স্পর্শের কাতরতা: দশম পর্ব

স্পর্শের কাতরতা: দশম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: স্পর্শ : স্পর্শের কাতরতা: দশম পর্ব

অন্যদিকে আদালতে আসামী যখন তার বক্তব্য প্রদান করে তার আগে তাকে পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শ করিয়ে শপথ করিয়ে নেয়া হয়। যাতে সে স্পর্শের অপরাধ থেকে বাঁচতে হলেও সত্য কথা বলে। স্পর্শের কাতরতায় সে ব্যাকুল হয়। কারণ ধর্মীয় বিধান মতে, পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শ করে মিথ্যাচার করা যাবে না। করলে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

বন্ধুতের শপথ যেমন পরস্পরের হাত ছুঁয়ে করা হয়। তেমনি নানাবিধ শপথে পবিত্র স্থান বা পবিত্র বস্তুর স্পর্শকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। মুখের কথা থেকে লেখার গুরুত্ব যেমন বেশি। তেমনি মুখের কথা-লিখিত দলিলেও হাতের স্পর্শ বা হাতে ছাপ দিতে হয়।

কোথাও কোথাও পবিত্র বস্তু-পদার্থকে স্পর্শ করেই শপথ করার বিধান। অন্যথায় সে শপথ বা ওয়াদাকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হয় না। আবার মানুষ একে অপরকে স্পর্শ করেও শপথ করে।

বিশ্বাসীরা বলে, যাকে স্পর্শ করে শপথ করা হয় বা কোনো কথা বলা হয়। তা যদি সত্য না হয় তাহলে যাকে স্পর্শ করে তা করা হয়েছে তার বিপদ অবশ্যম্ভাবী।

অনেকে বিশ্বাস করেন, কাউকে স্পর্শ করে কাউকে কোনো কথা দিয়ে সেটা না রাখলে; যাকে স্পর্শ করা হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত।

আবার পশ্চিমা বিশ্বে ‘টাচ্ উড’ বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে। তারা বিশ্বাস করে, কাঠ অর্থাৎ প্রকৃতিকে ছুঁয়ে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না। তাই তারা যে সত্য বলছে তা বোঝানোর জন্য বলে টাচ্ উড।

সত্য বলার-কথা রাখবার জন্য স্পর্শকে যেমন ব্যবহার করা হয় তেমনি নানা চাতুরিতেও এর ব্যবহারে জুড়ি নেই। খুব সহজ ভাবে বুঝাতে গেলে পকেটমাদের একটা কৌশলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে- পকেটমাররা যখন কাউকে টার্গেট করে তখন তারা টার্গেটের দেহের বিভিন্ন অংশ স্পর্শ করে তার মনোযোগ ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়।

মানুষ যে মুর্হূতে স্পর্শের স্থানগুলো নিয়ে সচেতন হতে থাকে ততক্ষণে পকেটমার পিক পকেট করে পগাড়পার। আবার ভণ্ড গুণীনরাও এরূপ একটা প্রয়োগ করে। তারা বিশেষ কারো সাথে সাক্ষাতের সময় বিশেষ শীতলীকৃত পারফিউমে হাত ভিজিয়ে তা শুকিয়ে নেয়।

এরপর যখন গ্রহকের হাতের বা কপালে কোনো অংশে সেই হাত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে। তখন সেই অদ্ভুত শীতল এক অনুভূতিতে মানুষের চিন্তা-চেতনা এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়। দেহ অবশের মতো হয়ে যায়। অনেকে এসময় সম্মোহিত হয়ে যায়। তখন ভণ্ডের ভণ্ডামী করতে আর কোনো বাঁধা থাকে না।

অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের মতো স্পর্শও একটি যোগাযোগের মাধ্যম। তা যেমন নিজের সাথে নিজের। দেহের সাথে চিত্তের। একের সাথে অপরের। নিজের সাথে ব্রহ্মাণ্ডের। এই যোগাযোগ মানেই তথ্য আদান প্রদান। আর তথ্য আদান-প্রদানে স্পর্শ অনেকটাই নিভৃতে-গোপনে কাজ করে।

