স্বামী বিবেকানন্দ

সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি তিন

-শংকর

স্বামীগম্ভীরানন্দের রচনায় আমরা এই অবস্থার হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা পাই- “সেদিন ক্রমাগত ঘর্মনিঃসরণের পর শরীর হিম হইয়া নাড়ী ছাড়িয়া গেল- যেন অন্তিমকাল উপস্থিত।” একজন অচেনা সাধু থলি থেকে কিঞ্চিৎমধু ও পিপুলচূর্ণ একত্রে মাড়িয়া রোগীকে ধীরে ধীরে খাওয়ালেন। “অমনি আশ্চর্য ফল ফলিল, স্বামীজি ক্ষণকালের মধ্যে চক্ষু মেলিয়া অস্পষ্টস্বরে কি যেন বলিতে লাগিলেন।”

এরপর মীরাট। অসুস্থ অখণ্ডানন্দকে দেখতে তিনি ডাক্তার ত্রৈলোক্যনাথ ঘোষের বাড়িতে গেলেন। স্বামীজি তখন খুব রোগা হয়ে গিয়েছেন। তাঁর রোগজীর্ণ শরীর দেখে অখণ্ডানন্দ চিন্তিত- “স্বামীজিকে এত রুগ্ন আমি কখনও দেখিনি, ঠিক যেন একখানি ছায়ামূর্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। মনে হয়েছিল তিনি যেন তখনও হৃষীকেশের সাংঘাতিক পীড়া থেকে উদ্ধার পাননি।”

অনেকদিন পরে স্যানফ্রানসিসকো থেকে ব্রহ্মানন্দকে (মার্চ ১৯০০) স্বামীজি লিখছেন, “আমি সত্য সত্য বিরাম চাই, এ রোগের নাম নিউরোসথেনিয়া- এ স্নায়ু রোগ। এ একবার হলে বৎসরকতক থাকে। তবে দু-চার বৎসর একদম বিশ্রাম হলে সেরে যায়।…এদেশ ঐ রোগের ঘর। এইখান থেকে উনি ঘাড়ে চড়েছেন। তবে উনি মারাত্মক হওয়া দূরে থাকুক দীর্ঘ জীবন দেন। আমার জন্যে ভেবো না। আমি গড়িয়ে গড়িয়ে যাব।”

নিজের চিকিৎসার জন্যও স্বামীজি দিন পনেরো ডা. ত্রৈলোক্যনাথ ঘোষের আশ্রয়ে থেকে গেলেন। জ্বরের প্রতিক্রিয়া ও পুনরাবির্ভাব প্রতিরোধের জন্য স্বামীজি তখন নিয়মিত ওষুধ খেতেন। ঠিক কতদিন মীরাটে থাকা হয়েছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে, কারও মতে কয়েক সপ্তাহ, কারও ধারণা তিন মাসের অধিক কাল- অখণ্ডানন্দের স্মৃতিকথার মতে চার-পাঁচমাস।

১৮৯১ সালের জানুয়ারিতে স্বামীজি মীরাট ছেড়ে দিল্লির পথে অগ্রসর হলেন। এখানেই ডাক্তার হেমচন্দ্র সেনের কাছে। টনসিলের চিকিৎসা করানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

দেশে দেশে ঘুরতে ঘুরতে রাজস্থানের আলোয়ারে এসে একজন বাঙালি ডাক্তারের সঙ্গে স্বামীজির আকস্মিক পরিচয় হয়, এঁর নাম গুরুচরণ লস্কর।

ডাক্তার লস্করই স্বামীজির থাকার ব্যবস্থা করে দেন। এখানেই এক মন্ত্রশিষ্য স্বামীজিকে জিজ্ঞেস করেন, “তেল মাখার কি কোন উপকার আছে?”

স্বামীজি উত্তর দিলেন, “আছে বই কি! এক ছটাক তেল ভাল করে মাখলে এক পোয়া ঘি খাওয়ার কাজ করে।”

অনেক পথ পেরিয়ে মাণ্ডবীতে স্বামীজির সঙ্গে স্বামী অখণ্ডানন্দের আবার দেখা হলো। ততক্ষণে স্বামীজির স্বাস্থ্যের যে বিশেষ উন্নতি হয়েছে তা অখণ্ডানন্দের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়।

অখণ্ডানন্দ দেখলেন, স্বামীজি যেন এক অপরূপ নবকলেবর প্রাপ্ত হয়েছেন। “তিনি রূপলাবণ্যে ঘর আলো করে বসে আছেন।”

ডাক্তারি সম্পর্কে স্বামীজির কিছু মতামত পাওয়া যাচ্ছে বেলগাঁওয়ের ফরেস্ট অফিসার হরিপদ মিত্রর বাড়িতে।

