পাগল মস্তান

সঙ্গে যাবি পাগল হবি: পর্ব-দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

[পূর্বে প্রকাশের পর]

তুমি আমারে তার মতো মন দাও। তার মতো মন দাও। আমারে এমন নিষ্ঠুর রাইখো না।

মাঝে মাঝেই ভাবি ভদ্রলোক কি দেখেছেন পাগলের কাছে যে প্রেমে তিনি তার সেবায় যাপিত জীবনের বাড়তি সময় টা কটিয়ে দিচ্ছেন। যদিও তিনি পাগলের কোনো কিছুই ধারণ করেন নি জীবনে। কোনো কিছুই মানতে পারেন নি বিশ্বাসের ভিত্তিতে। তারপরও তার মায়া ছাড়তে পারেন না। রজ্জব দেওয়ান লিখছে-

তুই আমারে করলি পাগল
আমার সকল নিয়া রে,
পাগল বানাইলিরে আমারে
হায়রে ও আমার দরদী।।

আরশিতে যার রূপ ধরে না
আরশি যায় ফাটিয়া,
আমি কেমনে রইব ঘরে
তোমায় পাসরিয়া রে।।

বহুদিন হয় আছো রে বন্ধু
আমারে ছাড়িয়া,
আমি মনেরে বুঝাইয়া রাখি
মানে না মোর হিয়া রে।।

অগ্নি যদি হইতি রে রাখতাম
অঞ্চলে বান্ধিয়া,
আমি একদিনে পুড়িয়া মরতাম
জনমের লাগিয়া।।

তুই যদি হইতিরে আমার
আমি যে হইতাম তর বন্ধুরে,
ভেবে রজ্জবে কয় তোমায় পেলে
করিতাম আদরও রে।।

পাগলের কথা উঠলে পাগল শ্রেষ্ঠ উয়াইস করনির নাম আসবেই। তার সম্পর্কে দুই-এক কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। উয়াইস করনি নবী প্রেমে এতোই মাতোয়ারা হয়েছিল যে, তার প্রেমের বার্তা হাজার মাইল দূরে নবীর কাছে ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল।

নবীজী দেহত্যাগের আগে তার নিজের জোব্বা দিয়ে গিয়েছিলেন সেই পাগলের জন্য। সাহাবীদের বলে গিয়েছিলেন তাকে তা পৌঁছে দিতে।

সাহাবীরা হতবাক হয়েছিল। বিস্মিত হয়েছিল। যে পাগলের সাথে সশরীরে নবীজীর সাথে কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। সেই পাগল কোথায় থাকে তাও কেউ জানে না। সে কিনা পেলো নবীর পোশাক। যে পোশাকের কাঙ্গাল ছিল সারা জাহান?

অনেক খোঁজাখুঁজির পর সাহাবীরা যখন করনিকে খুঁজে পেল তখন তারা জানতে পারলো পাগলের ইর্ষা করার মতো প্রেমের খবর। নবীজীর একটা দাঁত পরে গিয়েছিল এই খবর পেয়ে পাগল নিজের সমস্ত দাঁত তুলে ফেলেছিল। আরো কতো কি।

যদিও সবাই কিছু না কিছুর বাসনা-কামনা চাওয়া-পাওয়া সন্ধান-খোঁজের মধ্যেই থাকে। এরমধ্যে কেউ জ্ঞানের সন্ধান করে। কেউ পরমজ্ঞানের সন্ধান করে। কেউ বা করে সম্পদ-সম্পত্তির। কেউ সম্পর্কের। কেউ লাভ-ক্ষতির।

অনেকে এসবকে গালগল্প বললেও ভক্তের কাছে এসবই প্রেরণার কাহিনী। প্রেমে পাগল হওয়ার মন্ত্র। ভক্তকুল বলে, পাগলদের কোনো মৃত্যু নাই। তারা আড়ালে চলে গেলেও পাগলামীটা রয়েই যায়। উপযুক্ত ভক্তের মাঝে উপযুক্ত সময়ে তা উদয় হয়। সেই চূড়ান্ত ভাবের প্রকাশ না হলেও পাগলামী ঠিকই বিরাজ করে।

এক হিসেবে সাধুগুরু পীরমুর্শিদ অলিআউলিয়া অর্থাৎ আধ্যাত্মপথের সকল পথিকই তো পাগল। পাগল ভিন্ন কে আর সন্ধান করে? সন্ধানে যে বের হয় সে যেই মতেই হোক। যে যেই পথেই হোক। যে যেই ভাবেরই হোক। পাগলামিটা না থাকলে কি আর প্রথাগত পথ ছেড়ে মানুষ হাঁটতে পারে ভিন্ন পথে?

