যীশু খ্রীষ্ট ইশা বড়দিন খ্রিস্টান প্রভু

যে দিন আমি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা করে রেখেছি যে, যে সব লোক তোমাকে ও তোমার মাকে আল্লাহর সাথে শরীফ করে প্রভু বানাবে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে স্থান দিব। যে দিন আমি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এই সিন্ধান্ত চূড়ান্ত করে রেখেছি যে, আমি আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদের হাতে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করব।

তার উপরেই নবুওত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি টানব। তার জন্ম হবে মক্কায়, হিজরতস্থল (মদীনা) তায়্যিবা। শ্যাম দেশ তার করতলগত হবে। সে কর্কশ ভাষী ও কঠোর হৃদয় হবে না, বাজারে চিৎকার করে ফিরবে না, অশ্লীল অশ্রাব্য কথাবার্তা বলবে না। প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্যে আমি তাকে তাওফীক দিব। সৎ চরিত্রের যাবতীয় গুণাবলী তাকে প্রদান করব। তার অন্তর থাকবে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। জ্ঞান হবে প্রজ্ঞায় তার আদর্শ, নাম হবে তার আহমদ।

আমি তার সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সঠিক পথ দেখাব, অজ্ঞতা থেকে ফিরিয়ে জ্ঞানের দিকে আনব, নিঃস্ব অবস্থা থেকে স্বচ্ছলতার দিকে আনব, বিপর্যন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে উন্নতির সোপানে উঠাব। তার দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করবো। তার সাহায্যে বধির ব্যক্তিকে শ্রবণ শক্তি দান করব, আচ্ছাদিত হৃদয় সমূহকে উন্মুক্ত করে দিব, বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে সংযত করব।

তার উম্মতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা দান করব। মানব জাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে তাদের অত্যুদয় ঘটবে। তারা মানুষকে ভাল কাজে আহবান জানাবে ও গৰ্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে। আমার নামে তারা নিষ্ঠাবান থাকবে। রাসূলের আনীত আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে।

তারা তাদের মসজিদে, সভা সমিতিতে বাড়ি ঘরে ও চলতে ফিরতে সর্বাবস্থায় আমার তাসবীহ পাঠ করবে, পবিত্রতা ঘোষণা করবে ও লাইলাহা ইল্লালাহ কলেমা পড়বে। তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় রুকু সিজদার মাধ্যমে আমার জন্যে সালাত আদায় করবে। আমার পথে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দুশমনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আল্লাহর পথে রক্ত দান হচ্ছে তাদের নিকট পুণ্যকর্ম।

সুসংবাদের আশায় তাদের অন্তর ভরপুর, তাদের পুন্য কাজসমূহ প্রদর্শনীমুক্ত। রাতের বেলায় তারা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল। তাপস আর দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে সাক্ষাত সিংহ-এ সবই আমার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা! তাকে দিই। আমি মহা অনুগ্রহশীল।

উপরে যা কিছু আলোচনা হল, এর সপক্ষে প্রমাণাদি আমরা সূরা মায়িদা ও সূরা সাফ এর প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করব ইনশা আল্লাহ। আবু হযায়ফা ইসহাক ইব্‌ন বিশর বিভিন্ন সূত্রে কাব আল-আহবার, ওহাব ইব্‌ন মুনাব্বিাহ, ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও সালমান ফারসী (রা) থেকে বর্ণনা করেন।

বর্ণনায় তাদের একজনের বক্তব্য অন্যজনের বক্তব্যের সাথে মিশে গেছে। তারা বলেন যে, হযরত ঈসা ইব্‌ন মারিয়াম যখন বনী ইসরাঈলের নিকট প্রেরিত হলেন এবং তাদের সম্মুখে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি তুলে ধরলেন তখন বনী ইসরাঈলের মুনাফিক ও কাফির শ্রেণীর লোকেরা তার সাথে উপহাস করতো। তারা জিজ্ঞেস করত, বলুন তো, অমুক গতকাল কী খাবার খেয়েছে এবং বাড়িতে সে কী রেখে এসেছে?

