ভবঘুরেকথা
ভক্তের প্রকার ভক্তি ভক্ত

-মূর্শেদূল মেরাজ

সীতা প্রশ্ন করলেন, তোমার দেহে কোথায় রাম আছে আমাকে দেখাও।

তখন হনুমান তার বুক চিরে মা সীতাকে দেখালেন যে তার বুকের ভেতরে অবস্থান করছে প্রভু শ্রীরাম ও মা সীতার ছবি।। এই ভক্তির দৃশ্য দেখে সকলে হনুমানের জয়জয়কার করতে লাগলো।

ভক্ত নিয়ে শেষ কথা

ভক্ত নিয়ে, ভক্তের প্রকার নিয়ে বহুজন বহু মত দিয়েছে। বহুবার বহুভাবে ভক্তকে ভাগ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন- যিনি স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম স্থাপন করে স্রষ্টার প্রতি সমর্পিত হন তিনিই ভক্ত। ভক্ত চার প্রকার-

১. আর্ত ভক্ত : যারা বিপদে পরে স্রষ্টাকে স্মরণ করে। যেমন- দ্রৌপদী।
২. অর্থাথী ভক্ত : কার্য সিদ্ধির জন্য যারা স্রষ্টাকে স্মরণ করে। যেমন- অম্বা।
৩. জিজ্ঞাসু ভক্ত: স্রষ্টাকে জানার জন্য যারা স্মরণ করে। জ্ঞানের দ্বারা ভগবানকে জানার জন্য ডাকে। যেমন- অর্জুন।
৪. জ্ঞানী ভক্ত : কামনা বিহীন যারা স্রষ্টাকে স্মরণ করে। যেমন- প্রহ্লাদ।

স্রষ্টার কাছে জ্ঞানী ভক্তই শ্রেষ্ঠ। দুঃখ কষ্টের সময় স্রষ্টাকে ডাকলে সাড়া দেন ঠিকই। তবে তা স্বার্থের ভালবাসা হয়ে গেল। প্রকৃত ভক্ত সেই, যে বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে প্রতিটি মুহূর্তে স্রষ্টাকে নাম স্মরণ করেন।

ভাগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, বহু বহু জন্মের পরে কেউ যখন যথার্থ জ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি যথাযথভাবে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে সর্ব কারণের পরম কারণ বলে উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর শরণাগত হন।

শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, এই চার রকম ভক্তের মধ্যে জ্ঞানী ভক্তরাই তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। কারণ স্রষ্টার প্রতি তাঁদের আসক্তি কোন লৌকিক লাভের জন্য নয়।

ভক্তকে জানতে হলে জানতে হবে, ভক্তি কি? আর এ প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বেশ সহজ কর বলে গেছেন। তিনি আট রকম ভক্তির কথা বলতেন। এই আট প্রকার ভক্তি হল- জ্ঞান ভক্তি, বৈধী ভক্তি, প্রেমা ভক্তি, বিজ্ঞান ভক্তি, শুদ্ধা ভক্তি। অহৈতুকী ভক্তি, ঊর্জিতা ভক্তি ও মধুরা ভক্তি।

জ্ঞান ভক্তি: ঠাকুর আছেন এবং আমি তাঁর সন্তান এটি শাস্ত্র গ্রন্থ বা গুরুমুখ থেকে জেনে নিয়ে সেই ভাবে-সেই বিশ্বাসে আধারিত হয়ে ঠাকুরের আরাধনা এই প্রকার ভক্তিকে জ্ঞান ভক্তি বলে। ভগবান লাভের জন্য গুরুবাক্য বা শাস্ত্র-উপদেশে বিশ্বাস স্থাপন করা প্রয়োজন।

বৈধী ভক্তি: ভক্তি যেখানে বিধির উপর আশ্রিত তাকে বৈধী ভক্তি বলে। যেমন এত হাজার জপ, অমুক তীর্থ দর্শন, এত পুরশ্চরণ করা, এত ব্রাহ্মণ ভোজন করানো ইত্যাদি। এইরূপ বিধিবাদীর ভক্তি আচরণ করতে করতে ক্রমে ভগবানের উপর ভালবাসা আসে।