হরিপদবাবু স্বাস্থ্যের জন্য অনেকরকম ওষুধ খাচ্ছেন জেনে স্বামীজি বললেন, “যখন দেখিবে কোন রোগ এত প্রবল হইয়াছে যে শয্যাশায়ী করিয়াছে, আর উঠিবার শক্তি নাই, তখনই ওষুধ খাইবে, নতুবা নহে। স্নায়বিক দুর্বলতা প্রভৃতি রোগের শতকরা নব্বইটা কাল্পনিক…যতদিন বাঁচ আনন্দে কাটাও।”

চিকিৎসা সম্পর্কে স্বামীজির একটা স্পষ্ট মতামত পাওয়া যাচ্ছে, যদিও পরবর্তীকালে তিনি নিজেই স্নায়বিক রোগের বলি হয়েছিলেন।

অনেকদিন পরে স্যানফ্রানসিসকো থেকে ব্রহ্মানন্দকে (মার্চ ১৯০০) স্বামীজি লিখছেন, “আমি সত্য সত্য বিরাম চাই, এ রোগের নাম নিউরোসথেনিয়া- এ স্নায়ু রোগ। এ একবার হলে বৎসরকতক থাকে। তবে দু-চার বৎসর একদম বিশ্রাম হলে সেরে যায়।…এদেশ ঐ রোগের ঘর। এইখান থেকে উনি ঘাড়ে চড়েছেন। তবে উনি মারাত্মক হওয়া দূরে থাকুক দীর্ঘ জীবন দেন। আমার জন্যে ভেবো না। আমি গড়িয়ে গড়িয়ে যাব।”

মনে রাখা ভাল, ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৫ স্বামীজি জাহাজযোগে ইউরোপ থেকে নিউ ইয়র্কে ফিরে আসেন। সমুদ্র যাত্রাটি মোটেই সুখকর হয়নি। ৮ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্ক থেকে স্বামীজির চিঠি- “দশদিন অতিবিরক্তিকর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আমি গত শুক্রবার এখানে পৌঁছেছি। সমুদ্র ভয়ানক বিক্ষুব্ধ ছিল এবং জীবনে এই সর্বপ্রথম আমি সমুদ্রপীড়ায় অতিশয় কষ্ট পেয়েছি।”

বোম্বাই থেকে জাহাজে অজানার সন্ধানে প্রথম আমেরিকা যাত্রা পর্যন্ত সময়কালে স্বামীজির স্বাস্থ্যের একটা ছবি কোনোরকমে উপস্থিত করা গেল। ১৮৯৩ সালে জুন মাসে জাহাজে তার অপ্রত্যাশিত স্বাস্থ্যোন্নতির খবরও আমরা পেয়ে যাচ্ছি খেতড়ির মহারাজা অজিত সিংকে লেখা চিঠি থেকে।

সৌভাগ্যবশত অপরিচিতপ্রবাসেজীবনসংগ্রামের প্রথম পর্যায়ে স্বামীজির বড়রকম অসুখবিসুখের কোনো ইঙ্গিত নেই। এই সময় শরীর বিদ্রোহ করলে তার মিশন অবশ্যই ব্যর্থ হতে পারতো। নানা পথ পেরিয়ে অপরিচিত দেশে সহায়সম্বলহীন সন্ন্যাসী যে অসম্ভবকে সম্ভব করলেন তার পিছনে ছিল অপরিসীম মনোবল ও অমানুষিক পরিশ্রম।

বিরামহীন এই শ্রম যে ভিতরে ভিতরে স্বামীজির শরীরকে আক্রমণ করছে তা প্রকট হতে কিছু সময় লেগেছিলো। এমন যে হতে পারে তা আশঙ্কা করেই বোধ হয় কর্মযজ্ঞে স্বামীজির তাড়াহুড়ো। পরবর্তীকালে হরিমহারাজকে (স্বামী তুরীয়ানন্দ) স্বামীজি বলেছিলেন, “২৯ বছরের মধ্যে সব সেরে নিয়েছি।”

কিন্তু আমরা জানি ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ববিজয়টাই তার শেষ বড় কাজ এদেশে নয়, তার থেকেও সুদূরপ্রসারী কর্মযজ্ঞ স্বদেশে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজের গুরুত্ব ইউরোপ-আমেরিকা জয় থেকে অনেক বড়।

আমেরিকায় স্বামীজির শরীর ভাঙার প্রথম সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ১৮৯৬ সালের শুরু থেকে নিউ ইয়র্কে। ১৮৯৫-এর বড়দিনেও তার ছিল দুর্ধর্ষ শরীর ও অমানুষিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা। নববর্ষের চিঠিতে (মিসেস ওলি বুলকে লেখা) রয়েছে তার সমর্থন- “দৈহিক ও মানসিকভাবে আমি খুব ভাল আছি।”

কিন্তু স্বামীজির পরের চিঠিতেই (৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৬) অশনিসংকেত। “আমার শরীর প্রায় ভেঙে পড়েছে। নিউ ইয়র্কে আসা পর্যন্ত আমি একরাতও ঘুমোতে পারিনি।”