ইতিপূর্বে হযরত নূহ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত নূহের পুত্র সাম-কে জীবিত করে দেয়ার জন্যে বনী ইসরাঈলরা হযরত ঈসার নিকট দাবী জানায়। তিনি সালাত আদায় করে আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। ফলে আল্লাহ তাকে জীবিত করে দেন। সাম জীবিত হয়ে বনী ইসরাঈলদেরকে নূহ (আ)-এর নীেকা সম্বন্ধে অবহিত করেন, ঈসা (আ) পুনরায় দোয়া করলে তিনি আবার মাটির সাথে মিশে যান।

হযরত ঈসা (আ) তাদেরকে সঠিক জবাব দিয়ে দিতেন। এতে মুমিনদের ঈমান এবং কাফির ও মুনাফিকদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়ে যেত, এতদসত্ত্বে ও হযরত ঈসার মাথা গোজায় মত কোন ঘর বাড়ী ছিল না। খোলা আকাশের নীচে মাটির উপর তিনি সালাত ও তাসবীহ আদায় করতেন। তার কোন স্থায়ী আবাসস্থল বা ঠিকানা ছিল না। সর্বপ্রথম তিনি যে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। সে ঘটনাটি ছিল এরূপ :

একদা তিনি কোন এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ কবরের নিকটে এক মহিলা বসে। কাদছিল। ঈসা মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? মহিলাটি বলল, আমার একটি মাত্র কন্যা ছিল। সে ছাড়া আমার আর কোন সন্তান নেই। আমার সে কন্যাটি মারা গিয়েছে। আমি আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, হয় তিনি আমার কন্যাকে জীবিত করে দিবেন, না হয়।

আমিও তার মত মারা যাব, এ জায়গা ত্যাগ করব না। আপনি এর দিকে একটু লক্ষ্য করুন। ঈসা (আ) বললেন, আমি যদি লক্ষ্য করি তবে কি তুমি এখান থেকে ফিরে যাবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ তা-ই করব। তারপর হযরত ঈসা (আ) দু রাকাআত সালাত আদায় করে কবরের পাশে এসে বসলেন এবং বললেনঃ ওহে অমুক, তুমি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও, এবং বের হয়ে এস।

তখন কবরটি সামান্য কেঁপে উঠল। ঈসা (আ) দ্বিতীয়বার আহবান করলেন। এবার কবরটি ফেটে গেল। তৃতীয়বার আহবান করলে কবরবাসিনী বেরিয়ে আসল এবং মাথার চুল থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। ঈসা (আ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বের হতে তোমার দেরী হল কেন? মেয়েটি বলল, প্রথম আওয়াজ শোনার পর আল্লাহ আমার নিকট একজন ফিরিশতা পাঠান।

তিনি আমার দেহের অংগ-প্রত্যংগগুলি জোড়া লাগান; দ্বিতীয় আওয়াজের পর রূহ আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে। তৃতীয় আওয়াজ যখন হল তখন আমার ধারণা হল, এটা কিয়ামতের আওয়াজ। আমি ভীত-শংকিত হয়ে পড়লাম। কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল ও চোখের ভ্রষ্ঠ সব সাদা হয়ে গিয়েছে। তারপর মেয়েটি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা! আপনি আমাকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ দুইবার গ্রহণ করালেন কেন?

মা! ধৈর্য ধরুন, পুণ্যের আশা করুন। দুনিয়ার উপরে থাকার কোন আগ্রহ আমার নেই। হে রূহুল্লাহ! হে তুল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, যেন আমাকে তিনি আখিরাতের জীবন ফিরিয়ে দেন এবং মৃত্যুর কষ্ট কমিয়ে দেন। ঈসা (আ) আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন। ফলে মেয়েটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল এবং তাকে কবরস্থ করা হল। এ সংবাদ ইয়াহুদীদের নিকট পৌছলে তারা ঈসা (আ)-এর প্রতি পূর্বের চাইতে অধিক বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠে।

ইতিপূর্বে হযরত নূহ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত নূহের পুত্র সাম-কে জীবিত করে দেয়ার জন্যে বনী ইসরাঈলরা হযরত ঈসার নিকট দাবী জানায়। তিনি সালাত আদায় করে আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। ফলে আল্লাহ তাকে জীবিত করে দেন। সাম জীবিত হয়ে বনী ইসরাঈলদেরকে নূহ (আ)-এর নীেকা সম্বন্ধে অবহিত করেন, ঈসা (আ) পুনরায় দোয়া করলে তিনি আবার মাটির সাথে মিশে যান।

সুদন্দী … ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বরাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি হল, বনী ইসরাঈলের কোন এক বাদশাহর মৃত্যু হয়। কবরস্থ করার জন্যে তাকে খাটের উপর রাখা হয়। এ সময় হযরত ঈসা (আ) সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। ফলে বাদশাহ জীবিত হয়ে যায়। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে এ আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। আল্লাহর বাণী :

অনুগ্রহ স্মরণ করা ৪ পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শাক্তিশালী করেছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলতে; তোমাকে কিতাব হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কাদা দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখী সদৃশ আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুৎকার দিতে, ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখী হয়ে যেত;

