মা মনসা

মনসা সর্পের দেবী। মনসা উচ্চারণের সাথে সাথে সাপের কথা আমাদের মাথায় আসে। সাপ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র লভ্য, লভ্য কৃষি বাস্তুতন্ত্রে। বাংলার জমি- জলে-জঙ্গলে সাপের আনাগোনা ছিল এবং ছিল সর্পাঘাতে মৃত্যুর ঘটনা।

তাই সাপকে কেন্দ্র করে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক এবং ভয় থেকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়াও স্বাভাবিক। তবে গুরুত্ব শুধু ভয় থেকে আসে নি। মানুষ সাপের অনেক অঙ্গভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে সঙ্গীত সহ বিভিন্ন কলার বিকাশ ঘটিয়েছে।

জীবিকা তো অবশ্যই, এমনকি চিকিৎসা থেকে শত্রু নিধন পর্যন্ত সাপের ব্যবহার হতে লাগল। তাহলে আধ্যাত্মিক চর্চায় বাদ যাবে কেন? আধ্যাত্মিক চর্চায়ও সাপ রূপক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। দেহতত্ত্ব (যোগ ও তন্ত্রের বিচারে) অনুসারে সাপ হল কুলকুণ্ডলিনী।

সাধনার দ্বারা একে সহস্রারে আনতে হয়। মজার ব্যাপার হল, সহস্রারে অবস্থানরত নির্গুণ ব্রহ্ম হলেন স্বয়ং শিব। মনসা সেই শিবের কন্যা আবার কুলকুণ্ডলিনীতেও তাঁর অবস্থান। সেই কারণে মনসাকে দেখে শিবের কামভাব জাগে। অর্থাৎ শিবের কামভাব জাগবার সাথে সর্পতত্ত্বেরই সম্পর্ক বিদ্যমান।

জগতে চলা আকর্ষণ-বিকর্ষণকে বলা হয় সর্প বা ভুজঙ্গ। সর্পের সার হল বিষ। শিবই শেষ, শিব ছাড়া কোনওকিছুর অস্তিত্ব নেই। তাই শিব অঙ্গে বিরাজিত শেষনাগ। সৃষ্টির সংহারে যা বিদ্যমান থাকে এবং যার আর বিকার সম্ভব না তাকে বলে শেষ।

পার্বতীর কথা ভাবতে ভাবতে শিবের বীর্যপাত হয়েছিল এবং তার থেকে মনসার আবির্ভাব। আবার সেই মনসাকে দেখে শিবের কামভাব জাগ্রত হচ্ছে। এখানে রূপক দ্বারা পার্বতী ও মনসার সাথে সমতা করে কুলকুণ্ডলিনী আকারে দেখানো হয়েছে।

কিন্তু দেখা গেল মনসার মধ্যে কেবল শিবের অংশ এবং মনসার সাথে শিবের মিলন হচ্ছে না। এই জায়গাতে আবার ভিন্ন তত্ত্ব উপস্থিত হয়েছে। এখানে শিবের অংশ বলতে আবার বুঝে নিতে হবে শিবস্বরূপা। এই শিব আবার দ্বৈতের বিচারের শিব নয় আবার শুধু দেহের সহস্রারে আবদ্ধ শিব নয়।

এইক্ষেত্রে শিব হয়ে গেলেন তন্ত্রের অদ্বৈত ব্রহ্ম শিব। খেয়াল রাখতে হবে, জড় ও চৈতন্য একীভূত হয়ে থাকা তন্ত্রের ব্রহ্মরূপী শিব নিজেই মনসা রূপে হাজির হলেন। তাই মনসা একই সাথে নারী ও পুরুষ দুটোই। কিন্তু প্রচলিত দেহতত্ত্ব বাদ দেওয়া যায় না বিধায় কামভাবের জায়গাটা রাখতেই হবে।

তন্ত্র ব্যাখ্যা করতে গেলে দর্শন এবং দেহতত্ত্ব থাকবেই। হয়ত কাহিনীর ফলে পাশাপাশি থাকাটা খাপছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু এটাই রহস্য। এই রহস্য ভেদ করার দায়িত্বটুকু নিতেই হবে। কিন্তু সাপ সম্পর্কে আলাপ এখানেই থেমে যায় না। সাপের আরও দিক আছে এখানকার তত্ত্বে।

জগতে চলা আকর্ষণ-বিকর্ষণকে বলা হয় সর্প বা ভুজঙ্গ। সর্পের সার হল বিষ। শিবই শেষ, শিব ছাড়া কোনওকিছুর অস্তিত্ব নেই। তাই শিব অঙ্গে বিরাজিত শেষনাগ। সৃষ্টির সংহারে যা বিদ্যমান থাকে এবং যার আর বিকার সম্ভব না তাকে বলে শেষ।