এমন যে হতে পারে তা আশঙ্কা করছিলেন বিদেশী শিষ্য স্বামী কৃপানন্দ। তিনি লিখছেন, “দৈত্যর মতন পরিশ্রম করছেন বিবেকানন্দ, ঘরভাড়া, বিজ্ঞাপন, মুদ্রণ ইত্যাদির খরচ সামলাতে গিয়ে তিনি প্রায় না খেয়ে থাকছেন।” শিষ্যের আশঙ্কা স্বামীজি না অসুখে পড়ে যান।

নিষ্ঠুর আশঙ্কাটি সত্য হলো, ১৮৯৬ জানুয়ারি থেকেই স্বামীজির শরীর যখন ভাঙতে আরম্ভ করলো তখন তার বয়স মাত্র তেত্রিশ।

এই সময় একটা আজব কাণ্ড ঘটেছিল। মার্কিনী অনুরাগিণী ব্রুকলিন নিবাসিনী মিস্ এস ই ওয়ালডোকে স্বামীজি একবার বলেছিলেন, “এলেন, একটা অদ্ভুত কাণ্ড, আমি কেমন দেখতে তা আমি মনে রাখতে পারছি না, আমি আয়নার দিকে বারবাব তাকিয়ে থাকি। কিন্তু যে মুহূর্তে আমি মুখ ফিরিয়ে নিই, আমি কেমন দেখতে তা সম্পূর্ণ ভুলে যাচ্ছি।”রাল এমার্সনের আত্মীয়া এই নিষ্ঠাবতী শিষ্যাটির স্বামীজি নাম দিয়েছিলেন হরিদাসী।

মনে রাখা ভাল, ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৫ স্বামীজি জাহাজযোগে ইউরোপ থেকে নিউ ইয়র্কে ফিরে আসেন। সমুদ্র যাত্রাটি মোটেই সুখকর হয়নি। ৮ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্ক থেকে স্বামীজির চিঠি- “দশদিন অতিবিরক্তিকর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আমি গত শুক্রবার এখানে পৌঁছেছি। সমুদ্র ভয়ানক বিক্ষুব্ধ ছিল এবং জীবনে এই সর্বপ্রথম আমি সমুদ্রপীড়ায় অতিশয় কষ্ট পেয়েছি।”

নিউ ইয়র্কে ফিরে এসে দারুণ শীতে প্রায়ই সর্দিতে ভুগতে লাগলেন স্বামীজি। “আমার ঠাণ্ডা লেগেছে”- জানুয়ারির প্রবল ঠাণ্ডায় কে কারে ব্রুকলিন ব্রিজ বারবার পেরোতে হলে অসুখটা অস্বাভাবিক নয়।

১৮৯৬ সালের এপ্রিল মাসে আবার লন্ডনে ফিরে আসার পরে মেজভাই মহেন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বামীজির দেখা হয়। তার যে এখানেই মৃদু হলেও হার্ট অ্যাটাক হয় তার বিবরণ আমরা যথাসময়ে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে দেবো।

মেরি হেলকে দার্জিলিঙের চিঠি (২৮ এপ্রিল ১৮৯৭), “আমার চুল গোছ গোছ পাকতে আরম্ভ করেছে এবং মুখের চামড়া অনেক কুঁচকে গেছে- দেহের এই মাংস কমে যাওয়াতে আমার বয়েস যেন আরও কুড়ি বছর বেড়ে গিয়েছে। [এই সময় স্বামীজির বয়স ৩৪] এখন আমি দিন দিন ভয়ঙ্কর রোগা হয়ে যাচ্ছি, তার কারণ আমাকে শুধু মাংস খেয়ে থাকতে হচ্ছে- রুটি নেই, ভাত নেই, আলু নেই, এমনকি আমার কফিতে একটু চিনিও নেই!!

এবার জাহাজে সমুদ্রপীড়া এড়াবার জন্য আমি নিজেই কিছু চিকিৎসা করেছিলাম।”

লন্ডনে স্বামীজির বিচিত্র জীবনের নানা খবরাখবর পাঠক-পাঠিকারা এই বইয়ের শুরুতে ইতিমধ্যেই পেয়েছেন। আগস্ট মাসে কিছুটা ছুটি ও কিছুটা স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য স্বামীজি সুইজারল্যান্ডে উপস্থিত হয়েছেন।

সাবধানী পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন লুসার্ন থেকে স্বামীজি লিখছেন, “আমি বিশ্রী রকম সর্দিতে ভুগছি।”

মধ্যম ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে তাঁর চিন্তার শেষ নেই। মিস্টার ই টি স্টার্ডিকে স্বামীজি লিখছেন, “আশা করি রাজার কাছ থেকে মহিমের টাকা ইতিমধ্যেই তোমার জিম্মায় এসেছে। এসে থাকলেও আমি যে টীকা তাকে দিয়েছিলাম তা ফেরৎ চাই না। তুমি ওর সবটাই ওকে দিতে পার।”