অনুমতিক্রমে অর্থ আদেশক্রমে, আল্লাহর অনুমতি কথাটি আনার উদ্দেশ্য হল, মানুষ যাতে এই সন্দেহ না করে যে, ঈসা নিজের ক্ষমতা বলেই এরূপ করেছেন। জন্যান্ধ বলতে এখানে কোন কোন আলিম বলেছেন : যার কোন চিকিৎসা নেই। কুণ্ঠ রোগীও এমন কুণ্ঠরোগ, যার কোন চিকিৎসা নেই।

জন্মান্ধ ও কুণ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতিক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমা হতে বনী ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা কুফৱী করেছিল তারা বলেছিল, এতো স্পষ্ট যাদু। আরও স্মরণ করা, আমি যখন হাওয়ারীদেরকে এই আদেশ দিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার প্রতি ও আমার রাসূলের প্রতি ঈমান আনি, তারা

বলেছিল, আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা তো মুসলিম। (৫ মায়িদা)

এখানে আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসার প্রতি প্রদত্ত অনুগ্রহসমূহ ও পিতা ব্যতীত মায়ের থেকে সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁকে তিনি মানব জাতির জন্যে নিদর্শন বানিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এটা আল্লাহর অসীম ক্ষমতারই সুস্পষ্ট প্রমাণ। এ সবের পরেও তাঁকে রাসূল বানিয়ে নিজ অনুগ্রহ পূর্ণ করেন।

তোমার মায়ের প্রতি আমার অনুগ্রহ অর্থাৎ প্রথমত, এই বিশাল নিয়ামতের অধিকারী মহান নবীর মা হওয়ার জন্যে তাঁর প্রতি যে কুৎসা রটনা করেছিল তা থেকে মুক্ত করার জন্যে প্রমাণ উপস্থাপন। পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম। পবিত্র আত্মা অর্থ জিবরাঈল ফিরিশতা। জিবরাঈলের দ্বারা শক্তিশালী করেছিলেন।

এভাবে যে, তিনি তার রূহকে তার মায়ের জামার হাতার মধ্যে ফুৎকার দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন; রিসালাতের দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঈসা (আ)-এর সাথে সাথে থাকতেন এবং নবীর বিরোধীদেরকে তিনি প্রতিহত করতেন। দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে কথা বলার অর্থ-তুমি শিশুকালে দোলনায় থাকা অবস্থায় মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করেছ। এবং পরিণত বয়সেও তাদেরকে আহবান করবে।

কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়ার অর্থ লিপি জ্ঞান ও গভীর অনুধাবন শক্তি দান করা। প্রাচীন যুগের আলিম এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। কাদা দ্বারা পাখীর আকৃতি গঠন অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতিক্রমে তুমি কাদা দ্বারা পাখীর আকৃতি অবয়ব গঠন করতে। আমার অনুমতিক্রমেপখী হয়ে যেত।

অনুমতিক্রমে অর্থ আদেশক্রমে, আল্লাহর অনুমতি কথাটি আনার উদ্দেশ্য হল, মানুষ যাতে এই সন্দেহ না করে যে, ঈসা নিজের ক্ষমতা বলেই এরূপ করেছেন। জন্যান্ধ বলতে এখানে কোন কোন আলিম বলেছেন : যার কোন চিকিৎসা নেই। কুণ্ঠ রোগীও এমন কুণ্ঠরোগ, যার কোন চিকিৎসা নেই।

মৃতকে জীবিত করা অর্থাৎ কবর থেকে জীবিত অবস্থায় উঠানো। আমার অনুমতিক্রমে শব্দটির পুনরুক্তি। এ কথা দ্বারা ঐ ঘটনার দিকে ইংগিত করা হয়েছে, যখন বনী ইসরাঈলরা তাঁকে শূলে চড়াবার জন্যে

উদ্যত হয়েছিল। তখন আল্লাহ তাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং আপনি সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছিলেন। আমি যখন হাওয়ারীদেরকে ওহী মারফত আদেশ দিয়েছিলাম। এখানে ওহীর দুপ্রকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

হাওয়ারীরা বলল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহতে ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থাক। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যা অবতীর্ণ করেছ তাতে আমরা ঈমান এনেছি, এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্য দানকারীদের তালিকাভুক্ত কর। এবং তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও

