স্পর্শের কাতরতা: ষষ্ঠ পর্ব

স্পর্শের কাতরতা: ষষ্ঠ পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: স্পর্শ : স্পর্শের কাতরতা: ষষ্ঠ পর্ব

তবে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা সহ বহু দেশে বিচিত্র সব করমর্দন রীতির প্রচলন আছে। স্পর্শের কাতরতার আছে ভিন্ন ভিন্ন আচার-রীতি। অনেকে শুধু হাতের স্পর্শেই স্বাগত প্রীতি জ্ঞাপন সীমাবদ্ধ করে না। তার সাথে আরো অনেক কিছু জুড়ে দিয়ে তাতে ভিন্নতার সৃষ্টি করে।

কোনো কোনো সংস্কৃতিতে করমর্দনের পর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করে। মুসলমাদের মাঝে বুকে বুক মিলিয়ে জড়িয়ে ধরে পরপর তিনবার ঘাড় বিনিময় করার প্রথা চালু আছে। তারপর দুইজনই দুইহাত দিয়ে অর্থাৎ চারহাত একত্রিত করে প্রীতি জ্ঞাপন করেন।

কোনো কোনো সংস্কৃতিতে করমর্দনের পর অপর হাত দিয়ে বিপরীত জনের পিঠে হাত দিয়ে কাছে এনে একজন অপর জনের কাঁধ কাঁধ স্পর্শ করে দেন। এটা অনেকটা অর্ধ কোলাকুলির মতো। আধুনিক সমাজে পরস্পরকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে সম্ভাষণ করাকে বলা হয় ‘হাগ’।

অনেক সংস্কৃতিতে করমর্দনের পর হাত মুখের কাছাকাছি নিয়ে ঠোট দিয়ে হাতে চুমু খাওয়ার রেওয়াজও আছে। এটি পরিচিতি ‘ভিক্টোরিয়ান হ্যান্ডশেক’ নামে। এটি সাধারণত উচ্চপদস্থ বা বিশেষ সম্মানিতদের সম্মান প্রদশনার্থে করা হয়। তবে বিষয়টি প্রেম বিনিময়েও বহুল ব্যবহৃত হয়।

অনেক সংস্কৃতিতে স্বাগত সম্ভাষণে করমর্দন করে বা না করে পরস্পরের দুই গালে সরাসরি চুমু বিনিময়ে করে প্রীতি প্রদর্শন করা হয়।

অবশ্য অনেক জায়গায় এই একই প্রচলিত থাকলেও তা সরাসরি গালে চুমু না খেয়ে গালের খুব কাছে শূন্যতায় চুমু খাওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত। এই প্রথায় সব সময় দুই গালেই চুমু খেতে হয়। প্রথমে ডান গালে পরে বাম গালে। সরাসরি ঠোঁট দিয়ে গাল স্পর্শ করা যাবে না।

আসলে গালে গাল ছুঁয়ে মুখে মৃদু চুমুর শব্দ করার মতো একটা ব্যাপার। এই প্রথাটি বর্তমান গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে বেশ জনপ্রিয়। কোনো কোনো সংস্কৃতিতে পরস্পর পরস্পরের ঠোটে আলতো করে চুমু খাওয়ার রেওয়াজও লক্ষ্য করা যায়।

প্রাশ্চাত্যে এই প্রথা সর্বত্র প্রচলিত থাকলেও আরব দেশগুলোতে জনসম্মুখে নারী-পুরুষে চুমু খাওয়ার রীতি নেই। কিন্তু একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষকে সম্ভাষণ বিনিময়ে চুমু খাওয়া অতি সাধারণ। আর প্রেমিক প্রেমিকার চুম্বনের সম্ভাষণ তো সর্ব জনেরই জানা। তারও আছে নানা প্রকার-নানা ভঙ্গি।

এই পরস্পর পরস্পরকে ছুঁয়ে সম্ভোষণ করার রীতি কবে থেকে প্রচলিত হয়েছে সেটা বলা আসলেই মুশকিল। কারণ দিন তারিখ মেনে তো আর রীতিনীতির জন্ম হয় না। তবে হ্যান্ডশেক বা করমর্দনের আদি প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতকে অ্যাসিরীয় (বর্তমান ইরাক) সম্রাট তৃতীয় শালমানেসেরের শাসনকালের একটি শিলাখণ্ড থেকে।

