ঋষি অরবিন্দ

ঋষি অরবিন্দ’র কথা

-প্রণয় সেন

তিনি ঋষি সাধক শ্রী অরবিন্দ। ভারতমাতার আকাঙ্ক্ষা, ঈশ্বরের অভিপ্রায়, আশীর্বাদ যেন তাই-ই। তাই অসি ছেড়ে সাধনার বাঁশি অরবিন্দের হাতে। ১৯০২ সাল থেকে সশস্ত্র আন্দোলনেই জীবন জড়ানো। কার্জন সাহেবের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকেই তো বঙ্গবাসীর রাজনৈতিক আন্দোলনের যাত্রা। অরবিন্দও সেই বিপ্লবচর্চায়। দাদা বারীন্দ্র ঘোষকে বিপ্লবী গোষ্ঠীর নেতৃত্বের দায়িত্বও দিয়ে দিয়েছিলেন। এলো ১৯০৮ সাল। কলকাতার মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে বোমা বাঁধার কাজ। প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে মারতে গিয়েই ভুল করে দু’জন মহিলাকে মারা হল। ব্যাস, জোরালো মামলা দায়ের। প্রফুল্ল চাকী, ক্ষুদিরাম প্রমুখ অভিযুক্ত হলেন। নাহ! বাদ গেলেন না অরবিন্দও। মিথ্যা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ানো হলো। কী দুর্বিপাক!

মামলাটি ঐতিহাসিক। স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে এবং অরবিন্দের জীবনেও। কিন্তু অরবিন্দের জীবনে একটি স্মরণীয় মাইলস্টোনই এটি। এবং এখান থেকেই জীবনের একটি আশ্চর্য অধ্যায় লিখল ইতিহাস। মামলায় উকিল ছিলেন অবিসংবাদী মহান নেতা ব্যারিস্টার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ফল কী হল? বেকসুর খালাস অরবিন্দ। তারপর কলকাতা ছেড়ে সোজা পণ্ডিচেরি। জেল থেকে বেরিয়ে একেবারে অন্য এক মানুষ।

কিন্তু কারাগার অধ্যায়টিই তো জীবনের অবিস্মরণীয় পর্ব। আলিপুর জেল বা ওই কয়েদখানাই তো অরবিন্দের জীবনের সাধনপীঠ। এই সাধনপীঠ থেকেই বিপ্লবী অরবিন্দের সৃষ্টি ঋষি অরবিন্দ রূপে। বন্দিদশায় দিব্যজীবন লাভ। ঈশ্বর করুণার অলৌকিক বীজ পড়ল জীবনভূমিতে। বীজ থেকে মহাজীবনের মহীরুহের সৃষ্টি। কারাগার হয়ে গেল মহাতীর্থ। হয়ে গেলেন স্মরণীয় পূজনীয় বন্দনীয় অনন্ত মহাজীবন।

দিবানিশি সত্যের সাধনা বন্দিশালায়। কারার লৌহকপাটের ভেতরে সিদ্ধির দীপশিখা জ্বেলে দিলেন ঈশ্বর। সূর্যোদয়ের ভোরে পদ্ম ফুঁটে উঠেছে। এই অধ্যায়ের সাধনকথা হয়তো অনেকের অজ্ঞাত। কিন্তু তথ্যতত্ত্ব দার্শনিকতা এবং উপলব্ধির গভীরে গিয়ে সারসত্যটি হেনেছেন মহানামব্রত ব্রহ্মচারী।

দর্শন পেলেন ঈশ্বরের। অভাবনীয়। মন্দিরে নয়, পূজা বেদিতে নয়, হিমালয়ে নয়। যন্ত্রণার কারাগৃহে। বসুদেব কারাগারে দর্শন পেয়েছিলেন কৃষ্ণের চতুর্ভুজ রূপের। আর অরবিন্দ পেলেন বাসুদেবকে।


‘আদালতে বিচারককে দেখিতাম বাসুদেব। …আমার পক্ষের উকিল চিত্তরঞ্জনকে দেখিতাম বাসুদেব। বাসুদেব আমাকে আশ্বাস দেন আমিই সব। সকলের বুদ্ধিও আমি চালাই।’ গীতার উজ্জ্বল প্রতিফলন।