কারণ দুজনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে সাপ। শিব সাপকে গলায় রেখেছেন এবং বিষ খেয়েছেন। আবার কাহিনী অনুসারে মনসা শিবদুহিতা ও সর্পদেবী। অর্থাৎ নীলকণ্ঠ ও সর্পধারী শিবদুহিতা হলেন সর্পদেবী মনসা।

সৃষ্টির সর্বত্র এই শেষনাগ বাস করে। সৃষ্টিকে সে ধরে রাখে ও এর অন্তিম পরিণামও দেয়। দেহে কুলকুণ্ডলিনী হয়েও এই নাগই দেহকে ধারণ করছে। জগৎ যেহেতু নাগময় সেহেতু জগতের সার হল বিষ। আবার সংহারের উপাদানও বিষ। বিষ না থাকলে সংহার হয় না এবং কোনওকিছুই তার পরিণাম পায় না।

কথায় বলে: বিষস্য বিষমৌষধং। এই কথাকে সমঃ সমং শময়তি আকারেও বোঝা যায়। বাস্তব জগতে এই তত্ত্বের প্রমাণ সর্বত্রই মেলে। তবে চিকিৎসা নিয়ে আলাপের সময় এই কথাগুলো আমরা বেশি বলে থাকি। বিষ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা এই কথাগুলো থেকেই বোঝা যায়।

বিষকে আমরা এখন যে শুধুই ক্ষতিকারকক অর্থে ভাবতে শিখেছি সেই ভাবনা দ্বারা শিবের বিষপান পুরোপুরি বোঝা যাবে না, কেবল একটা দিক বোঝা যাবে। তাই শুরুতে আমরা সেইদিকটা বলে নিলাম। কিন্তু বিষের সবটা বোঝা ছাড়া আমরা তত্ত্ব বুঝতে পারব না।

আয়ুর্বেদ বলে জগতের কিছুই ঔষধীগুণের বাইরে নয়। কিন্তু রোগীর শরীর এবং চিকিৎসকের জ্ঞান দুটোর ওপর নির্ভর করে ওষুধের ব্যবহার হয়। তাই আয়ুর্বেদানুসারে গড়পড়তা ওষুধের ব্যবস্থা নেই। কেননা সবই বিষ এবং কোনটা কার শরীরে সহ্য হবে তা আগাম বলা কষ্টসাধ্য।

বিষে বিষক্ষয় হয় কিন্তু কোনটা দিয়ে কোথায় হয় সেটা বিচার করে চিকিৎসা শাস্ত্র। তাই বিষ শেষবিচারে ওষুধ। শিব যেহেতু চিকিৎসাশাস্ত্রের উদ্ভাবক তাই জগতের কল্যাণে তিনি বিষ সংরক্ষণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। জগতে যখন সৃষ্টির বিকাশ হয় তখন সাপের কেলা শুরু হয় আবার সৃষ্টির সংহারে সাপ স্থির হয়ে যায়।

শিব এই বিষ গলায় রেখেছেন। আর গলায় বিষ থাকার কারণে সাপও শিবের গলা জড়িয়ে থাকে। সৃষ্টির সার বিষ যাতে সহজে নিয়ন্ত্রিত হয় তাই শিব বিষ হজমও করেন নি আবার বাইরেও রাখেন নি। এই জায়গাতেও মনসা ও শিবের সাথে আমরা সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারি।

কারণ দুজনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে সাপ। শিব সাপকে গলায় রেখেছেন এবং বিষ খেয়েছেন। আবার কাহিনী অনুসারে মনসা শিবদুহিতা ও সর্পদেবী। অর্থাৎ নীলকণ্ঠ ও সর্পধারী শিবদুহিতা হলেন সর্পদেবী মনসা।

শিব থেকে সরাসরি মনসা আবির্ভূতা হওয়ায় শেষ বিচারে শিব ও মনসা এক হয়ে যাচ্ছেন। বাঙলার ভাবচর্চায় নীলকণ্ঠ ও সর্পধারী শিবই সর্পদেবী মনসা হয়ে ফিরে আসছেন।

(চলবে…)

<<মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -দুই ।। মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -চার>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………
আরো পড়ুন:
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -এক
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -দুই
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -তিন
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -চার
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -পাঁচ
মনসা: ভাবচর্চার অদেখা দিক -ছয়
মনসাদেবীর পাঁচালী

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!