এক: ওহী অর্থ ইলহাম বা প্রেরণা জাগিয়ে দেওয়া। এ অর্থে কুরআনের আয়াত যেমন

নির্দেশ দিয়েছেন (১৬ নাহল ৪ ৬৮); و او حینا الی اچ قوسی ان ار ضعیه فاذا خفت عليه فألقيه فى اليم. মূসার মায়ের অন্তরে আমি ইংগিতে নিদের্শ করলাম, শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাক। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোন আশংকা করবে। তখন একে দরিয়ায় নিক্ষেপ করে দিও। (২৮ কাসাস : ৭)

দুই; রাসূলের মাধ্যমে প্রেরিত ওহী এবং তাদেরকে সত্য গ্রহণের তাওফীক দেওয়া। এ জন্যেই তারা প্রতি উত্তরে বলেছিল-আমরা ঈমান আনলাম এবং তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলিম। হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ সমূহের মধ্যে অন্যতম বড় অনুগ্রহ এই যে, তিনি তাকে এমন একদল সাহায্যকারী ও সেবক।

দিয়েছিলেন, যারা তাকে সর্বোতভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন এবং মানুষকে এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান জানাতেন। যেমন আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ (সা) সম্পর্কে বলেছেন :

তিনি তোমাকে আপনি সাহায্য ও মুমিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন; এবং তিনি ওদের পরস্পরের হৃদয়ের মধ্যে গ্ৰীতি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের হৃদয়ে গ্ৰীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (৮ আনফাল : ৬২,৯৬২)

আল্লাহ বলেন-

এবং তিনি তাকে শিক্ষা দিবেন। কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল এবং তাকে বনী ইসরাঈলের জন্যে রাসূল করবেন। সে বলবে, আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের জন্যে কাদা দিয়ে একটি পাখীর আকৃতি গঠন করব; তাতে আমি ফুৎকার দিব; ফলে আল্লাহর হুকুমে তা পাখী হয়ে যাবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করব এবং আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবন্ত করব।

তোমরা তোমাদের ঘরে যা আহার কর ও মাওজুদ কর তাতোমাদেরকে বলে দেব। তোমরা যদি মুমিন হও তবে এতে তোমাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। আর আমি এসেছি আমার সম্মুখে তাওরাতের যা রয়েছে তার সমর্থকরূপে ও তোমাদের জন্যে যা নিষিদ্ধ ছিল তার কতকগুলোকে বৈধ। করতে।

এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তার ইবাদত করবে। এটাই সরল পথ। যখন ঈসা। তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করল তখন সে বলল, আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?

হাওয়ারীরা বলল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহতে ঈমান এনেছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি এর সাক্ষী থাক। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যা অবতীর্ণ করেছ তাতে আমরা ঈমান এনেছি, এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্য দানকারীদের তালিকাভুক্ত কর। এবং তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও

কৌশল করেছিলেন; আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। (৩ আলে ইমরান : ৪৮-৫৮)

প্রত্যেক নবীর মুজিযা ছিল তাঁর নিজ যুগের মানুষের চাহিদার উপযোগী। যেমন হযরত মূসা (আ)-এর যুগের লোকেরা ছিল তীক্ষুধী। যাদুকর। আল্লাহ তাঁকে এমন মুজিযা দান করলেন যা যাদুকরদের চোখ ঝলসিয়ে দিয়েছিল এবং যাদুকররা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিল। যাদুকররা যাদু সংক্রান্ত তথ্যাদি সম্পর্কে অবগত ছিল। যাদুর দৌড় যে কী পর্যন্ত, সে সম্পর্কেও তারা অবহিত ছিল।

সুতরাং যখন তারা মূসা (আ)-এর মুজিযা প্রত্যক্ষ করল তখন তারা বুঝতে পারলো যে, এতো মানবীয় ক্ষমতার বহির্ভূত ব্যাপার। আল্লাহর সাহায্য ও প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যতীত কোন মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু প্রকাশ হতে পারে না। কোন নবীর সত্যতা প্রমাণের জন্যে আল্লাহ এরূপ মানবীয় ক্ষমতার বহির্ভুত কিছু প্রকাশ করে থাকেন।

আল্লাহর বাণী তারা এক চক্রান্ত করেছিল, আর আল্লাহ এক কৌশল অবলম্বন করলেন। আল্লাহই উত্তম কৌশল অবলম্বনকারী। আল্লাহ আরও বলেন?স্মরণ করা, মারিয়াম তনয় ঈসা বলেছিল, হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে।

সুতরাং কালবিলম্ব না করে তারা মূসা (আ)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। অনুরূপভাবে হযরত ঈসা ইব্‌ন মারয়াম (আ)-কে যে যুগে প্রেরণ করা হয় সে যুগটি গ ছিল উন্নত চিকিৎসার জন্যে প্রসিদ্ধ। আল্লাহ তাকে এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন মুজিযা দান করলেন যা ছিল তাদের ক্ষমতা ও আয়ত্তের বাইরে।

