স্পর্শের কাতরতা: চতুর্থ পর্ব

স্পর্শের কাতরতা: চতুর্থ পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: স্পর্শ : স্পর্শের কাতরতা: চতুর্থ পর্ব

প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর দিতে না পারলেও ড. উসুই এ বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেন। তিনি স্পর্শের কাতরতা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। এর উত্তর অনুসন্ধানে তিনি খ্রিস্টীয় ধর্মশাস্ত্রে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। কিন্তু মনের তৃষ্ণা নিবারণ না হওয়ায় এ বিষয়ে আরো জানবার জন্য বৌদ্ধ মঠে যাতায়াত শুরু করেন।

স্পর্শ চিকিৎসার মূল ভাব বোঝার জন্য তিনি একে একে জাপানি, চায়না ও পালি ভাষা শিখেন। এভাবে ৭ বছর চেষ্টার পর তিনি বুঝতে পারেন কেবল তত্ত্ব দিয়ে এই রহস্য অনুধাবন অসম্ভব। তাই তিনি ধ্যানে বসার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।

জানা যায়, এরপর উসুই বেশকিছু পাথরের টুকরো নিয়ে জাপানের পবিত্র পর্বত কুটরীইয়ামার চূড়ায় আরোহন করেন। সেখানে তিনি দিনের পর দিন ধ্যান করতে থাকেন। প্রতিদিন সেখান থেকে একটি করে পাথর নিক্ষেপ করতেন। এভাবে ২১টি পাথর নিক্ষেপের দিন অর্থাৎ ২১তম দিনে তার সাধন সার্থকতা পায়।

২১ দিনের আত্মশুদ্ধির পর পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত হয়ে। নামার পথে তিনি পায়ে আঘাত পান এবং নিজে নিজেই নিজেকে স্পর্শ চিকিৎসা দ্বারা সুস্থ হন। এতে তার আস্থা বেড়ে যায়। তার এই বিদ্যা তিনি সমগ্র বিশ্বে মানব কল্যাণে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে যান বাকি জীবন।

বাইবেলে উল্লিখিত যীশুর স্পর্শে রোগী সুস্থ্য হয়ে ওঠার যে প্রশ্ন থেকে আধুনিক এই রেইকির উদ্ভব। সেই বাইবেলে যীশুর স্পর্শ চিকিৎসা প্রসঙ্গে কি বলেছে এই বেলা সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। এ প্রসঙ্গে বাইবেলের মথি পর্বে উল্লেখ আছে-

যীশু পাহাড় থেকে নেমে এলে অনেক লোক তাঁর পিছনে পিছনে চলতে লাগল। সেই সময় একজন কুষ্ঠ রোগী যীশুর কাছে এসে তাঁর সামনে নতজানু হয়ে বলল, ‘প্রভু! আপনি ইচ্ছে করলেই আমাকে ভাল করে দিতে পারেন।’

যীশু হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাই-ই চাই। তুমি ভাল হয়ে যাও।’ সঙ্গে সঙ্গে তার কুষ্ঠ রোগ ভাল হয়ে গেল।

তখন যীশু তাকে বললেন, ‘দেখ! তুমি কাউকে একথা বলো না, বরং যাও যাজকের কাছে গিয়ে নিজেকে দেখাও; আর গিয়ে মোশির আদেশ অনুসারে নৈবেদ্য উৎসর্গ কর। তাতে তারা জানবে যে তুমি ভাল হয়ে গেছ।’

অন্য ঘটনায় যীশু পিতরের বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, পিতরের শাশুড়ির ভীষণ জ্বর। তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। যীশু তাঁর হাত স্পর্শ করা মাত্রই জ্বর ছেড়ে গেল। তখন তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে যীশুর সেবা করতে লাগলেন।

সন্ধ্যা হলে লোকেরা ভূতে পাওয়া অনেক লোককে যীশুর কাছে নিয়ে এল। আর তিনি তাঁর হুকুমে সেই সব ভূতদের দূর করে দিলেন। এছাড়া তিনি আরো বেশ কিছু রোগীদের সুস্থ করলেন।

এর দ্বারা ভাববাদী যিশাইয়র ভাববাণী পূর্ণ হল- ‘তিনি আমাদের দুর্বলতা গ্রহণ করলেন, আমাদের ব্যধিগুলি বহন করলেন।’

