ভবঘুরেকথা
মোহাম্মদ আলী ফকির

মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: দুই

-ফিরোজ এহতেশাম

[ফকির মো. আলী শাহর সাক্ষাৎকার]

ফিরোজ: লালনের গানে কিছু প্রতীকী ও পারিভাষিক শব্দ আছে। লালনের ভাবধারায় যারা দিক্ষীত না, সাধারণ মানুষ, তারা কি সঠিক অর্থে সেই শব্দটি বুঝতে পারবে, নাকি ভুল বুঝবে?

আলী: আছে তো, অনেক শব্দই আছে। সাধারণ মানুষের অনেকে হয়ত এই শব্দগুলোকে ভুল অর্থে নিতে পারে। সব জিনিসেরই কিন্তু একটা ফাঁক আছে, আড়াল আছে। তবে একটা প্রমাণ দেই আপনাকে।

সাঁইজির এক বাণী আছে যে, ছয় মাসের এক কন্যা ছিল, নয় মাসে তার গর্ভ হইল, এগারো মাসে তিনটি সন্তান, কোনটা করবে ফকিরি। যে ফকিররা জানে তারাই এটা বুঝবে, সাধারণ লোকে বুঝবে না বা ভুল বুঝবে।

ফিরোজ: বাউলদের মধ্যে তো সাধন-সঙ্গী বেছে নেওয়ার ব্যাপার আছে, যে, সাধন-সঙ্গী বেছে নিয়ে বাউলরা সিদ্ধি লাভ করে…

আলী: যার আছে তার তো আছেই, যার স্ত্রী বা স্বামী নাই তার সাধন-সঙ্গী দরকার। তখন তারা যে সাঁইজির তরিকা জানে-বোঝে সেরকম দেখে সাধন-সঙ্গী বেছে নেয়। এরপর তারা সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে। কিভাবে সিদ্ধি লাভ করে তা বলা যাবে না। তবে সাধন-সঙ্গী ছাড়া সিদ্ধিলাভ করা সম্ভব না, সাধন-সঙ্গী লাগবেই।

সাঁইজির তরিকায় যুগল সাধনা দরকার, তাই যুগল সাধককেই লাগবে। আমি কিন্তু কথায় কোনো কিছু ফাঁক রাখছি না। সাঁইজি বলছেন, নিজের মনকে করলাম সোজা, বিবির মনে গোল রইল, আমার নামাজ আদায় কই হইল।

বিবির মনে গোলমাল থাকলে আর নামাজ হবে না। কোন নামাজ? পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, কপালে কালো পড়ার নামাজ? এই সেই নামাজ না। এটা দায়েমি নামাজ। পড় রে দায়েমি নামাজ এ দিন হল আখেরি। আমরা নামাজ কিন্তু পাঁচবার পড়ি না, দুইবার পড়ি। সকাল এবং সন্ধ্যায়।

ফিরোজ: যুগল সাধনায় কি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই সিদ্ধিলাভ করে?

আলী: এগারো মাসে তিনটি সন্তান, কোনটা করবে ফকিরি? ফকিরি তো সবাই করে না, একজন করে। সন্তান তো নিতেই হয়। তো তাদের অবস্থান এক জায়গায়, মানে তারা বাস করে এক জায়গায়, আর প্রকাশ ঘটায় আরেক জায়গায়।

এখন যদি আপনি বলেন যে, এই তিন জন কোথায় থাকে? এটা গোপন। তাদের কি নাম, তারা স্ত্রী না পুরুষ? তারা নারী, তিনজনই নারী। কোনটা করবে ফকিরি? এই ফকিরির সাহায্যেই তো আমার সাধনা। আমার কী মুরোদ আছে! ও আমাকে সাধনা করায় তাই আমি সাধনা করি।

তারপরও আমার সহধর্মীনি, আমার স্ত্রী যদি মনে করে যে একে আমি মেরে ফেলব বা একে আমি বাঁচাব তো সে-ই পারে। আপনার কোনো ক্ষমতা নাই। আপনি তো খালি ডুবার তালে রয়েছেন। ডুবে গেলেন আর উঠে চলে আসলেন।

এরপর অন্তত ঘণ্টাখানেক তো আপনার আর কোনো খবর নাই। তাই না? তারপরে যদি আবার জাগে তো ডুবাবেন। খোদ আপনি তো ডুবার তালে, আপনি ডুবা পার্টি।

ফিরোজ: গুরুর কাছে ফকিরদের খেলাফত বা দীক্ষা নেওয়ার বিষয়টা ও প্রক্রিয়াটা জানতে চাই।

আলী: দীক্ষা-শিক্ষা নেওয়ার পর খেলাফত হয়। খেলাফত বাড়ির কাছের জিনিস না। তবে এখন কিন্তু বাজারে কিনতে পাওয়া যায় খেলাফত! মেলায় পাওয়া যায়। এখন আপনি আইসে বলবেন যে সাঁইজি আপনাকে আমি এক হাজার টাকা দিচ্ছি আমাকে খেলাফতটা দিয়ে দেন, দিয়ে দিবি।

কিন্তু এই খেলাফত নিতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল আমার, অনেক কষ্ট ও সাধনার বিনিময়ে পেতে হয়েছে।

ফিরোজ: আপনার গুরু কে?