এতে দেখা যায়, সম্রাট শালমানেসের একজন ব্যাবিলনীয় শাসকের সঙ্গে করমর্দন করছেন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের গ্রিক সমাধির এপিটাফেও করমর্দনরত মানুষের খোদিত চিত্র পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমান মুদ্রাতেও বন্ধুত্ব এবং আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ করমর্দনের কথা উল্লেখ আছে।

তবে কথিত আছে, সতের শতকে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের কোয়াকার সম্প্রদায় হ্যাট খুলে মাথা ঝোঁকানোর বিকল্প হিসেবে করমর্দন চালু করে। ধারণা করা হয়, পরস্পরিক আশ্বাসকে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত করতেই এই প্রথাকে সরকারি মহল গ্রহণ করে। যা কালক্রমে সর্বত্র ছড়িয়ে পরে।

বিশেষ মহল এই করমর্দনের মধ্যে দিয়ে অনেক ধরনের তথ্যও পাচার করে থাকে। গোয়েন্দা সংস্থা, গুপ্ত সংঘ, অপরাধী সহ অনেকেই করমর্দনের মাধ্যমে তথ্য পাচারে বেশ চৌকশ ভূমিকা পালন করে থাকে। তারা করমর্দনের সময় এমন কিছু সংকেত দিয়ে থাকে যা সকলের সামনে ঘটলেও সাধারণের চোখে তা ধরা পরে না।

অনেক সময় আবার পরস্পরের দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে বা পরস্পরকে মিলিয়ে দিতে করমর্দন বা কোলাকুলি করার রেওয়াজ দেখা যায়। অর্থাৎ তারা যে মতে স্থির হলো তা দৃঢ় করার জন্য কেবল শব্দ-রূপ দর্শন নয় স্পর্শের অনুভূতিও অত্যাবশ্যক। এতে কেবল মন নয়, দেহও স্বাক্ষী থেকে যায়।

ইসলামী পরিভাষায় করমর্দনকে বলা হয় ‘মুসাফাহা’। আল বারাআ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী বলেছেন- ‘দুজন মুসলিম পরস্পর মিলিত হয়ে মুসাফাহা করলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (আবু দাউদ-৫২১২)

সাধারণত প্রথমে সালাম দেওয়া, তারপর উভয় হাতে মুসাফাহা করতে হয়। ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তিকে নবীজী বিদায় দেওয়ার সময় তাকে নিজের হাতে ধরতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের হাত নবীজী থেকে না ছাড়াতেন সে পর্যন্ত তিনিও তার হাত ছাড়তেন না। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪২)

এই করমর্দন যে কেবল পাড়া-মহল্লা বা গৃহে ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে করা হয় তাই নয়। বড় বড় রাষ্ট্র বা পরাশক্তিও পরস্পর যখন একমতে আসে বা কোনো চুক্তি বদ্ধ হয় তখনও এই করমর্দন বা কোলাকুলির প্রথা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ভারতবর্ষে প্রচলিত সনাতন রীতি থেকে উদ্ভূত সম্ভাষণ হলো ‘নমস্কার’। আঙুলগুলো উপরের দিকে রেখে হাতের তালুদুটিকে পরস্পর একসাথে করে কিছুটা নত হয়ে বলতে হয় নমস্কার। নমস্কারের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় থাকে বুকের কাছে। এই ভঙ্গিটিকে অঞ্জলি মুদ্রা বা প্রণামাসনও নামেও পরিচিত।

নমস্কার যে কেবল স্বাগত সম্ভাষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাই নয়। এটি বিদায় বেলা এমনকি প্রার্থনার সময়ও ব্যবহৃত হয়। প্রণামের ছয়টি রূপের একটি হল এই নমস্কার।

তবে অনেক দেশ সম্ভাবষণে ছোঁয়াছুঁয়ি বা স্পর্শের বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে চলেন। চীন-জাপানের অনেক সংস্কৃতেই কেবল দেহের উপরে ভাগ ঝুঁকিয়ে একে অন্যেকে সম্ভাষণ জ্ঞাপন করে থাকে। তবে এই মাথা নোয়ানো এবং শারীরিক ভঙ্গির পার্থক্যের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাষণ সম্বোধন প্রকাশ পায়।

অন্যদিকে আধুনিক সময়ে অল্পবয়সীদের মাঝে পারস্পরিক সাক্ষাতে করমর্দনের পরিবর্তে আরো অনেক ধরনের নতুন নতুন স্পর্শের কায়দা সংযোজিত হয়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলো শুধু সাক্ষাতের শুরুতেই নয়, উচ্ছ্বাস প্রকাশের সময়ও এসব স্পর্শের ভাষা প্রকাশ পায়। এরমধ্যে ‘হাই-ফাইভ’ সবচেয়ে জনপ্রিয়।