কী গভীর কী আশ্চর্য উপলব্ধি! জীবনী রচনায় বলেছিলেন, ‘যে কারাগার আমাকে মানব সমাজ হইতে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে, যেই দিকে তাকাইলাম, দেখিলাম বাসুদেব।’ আর কী দেখলেন? ‘দেখিলাম, উচ্চ প্রাচীর নয়-বাসুদেব আমাকে ঘিরিয়া আছেন।…আমার সেলের গরাদ দেখিয়া মনে হইত বাসুদেব আমাকে পাহারা দিতেছেন। আমার সেলের সম্মুখে বৃক্ষটি, তাহাকে দেখিতাম বাসুদেব।…আমার পালঙ্ক স্বরূপ যে মোটা কম্বলটি আমাকে দেওয়া হইয়াছিল, তাহাকে দেখিতাম ওটা বাসুদেব। কম্বল জড়াইয়া শুইয়া উপলব্ধি করিতাম শ্রীকৃষ্ণ বাহু বেষ্টনে আমাকে জড়াইয়া ধরিয়াছেন। সে বাহু আমার বন্ধুর। আমার প্রেমানন্দের।’ আরও বিস্ময়কর কথা শিহরণ জাগায়। বলছেন, ‘আদালতে বিচারককে দেখিতাম বাসুদেব। …আমার পক্ষের উকিল চিত্তরঞ্জনকে দেখিতাম বাসুদেব। বাসুদেব আমাকে আশ্বাস দেন আমিই সব। সকলের বুদ্ধিও আমি চালাই।’ গীতার উজ্জ্বল প্রতিফলন।

এই অভাবনীয় কৃষ্ণ দর্শন স্মরণ করিয়ে দেয়, কৃষ্ণজননী যশোদাকে আর সখা অর্জুনকে। বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন দু’জনকেই। মাকে ঘরের আঙিনায়, আর সখাকে যুদ্ধভূমিতে। অরবিন্দ দেখলেন কারাগারে। ওঁরা দেখলেন বিশ্ব চরাচরে। অরবিন্দ দেখলেন সারা কারাগার আর সন্নিহিত ঠাঁইয়ে। ‘সর্বৈব বাসুদেবম্‌।’ সেলময় কৃষ্ণের রূপ, নয়ন বদন বাহু বক্ষ, হাসি। সখ্য রসে দেখলেন। বলেছেন তো ‘সে বাহু আমার বন্ধুর’। বাসুদেব কেবলম্‌।

বৈদান্তিক সন্ন্যাসী ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকায় বলছেন, ‘অমল শুভ্র অরবিন্দ দেখিয়াছ কি? ভারত মানস সরোবরে প্রস্ফুটিত শতদল দেখিয়াছ? হৃদয়ের প্রসারতা বৃহৎ-স্বধর্ম মহিমায় মহৎ, …ইনি শ্রী অরবিন্দ।’

অরবিন্দের সাধনার নদীটি কৃষ্ণ করুণার সমুদ্রে মিশে গেছে। এই ভাবনায় রয়েছে মানবপ্রেম দেশপ্রেম এবং কৃষ্ণপ্রেম। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন বলেছেন, ‘অরবিন্দকে দেশ জানবে দেশপ্রেমের কবি, জাতীয়তার নবী আর বিশ্বমানবের প্রেমিক বলে।’


‘কামনার বিষদন্ত তোলা সাপুড়িয়ার সাপের মতো সে তখন জ্ঞানের কোলে খেলে।’ (গীতাধ্যান)। এভাবেই ভক্তিযোগের চরম মার্গে পৌঁছে ভগবান সামীপ্যে অরবিন্দের অবস্থান পাকাপোক্ত।

স্বাধীনতাকে তিনি মানুষের জীবনের সার্বিক কল্যাণের বিষয় বলে গ্রহণ করেছেন। ধর্মশূন্য স্বাধীনতা তাঁর কাছে মূল্যহীন। স্ত্রীকে একটি পত্রে বলেছেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মধ্যে যদি আধ্যাত্মিকতা জেগে না ওঠে, তবে সে স্বাধীনতা মূল্যহীন। প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের জীবন দর্শনেও তাইই। বলেছেন, ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পাবে। কিন্তু তা রক্ষার জন্য ব্রহ্মচর্য আর আধ্যাত্মিক জীবন অপরিহার্য। তা নইলে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা দুরূহ। অরবিন্দের অমৃতময় চিরঅমর ‘সাবিত্রী’ কাব্যে ধর্মদর্শন অতুলনীয়। কর্মযোগ দিয়ে তিনি অহংকে বিনাশ করেছেন। এবং তাতে ব্রহ্মলাভ করেছেন। এই কর্মযোগের সঙ্গে মিশেল রয়েছে জ্ঞানযোগ। এই দুয়ের সম্মিলনের ফলে ভক্তবর অরবিন্দের কর্ম একেবারেই কামনাশূন্য। এই তত্ত্বটিকে মহানামব্রতজি আশ্চর্য অনুভবে প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘কামনার বিষদন্ত তোলা সাপুড়িয়ার সাপের মতো সে তখন জ্ঞানের কোলে খেলে।’ (গীতাধ্যান)। এভাবেই ভক্তিযোগের চরম মার্গে পৌঁছে ভগবান সামীপ্যে অরবিন্দের অবস্থান পাকাপোক্ত।

