মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -চার

মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -চার

সাপ প্রজননের প্রতীক একথা অস্বীকারের জো নেই। মনসা যেহেতু সর্পের দেবী তাই প্রজননের সম্পর্ক তাঁর সাথেও আছে। মনসার মূর্তিতে তাঁর কোলে শিশুকে বসিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ সম্পর্কে কারো অজানা নয়।

প্রজনন বলতে আমরা এখন যা বুঝি অর্থাৎ নারী-পুরুষের দৈহিক মিলন ও পরিণামে সন্তান জন্মানো; এটা পরিপূর্ণ ধারণা নয়। এটা বুঝতে গেলে আমাদের এই অঞ্চলের চিন্তাপদ্ধতি সম্পর্কে, বিশেষ করে তন্ত্র সম্পর্কে, ভাল ধারণা থাকতে হবে।

প্রজননের আসল কথা সৃষ্টি। আর সৃষ্টি অর্থ গতি, গতি থেকে বিকাশ আর বিকাশ থেকেই সভ্যতা। আমাদের এই অঞ্চলে প্রজননের দার্শনিক অবস্থান ছিল এই রকম। তাইতো যাবতীয় প্রজননের চিহ্নকে ব্যবহার করে দুরূহ দার্শনিক চর্চার নজীর স্থাপন করে গেছেন পূর্বজরা।

মনসার সাথে এই প্রজননের সম্পর্কের আরেকটা রূপ হচ্ছে পূজায় গাছ ব্যবহার করা। মনসার গল্পেও গাছাপালা, বনজঙ্গলের সাথে মনসার সম্পর্ক দেখানো হয়। গাছাপালার সাথে শেষ বিচারে সৃষ্টিরই সম্পর্ক। তাই সর্পকে ছোট করে দেখা সম্ভব নয়।

আমরা প্রজনন না বলে সহজ বাংলায় বলতে পারি কাম। কাহিনী অনুসারে, কাম থেকে মনসার জন্ম এবং মনসাকে দেখেও শিব কামাসক্ত হয়েছিলেন। সারা জগৎ কাম-রতির লীলায় চলছে। যারা তত্ত্বদর্শী হন তারা বুঝে নিষ্কামী হন।

কামের পথে না পিছলে নিষ্কামী কেউ হতে পারে না। কামের চাবিও মনসার কাছে আবার নিষ্কামের চাবিও মনসার কাছে। আমরা যে সারাবিশ্বে আমাদের কলা, সভ্যতা, উৎপাদনের কাজ করছি এগুলো কি কাম নয়?

এগুলো কামেরই প্রকাশ। মদন-রতি নিত্য লীলা করছে বলেই না এসব সম্ভব হচ্ছে। আমরা আমাদের উদ্ভাবিত জ্ঞানকে নিজেদের মত করে ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছি। এই জ্ঞান তাত্ত্বিক বিচারে মনসারই অংশ।

বঙ্গে মনসা শেষ বিচারে চৈতন্যের স্ফুরণ বা চৈতন্যময়ী। তাই যথাযথভাবে মনসাকে বুঝতে গেলে আমাদের চৈতন্যের স্ফুরণ কিভাবে ঘটে সেটা বোঝা জরুরী। চৈতন্য একই সাথে ইচ্ছাশক্তির দ্বারা কর্মে রূপান্তরিত হয় আবার কর্মের বীজও ধারণ করে।

অর্থাৎ চৈতন্য দুই ভূমিকায় অবতীর্ণা হয়। চৈতন্য নিজে স্ফুরিতা হয় আবার স্ফুরণ করে। অনেকটা শক্তির মত করেও বিচার করতে পারি। শক্তির দ্বারাই যেমন শক্তি নিজে নিত্য-নতুন হয়ে আবির্ভূতা হয় ও বৈচিত্র্যের আবির্ভাব ঘটায় ; চৈতন্যও তদ্রূপ নিজেকে নিজে নিত্য-নতুন রূপে হাজির করে ও কর্মের প্রণোদনা দেয়।

শক্তির প্রভাবে জড়প্রপঞ্চের আবির্ভাব, জড়ের বিবর্তনে এল প্রাণ, প্রাণের এক বিকশিত পর্যায়ে শক্তি চৈতন্য রূপে আবির্ভূতা হল, সেই আবির্ভাবের দরুণ কর্তাসত্তার আবির্ভাব ঘটল, সেই কর্তা আবার তার উৎপত্তিস্থল হিসেবে আবিষ্কার করল ভাষা।