প্রেমা ভক্তি: বৈধী ভক্তির চর্চা করতে করতে প্রেমা ভক্তির উদয় হয়। এই ভক্তি এলে আর বিধি নিয়মের দরকার নেই। এ অতি উচ্চ স্তরের ভক্তি। এই ভক্তি দিয়ে ভগবান কে বাঁধা যায়। কিন্তু এই ভক্তি লাভ করা বড় কঠিন। এ ভক্তির আড়ম্বর নেই।

ভক্তের কাছে ভগবান চান ফুল, পাতা, ফল, জল। যা সহজেই পাওয়া যায়। শ্রী ভগবান বলেছেন, “শুদ্ধ চিত্ত ভক্ত প্রেমাভক্তির সাথে আমাকে ফুল পাতা ফল জল অর্পণ করলে তার সেই উপহার আমি গ্রহণ করি।”

ঠাকুর বলতেন, “ভগবানকে যা কিছু অর্পণ করবে অনুরাগের সাথে করা চাই। পত্র পুষ্প ইত্যাদি সবটি তো তাঁর, আমার কি রইলো তার সঙ্গে? আমাদের প্রীতি ভালবাসাটুকু মিশিয়ে দিতে হবে। ভগবান সেইটি দেখেন। ঐশ্বর্যের ভাব থাকলে ভালবাসা চাপা পড়ে যায়, ঐশ্বর্যের মধ্যে মাধুর্য থাকে না।

বিজ্ঞান ভক্তি: ব্রহ্ম জ্ঞান লাভের পর যারা ‘বিদ্যার আমি’ রেখে ভগবৎ লীলা আস্বাদন করেন। আর লোকশিক্ষার জন্য করেন, তাঁদের বিজ্ঞান ভক্তি। যেমন নারদাদি। ভগবান লাভের পর যে করম-তাতে কত আনন্দ! তখন ভগবান লাভ হয়ে গেছে, ভক্ত ভগবানের মধ্যে রয়েছে।

শুদ্ধা ভক্তি: গোপীদের ভক্তি শুদ্ধা ভক্তির উদাহরণ। সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শুদ্ধা ভক্তি বা নিষ্কাম ভক্তি। ঠাকুর বলতেন যে তিনি শুদ্ধা ভক্তি দিতে কাতর। শুদ্ধা ভক্তি দুর্লভ।

অহেতুকী ভক্তি: যেখানে কোনও কামনা নেই, তার্কাকরি নামযশ এসব কিছুর চাহিদা নেই। শুধু ভালবাসার জন্য ভক্তি। তাকে অহেতুকী ভক্তি বলে। প্রহ্লাদের এই ভক্তি ছিল। ঠাকুর জগদম্বার কাছে এই শুদ্ধা অমলা নিষ্কাম অহেতুকী ভক্তি চেয়ে ছিলেন, এই ভক্তিতেই তিনি মাকে বেঁধেছিলেন।

ঊর্জিতা ভক্তি: এই ভক্তি অনেক উচ্চ স্তরের জিনিস, এতে ভক্ত হাঁসে কাঁদে নাচে গায়, যেমন অবস্থা চৈতন্য দেবের, ঠাকুরের হয়েছিল। ঠাকুর বলেছেন, “যদি কারো ঊর্জিতা ভক্তি হয়, নিশ্চয় জেনো ঈশ্বর সেখানে স্বয়ং বর্তমান।”

মধুরা ভক্তি: দাস্য সখ্য প্রভৃতি স্বকর্ম ভাবের সমন্বয় হলে এই ভক্তির উৎপন্ন হয়। এ ভক্তি শ্রীমতী রাধারানীর হয়েছিল। অশ্রু স্তম্ভ পুলক বৈবর্ণ্য ও দিব্যন্মাদ- শ্রীমতীর যেরূপ হয়েছিল। জীবের এ ভাব হয় না, এই ভক্তিই চরম ভক্তি।

