ভবঘুরে কথা
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

-নূর মোহাম্মদ মিলু

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৌরবের দীপ্তিময় এক নক্ষত্রের নাম সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ৪৭তম মহা প্রয়াণ দিবস। ১৯৭২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার(বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া) নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামে। অন্যদিকে ২ সেপ্টেম্বর আলাউদ্দিন খাঁর ছোট ভাই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়েত খাঁর প্রয়াণ দিবস। সুরের রাজ্যে আলাউদ্দিন খাঁ কিংবদন্তীর এক সম্রাট। তাঁর জীবন ও সুরের সাধনা এক বিস্ময়কর গল্প। সুরের জন্য এতো ত্যাগ! এতো কষ্ট! এতো ধৈর্য্য! যে তা শুনলেও বিশ্বাস করা কঠিন। এসব সত্য কাহিনী গল্পের মতো প্রচলিত। সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে উপমহাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে সব সঙ্গীতজ্ঞ সমীহের সাথে তাঁর নামটিও উচ্চারিত হয়। তিনি তাঁর সুরের রাজ্যে দীক্ষাগ্রহণের মধ্য দিয়ে চরম দুরবস্থা, আর্থিক কষ্ট, বেঁচে থাকার কষ্ট সব সহ্য করে এক অসীম অধ্যবসায় নিয়ে অসাধ্য সাধন করেছিলেন। 

পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ। সঙ্গীতে উচ্চতর শিক্ষা ও অধিক জানার অসম্ভব তৃষ্ণায় তিনি বাড়ি ছাড়েন। তাঁর পিতার নাম সবদর হোসেন খান; ওরফে সদু খাঁ। বাল্যকালেই তিনি তাঁর পিতার কাছেই সেতারে হাতেখড়ি নেন। পরে বড়ভাই সাধক ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ’র কাছে তালিম নেন, আলাউদ্দিন খাঁর  শৈশব থেকে গ্রাম-বাংলার লোকজ সঙ্গীত ও লোক সুর আকৃষ্ট হন। গ্রামীন জীবনে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাউল সুর, ভাটিয়ালী, জারি আর সারি গান তাঁকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া গ্রামের কীর্তন, পীরের পাঁচালী, ধর্মসংগীতের প্রতি আগ্রহও তাঁর জীবনে প্রভাবক ভূমিকা রাখে। সুতরাং গ্রামীন জীবন, গ্রামের প্রকৃতি, লোক গান আর তাঁর পারিবারিক পরিবেশ তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রতি প্রণোদিত করে একথা নি:সন্দেহে বলা যায়। যাত্রাদলের প্রতি ছিল আলাউদ্দিন খাঁর বিশেষ আকর্ষণ। সুরের নেশায় যাত্রা দলের সাথে তিনি একসময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। 

তিনি এই বেরিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে সন্ধান করতে শুরু করেন উপযুক্ত সঙ্গীত গুরুর। এই সন্ধানা করতে করতেই তিনি পৌঁছে যান কোলকাতা শহরে। তিনি শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করেন একজন ওস্তাদকে। তিনি ওস্তাদের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করার চিন্তা করলেও মুসলমান বলে যদি তাঁকে শিষ্য করেন এই ভাবনায় তিনি হিন্দু নাম গ্রহণ করে ঐ ওস্তাদের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। এভাবেই কেটে যায় একটানা ৭ বছর। এসময় বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না তাঁর। বাড়িতে উৎকণ্ঠা পরিবারের সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বালক ছেলেটি বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গেলো। তারা বালক আলাউদ্দিনের খোঁজই পাচ্ছিলেন না। বড় ভাই কোলকাতায় গিয়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর খুঁজে বের করেন ছোট ভাইকে। তিনি সাথে করে বাড়ি নিয়ে এলেন আলাউদ্দিনকে। তখন পরিবার সিদ্ধান্ত নেন তাঁকে ঘরমুখো করার জন্য বিয়ে করিয়ে দিতে হবে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়েও করানো হয়। কিন্তু বিয়ের রাতেই পালালেন আলাউদ্দিন। আবার নিরুদ্দেশ; এ শুধু সঙ্গীতের টানে। 

শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে এরপর ছুটে চললেন বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে। কোলকাতায় যাদের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন তাঁরা হলেন হাবু দত্ত, নুলো গোপাল, ওস্তাদ আয়েত আলী খান উল্লেখযোগ্য। এই সকল ওস্তাদদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করলেও সঙ্গীতের তৃষ্ণা তাঁর থেকেই যায়। তাঁর ইচ্ছে ছিলো ভারতের বিখ্যাত গায়ক তানসেনের বংশধর ওস্তাদ ওয়াজির খানের শিষ্যত্ব নেয়া। ওয়াজির খানের শিষ্যত্বের সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। ওয়াজির খান ছিলেন মধ্য ভারতের রামপুর রাজ্যের নবাবের দরবারি গায়ক। মাস-বছর চলে যায় আলাউদ্দিন খাঁ ওয়াজির খানের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগই বের করতে পারলেন না। এমনকি নিজের ইচ্ছের কথাটাও জানাতে পারলেন না। বন্ধুদের আলোচনায় বুঝলেন নবাবের নির্দেশ পেলে হয়ত ওয়াজির খান তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। নবাবের সাথে দেখা করে কথাটা বলার সুযোগ না পেয়ে একদিন নবাবের গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পরলেন। রাস্তায় হৈ চৈ-সোরগোল শুরু হয়ে গেলে নবাব তাঁকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন। দরবারে গিয়ে যুবক আলাউদ্দিন তাঁর মনের কথা খুলে বললেন নবাবকে। নবাব সঙ্গীত অনুরাগী ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। দরবারে ছিল অনেক বাদ্যযন্ত্র। পরীক্ষা দিতে হবে এসব বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে আলাউদ্দিন খাঁ এসব বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সবাইকে অবাক করে দিলেন। গানের প্রতি, শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ দেখে সবাই বিস্মিত। তাঁর বাজনায় সবাই মুগ্ধ। মুগ্ধ নবাব, মুগ্ধ ওস্তাদ ওয়াজির খানও। এভাবে ওয়াজির খানের কাছে তাঁর সঙ্গীতের নতুন শিক্ষা শুরু হলো। 

এদিকে নবীনগরে তাঁর বাড়িতে নিরুদ্দেশ ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সেই যে বিয়ের রাতে পালিয়ে গেল আর তাঁর সন্ধান পায়নি স্ত্রী মদিনা। বাপের বাড়িতে বছরের পর বছর কেটে গেল স্বামীর সন্ধান নেই। এক অনিশ্চয়তা, অজানা আশংকা, হয়তো আলাউদ্দিন মারা গেছে আর ফিরে আসবে না। এ ভয়, এ শংকা কাটাবার জন্য আলাউদ্দিন খাঁর স্ত্রী মদিনা বাপের বাড়িতে না বলে একদিন শ্বশুড় বাড়ি চলে আসেন। কিন্তু সেখানে শাশুড়ি ছাড়া স্বামীর কোন খবর পাওয়া যায়নি। চরম হতাশার মধ্যে মদিনার চরম ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় কিন্তু ধরা পড়ে সে যাত্রায় বেঁচে যান। পরে আলাউদ্দিন খাঁর বড় ভাইকে আবার পাঠানো হয় কোলকাতায়। তিনি সেখানে খুঁজতে খুঁজতে রামপুরের সন্ধান পান ছোট ভাইয়ের। খবর পাঠানো হয় রামপুরে। আলাউদ্দিন খাঁ মায়ের খবর পেয়ে বহুবছর পর ফিরে আসেন বাড়িতে। মায়ের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চান। মা তার অতি স্নেহের  আলমকে ক্ষমা করে দেন। উল্লেখ্য আলাউদ্দিন খানের ডাক নাম ছিল আলম।

এরপরের ইতিহাস ভিন্ন। ১৯১৮ সালে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর নির্দেশে রামপুরের নবাব আলাউদ্দিন খাঁকে নিজ গুরুর পদে অভিষিক্ত করেন। ১৯২৬ সালে ওয়াজির খাঁর মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন খাঁ মাইহারে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। 

