জগৎ জননী ফাতেমা-১১

জগৎ জননী ফাতেমা-১১

-নূর মোহাম্মদ মিলু

আল্লাহর প্রিয় পাত্রী
ফাতেমা যে, আল্লাহরও প্রিয় পাত্রী ছিলেন কোন কোন অলৌকিক ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে একবার সামান্য খাদ্যে আল্লাহ যে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করেছিলেন তা উল্লেখ করা যায়। বিভিন্ন সূত্রে ঘটনাটি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার সারকথা হলো-

একদিন তাঁর এক প্রতিবেশিনী তাঁকে দুইটি রুটি ও এক খণ্ড গোশত উপহার হিসেবে পাঠালো। তিনি সেগুলো একটি থালায় ঢেকে ঢেকে দিলেন। তারপর নবীজীকে ডেকে আনার জন্য ছেলেকে পাঠালেন। নবীজী আসলেন এবং ফাতেমা তাঁর সামনে থালাটি উপস্থাপন করলেন।

এরপরের ঘটনা ফাতেমা বর্ণনা করেছেন এভাবে-

আমি থালাটির ঢাকনা খুলে দেখি সেটি রুটি ও গোশতে পরিপূর্ণ। আমি দেখে তো বিস্ময়ে হতবাক! বুঝলাম, এ বরকত আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং তাঁর নবীর উপর দরূদ পাঠ করলাম। তারপর খাদ্য ভর্তি থালাটি নবীজীর সামনে উপস্থাপন করলাম।

তিনি সেটি দেখে আল্লাহর প্রশংসা করে প্রশ্ন করলেন- মেয়ে! এ খাবার কোথা থেকে এসেছে?

বললাম- আব্বা, আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিজিক দান করেন।

নবীজী বললেন- আমার প্রিয় মেয়ে! সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি তোমাকে বনী ইসরাঈলের নারীদের নেত্রীর মত করেছেন। আল্লাহ যখন তাঁকে কোন খাদ্য দান করতেন এবং সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো, তখন তিনি বলতেন- এ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিজিক দান করেন।

সেই খাবার নবীজী, আলী, ফাতেমা, হাসান, হুসায়ন এবং নবীজীর সকল বেগম গ্রহণ করেন। তাঁরা সবাই পেট ভরে খান। তারপরও থালার খাবার একই রকম থেকে যায়। ফাতেমা সেই খাবার প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

আল্লাহ সেই খাবারে প্রচুর বরকত ও কল্যাণ দান করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৬/১১১; হায়াত আস-সাহাবা-৩/৬২৮; তাফসীর ইবন কাছীর -৩/৩৬০)

নবীজী একবার দোয়া করেন, আল্লাহ যেন ফাতেমাকে ক্ষুধার্ত না রাখেন। ফাতেমা বলেন, তারপর থেকে আমি আর কখনো ক্ষধার্ত হইনি।

ঘটনাটি এরকম-

একদিন নবীজী ফাতেমার ঘরে গেলেন। তখন তিনি যাতায় গম পিষছিলেন। গায়ে ছিল উটের পশমে তৈরি কাপড়। মেয়ের এ অবস্থা দেখে পিতা কেঁদে ফেলেন এবং বলেন- ‘ফাতেমা! আখিরাতের সুখ-সম্ভোগের জন্য দুনিয়ার এ তিক্ততা গিলে ফেল।’

ফাতেমা উঠে পিতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পিতা কন্যার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, প্রচণ্ড ক্ষুধায় তার মুখমণ্ডল রক্তশূন্য হয়ে পাণ্ডু বর্ণ হয়ে গেছে। তিনি বললেন- ফাতেমা! কাছে এসো। ফাতেমা পিতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পিতা একটি হাত মেয়ের কাঁধে রেখে এই দোয়া উচ্চারণ করেন-

‘ক্ষুধার্তকে আহার দানকারী ও সংকীর্ণতাকে দূরীভূতকারী হে আল্লাহ! তুমি ফাতেমা বিনত মোহাম্মদের সংকীর্ণতাকে দূর করে দাও।’ (আ‘লাম আন-নিসা’- ৪/১২৫)

কথাবার্তা, চালচলন, উঠাবসা প্রতিটি ক্ষেত্রে ফাতেমা ছিলেন নবীজীর প্রতিচ্ছবি। হজরত আয়েশা বলেন-

‘ফাতেমা হ্যাঁটতেন। তাঁর হ্যাঁটা নবীজীর হ্যাঁটা থেকে একটুও এদিক ওদিক হতো না।’ (সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা’-২/১৩০)

সততা ও সত্যবাদিতায় তাঁর কোন জুড়ি ছিল না। আয়েশা বলতেন-

আমি ফাতেমার চেয়ে বেশী সত্যভাষী আর কাউকে দেখিনি। তবে যাঁর কন্যা (নবীজী) তাঁর কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।’ (প্রাগুক্ত-১৩১)

আয়েশা আলো বলেন-

আসি কথাবার্তা ও আলোচনায় নবীজীর সাথে ফাতেমার চেয়ে বেশী মিল আছে এমন কাউকে দেখি না। ফাতেমা যখন নবীজীর কাছে আসতেন, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে কাছে টেনে চুমু দিতেন, স্বাগত জানাতেন। ফাতেমাও পিতার সাথে একই রকম কারতেন।’

নবীজী যে পরিমাণ ফাতেমাকে ভালোবিাসতেন, সেই পরিমাণ অন্য কোন সন্তানকে ভালোবাসতেন না। (আবু দাঊদ- বাবু মা জায়াফিল কিয়াম (৫২১৭) ; তিরমিযী- মানাকিবু ফাতেমা (৩৮৭১))