অন্যদিকে শ্রীশ্রী চরণ দাস তার তত্ত্বরসামৃত জ্ঞানমঞ্জরী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ভক্তির চৌষট্টি অঙ্গের কথা। বৈষ্ণব মতে ভক্তিকে চৌষট্টি অঙ্গে ভাগ করা হয়েছে।

আদতে জগতে ভক্ত তো সকলেই। প্রকারে ভিন্ন মাত্র। প্রথাগত বিচারে সকলকে ভক্ত বলে মেনে নেয়া যেমন কঠিন। তেমনি সকলে নিজেকে ভক্ত বলে স্বীকার করে নিতেও অপারগ। সকলেই হয়তো গুরুর ভক্ত নয়, স্রষ্টার ভক্ত নয়, মানুষের ভক্ত নয়, জীবের ভক্ত নয়। তারপরও সকলেই শেষ বিচারে কারো না কারো ভক্ত।

তাই ভক্তকে বুঝতে গেলে মানুষকে বোঝা জরুরী। আর মানুষকে বুঝতে গেলে মানুষের কু-বৃত্তি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা ভালো। তাতে কু প্রবৃত্তির মানুষ থেকে দূরে থাকা যায়। শুদ্ধ সাধনের পথে সেটা অতীব জরুরী। তবে মানুষ চেনা সহজ নয়। বড়ই কঠিন কাজ।

তবে সমাজে বহুল প্রচলিত কিছু লক্ষণ প্রচারিত আছে। যা দেখে-শুনে হীন স্বভাবের মানুষকে চিহ্নিত করা যায়। আর এই হীন স্বভাবের মানুষকে চিহ্নিত করতে পারলে বা নিজের মধ্যে এই সব দোষ থাকলে তা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলে। তবেই প্রকৃত ভক্ত হয়ে উঠা যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।

প্রচরিত নিম্ন মানুসিকতার লোকের লক্ষণগুলো আগে জেনে নেয়া যাক-

  • কখনও পরাজয় স্বীকার করে না।
  • যুক্তিতে হারতে চায় না।
  • অহংকার করে কথা বলে।
  • নিজের ক্ষমতা দেখাতে চেষ্টা করে।
  • সব বিষয়ে পারদর্শিতা দেখায়।
  • সবাইকে সন্দেহ করে।
  • সামান্য ব্যাপারে রেগে যায় এবং আঘাত করার চেষ্টা করে।
  • সত্য মিথ্যা বুঝতে চায় না।
  • অন্যের সম্মান দেখানোকে দুর্বলতা ভাবে।
  • কথায় কথায় তিরস্কার করে।
  • মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে।
  • নিজের স্বার্থ আগে দেখে।
  • যে কোন প্রতিভাকে ছোট করে দেখে।
  • নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করে।

পঞ্চভূতের মানুষের ত্রিগুণ হলো- তম, রজ ও সত অর্থাৎ তামসিক, রাজসিক ও সাত্ত্বিক। তামসিক স্বভাব হলো আলস্যের প্রতিরূপ। রাজসিক হলো রাজার স্বভাব বা অতি উদ্যামী। আর সাত্ত্বিক স্বভাব হলো সমতার বৈশিষ্ট অর্থাৎ সাধুর স্বভাব।

এই তিন গুণ মিলেই জীব তাই এর কোনোটাকেই শূন্য করা সম্ভব নয়। তবে তামসিক আর রাজসিকের মাত্রা বেশি হলে সাধু স্বভাবের হওয়া সম্ভব না। তাই প্রকৃত ভক্ত হতে হলে সাধককে হতে হয় সাত্ত্বিক স্বভাবের। তবে সাত্ত্বিক স্বভাব ধারণ করতে গেলে ছাড়তে হয় বহু কিছু।

ষড়রিপু থেকে হতে হয় মুক্ত। তাই এটি মোটেও সহজ যেমন নয়। তেমনি একদিনে হওয়ার বিষয়ও নয়। তাই সাধকের সারাজীবনের সাধনাই থাকে সাত্ত্বিক স্বভাবের হয়ে উঠা। এবং সেটাকে ধরে রাখা।