যা সকলের সম্মুখে ঘটলেও যে স্পর্শ করছে আর যাকে স্পর্শ করা হচ্ছে তারাই এর অনুভূতি যর্থাথতা টের পায়। বাকিরা দর্শক মাত্র। স্পর্শ ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগিয়ে তাই যুগে যুগে নানা মায়ামোহে মানুষকে বশে রাখবার প্রয়াস করেছে এক শ্রেণীর মানুষ।

কাজ আদায় করিয়ে নেয়ার জন্যে স্পর্শের পরশ দিয়ে বোকা বানানোর ঘটনাও কম ঘটে না। এই স্পর্শ যে কেবল মানুষের মাঝেই তথ্য আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ থাকে তাই নয়। সমগ্র প্রকৃতিই স্পর্শের মধ্যে দিয়ে বলে যায় তার নিজের কথা। প্রকাশ করে নিজের স্বরূপ।

অনেক ধ্যানের বিশেষ পর্যায়ে বহুবর্ষজীবী বৃহৎ সব প্রাচীন বৃক্ষকে স্পর্শ করে স্থির থাকবার অভ্যাস করানো হয়। বলা হয়, এতে মানুষের মাঝে বৃক্ষের স্থিরতরার বার্তা প্রবাহিত হয়। এই স্পর্শে মানুষ বৃক্ষের কাছ থেকে স্থির হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়।

স্পর্শের বন্ধনে অন্যতম হলো প্রেমের বন্ধন। মধুর মিলন। পারস্পরিক ভালোবাসায় যখন প্রেমিক-প্রেমিকা স্পর্শের বন্ধনে ঘনিষ্ট হয় তখন সমস্ত দেহ-মনে তার আবেশ ছড়িয়ে পরে। আর এই পারস্পরিক মিলনেই কেবল নতুন প্রাণ জন্ম লাভ করে তাও কিন্তু নয়।

কারণ ধর্ম বলে, পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই মা মারিয়ামের গর্ভে জন্ম নেন শিশু যীশু। আবার আধুনিক নানা প্রযুক্তিতে নর-নারীর মিলন ছাড়াও শিশু জন্মের নানা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে। তবে যত পদ্ধতিই আবিষ্কার হোক না কেনো মানুষ নিজের করে কোনো কিছুকে নিতে চাইলে স্পর্শ ইন্দ্রিয়ের চেয়ে গুরুত্ব আর কিছুই যেন বহন করে না।

রায় দীনেশচন্দ্র সেন বাহাদুর তার ‘পদাবলী-মাধুর্য্য’ গ্রন্থে লিখেছেন- “কৃষ্ণ পদ স্পর্শ করিয়া আছেন, সেই স্পর্শের গৌরবে রাধা আবিষ্ট হইয়া আছেন- তাঁহার বাহিরের জ্ঞান নাই। স্পর্শরসে তিনি আত্মহারা। হতাশ কৃষ্ণ এবার ফিরিয়া যাইতেছেন- রাধাকুণ্ডে প্রাণত্যাগ করিতে। কিন্তু একবার কতকটা যাইয়া ফিরিয়া চাহিতেছেন, রাধার মান ভাঙ্গিল কি না দেখিতে। এইভাবে পুনঃ পুনঃ থামিয়া থামিয়া কৃষ্ণ চলিয়া গেলেন।

কৃষ্ণের কোমল স্পর্শে আত্মহারা হইয়া রাধার মন বাস্তব জগতে জাগিয়া উঠিল, তখন মান আপনা হইতেই ভাঙ্গিয়া গেল এবং কৃষ্ণের জন্য মন হাহাকার করিয়া উঠিল। তাঁহাকে ফিরাইয়া আনিবার জন্য রাধা সখীদের সাধিতে লাগিলেন।

অনেক কথার কাটাকাটি হইল, সখীরা সময় পাইয়া বেশ দু’কথা শুনাইতে ছাড়িল না। রাধা বিলাপ করিয়া বলিলেন, ‘নারী জনমে হাম না করিলু ভাগী। এখন মরণ শরণ ভেল মানকি লাগি।’ নারীজন্মে আমি কোন ভাগ্যই করি নাই, এখন মানের জন্য আমার মৃত্যুর শরণ লইতে হইল।