যীশু যখন দেখলেন যে তাঁর চারপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছে, তখন হ্রদের ওপারে যাওয়ার জন্য অনুগামীদের আদেশ দিলেন। (মথি)

যীশু ও তাঁর শিষ্যেরা যিরীহো শহর ছেড়ে যাবার সময় অনেক লোক যীশুর পিছনে পিছনে চলল। পথের ধারে দু’জন অন্ধ লোক বসে ছিল। যীশু সেই পথ দিয়ে যাচ্ছেন শুনে তারা চিৎকার করে বলল, ‘প্রভু! দায়ূদের বংশধর, আমাদের দয়া করুন।’

তারা যেন চুপ করে সেই জন্য লোকেরা তাদের ধমক দিল। কিন্তু তারা আরও চিৎকার করে বলল,’ প্রভু! দায়ূদের বংশধর, আমাদের দয়া করুন।’

তখন যীশু দাঁড়ালেন এবং তাদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা কি চাও? আমি তোমাদের জন্য কি করব?’

তারা তাঁকে বলল, ‘প্রভু! আমাদের চোখ খুলে দিন।’

তখন যীশু মমতায় পূর্ণ হয়ে তাদের চোখ ছুঁলেন, আর তখনই তারা দেখতে পেল এবং তাঁর পিছনে পিছনে চলতে লাগগো।

এতো গেলো বাইবেলের কথা। এবার একটু বিজ্ঞানে মনোনিবেশ করা যাক। বিজ্ঞান বলে, ত্বকের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের সমন্বয়ে ‘স্পর্শেন্দ্রিয়’ গঠিত। স্পর্শেন্দ্রিয় মূলত ত্বকে চাপ ও বিকৃতির সাড়া দেয়।

প্রধানত তলাকৃতি কণিকা, স্পর্শগ্রাহ্য কণিকা, স্পর্শগ্রাহ্য চাকতি ও রাফিনি কণিকা এই চার ধরনের গ্রাহক স্পর্শেন্দ্রিয় কাজ করে থাকে। এই গ্রাহকগুলো প্রান্তীয় স্নায়ু তন্তুর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সংকেত পাঠায় যাতে করে স্পর্শের অনুভূতি জাগে।

বলা হয়, দেহের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ ওজনই হয় চামড়া তথা ত্বকের। ত্বক আমাদের দেহের বাইরের অংশকে শীতলতা ও উষ্ণতা থেকে যেমন রক্ষা করে। তেমনি দেহের অভ্যন্তরের ক্ষতিকারক পদার্থ রোমকূপের গ্রন্থি দিয়ে বের করে দেয়ার কাজটিও করে।

সাত স্তরের এই ত্বকে আছে অসংখ্য কৈশিক রক্তনালী। এই রক্তনালীগুলো রক্ত ধরে রাখে; যা প্রয়োজন মতো দেহের অভ্যন্তরে যায়।

রক্ত চলাচল ছাড়াও ত্বক দেহের তাপের সমতা রক্ষা করে। দেহ ঠাণ্ডা হয়ে উঠলে রক্ত ভেতরে চলে যায়, যাতে দেহের তাপ বাইরে না যেতে পারে। আর দেহ গরম হয়ে উঠলে নালীগুলোর মুখ খুলে গিয়ে রক্ত এসে ত্বকে জমা হয় তাপ বৃদ্ধি করে।

অন্যদিকে ত্বকের স্বেদগ্রন্থি ঘাম তৈরি করে। ঘাম বের হলে দেহ যেমন ঠাণ্ডা হয় তেমনি দেহের অভ্যন্তরীণ দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যায়।

দেহের ত্বকের মধ্যে থাকা নার্ভের অসংখ্য প্রান্তই মূলত স্পর্শেন্দ্রিয়। এই নার্ভগুলোর জন্যই আমরা স্পর্শ টের পাই। এরাই আমাদের মস্তিষ্কে স্পর্শের তথ্য প্রেরণ করে।

অন্যদিকে যোগ সাধন মতে, ব্রহ্মাণ্ডের মতো মানবদেহও যেমন পঞ্চতত্ত্ব অর্থাৎ- মাটি, পানি, আগুন, বাতাস ও আকাশের সমন্বয়ে সৃষ্টি। তেমনি মানবদেহে এই পঞ্চতত্ত্ব ‘তরঙ্গ’ রূপে প্রবাহিত হয়। আর সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তরঙ্গ মানবদেহ থেকে যেমন বাইরে বের হয় তেমনি আবার বাইরে থেকে ভেতরেও প্রবেশ করে।

