দাসের যোগ্য নই চরণে

-মূর্শেদূল মেরাজ

মাই ডিভাইন জার্নি : তের

ভদ্রলোক বললেন, ভাই আপনার গুরুপাঠ কোথায়?

আমি নিচুস্বরে বললাম, আমি দীক্ষা গ্রহণ করি নি।

ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে শোয়া থেকে খানিকটা উঠে বালিশে পিঠ দিয়ে আধা শোয়া ভঙ্গিতে বসলেন।

বাইরে কনকনে শীত। দেশে তখন মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে। বহু মানুষ শীতে কষ্ট করছে শীতবস্ত্রের অভাবে। তবে সাধুর বাড়িতে পর্যাপ্ত কাঁথা-কম্বল আছে। আর শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আমরাও কয়েক প্রস্থ গরম জামা গায়ে জড়িয়েই গেছি সাধুসঙ্গে।

ভদ্রলোক বৌ-বাচ্চা নিয়ে এসেছেন। তারা সকলে এতোক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। তখন অবশ্য শেষরাত। সাধুসঙ্গের ভাবসংগীত শেষ হওয়ার পর সাধুসেবা নিয়ে সকলে কাঁথা-কম্বলে মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে। চারপাশ থেকে বিচিত্র সব নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসছে।

ভদ্রলোক ফিসফিস গলায় আবার বললেন, “আপনি তো বহুদিন ধরে এই পথে আছেন, একজন গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে নিচ্ছেন না কেনো? সবকিছুরই তো একটা স্কুলিং আছে, তাই না? আপনি এমনি এমনি নিজের মতো করে পড়াশোনা করতেই পারেন।

কিন্তু একটা স্কুলে ভর্তি হলে, হবে কি সঠিক নিয়মে সব কিছু জানতে পারবেন। বুঝতে পারবেন। বিভিন্ন শিক্ষক পাবেন। অনেককিছু জানতে পারবেন। পাশাপাশি আপনার মতোই অনেককে পাবেন যারা আপনার সহপাঠি। তারা কি করে শিখছে-আপনি কি করে শিখছেন। সব দেখতে পাবেন, তাই না? কি বলেন? এটা ভালো হয় না?

সম্ভবত ভদ্রলোকেরও ঘুম আসছিল না। তার উপর আমার মতো মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে ভদ্রলোক আরো খানিকটা উঠে বসে নিচু স্বরে বলে চললো, এইরকম এ জগতটাও ভাই। এখানে এমনি এমনি ঘুরলে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন না। কেবল ঘুরতেই থাকবেন।

তারচেয়ে যদি কোনো একটা স্কুলে ভর্তি হয়ে যান। মানে কোনো গুরুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। তারপর ঘুরতে থাকেন। তখন দেখবেন আরো গভীর থেকে সব বুঝতে পারবেন। এই পথে অদ্ভুত কিছু মিস্ট্রি আছে। যা নিজ গুরু না থাকলে জানা যায় না। বোঝা যায় না। আপনি একজন গুরু ধরে ফেলেন। তারপর নিজের মতো ঘুরেন-জানেন। দেখবেন কত আনন্দ।”

শীতটা আরো বাড়ছিল। আখড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে সো সো করে বাতাস ঢুকছে। এতোগুলো পোশাকের উপর মোটা কম্বল দিয়েও শীতকে ঠিক বাগে আনা যাচ্ছে না। ডেকোরেটারের লোকজন আগেই কোথাও ঘুমিয়ে পরেছে। তাই আখড়ার ভেতরের বাড়তি বাতিগুলো আর নিভিয়ে দেয়া যায়নি। এই শেষ রাতেও তীব্র আলোতে আখড়া ঘরের ভেতরের কুয়াশার পাতলা আবরণটা বেশ চোখে পরছে।

আসলেই কি শীতের তীব্রতায় ঘুম আসছিল না, নাকি ভদ্রলোকের কথাগুলো ঘুমাতে দিচ্ছিল না তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আচ্ছা সকলকে কি স্কুলে পড়তেই হবে? সকলকে কি শিক্ষিত হতেই হবে?? আর যদি শিক্ষিত হতেই হয় তাহলে কি প্রথাগত স্কুলিং-এর ভেতর দিয়েই যেতে হবে??? কে এমন দিব্বি দিয়েছে? শিক্ষার মাধ্যম কি তবে এমনই??? এ পথে না গেলে কি শিক্ষিত হওয়া যাবে না?

কেবল যারা স্কুলে পড়বে তারাই কেবল শিক্ষিত হতে পারবে? যারা স্কুলে পড়বার সুযোগ পায় না বা নেয় না তারা কি জ্ঞানকে ধারণ করতে পারে না? পারবে না?? এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়েছি খেয়াল নেই। ঘুমের ভেতরেই গোষ্ঠ শুনছিলাম। কিন্তু তখনো সারা শরীরে ঘুমের আবেস। উঠে বসে গোষ্ঠলীলা শোনার ইচ্ছাটাকে দমন করে ঘুমের ঘোরেই শুনতে লাগলাম-

লয়ে গো ধন গোষ্ঠের কানন
চল গোকুল বিহারী
গোষ্ঠে চল হরি মুরালী।।

ওরে ও ভাই কেলে সোনা
চরণে নূপুরও নিনা,
মাথায় মোহনচূড়া দেনা
ধরা পড় বংশীধারী।।

তুই আমাদের সঙ্গে যাবি
বনফল সব খেতে পাবি,
আমরা মলে তুই বাঁচাবি
তাই তোকে সঙ্গে করি।।

যে তরাবে এ ত্রিভূবন
সেই যাবে গোষ্ঠের কানন,
ঠিকরে ভ্রমণ অভয় চরণ
লালন ঐ চরণের ভিখারী।।