ভাষা এই কর্তার সাথে লীলা করে জগৎপ্রপঞ্চকে মানুষের মধ্যদিয়ে বিকশিত করছে। মানুষের সার কথা আছে মনে। চৈতন্যের খেলা মনের মত উভয়েন্দ্রিয় ছাড়া অসম্ভব। তাই প্রাণের পরে মন বিকশিত হয়েছিল এই কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

এই মনের প্রভাবে এত বিকাশ ও বৈচিত্র্য সংঘটিত হতে পারছে। আর মনসার সাথে সম্পর্ক মনের। মনের সাথে মনসার সম্পর্কের জায়গাটা যদি আমরা ভালভাবে বিচার করি তাহলে আমরা সরলভাবে সিদ্ধান্ত দিতে পারি যে, মনসা চৈতন্যের সাথে একাকার।

অন্তত বৃহৎ বঙ্গের ভাবচর্চার জায়গা থেকে মনসাকে কেবলমাত্র লৌকিক দেবী হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না।

মনসার কাহিনীকে আমরা বেহুলা-লক্ষিন্দরের (লখিন্দর বানানও লেখা হয়) কাহিনী হিসেবে পাঠ করতে পছন্দ করি। আসলে মনসামঙ্গলকে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। মনসার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়েছিল বেহুলা-লখিন্দরের দ্বারাই।

সওদাগর বা বেনে সম্প্রদায়ের বেহুলা ও লখিন্দরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অর্থাৎ সওদাগরদের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিপক্ষে লড়াইয়ে জিততে মনসার সহায়ক হিসেবে বেহুলা-লখিন্দরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা অসামান্য।

তন্ত্রের দার্শনিক মতামতকে আদর্শ ধরে বলতে পারি, মনসা বেহুলা ও লখিন্দরের রূপে এই ভূ-মণ্ডলে তাঁর কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে লখিন্দর শবরূপী শিব এবং বেহুলা হলেন শক্তি সঞ্চারিণী পার্বতী। তাই তো মৃত লখিন্দরকে নিয়ে বেহুলা উজানে চলেছেন। উজানে গিয়ে তারপর স্বামীর প্রাণসঞ্চার করেছেন।

বাঙলায় বিদ্যমান (সাংখ্য ও তন্ত্র মিশ্রিত) যুগলের ধারণা এবং তন্ত্রের সাধনা এই দুটোই মিশে আছে বেহুলা-লখিন্দরের গল্পে। খেয়াল করার বিষয় হল, বাসর ঘরে বা মিলনের সময় লখিন্দরকে সাপে কেটেছে। অর্থাৎ শক্তির সাথে ক্রীড়া করার সময় সাপের দংশনে মারা যায়।

মারা যাবার পর দেহটি বেহুলার সাথে ভেলায় উজানে চলতে থাকে। এখানে সাপে কেটে মারা যাওয়াটা আসলে লৌকিক মৃত্যু নয়। বরং সাধনভজনে প্রবেশ করে জ্যান্তে মরা হওয়া। জ্যান্তে মরা হবার পর আবার যখন প্রাণসঞ্চারিত হল তখন আবার দুজনেই ফিরে গেল অমৃতলোকে। কিন্তু যাওয়ার আগে মনসাকে প্রতিষ্ঠিত করে গেল।

কাহিনী অনুসারে বোঝা যাচ্ছে, বেহুলা-লখিন্দর মনসার ভাব প্রতিষ্ঠিত করেছে। তন্ত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করলে মনসাকেই বেহুলা-লখিন্দর হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তন্ত্রের এই জায়গা থেকেই আমরা এগিয়ে যেতে পারি কেন মনসার ভাব এদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে হল বা বেহুলা-লখিন্দরের রূপ ধরেই কেন মর্ত্যে আগমন করতে হল।

চিন্তা বা চৈতন্য জগতের সঙ্গে তার বৈষয়িক সম্বন্ধ সম্পর্কে কোনো খবর না রাখলে নিজেকে নিজে কখনই জানতে পারে না। কারণ চিন্তা পরিপূর্ণ হয় জগতের সাথে সম্বন্ধ বিচারের দ্বারাই। সেই সম্বন্ধ বিচার করার জন্যই এবং জগতে বর্তমান হওয়ার জন্যই বেহুলা-লখিন্দরের তৎপরতার প্রয়োজন ছিল।

মনসার ভাবকে বর্তমান করে তোলা সম্ভব হয়েছে বা মনসার পূজা পাওয়া সম্ভব হয়েছে বেহুলা-লখিন্দরের কারণে। কাহিনী অনুসারে মনসা অনেক শক্তিশালী হয়েও নিজের স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। অথচ বেহুলা-লখিন্দরের তৎপরতা দ্বারা নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেন।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন:
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -এক
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -দুই
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -তিন
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -চার
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -পাঁচ
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -ছয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!