কৃষ্ণকমল গেঁয়ো কথায়, ‘আমি অতি পাষাণ-বুকী, সে মুখে হ’লাম বিমুখী-সে যে কেঁদে কেঁদে সেধে গেল গো’ বলিয়া হৃদয়ের তীব্র ব্যথা বুঝাইয়াছেন; তাঁহার আর একটি পদ এইরূপ’ ‘আমি নহি প্রেমযোগ্য, করেছিলাম প্রেমযজ্ঞ, যোগ্যাযোগ্য বিচার না করে’ -এই যজ্ঞের আমি যোগ্য নই, যজ্ঞেশ্বর কেন আমার যজ্ঞ গ্রহণ করিবেন?”

প্রিয়জনের কাঙ্খিত স্পর্শে মানুষ উজ্জীবিত হয়ে উঠে। তেমনি অপ্রিয় করো অনাকাঙ্খিত স্পর্শে মানুষ ক্রোধে-ক্ষোভে ফেটে পরে। কিংবা দু:খ-কষ্টে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই স্পর্শও সকল সময় মানুষ একই ভাবে নেয় না। মনের স্থিতির সাথে এই স্পর্শ ইন্দ্রিয় সরাসরি যুক্ত।

একই মানুষের… এই ভঙ্গিমার স্পর্শ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকৃয়া দিতে পারে। কখনো তা পরম আনন্দের, কখনো তা চরম অপমানের আবার কখনো তা বিরক্তির কারণ হতে পারে। আর এসব বেশিভাগ সময় হয় সেই যে বলেছিলাম সঞ্চিত সংস্কার? সেই সঞ্চিত সংস্কারের শাসনাবলে।

আপনার দৃষ্টি আবদ্ধ থাকলেও প্রিয়জনের স্পর্শকে যেমন সঞ্চিত অনুভূতির সংস্কার আপনাকে চিনিয়ে দিতে পারে। তেমনি আবার ধোঁকাও দিতে পারে। যেমন পোষা প্রাণীকে জবাই করার আগে তাকে স্পর্শ করে ভরসা দেয়া হয়। সেও ভরসা মতো এগিয়ে চলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্পর্শ তার বিশ্বাস রক্ষা করে না।

তেমনি মানুষের জীবনেও স্পর্শ এমনি বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ হয়ে উঠে স্পর্শকাতর। সাধারণ অর্থে স্পর্শকাতর অর্থ ‘অল্পেই মনে আঘাত পায় এমন’। তবে এর অর্থ যেমন নানাবিধ হতে পারে। তবে সহজ করে বলতে গেলে বলা যায়, স্পর্শ সম্পর্কে অধিক সচেতন হয়ে উঠে।

আর এই সচেতনতা তাকে আরো বেশি বিভ্রান্তির দিকেও ধাবিত করে। সন্দেহ বাতিক করে তোলে। মূল কথা স্পর্শ এমন এক অনুভূতি যা দেহের বহিরাবরণ দিয়ে অনুভব করা হলেও তা জুড়ে থাকে সমস্ত চিন্তা-চেতনায়।

তবে স্পর্শ যে কেবল ত্বকে লাগে তাই নয়। এই স্পর্শ আবার গভীরে ছুঁয়ে যায়। হৃদয় স্পর্শ করে এমন ঘটনাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি মর্মস্পর্শ। অর্থাৎ ঘটনার গতি-প্রতৃতি এমনই যে তা স্পর্শ করেছে মর্ম বা চিত্তকে। আসলে স্পর্শ ব্যাপারটিই এমন। যা কোথায় কখন কি ভাবে ছুঁয়ে যাবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।

রূপকথার লোভী রাজা মিডাস বর চেয়েছিল তিনি যা স্পর্শ করবেন তাই যেন সোনা হয়ে যায়। চাহিদা মতো একদিন তিনি তা পেয়েও গেলে। মহাখুশি হয়ে রাজা একে একে সবকিছু সোনা বানাতে লাগলেন। তিনি যা ছুঁয়ে দেন তাই সোনা হয়ে উঠছে।