১৯৩৫ সালে তিনি উদয় শংকরের নৃত্য দলের সাথে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে পরিভ্রমণ করেন। তাঁর পরিবেশনায় শ্রোতারা মুগ্ধ হয়। ইংল্যান্ডের রাণী কর্তৃক সুর সম্রাট উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৫২ সালে তিনি সঙ্গীত আকাদেমি পুরষ্কার লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি সঙ্গীত আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় উপাধি ‘পদ্মভুষণ’ লাভ করেন। ১৯৬১ সালে বিশ্বভারতী তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

আলাউদ্দিন খাঁ জীবনের শেষ পর্যন্ত মাইহারে অবস্থান করেন। তাঁর স্ত্রীর নামে তাঁর বাড়ির নাম রাখেন মদিনা ভবন। তিনি জীবনের দীর্ঘসময় সঙ্গীত শিক্ষার কাজে যেমন ব্যয় করেন। নিজে শিক্ষাগ্রহণ করেন তেমনি দীর্ঘ দিন শিক্ষাদান করেন। তিনি সুর সাধন করে অগণিত রাগ সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন বাদ্যযন্ত্র। উচ্চাঙ্গ সুরের রাজ্যে তিনি মহা সম্রাটের মতো অধিষ্ঠিত ছিলেন। আর এভাবেই তিনি বিশ্বব্যাপী সুর সম্রাট। উপমসহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী তাঁর সম্মান ও মর্যাদাকে আরো সমুন্নত করেছেন। তাঁরা হলেন শবণরাণী, রবীন ঘোষ, শিশির কণা, নিখিল বন্দোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল, পান্নালাল ঘোষ, তিমির বরণ, অন্নপূর্ণা, রবিশংকর, বাহাদুর হোসেন খান, আলী আকবর খান প্রমুখ। 

বিশ্বজনীন খ্যাতিসম্পন্ন এ সঙ্গীত সম্রাট তৎকালীন কুমিল্লারই সন্তান। যদিও তাঁর বাড়ি বৃহত্তর কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লাতে তাঁর স্মরণে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল কিন্তু সেই নাম ফলকটি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তাঁকে-তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য অনেক কিছুই করা উচিৎ হলেও আজও তেমন কিছুই করা হয়নি। এ উদ্যোগ কুমিল্লাবাসীকিই নিতে হবে। অন্যদিকে তাঁর ছোট ভাই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর জীবনের শেষার্ধে আমৃত্যু কুমিল্লাতেই কাটিয়েছেন। তাঁর স্মরণেও একটি সড়কের নাম ছিল বলে জানা গেলেও তাও আজ হারিয়ে গেছে। তাঁকে কুমিল্লা নিউ হোস্টেল কবরস্থানে কবরস্থ করা হয়েছিল। যদিও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে সুর সম্রাট আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন রয়েছে, যেখানে শতশত শিশু এবং তরুণ-তরুণী সংগীতচর্চা করছে, এই তো সেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে সুর সম্রাট আলাউদ্দিন জাদুঘর তৈরি হয়েছে। তবে এখানেই শেষ হলে হবে না বাংলাদেশ সরকারকে আরো উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বর্তমান সময়ের তরুণ তরুণীরা এই মহান সুর স্রষ্ট সম্পর্কে জানতে পারে। মহাপ্রয়াণে এই সুর স্রষ্টাকে পরম শ্রদ্ধা ভক্তি নিবেদন করে শেষ করছি।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

২ Comments

  • কি সন্ধানে যাই সেখানে? – কে কি কেনো? , বুধবার সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৯ @ ৪:৩০ পূর্বাহ্ন

    […] এক সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সুরের টানে ঘর ছেড়ে কোলকাতায় গিয়ে নাম […]

  • কি সন্ধানে যাই সেখানে? – কে কি কেনো? , বৃহস্পতিবার সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯ @ ১:৪৬ পূর্বাহ্ন

    […] এক সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সুরের টানে ঘর ছেড়ে কোলকাতায় গিয়ে […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!