির উপাদান, সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাহাকে সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলার ফেরেশতাদের নিকট ঘোষণা দান, ফেরেশতাগণের উক্তি ও সে ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলার জবাব, আল্লাহ্ পাক কর্তৃক আদম (আ)-কে জ্ঞান ও মর্যাদা দান।

আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ কর্তৃক আদম (আ)-কে সিজদা করা ও ইহাতে আযীলের অস্বীকৃতি, কুযুক্তি উত্থাপন এবং পরিণামে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত হওয়া, আদম (আ)-এর জান্নাতে অবস্থান ও সঙ্গীরূপে স্ত্রী হাওয়াকে লাভ।

শয়তানের প্ররোচনায় জান্নাতে আদম ও হাওয়া দম্পতির নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ ও পরিণামে জান্নাত হইতে পৃথিবীতে অবতরণ, তাঁহাদের তওবা কবুল হওয়া, তাহাদের বংশবিস্তার, হাবীল-কাবীলের দ্বন্দ্ব ও তাহাদের কুরবানী, কাবীল কর্তৃক হাবীলকে হত্যা প্রভৃতি প্রসঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে।

আদম (আ)-এর নাম সম্পর্কে

আদম শব্দটির আরবী বা অনারবী হওয়া সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ অভিমত হইল উহা হিব্রুভাষায় ৬১। শব্দ হইত গৃহীত- যাহার অর্থ পৃথিবী। কেননা, পৃথিবীর মাটি হইতে তিনি সৃষ্ট (দায়েরাতুল মাআরিফ, আরবী, ১খ, পৃ. ৪৫) আবু মনসূর জাওয়ালি বলেন, আদম, সালিহ, শুআয়ব ও মুহাম্মাদ (সা) ব্যতীত সকল নবীর নামই অনারবী।

জাওহারী বলেন, আদম শব্দটি আরবী (দায়েরাতুল মাআরিফিল ইসলামিয়া = আরবী ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্র. আদম প্রসঙ্গ)

ইমাম আবু জাফর তাবারী (র) বলেন, হযরত ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন:মহান আল্লাহ ফেরেশতা আযরাঈল (আ)-এক পৃথিবীতে পাঠাইলেন। তিনি পৃথিবীর উপরিভাগের যে মাটি লইয়া যান উহা দ্বারাই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়।

পৃথিবীর উপর আস্তরণ বা ভূ-ত্বককে যেহেতু আরবীতে ১ (আদীম) বলা হইয়া থাকে, সে জন্য তাহার নামকরণ করা হয় আদম।

সাঈদ ইবন জুবায়র (রা)-ও বলেন, আদম (আ)-কে যেহেতু আদীমুল আরদ (ভূত্বক) হইতে সৃষ্টি করা হয় এই জন্যই তাহার নাম আদম রাখা হয়।

হযরত আলী (রা) বলেন, আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয় আদীম বা ভূ-ত্বক হইতে। তাহাতে উত্তম-অধম, কল্যাণকর ও অকল্যাণকর সবকিছুই ছিল। এই জন্যই তুমি আদম সন্তানদের মধ্যে বিভিন্নতা দেখিতে পাও। তাহাদের মধ্যকার কেহ বা পুণ্যবান ও কল্যাণকর, আবার কেহ পাপাচারী ও অকল্যাণকর (তাফসীরে তাবারী, আরবী), (সূরা বাকারার ৩১নং আয়াতের তাফসীর) রাগিব ইসফাহানী বলেন-

“আদম-মানবজাতির আদি পিতা, তাহার এইরূপ নামকরণের কারণ হইল তাহার দেহ আদীমুল আরদ বা ভূ-ত্বক হইতে সৃষ্ট। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন:তাঁহার দেহের, ১/ বা গো-ধুম বর্ণের জন্য তাহার এইরূপ নামকরণ করা হইয়াছে (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, পৃঃ ১৪, দ্র. আদম, দারুল-মারিফা, কায়রো)

কেহ কেহ আবার আদম শব্দটি ১। (আদম) অথবা a১। শব্দ হইতে গৃহীত বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। উহার অর্থ সমন্বিত ও সংমিশ্রিত। এই অর্থ দ্বারা আদম (আ)-এর মধ্যে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদানের সমন্বয় ও সংমিশ্রণ ঘটিয়াছে বুঝায়। কেননা মাটি ও পানির মিশ্রণে তাহার খামীর প্রস্তুত করা হইয়াছিল।

কেহ কেহ আবার […] শব্দটি […] শব্দ হইতে উদ্ভূত বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার অর্থ অনুসরণযোগ্য। কিন্তু যামাখশারী শব্দটি আরবী বলিলেও নিম্নোক্ত কারণে শব্দটি অনারব বলিয়া প্রতীয়মান হয়। শব্দটির বহুবচন ১ll এবং ইহার বা ক্ষুদ্রত্ববোধকরূপ দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন হয় যে, শব্দটি অন-আরবী, অন্যথায় উভয়রূপেই আদ্যাক্ষর অপরিবর্তিত থাকিত।

হিব্রু ভাষায় […] শব্দের অর্থ মানবজাতি। ফিনিশীয় এবং সাবাঈ ভাষায়ও শব্দটির একই রূপ। ইংরেজী সাহিত্য ও অন্যান্য ভাষায় […] ও […] শব্দ ইন্জীল এবং তাওরাতের মাধ্যমে প্রচলিত হইয়াছে। বাইবেলের আদিপুস্তকে উল্লিখিত আছে যে, আদম তাহার স্ত্রীর নাম […] এই জন্য রাখিয়াছিলেন যে, তিনি জীবকূলের মাতা (আরও দ্র. হিব্রু, বিশ্বকোষ, হাওওয়া নিবন্ধ)

এবং […]-এর অর্থ যে কোন বিষয়ের জন্মদাতা, গোত্র বা জাতির বড় নেতা এবং আদি পুরুষ।যেমন দক্ষিণাত্যের ওয়ালী উর্দু কবিদের বাবা আদম ছিলেন। আরও তু. ১৮৮৪, পৃ. ৩৯৬। (দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ, ইফা প্রকাশিত, ১খ, নিবন্ধ আদম, পৃ. ২৪)

…………………………
সীরাত বিশ্বকোষ থেকে

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………………..
আরও পড়ুন-
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : তৃতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : চতুর্থ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : পঞ্চম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : ষষ্ঠ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : সপ্তম কিস্তি
সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে প্লাতনের মতবাদ
মহাবিশ্বের সৃষ্টি কাহিনী
পবিত্র কোরানে সৃষ্টিতত্ত্ব
আরশ ও কুরসী সৃষ্টির বিবরণ
সাত যমীন প্রসঙ্গ
সাগর ও নদ-নদী
পরিচ্ছেদ : আকাশমণ্ডলী
ফেরেশতা সৃষ্টি ও তাঁদের গুণাবলীর আলোচনা
পরিচ্ছেদ : ফেরেশতাগণ
জিন সৃষ্টি ও শয়তানের কাহিনী
সীরাত বিশ্বকোষে বিশ্ব সৃষ্টির বিবরণ
আদম (আ) পৃথিবীর আদি মানব
আদম সৃষ্টির উদ্দেশ্য
আদম (আ)-এর সালাম
আদম (আ)-এর অধস্তন বংশধরগণ
হাদীসে আদম (আ)-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ
আদম (আ)-এর সৃষ্টি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!