সাধুগুরুরা মানুষের মানুষিক স্তরের চার ধাপের কথা উল্লেখ করেন। যারা কেবল খাওয়া আর যৌনতায় থাকে তারা প্রথম স্তর। যারা খাওয়া-যৌনতার পাশাপাশি মনের ভাবনাকে গুরুত্ব দেয় তারা দ্বিতীয় স্তর।

আর যারা খাওয়া-যৌনতার পাশাপাশি মনের ভাবনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবনা থেকে সামষ্টিক চিন্তায় প্রবেশ করতে পারে তারা চতুর্থ ধাপে পৌঁছাতে পারে। তারা সত্যকে প্রতিষ্ঠাকেই চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করে।

এভাবে তামসিক থেকে রাজসিক হয়ে যখন সাত্ত্বিকে পৌঁছে সাধারণ জীব সাধক হয়ে উঠে। হয় ভক্ত। আর সেই ভক্তের জন্যই সাঁইজি লিখেন-

ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই।
হিন্দু কি যবন বলে জাতের বিচার নাই।।

ভক্ত কবির জেতে জোলা
শুদ্ধ ভক্তি মাতোয়ালা,
ধরেছে সেই ব্রজের কালা
দিয়ে সর্বস্ব ধন তাই।।

রামদাস মুচি ভবের পরে
ভক্তির বল সদাই করে,
সেবায় স্বর্গে ঘণ্টা পড়ে
সাধুর মুখে শুনতে পাই।।

এক চাঁদে হয় জগৎ আলো
এক বীজে সব জন্ম হলো,
লালন বলে মিছে কলহ
ভবে দেখতে পাই।।

অন্যদিকে লেখক হুমায়ূন আজাদ কটাক্ষ করে লিখেছেন- “ভক্ত শব্দের অর্থ খাদ্য। প্রতিটি ভক্ত তার গুরুর খাদ্য। তাই ভক্তরা দিনদিন জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হয়ে আবর্জনায় পরিণত হয়।” ভক্তের ভক্তি নিয়ে নানান মহলে আছে নানান সমালোচনা-পর্যালোচনা।

সকল কিছুকেই তুচ্ছজ্ঞান করে যিনি ভক্তি উদয় ঘটিয়ে নিজেকে প্রেমময় করতে পারে জগৎ তাকেই মনে রাখে। তিনিই হন চির স্মরণীয়। আবার চরম অভক্তও সভ্যতার ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু জগৎ তাকে স্মরণ করে ভক্তিতে নত হয় না।

যিনি ভক্তি ধারণ করেন তিনি যেমন ভক্ত হয়ে উঠেন। আবার তিনি পূর্ণ ভক্ত হয়ে উঠতে পারলে সকলেও তাখে ভক্তি করেই স্মরণ করে। তাই পরিশেষে নতশিরে বলি-

জগৎ মুক্তিতে ভুলালেন সাঁই।
ভক্তি দাও হে যেন চরণ পাই।।

রাঙ্গাচরণ দেখব বলে
বাঞ্ছা সদায় হৃদকমলে,
তোমার নামের মিঠায় মন মজালে
রূপ কেমন তাই দেখতে চাই।।

ভক্তিপদ বঞ্চিত করে
মুক্তিপদ দিচ্ছো সবারে,
যাতে জীব ব্রহ্মাণ্ডে ঘোরে
কাণ্ড তোমার দেখতে পাই।।

চরণের যোগ্য মন নয়
তথাপি মন ওই চরণ চাই,
অধীন লালন বলে হে দয়াময়
দয়া কর আজ আমায়।।

(সমাপ্ত)

<<ভক্তের প্রকার: প্রথম কিস্তি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………….
আরো পড়ুন:
ভক্তের প্রকার: প্রথম কিস্তি
ভক্তের প্রকার: দ্বিতীয় কিস্তি
ভক্তের প্রকার: তৃতীয় কিস্তি
ভক্তের প্রকার: চতুর্থ কিস্তি
ভক্তের প্রকার: পঞ্চম কিস্তি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!