১৬ই ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে সেবারের মতন পশ্চিমের পালা শেষ করে স্বামী বিবেকানন্দ লন্ডন ত্যাগ করলেন এবং ১৫ জানুয়ারি ১৮৯৭ কলম্বো পৌঁছলেন।

সিংহলে বিপুল অভ্যর্থনার স্রোতে এবং অবিরাম পথশ্রমে স্বামীজি যে অসুস্থ বোধ করতে লাগলেন এবং তা যে ডায়াবিটিসের লক্ষণ তা যথাসময়েই জানা গেল। তার এই রোগ কোথায় প্রথম ধরা পড়লো? কলম্বো, মাদ্রাজ না কলকাতায় তা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট নয়।

আমরা শুধু দেখছি, মাদ্রাজ থেকে জাহাজে কলকাতা আসবার সময় ডাক্তাররা তাঁকে জলের বদলে ডাব খাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং সে জন্য জাহাজে প্রচুর ডাব তুলে দিয়েছিলেন অনুরাগীরা। সত্য কথাটি হলো স্বামীজি ভাঙা শরীর নিয়েই কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন।

ভগ্নস্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৯৬ সালের প্রারম্ভকেই অন্তিমলীলাপর্বের শুরু বলাটা বোধ হয় অন্যায় হবে না। এই পর্বের তিনটি অধ্যায়, যার প্রথমটির বিস্তার স্বামীজির স্বদেশে অবস্থিতি পর্যন্ত, দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তৃতি দ্বিতীয়বার বিদেশ গমন থেকে আকস্মিক আবার ভারতে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত। তৃতীয় পর্যায়ের শেষপ্রান্তে বেলুড়ে ৪ঠা জুলাই ১৯০২ এ মহাসমাধি।

১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৮৯৭ স্বামীজি কলকাতায় ফিরে এলেন আর ডাক্তারদের পরামর্শে ৮ই মার্চ তাকে দার্জিলিং যেতে হলো। এই সময় স্বামীজির গরম একেবারেই সহ্য হচ্ছে না। এর আগেও তিনি প্রচণ্ড গরমকে এড়িয়ে শরীর বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

প্রচণ্ড গরমে তার মাথার ঘিলু যে টগবগ করে ফোটে একথা তিনি আগেই লিখেছেন। দার্জিলিঙে প্রথম দিকে স্বাস্থ্যপরিস্থিতি যে খুব উদ্বেগজনক নয় তার প্রমাণ স্বামীজি খেতড়ির রাজা অজিত সিংকে দেখবার জন্য ২১ মার্চ কলকাতায় ফিরে এলেন। মহারাজ অজিত সিং কলকাতা ত্যাগ করেন ২৬ মার্চ এবং স্বামীজি সঙ্গে সঙ্গে দার্জিলিঙে ফিরে যান।

মেরি হেলকে দার্জিলিঙের চিঠি (২৮ এপ্রিল ১৮৯৭), “আমার চুল গোছ গোছ পাকতে আরম্ভ করেছে এবং মুখের চামড়া অনেক কুঁচকে গেছে- দেহের এই মাংস কমে যাওয়াতে আমার বয়েস যেন আরও কুড়ি বছর বেড়ে গিয়েছে। [এই সময় স্বামীজির বয়স ৩৪] এখন আমি দিন দিন ভয়ঙ্কর রোগা হয়ে যাচ্ছি, তার কারণ আমাকে শুধু মাংস খেয়ে থাকতে হচ্ছে- রুটি নেই, ভাত নেই, আলু নেই, এমনকি আমার কফিতে একটু চিনিও নেই!!

…আমি এখন মস্ত দাড়ি রাখছি; আর তা পেকে সাদা হতে আরম্ভ হয়েছে- এতে বেশ গণ্যমান্য দেখায়।…হে সাদা দাড়ি, তুমি কত জিনিসই না ঢেকে রাখতে পারো! তোমারই জয় জয়কার।”

এই সময় তিনি যেসব বৈপ্লবিক কাজকর্মের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তা আজও মানুষকে বিস্মিত করে। আলমোড়া থেকেই আপনজনদের কাছে যুগনায়ক পাঠাচ্ছেন তার মৃত্যুঞ্জয়ী বাণী, “হে মূর্খগণ, যে-সকল জীবন্ত নারায়ণে ও তাঁর অনন্ত প্রতিবিম্বে জগৎ পরিব্যাপ্ত, তাকে ছেড়ে তোমরা কাল্পনিক ছায়ার পিছনে ছুটেছ! তার- সেই প্রত্যক্ষ দেবতারই উপাসনা করো এবং আর সব প্রতিমা ভেঙে ফেল।”

“ব্যারাম-ফ্যারাম দার্জিলিং-এ একেবারেই পালিয়েছে। কাল আলমোড়া নামক আর একটি শৈলাবাসে যাচ্ছি- স্বাস্থ্যোন্নতি সম্পূর্ণ করবার জন্য, কলকাতায় আলমবাজার মঠ থেকে মিসেস সারা বুলকে স্বামীজি চিঠি লিখছেন ৫ই মে ১৮৯৭।