ব্যাতিক্রমী মনোভাবকে মানুষ কখনোই সহজভাবে নিতে পারে না। সভ্যতার নিরিখে-প্রচলিত শিক্ষানীতির বিধিতে-সামাজিক কাঠামোতে খাপ না খেলেই মানুষ তাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে। ধরেই নেয় তাদের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে।

মস্তিষ্ক বিকৃত না হলে ঝা চকচকে ভোগের জগৎ ছেড়ে কেনো কেউ কি সেই পথে পা বাড়ায়? যে পথে প্রেমিক হলে শেষ বিচারে শূন্যতা ভিন্ন কিছু পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। তারপরও কিছু মানুষ সে পথে পা বাড়াবেই। তারা প্রথাগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে অজানাকে জানার ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দেয়।

প্রেমে বুঝতে চায় জগৎকে, জগৎ সংসার তথা ব্রহ্মাণ্ডকে। তাই ফকির লালন সাঁইজি বলছেন- “যে করে কালার চরণের আশা, জানো নারে মন তার কী দুর্দশা”। পরমকে পাওয়াকে যে বাসনা করে তার দু:খের সীমা থাকে না। সেই দু:খের কথা। পাওয়ার কথা। না পাওয়ার কথা। না সওয়া যায়। না বলা যায়।

যদিও সবাই কিছু না কিছুর বাসনা-কামনা চাওয়া-পাওয়া সন্ধান-খোঁজের মধ্যেই থাকে। এরমধ্যে কেউ জ্ঞানের সন্ধান করে। কেউ পরমজ্ঞানের সন্ধান করে। কেউ বা করে সম্পদ-সম্পত্তির। কেউ সম্পর্কের। কেউ লাভ-ক্ষতির।

মোটা দাগে বলতে গেলে কেউ জাগতিক চাহিদায় ভোগে ডুবে থাকে। আর কেউ কেউ জাগতিক চাহিদার ঊর্দ্ধে উঠে ত্যাগের পথে হাঁটে।

পাগলের পথ হলো প্রেমের পথ। একে যুক্তির নিরিখে খুঁজতে গেলে বিপদ। তবে মজার বিষয় হলো। যদি সত্যি সত্যি প্রেমের পথকে কেউ খুঁজতে বের হয়। তা সে যুক্তিহীন প্রেমের পক্ষেই থাকুক বা বিপক্ষে। তাকে এক না এক সময় তাতে ডুবতেই হবে।

যারা চারপাশের যাবতীয় মোহ-মায়া-লোভ-ভোগের আকর্ষণে বদ্ধ না হয়ে ব্রহ্মাণ্ড জ্ঞানের সন্ধানে বের হয় তাদেরকে সমাজ স্বাভাবিক ভাববে কি করে? সভ্যতার গণ্ডিতে সমাজ নিজে যে কাঠামো তৈরি করেছে তার ব্যতিক্রম ঘটলেই সে চটে যায়। সে মনে করতে শুরু করে তার নির্ধারিত মত-পথে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আর সেই প্রশ্ন বড় হতে হতে সমাজের কাঠামোকে ভাঙতে উদ্যত হতে পারে। যা তার জন্য হুমকি মনে করতে শুরু করে। তাই তাদের ‘পাগল’ ‘বিকৃত মস্তিষ্ক’ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে সমাজে, সামজিক কাঠামো, সভ্যতা বিজয়ের হাসি হাসতে চায়।

তবে যারা ইশকে পাগল। খোদার পাগল। পরমের পাগল। পরমেশ্বরের পাগল। তারা সে সবের ফাঁদে পরতে রাজি না। তারা রীতিমতো ঘোষণা দিয়েই বলে ‘আমি পাগল। পারলে ঠেকাও। নইলে হও।’ আর যারা মস্তিষ্ক বিকৃত বা বিকৃত নয় তারা মানতেই পারে না তারা ‘পাগল’। তাই সাধারণ কাউকে পাগল বলে সে উত্তেজিত হয়ে যায়।

আমরা সাধারণ জ্ঞানের মানুষ প্রকৃত খোদাপ্রেমী পাগলদের কথা ঠিক ধরতে পারি না। অতি বেশি বিচার-বিবেচনা করতে গিয়ে অনেক সময় যুক্তির ভিত্তিতে তাদের খুঁজেও পাই না। যেহেতু আমরা যুক্তির ভিত্তিতেই সকল কিছু মেনে নিতে চাই। তাই আমাদের মন সকল কিছুর শেষে যুক্তি খুঁজবেই সেটাই স্বাভাবিক।

তারপরও আমরা বেশিভাগ ক্ষেত্রে প্রেমের সাথে যুক্তির সম্পর্ক খুঁজে পাই না। অনেক পথের মধ্যে প্রেমের পথ এমনই একটা পথ যে পথ যুক্তির ধার ধারে না। প্রেমের কাছে সবাই সব কিছু উজার করে দেয়। বিলিয়ে দেয় নিজেকে। সমর্পিত হয় প্রেমের কাছে। নিবেদন করে নিজেকে প্রেমের পদতলে।