গীতায় অর্জুনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘ময্যাবেশ্য মনো যে সাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।শ্রদ্ধয়া পরযোপেতান্তে সে যুক্ততমা মতাঃ।।’

অর্থাৎ, যাঁরা সম্পূর্ণভাবেই আমাতেই মন নিবিষ্ট করে। নিত্য যুক্ত হয়ে পরম শ্রদ্ধাভরে আমার উপাসনা করে, তাঁরা আমার শ্রেষ্ঠ সাধক। ভক্তের পরম ঈশ্বর প্রেম, ঈশ্বর ধ্যান এবং ভগবানের এই প্রিয়ত্বের যোগফলেই তো কারাগার বাসুদেবময় কৃষ্ণময়। ভাবতে হয়, কারাগারে কৃষ্ণের জন্ম, আবার কারাগারেই কৃষ্ণপ্রাপ্তি অরবিন্দের।

প্রসঙ্গত বলা যায়, বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকতা তো জীবনের এক প্রধানতম সম্পদ বটেই। কিন্তু রাজনীতিক আদর্শ প্রসঙ্গেও অরবিন্দ’র চিন্তাধারা ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে বিজড়িত। তাঁর মতে ভ্রাতৃত্বের ওপর সাম্য প্রতিষ্ঠা না করে সাম্যের উপর ভ্রাতৃত্ব নয়। বরং ভ্রাতৃত্বই সাম্যের ভিত্তিভূমি হওয়া উচিত। ভ্রাতৃত্বকে গৌণ করে সাম্য সাম্য করলে ব্যর্থতা অনিবার্য। ভক্তিতে পূর্ণ সাম্যের মধ্যে বিশ্বপ্রেমের সার্থকতা। তখনই বিশ্ব হয়ে ওঠে স্বর্গতুল্য। এই বিশ্বপ্রেমে আধ্যাত্মিকতার সিঞ্চনে জীবনের সিদ্ধি ঘটে। ‘The Hour of God’ গ্রন্থে অরবিন্দ বলেছেন, ‘The animal soul fulfills itself when if transcends animality and becomes human. Humanity also fulfills itself when if transecnds humanity and becomes God.’ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির Aristocratic ধারাকে Democratic পর্বে এনে মানবকল্যাণে ‘বহুজন হিতায়ঃ বহুজন সুখায়’ করে তুলতে পারলেই পূর্ণ আধ্যাত্মিক কল্যাণ সম্ভব। (মোঃ মতিউর রহমানের বিশ্লেষণ অহনা) অরবিন্দের জীবনে পাঁচটি স্বপ্ন ছিল। রাজনীতি বা সমাজনীতি ছাড়া চতুর্থ স্বপ্নটি ছিল, ভারতে আধ্যাত্মিকতার পুনরুজ্জীবন এবং সেটা ছাড়া পঞ্চম স্বপ্নটি ছিল মানব চেতনার বিবর্তনে একটি নতুন পদক্ষেপ।

মনের ঊর্ধ্বে সত্য চেতনায় এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ। ভারতের বহু দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী তাতে সাড়াও দিয়েছেন। স্যার আর্থার এডিংটন, জেমস জিনস, আইনস্টাইন প্রমুখ এই মতের অনুসারী। পণ্ডিচেরির অরবিন্দ সোসাইটির সম্পাদক গোপাল ভট্টাচার্য অরবিন্দের দর্শন সম্পর্কে এমনটাই গবেষণা করেছেন।

‘সাবিত্রী’ কাব্যে অরবিন্দর দিব্যজীবন ভাবনা সম্বন্ধে যা দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে মনের ঊর্ধ্বে সত্য চেতনায় পৌঁছনোর বিষয়টির ক্রমান্বয় পাওয়া যায়। ‘সাবিত্রী’তে তিনি বলেছেন,

‘অজ্ঞানের সীমানা দূরে সরে যাবে,

জীবেরা আলোর মধ্যে প্রবেশ করবে ক্রমবর্ধিত সংখ্যায়,
প্রকৃতি তার জীবন যাপন করবে গুপ্ত ভগবানকে ব্যক্ত করবার জন্য
চিন্ময় পুরুষই মানুষী লীলার ভার গ্রহণ করবে,
এই পার্থিব জীবনই হয়ে উঠবে দিব্যজীবন।’

তথ্যসূত্র: মহানামব্রতজির ও মহানামব্রতের প্রবন্ধাবলী।
ঋণস্বীকার : বর্তমান পত্রিকার জন্য লেখেছেন চিদানন্দ গোস্বামী।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!