আলমোড়া থেকে “অভিন্নহৃদয়” স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লেখা দু সপ্তাহ পরের চিঠি (২০ মে ১৮৯৭): “জ্বরভাবটা সব সেরে গেছে। আরও ঠাণ্ডা দেশে যাবার যোগাড় দেখছি। গরমি বা পথশ্রম হলেই দেখছি লিভারে গোল দাঁড়ায়।…আজকাল মেজাজটাও বড় খিটখিটে নাই, ও জ্বরভাবগুলো সব ঐ লিভার- আমি বেশ দেখছি। আচ্ছা, ওকেও দুরস্ত বানাচ্ছি- ভয় কি?”

কলকাতা থেকে প্রিয় শশী ডাক্তারের চিঠি ও দু বোতল ওষুধ এসে গিয়েছে। ২৯ মে শশী ডাক্তারকে স্বামীজির চিঠি- “যোগেন কি লিখছে, তা হৃক্ষেপ করবে না। সে নিজেও যেমন ভয়-তরাসে, অন্যকেও তাই করতে চায়। আমি লখনৌ-এ একটি বরফির ষোল ভাগের একভাগ খেয়েছিলাম; আর যোগেনের মতে ঐ হচ্ছে আমার আলমোড়ার অসুখের কারণ।”

এবার ১ জুন স্বামী শুদ্ধানন্দকে শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষায় লেখা চিঠি- “অব্যাহতবায়ুসেবনেন মিতেন ভোজনেন সমধিকব্যায়ামসেবয়া চ সুদৃঢ়ং সুদৃশ্যং চ সঞ্জাতং মে শরীর।” সেই সঙ্গে আশীর্বাদং বিবেকানন্দস্য। “মুক্তবায়ু সেবন, মিতাহার এবং যথেষ্ট ব্যায়ামের ফলে আমার শরীর বিশেষ সুদৃঢ় ও সুদৃশ্য হয়েছে।”

পরের দিন, ২রা জুন ১৮৯৭ ইংরিজিতে লেখা চিঠি মেরি হেলবয়েস্টারকে পুনরায় বিলেতে যাওয়া সম্পর্কে- ”আমার চিকিৎসকরা এত শীঘ্র আমাকে কাজে নামতে দিতে নারাজ। কারণ ইউরোপে যাওয়া মানেই কাজে লাগা। তাই নয় কি? সেখানে ছুটি নিলে রুটি মেলে না। এখানে গেরুয়াকাপড়খানাই যথেষ্ট, অঢেল খাবার মিলবে।…নিদ্রা আহার ব্যায়াম এবং ব্যায়াম আহার নিদ্রা- আরও কয়েক মাস শুধু এই করে আমি কাটাতে যাচ্ছি।”

পরের দিনে জনৈক এক আমেরিকান ভক্তকে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট, স্বামীজি আবার অজীর্ণরোগে মাঝে মাঝে ভুগছে এবং তা সারাবার জন্যে “নিজের বিশ্বাস বলে রোগ সারানোর (ক্রিশ্চান সায়ান্স মত অনুযায়ী) বিশেষ চেষ্টাও করছি।

দার্জিলিং-এ শুধু মানসিক চিকিৎসাসহায়েই আমি নীরোগ হয়েছিলাম।…যদি শেষপর্যন্ত আমার স্বাস্থ্য ভেঙেই পড়ে, তাহলে এখানে কাজ একদম বন্ধ করে দিয়ে আমি আমেরিকায় চলে যাব। তখন আমাকে আহার ও আশ্রয় দিতে হবে- কেমন, পারবে তো?”

এদিকে ডায়াবিটিসের প্রকোপ বোধ হয় কমের দিকে। স্বামীজি এবার ব্রহ্মানন্দকে লিখছেন, “আমি সেরেসুরে গেছি। শরীরে জোরও খুব; তৃষ্ণা নাই…কোমরে বেদনা-ফেদনা নাই; লিভারও ভাল। শশীর ঔষধে কি ফল হ’ল বুঝতে পারলাম না কাজেই বন্ধ।”

শরীরে নানা রোগের প্রকোপ, কিন্তু জর্জরিত বা পরাজিত নন আমাদের বিবেকানন্দ।

এই সময় তিনি যেসব বৈপ্লবিক কাজকর্মের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন তা আজও মানুষকে বিস্মিত করে। আলমোড়া থেকেই আপনজনদের কাছে যুগনায়ক পাঠাচ্ছেন তার মৃত্যুঞ্জয়ী বাণী, “হে মূর্খগণ, যে-সকল জীবন্ত নারায়ণে ও তাঁর অনন্ত প্রতিবিম্বে জগৎ পরিব্যাপ্ত, তাকে ছেড়ে তোমরা কাল্পনিক ছায়ার পিছনে ছুটেছ! তার- সেই প্রত্যক্ষ দেবতারই উপাসনা করো এবং আর সব প্রতিমা ভেঙে ফেল।”