একজন চিকিৎসক যখন অন্ধ, খঞ্জ,কুণ্ঠ ও পঙ্গুকে ভাল করতে অক্ষম, সেখানে একজন জন্মািন্ধকে ভাল করার প্রশ্নই উঠে না। আর একজন মৃত ব্যক্তিকে কবর থেকে জীবিত উঠাবার শক্তি মানুষের জন্যে তো কল্পনাই করা যায় না। প্রত্যেকেই বুঝে যে, এসব এমন মুজিযা, যার মাধ্যমে এগুলো প্রকাশ পায় তার দাবির পক্ষে এটা হয়ে থাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং যে সত্তা তাকে প্রেরণ করেন তার কুদরত ও মহাশক্তির প্রমাণ।

একই পদ্ধতিতে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে যে যুগে প্রেরণ করা হয় সে যুগটি ছিল বালাগােত-ফসাহাত তথা অলংকারশাস্ত্রে সমৃদ্ধ উন্নত ভাষা শিল্পের যুগ। আল্লাহ তার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করেন। যে কোন ত্রুটি থেকে তা মুক্ত।

কুরআনের বাক্য ও শব্দগুলো এমনই মুজিযা যে, মানব ও জিন জাতিকে সম্মিলিতভাবে এই কুরআনের অনুরূপ একটি কুরআন, কিংবা অনুরূপ ১০টি সূরা অথবা মাত্র ক্ষুদ্র একটি সূরা রচনা করার চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এরপর দৃঢ়তার সাথে বলা হয়েছে যে, তারা কোন দিন এ চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা করতে পারবে না-বর্তমানেও না, ভবিষ্যতেও না, এখনই যখন পারেনি, ভবিষ্যতে কখনও পারবে না।

এরকম ভাষা তারা তৈরি করতে এ জন্যে পারবে না, যেহেতু এটা আল্লাহর বাণী। আর আল্লাহর সাথে কোন কিছুরই তুলনা হতে পারে না। –না তার সত্তার সাথে না তাঁর গুণাবলীর সাথে, না। তার কার্যাবলীর সাথে।

হযরত ঈসা (আ) যখন বনী ইসরাঈলের নিকট অকাট্য দলীল-প্রমাণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন তখন তাদের অধিকাংশ লোকই কুফারী, ভ্রষ্টতা, বিদ্বেষ ও অবাধ্যতার উপর অটল থেকে যায়। তবে তাদের একটি ক্ষুদ্র দল তার পক্ষ অবলম্বন করে এবং বিরোধিতাকারীদের প্রতিবাদ জানান।

তারা নবীর সাহায্যকারী হন ও তার শিষ্যত্ব বরণ করেন। তাঁরা নবীর আনুগত্য করেন, সাহায্য-সহযোগিতা করেন ও উপদেশ মেনে চলেন। এই ক্ষুদ্র দলটির আত্মপ্রকাশ তখন ঘটে যখন বনী ইসরাঈল তাকে হত্যার জন্যে পরিকল্পনা গ্ৰহণ করে এবং সে যুগের জনৈক বাদশাহর সাথে ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করে তাঁকে হত্যা ও শূলে চড়ানোর চক্রান্ত সম্পন্ন করে।

কিন্তু আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেন। তাদের মধ্য থেকে নবীকে তার সান্নিধ্যে উঠিয়ে নেন। এবং তাঁর একটি শিষ্যকে তার চেহারার অনুরূপ চেহারায় রূপান্তরিত করে দেন। কিন্তু বনী ইসরাঈলরা তাকে ঈসা। মনে করে হত্যা করে ও শূলে চড়ায়। এব্যাপারে তারা ভুল সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করে ও সত্যকে উপেক্ষা করে। খ্ৰীষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোক এদের দাবিকে সমর্থন করে। কিন্তু উভয় দলই এ ব্যাপারে ভুলের মধ্যে রয়েছে।

আল্লাহর বাণী তারা এক চক্রান্ত করেছিল, আর আল্লাহ এক কৌশল অবলম্বন করলেন। আল্লাহই উত্তম কৌশল অবলম্বনকারী। আল্লাহ আরও বলেন?স্মরণ করা, মারিয়াম তনয় ঈসা বলেছিল, হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে।

<<হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : দুই ।। হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : চার>>

………………..
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইসলামের ইতিহাস : আদি-অন্ত।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : এক
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : দুই
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : তিন
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : চার
হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম ও ওহীর সূচনা : পাঁচ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!