আলী: আমার গুরু এখান থেকে সাত মাইল দূরে আলমপুর ইউনিয়নর রাজপুরে অবস্থান করছেন। আমার গুরুর নাম রহমত শাহ। উনি জীবিত আছেন।

ফিরোজ: টাকা দিয়ে খেলাফত দিয়ে বা নিয়ে কার কি লাভ?

আলী: কিছুই লাভ না, গুরুর কিছু আর্থিক সহযোগিতা হইল। যে নিল তারও কোনো লাভ নেই, বরং অপরাধ বা পাপ করলাম আমি বা গুরু। যে টাকা নিল সে-ই কিন্তু অপরাধ করল। যে দিল তারও অপরাধ।

ফিরোজ: নফি, এজবাত-এই জিনিসগুলা কী, একটু বলেন তো?

আলী: নফি, এজবাত হলো জিকির। আপনি তো সবই দেখি নিয়ে আইছেন। (হাসি) তো সেইখানে যেতে হচ্ছে যে, ‘শহরে ষোল জনা বোম্বেটে, করিয়ে পাগলপারা আমায় নিল সব লুটে।’ তো সব তো লুটে নিচ্ছেন আমার কাছ থেকে (হাসি)। নফি, এজবাত জিকির।

আমি বলব, কিন্তু এর মূলে কিন্তু যাব না। এই জিকির করতে ছয়টা মোকামে যাওয়া লাগে। সেখানে গুরুরূপ আমার জ্ঞানে থাকতে হবে। গুরুরূপ জ্ঞানে রেখে ওই ছয় মোকামে যাব, গিয়ে নফি, এজবাতটুকু পড়ব। এই ছয়টা মোকাম কি তা বলা যাবে না। এই দেহের ভিতরে ছয়টা মোকাম, মানে ছয়টা জায়গা, ছয়টা ঘর আছে।

তাই সাঁইজি বললেন, ‘ছয় মহলে ঘড়ি ঘোরে, শব্দ হয় নিঃশব্দের ঘরে, কলকাঠি মুকন্দদ্বারে, কি আজব কারখানা। কয় দমেতে বাজে ঘড়ি করো রে ঠিকানা।’ সাঁইজি আমার কিচ্ছু বাদ রাখেন নাই। সাঁইজি, সাঁইজি না। আমরা মানুষরূপে তারে দেখেছি, সাঁইজি মানুষ না। অনেক অনেক অনেক ঊর্ধ্বের জিনিস সাঁইজি।

আমরা সাধারণত তাকে মানুষ ভেবে কত ইঙ্গিত করি, কত খারাপ কথা বলি, তাই না? ধুর, নামাজ পড়ে না, রোজা করে না। আরে নামাজ-রোজার কথা তো আলাদা জিনিস। আমার সাঁইজি কিন্তু এসবের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বের জিনিস। যাক, সেই নফি, এজবাত হচ্ছে জিকিরের সাধনা।

ফিরোজ: এখন তো অনেকেই লালনের গানের কথা ও সুর বিকৃত করে গায়। এটা বন্ধ করার কোনো উপায় নাই?

আলী: এটা যার যার ব্যাপার। এটা সম্বন্ধে আমি কী বলব! যেমন সাঁইজির একটা বাণী আছে, ‘পাখি কখন যেন উড়ে যায়, একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়…।’ কত করুণ সুর না? এটা কি লাফালাফির গান? এই গানটা গাওয়ার সময় কি নাচা আসবে?

আমি যত বড় নর্তকী হই, যত বড় কোমড় দুলানেআলা হই, আমার কোমড় কি দুলবে? আমার চোখ দিয়ে টসটস করে পানি ঝরবে। নয়নবারি ঝরলে কি আর নাচা আসে! কিন্তু এখন দেখি এই গানটার সময় নাচা হয় এবং নর্তন-কুর্দন হয়! এই হচ্ছে ঘটনা! এখন বুঝে নেন।

লালনের মূল সুর এখন তো টিকায়ে রাখার কোনো পজিশন নেই। তখন অসুবিধা ছিল যে সাঁইজির গানের তো কোনো স্বরলিপি ছিল না। স্বরলিপি থাকলে তারা হয়তো সেটা মেইনটেইন করত। তাই এখন যে যেরকম মনে করছে সে সেরকম গাচ্ছে।

আদি বাউল যারা, আদি ফকির যারা তারা গাইত, তাদের পরম্পরায় এটা হয়ে আসছে। আদি সুরে যারা গায়, তারা হয়ত সঠিক গায়। এখন মর্ডান সিঙ্গার যারা তারাও সাঁইজির স্বরলিপি তৈরি করে ফেলেছে! তারপরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি তো, সাঁইজির অনেক আদি সুর হারিয়েই গেছে বলতে গেলে।

ফরিদা পারভীন কিন্তু অনেক গান আদি সুরে গায়। তিনি আমার বাবার কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। আমার বাবা ফরিদা পারভীনকে গান শিখায়েছিল।

ফিরোজ: বাউলধর্মের মূল টার্গেটটা কী, উদ্দেশ্যটা কী?