সেই সঙ্গে রয়েছে বিপুল আর্থিক দুশ্চিন্তা- “এদেশের লোক ত এখনও এক পয়সা গাড়িভাড়া পর্যন্ত দিলে না- তাহাতে মণ্ডলী লইয়া চলা যে কি কষ্টকর বুঝিতেই পার। কেবল ঐ ইংরেজ শিষ্যদের নিকট হাত পাতাও লজ্জার কথা। অতএব পূর্বের ভাবে কম্বলবন্ত’ হইয়া চলিলাম।”

পরের দিনই (১০ জুলাই, ১৮৯৭) অভিন্নহৃদয় বন্ধু স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামীজি জানাচ্ছেন, রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম দুর্ভিক্ষ সেবাকার্য “অতীব সুন্দর।…

ফিলসফি, যোগ, তপ, ঠাকুরঘর, আলোচাল, কলা মূলো- এসব ব্যক্তিগত ধর্ম, দেশগত ধর্ম; পরোপকারই সার্বজনীন মহাব্রত।”

সারাক্ষণই শরীরকে ডোন্টকেয়ার করে বিবেকানন্দ ভাবছেন তার প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘের কথা। পরের দিনই স্বামী শুদ্ধানন্দকে লিখছেন, “এখন মনে হচ্ছে- মঠে অন্তত তিনজন করে মহান্ত নির্বাচন করলে ভাল হয়; একজন বৈষয়িক ব্যাপার চালাবেন, একজন আধ্যাত্মিক দিক দেখবেন, আর একজন জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করবেন।”

আরও লিখছেন, “মঠ দর্শন করতে কেবল কলকাতার বাবুর দল আসছেন জেনে বড় দুঃখিত হলাম। তাদের দ্বারা কিছু হবে না। আমি চাই সাহসী যুবকের দল- যারা কাজ করবে; আহাম্মকের দল দিয়ে কি হবে?”

প্রিয় শিষ্যদের তিনি বলছেন, “তোমরা মনে রেখো, আমি আমার গুরুভাইদের চেয়ে আমার সন্তানদের নিকট বেশী আশা করি- আমি চাই, আমার সব ছেলেরা, আমি যতবড় হতে পারতাম, তার চেয়ে শতগুণ বড় হোক।”

মনে রাখতে হবে, স্বামীজি যখন এইসব চিন্তা করছেন, তখন তার “উঠতে বসতে হাঁপ ধরে…পূর্বে আমার দুইবার সর্দি-গরমি হয়, সেই অবধি রৌদ্র লাগিলেই চোখ লাল হয়, দুই তিনদিন শরীর খারাপ যায়।”

নিজের শরীরযন্ত্রণার কথা ভুলে স্বামীজি তাঁর গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দের শরীর নিয়ে অনেক বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন।”তোমার শরীরের ওপর বিশেষ লক্ষ্য রাখবে-তবে বিশেষ আতুপুতুতে শরীর উল্টে আরও খারাপ হয়ে যায়।”

রোগভোগের কথা স্বামীজি একেবারেই মনে রাখতে চান না। কিন্তু মধ্যিখানের কিছু চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে টনসিল, জ্বর ইত্যাদি কিছুতেই তাঁকে ছাড়তে রাজি নয়, যদিও “ধর্মশালা পাহাড়ে যাইয়া শরীর অনেক সুস্থ হইয়াছে।”

কাশ্মীর থেকে (৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৭) স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে স্বামীজি সুখবর পাঠাচ্ছেন, “এবার শরীর অনেক সুস্থ হওয়ায় পূর্বের ভাবে পুনরায় ভ্রমণ করিব, মনস্থ করিয়াছি।”

সেই সঙ্গে রয়েছে বিপুল আর্থিক দুশ্চিন্তা- “এদেশের লোক ত এখনও এক পয়সা গাড়িভাড়া পর্যন্ত দিলে না- তাহাতে মণ্ডলী লইয়া চলা যে কি কষ্টকর বুঝিতেই পার। কেবল ঐ ইংরেজ শিষ্যদের নিকট হাত পাতাও লজ্জার কথা। অতএব পূর্বের ভাবে কম্বলবন্ত’ হইয়া চলিলাম।”

…লড়াই করলুম কোমর বেঁধে- এ আমি খুব বুঝি; আর যে বলে কুছ পরোয়া নেই, ওয়া বাহাদুর, আমি সঙ্গেই আছি’..তাকে বুঝি, সে বীরকে বুঝি, সে দেবতাকে বুঝি।…তারাই জগৎপাবন, তারাই সংসারের উদ্ধারকর্তা। আর যেগুলো খালি বাপ রে এগিও না-ওই ভয়, ওই ভয় ডিসপেপটিকগুলো প্রায়ই ভয়তরাসে।