হাই-ফাইভে একে অপরের হাতের তালু মিলিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশের একটা রীতি। তবে এখন এই হাই-ফাইভে আরো অনেক অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে। আর এই সব ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন ভাষা প্রকাশ করে। অনেকে নিজেদের মধ্যে কোড স্পর্শ হিসেবে হাই-ফাইভের ভিন্নতা রক্ষা করে চলে।

জানা যায়, ১৯৭৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ডজার্স ও হিউস্টন অ্যাস্ট্রস দল বেসবল খেলায় টানটান উত্তেজনার মুর্হূতে, খেলোয়ার গ্লেন বার্কের আকাশের দিকে তুলে দেয়া হাতের তালুতে খেলোয়ার ডাস্টি বেকারও কিছু না বুঝে হাত তুলে তাতে স্পর্শ করেন।

এই সংবাদ ইএসপিএনের প্রতিবেদনে শিরোনাম পায় ‘দ্য হাই-ফাইভ’ নামে। ধারণা করা হয়, এরপর থেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশের এই রীতি চলে আসছে। তবে অনেকে বলেন, এটি উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই প্রচলিত ছিল কিন্তু এই ঘটনায় তা নতুন মাত্রা পায়।

উচ্ছ্বসের আরো বহুবিধ স্পর্শের ভাষা প্রচলিত আছে পৃথিবীময়। তবে উচ্ছ্বসের বর্হি প্রকাশ হিসেবে জড়িয়ে ধরার রীতি সর্বাধিক প্রচলিত। ভারতের পাঞ্চাবীদের মধ্যে জড়িয়ে ধরে একে অপরকে একে একে উপরে তুলে ধরার রীতি দেখতে পাওয়া যায়।

অন্যদিকে পরস্পরের সাক্ষাতে এসব নানাবিধ রীতির পাশাপাশি, বয়সে বড় এবং ছোটদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্পর্শের সম্ভাষণের প্রথাও প্রচলিত আছে।

সাধারণভাবে বড়রা আর্শিবাদ করার সময় বয়সে ছোটদের মাথার উপর হাত রেখে তবে আর্শিবাদ করেন। অনেকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরেন। ভরসা দেয়ার জন্য কাঁধে হাত রাত রাখেন। বা দুই হাতের তালুতে হাত চেপে ধরে ভরসা দেয়। আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সর্বোচ্চ আবেগও প্রকাশ পায় কখনো কখনো।

স্পর্শ নিয়ে জয় গোস্বামী লিখেছেন-

এতই অসাড় আমি, চুম্বনও বুঝিনি।
মনে মনে দিয়েছিলে, তাও তো সে না-বোঝার নয়-
ঘরে কত লোক ছিল, তাই ঋণ স্বীকার করিনি।
ভয়, যদি কোন ক্ষতি হয়।
কী হয়? কী হতে পারতো? এসবে কী কিছু এসে যায়?
চোখে চোখ পড়ামাত্র ছোঁয়া লাগলো চোখের পাতায়-
সেই তো যথেষ্ট স্বর্গ- সেই স্পর্শ ভাবি আজ; সেই যে অবাক করা গলা
অন্ধকারে তাও ফিরে আসে…
স্বর্গ থেকে আরো স্বর্গে উড়ে যাও আর্ত রিনিঝিনি
প্রথমে বুঝিনি, কিন্তু আজ বলো, দশক শতক ধ’রে ধ’রে
ঘরে পথে লোকালয়ে স্রোতে জনস্রোতে আমাকে কি
একাই খুঁজেছো তুমি? আমি বুঝি তোমাকে খুঁজিনি?

আবেগের প্রকাশের সাথে যেমন স্পর্শের নিবিড় সম্পর্ক তেমনি সাধুগুরুদের কাছে বা সাধনপথে স্পর্শ একটা বিশাল ভূমিকা পালন করে। গুরুকে একবার ছুঁয়ে দেখার বাসনায় সাধক কত যে কঠিন তপ-জপ করে তার ইয়ত্তা নাই।

(চলবে…)

………………….
আরো পড়ুন:
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-২
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৩
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৪
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৫
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৬
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৭
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৮
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-৯
স্পর্শের কাতরতা: পর্ব-১০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!