আর এই তরঙ্গের যাতায়াতের কাজটি সবচেয়ে সুচারুরূপে করে হাতের আঙ্গুলগুলো। কারণ হাতের আঙ্গুল দিয়ে এই তরঙ্গ প্রবাহিত হয় উভয় দিকেই। অর্থাৎ বাইর ও প্রবেশ উভয়মুখি ক্রিয়াই হয় হাতের আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে।

আরকটু বিস্তারিত বলতে গেলে বলতে হয়- এই পঞ্চতত্ত্ব ‘তরঙ্গ রূপে’ দেহের বাইরে যেমন প্রবাহিত হয় তেমনি পঞ্চতত্ত্ব ‘তরঙ্গ রূপে’ ব্রহ্মাণ্ড থেকেও দেহের মাঝেও প্রবেশ করে। দেহের মধ্যে আঙ্গুলই পঞ্চতত্ত্ব তরঙ্গ প্রবেশ ও বাহির হওয়ার প্রধানতম পথ।

প্রাচীন ভারতীয় মুনিঋষিরা হাতের কোন আঙ্গুলে কোন তরঙ্গ প্রবাহিত হয় তাও নির্দিষ্ট করেছেন। বিষয়টি সাধারণের কাছে হাস্যকর মনে হতেই পারে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সেই তর্কে না দিয়ে সাধকরা এই বিষয়ে কি ভাবেন তা সাধারণ ভাষায় একটু বলবার চেষ্টা করি-

যোগ মতে, প্রতি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি আগুন তত্ত্ব, তর্জনীতে বায়ু বা বাতাস তত্ত্ব, মধ্যমাতে আকাশ তত্ত্ব, অনামিকাতে মাটি তত্ত্ব এবং কনিষ্ঠা আঙ্গুলে পানি বা জল তত্ত্ব প্রবাহিত হয়। এই তরঙ্গ প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে দেহের পঞ্চতত্ত্বের সমতা আনার নানা কৌশলও বাতলে দিয়েছেন সাধুগুরুরা।

এই প্রবাহিত সূক্ষ্ম তরঙ্গকে ব্যবহারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে হাতের আঙ্গুলের বিভিন্ন মুদ্রা। আঙ্গুলের অগ্রভাগের ত্বকের স্পর্শকে ব্যবহার করা এসব মুদ্রা মূলত যোগ হস্তমুদ্রা নামে পরিচিত।

হাতের আঙ্গুল দিয়ে অসংখ্য মুদ্রার প্রচলন আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটার নাম বলতে গেলে বলতে হয়- ধ্যানমুদ্রা, অপান মুদ্রা, অপানবায়ু মুদ্রা, জ্ঞানমুদ্রা, প্রাণ মুদ্রা, বজ্র মুদ্রা, বরুণ মুদ্রা, বায়ু মুদ্রা, ভৈরব মুদ্রা, সুনয় মুদ্রা, সুরভী মুদ্রা ইত্যাদি।

একক হাত দিয়ে যেমন মুদ্রা করা হয়। তেমনি দুই হাতের ব্যবহারেও একক মুদ্রা করা হয়। সাধারণত উভয় হাতে একই মুদ্রা ধারণ করে ধ্যান করা হয়। তবে দুই হাতের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রাও একসাথে করার বিধান আছে।

সাধুগুরুরা বলেন, এ অতি সূক্ষাতিসূক্ষ্ম তরঙ্গের খেলা। এ বিদ্যা উপযুক্ত গুরুর কাছ থেকে জেনে-বুঝে তবেই করা উচিৎ। কারণ এই প্রকৃয়ায় পঞ্চতত্ত্ব সমতায় কাজ করে খুবই ধীর গতিতে। কিন্তু এর প্রভাব মারাত্মক। তাই না জেনে করলে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানুষিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

বোঝার জন্য বলতে গেলে বলতে হয়ে গৌতম বুদ্ধের মূর্তিতে দেখা যায় তিনি ডান হাত বুকের সামনের দিকে তালু দিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর অগ্রভাগ যুক্ত করে অন্য তিন আঙ্গুল উপরের দিতে তুলে ধরা। এই মুদ্রাটির নাম অভয় মুদ্রা।

(চলবে…)

………………….
আরো পড়ুন:
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-২
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৩
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৪
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৫
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৬
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৭
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৮
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৯
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!