কম্বলবন্ত অবশ্যই আবার চলমান! সন্ন্যাসী চষে বেড়াতে চাইছেন সমস্ত ভারতবর্ষ, কিন্তু রোগ কিছুতেই তাকে ছাড়তে রাজি নয়।

এই সময়ে স্বামীজির শারীরিক ছবিটা এই রকম- আলমোড়া থেকে কাঠগোদাম যাবার পথে অসুস্থ স্বামীজি একদিনের জন্যে বন্দী ভীমতালে। ৯ই আগস্ট ১৮৯৭ বেরিলী পৌঁছে আবার ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত জ্বরের বেশ প্রকোপ। কিন্তু ওই সময় হাতগুটিয়ে বসে না থেকে, স্বামীজি একের পর এক বক্তৃতা করছেন, আবার এরই মধ্যে আর্যসমাজের স্বামী অচ্যুতানন্দকে বলছেন, আর পাঁচ-ছ বছরের বেশি মরজগতে থাকবেন না।

১২ আগস্ট স্বামীজি আম্বালায় উপস্থিত। এবার জ্বর নয়, কিন্তু প্রবল উদর বেদনা। তাই নিয়েই দেড়ঘণ্টা হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা করলেন স্বামীজি, কিন্তু অনাহারে রইলেন।

ধর্মশালার পথে অমৃতসরে স্বামীজি যে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তার খবর আছে, বাধ্য হয়ে তিনি টাঙ্গা-গাড়িতে মারী-তে গেলেন। সেখানেও কিন্তু স্বামীজি শয্যাশায়ী হতে রাজি নন, ভগ্ন শরীর নিয়ে স্থানীয় গুণগ্রাহীদের অনেকক্ষণ ধরে ধর্মসঙ্গীত শোনালেন।

নিজেকে যখন তিনি তিলে তিলে ক্ষয় করছেন, সেই সময় স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামীজি লিখছেন (১১ অক্টোবর ১৮৯৭), “আজ দশ দিন পর্যন্ত সমস্ত কাজ যেন একটা ঝেকে করেছি বলে মনে হচ্ছে। সেটা শরীরের রোগ হোক বা মনেরই হোক। এক্ষণে আমার সিদ্ধান্ত এই যে, আমি আর কাজের যোগ্য নই।

…তোমার উপর অত্যন্ত কটু ব্যবহার করেছি বুঝতে পারছি, তবে তুমি আমার সব সহ্য করবে জানি; ও মঠে আর কেউ নেই যে সব সইবে। তোমার উপর অধিক অধিক কটু ব্যবহার করেছি; যা হবার তা হয়েছে কর্ম! আমি অনুতাপ কি করব, ওতে বিশ্বাস নাই- কর্ম!

মায়ের কাজ আমার দ্বারা যতটুকু হবার ছিল ততটুকু করিয়ে শেষ শরীর-মন চুর করে ছেড়ে দিলেন মা। মায়ের ইচ্ছা!..দু-একদিনের মধ্যে আমি সব ছেড়ে দিয়ে একলা একলা চলে যাব; কোথাও চুপ করে বাকী জীবন কাটাব। তোমরা মাপ করতে হয় করো, যা ইচ্ছা হয় করো।

…আমি লড়াইয়ে কখনও পেছপাও হইনি; এখন কি…হবো? হার-জিত সকল কাজেই আছে; তবে আমার বিশ্বাস যে, কাপুরুষ মরে নিশ্চিত কৃমিকীট হয়ে জন্মায়। যুগ যুগ তপস্যা করলেও কাপুরুষের উদ্ধার নেই- আমায় কি শেষে কৃমি হয়ে জন্মাতে হবে?

…আমার চোখে এ সংসার খেলামাত্র- চিরকাল তাই থাকবে। এর মান অপমান দুটাকা লাভলোকসান নিয়ে কি ছমাস ভাবতে হবে?…আমি কাজের মানুষ! খালি পরামর্শ হচ্ছে- ইনি পরামর্শ নিচ্ছেন, উনি দিচ্ছেন; ইনি ভয় দেখাচ্ছেন, তো উনি ডর! আমার চোখে এ জীবনটা এমন কিছু মিষ্টি নয় যে, অত ভয়-ডর করে হুঁশিয়ার হয়ে বাঁচতে হবে।

…লড়াই করলুম কোমর বেঁধে- এ আমি খুব বুঝি; আর যে বলে কুছ পরোয়া নেই, ওয়া বাহাদুর, আমি সঙ্গেই আছি’..তাকে বুঝি, সে বীরকে বুঝি, সে দেবতাকে বুঝি।…তারাই জগৎপাবন, তারাই সংসারের উদ্ধারকর্তা। আর যেগুলো খালি বাপ রে এগিও না-ওই ভয়, ওই ভয় ডিসপেপটিকগুলো প্রায়ই ভয়তরাসে।