আলী: বাউলধর্মের টার্গেটটা তো এক কথায় বলা যাবে না। এর আগে বাউল শব্দের অর্থটা বুঝতে হবে। ‘বা’ মানে বাতাস, ‘উল’ মানে সন্ধান। বাতাসের সন্ধান। এই যে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস যাওয়া-আসা করছে না? এরই সন্ধান করা। ইনি কে? কোথায় থাকেন? এর সন্ধান করার নামই বাউল।

ফিরোজ: আমরা বলতেছিলাম লালনের গানের সুরের কথা, স্বরলিপির কথা। লালনের গানের স্বরলিপি তো তৈরি হয় নাই…

আলী: হ্যাঁ, সে সময় তো স্বরলিপি তৈরি হয় নাই। এখন অবশ্য যারা মর্ডান সিঙ্গার, ওরা তো স্বরলিপি তৈরি করে ফেলেছে সাঁইজিরও। ওভাবে এখন গাওয়া হয়। তারপরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি তো, সাঁইজির আদি সুরটা মোটামুটি হারিয়েই গেছে বলতে গেলে।

ফিরোজ: সাধুসঙ্গের ব্যাপারটা একটু বলেন তো। সাধুসঙ্গের প্রক্রিয়াগুলো কী ধরনের?

আলী: সাধুসঙ্গের প্রক্রিয়া তিনটা। অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবা। বাল্যসেবা সকালে, পূর্ণসেবা দুপুরে। এখন পূর্ণসেবা হচ্ছে। (লালনের আখড়ায় তখন দুপুর)

ফিরোজ: অধিবাসের খাবার ব্যাপারটা কীরকম?

আলী: অধিবাসে খাবার নরমাল দেয়। খিচুড়ি-টিচুড়ি দেয় আর কী। অ্যাবিলিটি অনুপাতে। কারও সামর্থ্য যদি থাকে তো খিচুড়ির সঙ্গে মাছ দিবে। কিন্তু মাংস দিতে পারবে না।

ফিরোজ: খাওয়া-দাওয়া নিয়ে তো নিয়ম কানুন আছে। পুরা জীবনদর্শনই তো…

আলী: উনি (লালন) মাংস খেতেন না। উনি মাংসাশী ছিলেন না। উনি জীবহত্যা করতেন না। উনি ডিম খেতেন না।

ফিরোজ: মাছ কী জীব না?

আলী: মাছ জীব হলেও মরা মাছ খেতেন। মাছ তোলার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু মরে যায়। অধিবাস হলো ওই একদিন, সূচনা সন্ধ্যায়।

ফিরোজ: তারপর সকালেরটাকে কী বলে?

আলী: বাল্যসেবা। দুপুরেরটা পূর্ণসেবা।

ফিরোজ: তারপর শেষ?

আলী: সাঁইজির অনুষ্ঠান (সাধুসঙ্গ) শেষ। এখন যদি আপনি সাধু-গুরু হয়ে থাকেন, এখানে বসে থাকেন, হয়ত তারা এক মাস থাকবে, থাকলে নিজের খরচে খাবেন। তবে আপনের খরচে খাওয়া লাগবে না, মনে হয় আমরাই দিব। আমরাই দিব, আজকে তো দিলাম না, আজকে তো এখানেই হইল। পরপর তিন দিন মনে হয় দিবে।

ফিরোজ: খাওয়া-দাওয়া এখানে দিচ্ছে কারা?

আলী: খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে ধরেন এখানে একটা কমিটি আছে…

ফিরোজ: লালন একাডেমির?

আলী: লালন একাডেমির কমিটি আছে। বাইরেরও হেল্প আসে।

ফিরোজ: অনেকেই দেয়…

আলী: হ্যাঁ, সাধুসেবা হচ্ছে, আমি পাঁচ সের, আমি ১০ সের চাইল দিয়া দিচ্ছি। যে আমার কিছু নেই, আমি কয়টা বেগুন দিয়া আসি। মনের ব্যাপার।

ফিরোজ: নিজে নিজেই…

আলী: হ্যাঁ, স্বেচ্ছায়।

ফিরোজ: সাঁইজি সাধুসঙ্গ কেন করতেন?

(চলবে…)

মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: তিন>>

………………
সাক্ষাৎকারটি ফিরোজ এহতেশামের ‘সাধুকথা: ১৩ বাউল-ফকিরের সাথে কথাবার্তা’ বই থেকে পুনর্মুদ্রিত

……………………….
আরো পড়ুন:
মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: এক
মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: দুই
মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: তিন
মানুষের ভিতরে অসীম মানুষ বাস করে: চার

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
দর্শনের ইতিহাস বিচার
আইয়োনীয় দর্শন
টোটেম বিশ্বাস
নির্ধারণবাদ
বিতণ্ডাবাদী
অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদ
জনগণের দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শন
লোকায়ত ও সাংখ্য
লোকায়ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া
প্রকৃতিবাদী দার্শনিকবৃন্দ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!