পাগলের পথ হলো প্রেমের পথ। একে যুক্তির নিরিখে খুঁজতে গেলে বিপদ। তবে মজার বিষয় হলো। যদি সত্যি সত্যি প্রেমের পথকে কেউ খুঁজতে বের হয়। তা সে যুক্তিহীন প্রেমের পক্ষেই থাকুক বা বিপক্ষে। তাকে এক না এক সময় তাতে ডুবতেই হবে।

আর মাওলানা রুমি বলে, ‘স্রষ্টাকে পাওয়ার অনেক পথ আছে, আমি প্রেমের পথকে বেছে নিয়েছি।’ পাগল হচ্ছে সেই যাত্রী যারা প্রেমের পথের টিকেট কেটে বসে আছে। কে কতটা এগিয়েছে। কে কোন মোকামে পৌঁছেছে সে অন্য হিসেব। কিন্তু এই পথে যে হাঁটে সে নিজে যেমন পাগল হয়। অন্যেকেও পাগল করে।

প্রেম এমনই এক চোরাবালি। তাতে ডোবার পথ তো আছে। কিন্তু বের হওয়ার রাস্তা নেই। সেই প্রেম যদি শুদ্ধ প্রেম হয় তাহলে তো কথাই থাকে না। সেই ডুবে যেতে যেতেই পরিচয় হয় লীলার সাথে। আর সেই লীলা যে প্রত্যক্ষ করে সে আর তা থেকে বেড়িয়ে আসতে চায় না।

এ পথ প্রেমের পথ। এ পথ প্রেমের হাত ধরে জ্ঞানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মত। এই পথে সাধক জ্ঞান প্রাপ্ত হয় ঠিকই কিন্তু তা হয় প্রেমময় জ্ঞান। যা জাহির করে বেড়ানোর জ্ঞান নয়। নিজের মাঝে নিমঞ্জনের জ্ঞান। তিরমিজি শরিফে বলা হয়েছে, ‘যে জ্ঞানের সন্ধানে বের হয়, সে স্রষ্টার পথে বের হয়।’

আর মাওলানা রুমি বলে, ‘স্রষ্টাকে পাওয়ার অনেক পথ আছে, আমি প্রেমের পথকে বেছে নিয়েছি।’ পাগল হচ্ছে সেই যাত্রী যারা প্রেমের পথের টিকেট কেটে বসে আছে। কে কতটা এগিয়েছে। কে কোন মোকামে পৌঁছেছে সে অন্য হিসেব। কিন্তু এই পথে যে হাঁটে সে নিজে যেমন পাগল হয়। অন্যেকেও পাগল করে।

রাধারমণ দত্ত লিখেছেন-

এ ভব শুধু পাগলের মেলা পাগলে পাগলে ঠেসাঠেসি
পাগলে পাগলে মেলা।।

এক পাগল শচীর গৌরাঙ্গ বহু পাগল ধরছে সঙ্গ
নিতাই অদ্বৈত পাগল হরিদাস সঙ্গের চেলা।।

সব ঠাঁই পাগলের কারখানা পাগল ছাড়া সুস্থ মিলে না
রূপ সনাতন বদ্ধ পাগল শয়ন করছে গাছের তলা।।

যত সব পাগলের কারবার পাগলে পাগলে ভরা হাট গঞ্জ বাজার
কোনো পাগল লোকসান দেয় কোনো পাগলের বেলার মেলা।।

কোনো পাগলে কান্দে বসে কোনো পাগলে সদায় হাসে
রাধারমণ পাগল বলে হেলায় হেলায় জনম গেলা।।

মতুয়া মতাদর্শের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর একবার নিজ পুত্র গুরুচাঁদকে ধৈর্য পরীক্ষা করতে ভক্ত গোলক পাগলের সাথে মাঠে ধান কাটতে পাঠালেন। গুরুচাঁদ পিতার আদেশে পাগলের সাথে ধান কাটতে গেল। ধানক্ষেতের আইলে গিয়ে বসে গোলক পাগল গুরুচাঁদকে বললেন তার তামাক খেতে ইচ্ছে করছে।

গুরুচাঁদ ঠাকুর যত্ন সহকারে তামাক সাজিয়ে দিয়ে ধান কাটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে আবার গোলক পাগল বললো তামাক সাজিয়ে দিতে। গুরুচাঁদ ধান কাটা রেখে আবার তামাক সাজিয়ে দিলো। পাগল তামাক খেতে শুরু করলো।

(চলবে…)

……………………………….
স্থিরচিত্র: ফাহিম ফেরদৌস

……………………………….
আরো পড়ুন:
সঙ্গে যাবি পাগল হবি: পর্ব-এক
সঙ্গে যাবি পাগল হবি: পর্ব-দুই
সঙ্গে যাবি পাগল হবি: পর্ব-তিন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!