তবে আমার মায়ের কৃপায় মনের এত জোর যে, ঘোর ডিসপেপসিয়া কখনো আমায় কাপুরুষ করতে পারবে না। কাপুরুষদের আর কি বলব, কিছুই বলবার নাই।”

মৃত্যুচিন্তার যে অবসান নেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লাহোর থেকে ইন্দুমতী মিত্রকে লেখা চিঠিতে- “কলিকাতায় এক মঠ হইলে আমি নিশ্চিন্ত হই। এত যে সারা জীবন দুঃখ কষ্টে কাজ করিলাম, সেটা আমার শরীর যাওয়ার পর নির্বাণ যে হইবে না, সে ভরসা হয়।”

মাত্র পঞ্চাশটি টাকার জন্য অসুস্থ স্বামীজি চিঠি লিখছেন হরিপদ মিত্রকে। অনুরোধ করছেন টেলিগ্রামে টাকা পাঠাতে। “আমার এখানকার সমস্ত খরচপত্র উক্ত আমেরিকান বন্ধুরা দেন এবং করাচি পর্যন্ত ভাড়া প্রভৃতি তাহাদের নিকট হইতেই লইব।

একই দিনে (১৫নভেম্বর ১৮৯৭) স্বামীজি জানাচ্ছেন স্বামীব্ৰহ্মানন্দকে, “আমার শরীর বেশ আছে। তবে রাত্রে দু-একবার উঠিতে হয়। নিদ্রা উত্তম হইতেছে। খুব লেকচার করিলেও নিদ্রার ব্যাঘাত হয় না, আর এক্সারসাইজ রোজ আছে। ভাত তো আজ তিন মাস রোজ খাই, কিন্তু কোনও গোল নাই। এইবার উঠে-পড়ে লাগো।”

দশদিন পরেই স্বামীজি ডেরাডুন থেকে স্বামী প্রেমানন্দকে পুরনো ঘি পাঠাতে অনুরোধ করছেন, কারণ “ঘাড়ের একটা বেদনায় অনেকদিন যাবৎ ভুগিতেছি।” এই ঘি কোথা থেকে সংগ্রহ হবে? “হাবু, শরৎ (উকিল)-এর নিকট নিশ্চিত পাইবে।”

ঐ বছরের শেষ পর্বে আর একটি মাত্র রোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে, দিল্লিতে স্বামীজি সর্দির প্রকোপ এড়াতে পারছে না।

আরও কয়েকটা মাস ঝপঝপ করে এগিয়ে যাওয়া যাক। স্বামীজি কাজের মাধ্যমে নিজেকে তিলে তিলে ক্ষয় করে ফেললেন। তিনি নিবেদিতাকে (২৫ আগস্ট ১৮৯৮) কাশ্মীর থেকে লিখছেন, “কাজের চাপে নিজেকে মেরে ফেলো না যেন। ওতে কোন লাভ নেই; সর্বদা মনে রাখবে কর্তব্য হচ্ছে যেন মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো- তার তীব্র রশ্মি মানুষের জীবনী শক্তি ক্ষয় করে।”

এর আগে ১৭ জুলাই ১৮৯৮ শ্রীনগর থেকে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামীজির চিঠি, “যদি উত্তম ঘর হয় এবং যথেষ্ট কাঠ থাকে এবং গরম কাপড় থাকে, বরফের দেশে আনন্দ বই নিরানন্দ নাই। এবং পেটের রোগের পক্ষে শীতপ্রধান দেশ ব্রহ্মৌষধ।

…আমার শরীর বেশ আছে। রাত্রে প্রায় আর উঠিতে হয় না, অথচ দু-বেলা ভাত আলু চিনি যা পাই তাই খাই। ওষুধটা কিছু কাজের নয়-ব্ৰহ্মজ্ঞানীর শরীরে ঔষধ ধরে না। ও হজম হয়ে যাবে কিছু ভয় নাই।”

কিন্তু ঠিক দুমাস পরে (১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮) শ্রীনগর থেকে শ্রীযুক্ত হরিপদ মিত্রকে অবসন্ন স্বামীজির চিঠি মনকে বড় কষ্ট দেয়। “মধ্যে আমার শরীর অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ায় কিঞ্চিৎ দেরি হইয়া পড়িল, নতুবা এই সপ্তাহের মধ্যে পঞ্জাবে যাইবার পরিকল্পনা ছিল।…ডাক্তার যাইতে নিষেধ করিতেছেন।”

মাত্র পঞ্চাশটি টাকার জন্য অসুস্থ স্বামীজি চিঠি লিখছেন হরিপদ মিত্রকে। অনুরোধ করছেন টেলিগ্রামে টাকা পাঠাতে। “আমার এখানকার সমস্ত খরচপত্র উক্ত আমেরিকান বন্ধুরা দেন এবং করাচি পর্যন্ত ভাড়া প্রভৃতি তাহাদের নিকট হইতেই লইব।

…………………….
অচেনা অজানা বিবেকানন্দ- শংকর।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি এক
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি দুই
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি তিন
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি চার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!