তিনি বলেছেন- ‘ফাতেমা আমার দেহের একটি অংশ। কেউ তাকে অসন্তুষ্ট করলে আমাকে অসন্তুষ্ট করবে।’

ইমাম আস-সুহাইলী এই হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন, কেউ ফাতেমাকে গালিগালাজ করলে কাফের হয়ে যাবে। তিনি তাঁর অসন্তুষ্টি ও নবীজীর অসন্তুষ্টি এক করে দেখেছেন। আর কেউ নবীজীকে ক্রোধান্বিত করলে কাফের হয়ে যাবে। (আ‘লাম আন-নিসা’ -৪/১২৫, টীকা-২)

ইবনুল জাওযী বলেছেন, নবীজীর অন্য সকল কন্যাকে ফাতেমা এবং অন্য সকল বেগমকে আয়েশা সম্মান ও মর্যাদায় অতিক্রম করে গেছেন। (প্রাগুক্ত-৪/১২৬)

হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবীজী বলেছেন- একজন ফেরেশতাকে আল্লাহ আমার সাক্ষাতের অনুমতি দেন। তিনি আমাকে এ সুসংবাদ দেন যে, ফাতেমা হবে আমার উম্মাতের সকল নারীর নেত্রী এবং হাসান হুসায়ন হবে জান্নাতের অধিবাসীদের নেতা। (প্রাগুক্ত-৪/১২৭)

এক প্রসঙ্গে তিনি আলীকে বলেন- ফাতেমা আমার দেহের একটি অংশ। সুতরাং তার অসন্তুষ্টি হয় এমন কিছু করবে না।’

পিতার প্রতি ফাতেমার ভালোবাসা
নবীজী যেমন কন্য ফাতেমাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তেমনি ফাতেমাও পিতাকে প্রবলভাবে ভালোবাসতেন। পিতা কোন সফর থেকে যখন ফিরতেন তখন সর্বপ্রথম মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তারপর কন্যা ফাতেমার ঘরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে নিজের ঘরে যেতেন। এটা তাঁর নিয়ম ছিল।

একবার নবীজী এক সফর থেকে ফিরে ফাতেমার ঘরে যান। ফাতেমা পিতাকে জড়িয়ে ধরে চোখে-মুখে চুমু দেন। তারপর পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেন। নবীজী বলেন- কাঁদছো কেন?

ফাতেমা বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে এবং আপনার পরিধেয় বস্ত্রও ময়লা, নোংরা হয়েছে। এ দেখেই আমার কান্না পাচ্ছে।

নবীজী বললেন- ফাতেমা, কেদঁ না। আল্লাহ তোমার পিতাকে একটি বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। ধরাপৃষ্ঠের শহর ও গ্রামের প্রতিটি ঘরে তিনি তা পৌঁছে দেবেন। সম্মানের সঙ্গে হোক বা অপমানের সঙ্গে। (কানয আল-‘উম্মাল-১/৭৭; হায়াত আস-সাহাবা-১/৬৫)

নবীজীর তিরস্কার ও সতর্ককরণ
নবীজীর এত প্রিয়পাত্রী হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়ার সুখ-ঐশ্বর্য্যের প্রতি সামান্য আগ্রহ দেখলেও নবীজী তাঁকে তিরস্কার করতে কুণ্ঠিত হতেন না। নবীজী পার্থিব ঠাঁটবাট ও চাকচিক্য অপছন্দ করতেন। তিনি নিজে যা পছন্দ করতেন না তা অন্য কারো জন্য পছন্দ করতে পারেন না।

একবার স্বামী আলী একটি সোনার হার ফাতেমাকে উপহার দেন। তিনি হারটি গলায় পরে আছেন। এমন সময় নবীজী আসেন এবং হারটি তাঁর দৃষ্টিতে পড়ে। তিনি বলেন, ফাতেমা! তুমি কি চাও যে, লোকেরা বলুক নবীজীর কন্যা আগুনের হার গলায় পরে আছে?

ফাতেমা পিতার অসন্তুষ্টি বুঝতে পেরে হারটি বিক্রি করে দেন এবং সেই অর্থ দিয়ে একটি দাস ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। একথা নবীজী জানার পর বলেন-

‘সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি ফাতেমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়েছেন।’ (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব-১/৫৫৭; মুসনাদ-৫/২৭৮, ২৭৯; নিসা‘ হাওলাদার রাসূল-১৪৯)

আরেকটি ঘটনা। নবীজী কোন এক যুদ্ধ থেকে ফিরলেন। অভ্যাস অনুযায়ী তিনি ফাতেমার গৃহে যাবেন। ফাতেমা পিতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ঘরের দরজায় পর্দা ঝুলালেন, দুই ছেলে হাসান ও হুসায়নের হাতে একটি করে রূপোর চুড়ি পরালেন। ভাবলেন, এতে তাঁদের নানা নবীজী খুশি হবেন। কিন্তু ফল উল্টো হলো।

(চলবে…)

…………………………………
আরো পড়ুন:
জগৎ জননী ফাতেমা-১
জগৎ জননী ফাতেমা-২
জগৎ জননী ফাতেমা-৩
জগৎ জননী ফাতেমা-৪
জগৎ জননী ফাতেমা-৫
জগৎ জননী ফাতেমা-৬
জগৎ জননী ফাতেমা-৭
জগৎ জননী ফাতেমা-৮
জগৎ জননী ফাতেমা-৯
জগৎ জননী ফাতেমা-১০
জগৎ জননী ফাতেমা-১১
জগৎ জননী ফাতেমা-১২

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!