আনন্দে তিনি দিশেহারা হয়ে নিজ কন্যাকে ছুঁতেই সেও সোনার মূর্তি হয়ে গেলো। তখন রাজার বোধদয় হলো। সে জল-খাবার কিছুই খেতে পারছে না। কারণ যাতে তার স্পর্শ লাগে তাই সোনা হয়ে যায়। তখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে হায় হায় করতে লাগলেন।

সোনা হয়ে যাওয়ার স্পর্শ থেকে বাঁচতে লোভী রাজা মিডাসের মতো মানুষ যেমন বিলাপ করে জীবনভর। তেমনি সাধককুল গুরুর স্পর্শে নিজেকে সোনার মানুষ গড়ে তুলবার সাধনায় রত থাকে আজীবন। কবে গুরুর সেই স্পর্শ সে পাবে এই স্বপ্নে বিভোর থাকে সাধক।

যে স্পর্শ তাকে সেই পরমের স্পর্শের অনুভূতি দেবে। সাধককুল বলে, সেই স্পর্শ পেতে হলে স্পর্শেন্দ্রিয়কে সেই রূপ খাটি করতে হয় যাতে সেই পরমের পবিত্র স্পর্শ পাওয়ার সে যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। স্পর্শ ইন্দ্রিয় সেইরূপ শুদ্ধ না হলে পরমের স্পর্শের অনুভূতি প্রাপ্ত হওয়া যায় না।

পরম তো সর্বত্রই বিস্তার করে আছেন। সমগ্র সৃষ্টিতেই তো তিনি বিরাজমান। কিন্তু তাকে অনুভব করতে হলে হতে হয় পূত পবিত্র-স্বচ্ছ-শুদ্ধ। আনতে হয় স্পর্শের নিয়ন্ত্রণ। পৌঁছাতে হয় স্পর্শহীনতার স্পর্শের অনুভূতি নেয়ার সক্ষমতায়। তবেই মেলে সেই পরমের স্পর্শ।

আসলে ইন্দ্রিয় নিয়ে লেখা কোথাও শেষ করা খুবই দুরূহ। সে চেষ্টা আমার মতো অক্ষমের পক্ষে না করাই শ্রেয়। আমি কেবল ইন্দ্রিয় সম্পর্কে কিছু কথা-কিছু শব্দ-কিছু অনুভূতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র।

যারা এর গভীরে হাঁটতে চান তারা তাদের এই লেখা যদি কিছুটা সহায়তা করে কিছু সূত্র দিয়ে। তবেই এই ধারাবাহিক লেখার স্বর্থকতা। এর বেশি কিছু নয়।

শেষ হইয়াও হইলো না শেষ এমন অবস্থায় পাগল বিজয় সরকারের গান দিয়ে লেখার ইতি টানলাম। জয়গুরু।।

পাগল বিজয় বলে-

তারে দূরে থেকে ভালোবাসিস আনিস না কাছে,
তোর মনের মলিনছোঁয়া লেগে
সব খোয়া যাবে পাছে।।

এখনো কি ভাঙ্গে নাই তোর ভুল
দেবতার পূজায় লাগে না পাঁপড়ি ঝরা ফুল;
তুই ভুল করে ফুল তুলতে যাস নে গাছের ফুল
থাকুক গাছে।।

দুর গগনে দেখে কালোমেঘ
চাতকিনীর চিতে জাগে কতো কি আবেগ;
ভাবের আবেগে দেখে দূরের মেঘ
ময়ূর ময়ুরী নাচে।।

পাওয়ার চেয়ে চাওয়ায় সুখ জানি
চাঁদকে পেয়ে কুমুদিনী জাগে রজনী;
আরো সূর্যমুখী সরোজিনী
পুরবের আলো যাচে।।

পাগল বিজয় বলে, প্রেমের এই রীতি
নিজের সাথে নিজে আগে কারো পিরিতি;
পরে পাবে পরাৎপরের প্রীতি
তোর ঘরে তোর সব আছে।।

(সমাপ্ত)

………………….
আরো পড়ুন:
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-২
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৩
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৪
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৫
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৬
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৭
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৮
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৯
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!