তবে গোষ্ঠগানের একটা অদ্ভুত গুপ্ত লীলা আছে। তা অবশ্য ভক্ত ভিন্ন অন্যত্র প্রকাশ্যে বলা চলে না। সে সব গভীরের কথা বাদ দিলেও গোষ্ঠ তার জাগরনিয়া সুরে ঠিকই ভোর ভোর ঘুম ভাঙ্গিয়ে উঠিয়ে বসায়। কি আর করা। অগত্যা ঘুম ঘুম চোখে সকলের পাশে আমিও গোল হয়ে বসে পরলাম।

সাধুরা এর মাঝেই উঠে পরিপাটি হয়ে নিয়েছে। গান করছেন কুষ্টিয়ার প্রাগপুরের নহির ফকির। তাকে ঘিরে বসেছেন মোকারম ফকির, মাহতাব ফকির, রওশন ফকির, সামুসল ফকির, বুড়ি মা সহ আরো বেশ কয়েকজন সাধুগুরু।

সাধুগুরুরা যখন গোষ্ঠ গান করেন তখন তাদের মধ্যে একটা ঔজ্জ্বল্য ধরা দেয় তাদের কণ্ঠে-বদনে-সাধুসঙ্গে সর্বত্র। অধিবাস, সন্ধ্যা নিবেদন আর গোষ্ঠ গানের সময় সাধুদেরকে আমি নতুন করে চিনতে শুরু করি। আমার কেনো যেন মনে হয় লালন ঘরের কোনো সাধুগুরুকে গভীরভাবে বুঝতে গেলে এই সময়কালগুলোতে সাধুগুরুদের লক্ষ্য করাটা জরুরী। এইসময় তাদের ভক্তিভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকাশ পায় সাধারণের মাঝে।

একই শীতে আরেকটা সাধুসঙ্গে গেছি। অপূর্ব পরিবেশে সন্ধ্যা থেকে টানা গান চলছে। প্রহর বিবেচনায় গানের ধরণ পাল্টাচ্ছে। যা আজকাল অনেক সাধুসঙ্গেতেই তেমনভাবে পাওয়া যায় না। এই সাধুসঙ্গে থাকতে পেরে অন্যরকম একটা ভালো লাগাও তৈরি হচ্ছিল।

সেই গত সন্ধ্যায় শুরু হওয়া গান চলতে চলতে রাত পেরিয়ে মাথার সূর্য যখন মধ্য গগনে; তখন আর গান কেনো যেন নিতে পারছিলাম না। ভালো জিনিস যতই ভালো হোক তারও একটা বিরতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আয়োজকরা সেটা মাথায় রাখেনি।

তারা টানা গান মঞ্চায়ন করেই চলেছেন। গানের ভাব খুবই ভালো হচ্ছে। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ধারণ ক্ষমতারও তো একটা সীমা আছে। যখন মাথায় আর কোনোভাবেই গান ভাব তৈরি করতে পারছিল না। তখন হাঁটতে বের হলাম।

শীতের দুপুরে রোদ রোদ ভাব থাকলেও ঠাণ্ডাটা নেহাত কম না তখনো। আখড়া থেকে বের হয়ে ডান পাশের মাটির পথটা ধরলাম। খানিকটা এগিয়ে যেতেই একজন পৌর ভদ্রলোক এগিয়ে এসে হাসি হাসি মুখে কথা জুড়ে দিলো। দু’জনে পাশাপাশি হাঁটছি।

ভাববাদ নিয়ে উনার অগাধ জ্ঞান সেটা বোঝা গেল অল্প সময়ের মধ্যেই। মাঝেমধ্যেই আমার বেশ আশ্চর্য লাগে কি অসামান্য জ্ঞান নিয়ে গ্রামের এই সব মানুষজন সাধারণের মাঝে মিশে থাকে। কিন্তু আমরা শহুরে মানুষরা দুই/এক পাতা পড়েই এমন একটা ভাব নিয়ে পা ফেলি; যাতে করে মাটিও লজ্জা পায়। যাক সে কথা।

ভদ্রলোক বেশ রসিক। আলাপ জনমে সময় লাগলো না। জানা গেল উনি নকশাবন্দীয়া তরিকায় দীক্ষিত। পাশের গ্রামেই বাড়ি। কথায় কথায় অনেক কথাই হলো। আরো ভালো করে বলতে গেলে বলা যায় তিনি বলে যাচ্ছিলেন আমি শুনে যাচ্ছিলাম। এভাবে ভালোই চলছিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো এসে গোষ্ঠ গানে।

উনি যখন বলছিলেন গোষ্ঠ গানের কোনো মানে নেই; এর কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই। এতে কোনো ভাব নেই। এসব লালন ফকিরসহ আরো অনেক সাধকই লিখেছেন কৃষ্ণের ভূমিকায় বসে। কখনো লিখেছেন যশোধার ভূমিকায় বসে। এসব কেবলই ঘটনা। গোষ্ঠ গানে সাধকরা কেবল ঘটনার বর্ণনা করে গেছেন। এর কোনো গুরুত্বই নেই।

এখনকার আমি তর্ক করার লোক না। তারপরও বললাম, সাধু আমি বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখি। ফকির লালনকে নয় গোটা ভাববাদকে বুঝতে গেলেই স্থূলদেশ পদকে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই স্থুল-প্রবর্ত্য ভাবগান বুঝতে বুঝতেই নিজের মধ্যে সমর্পণ ভাব জাগাতে হয়।

হৃদমাজারে সমর্পণভাব জাগলেই শূন্যবাদ বুঝতে সহজ হয়। আর শূন্যবাদকে বুঝে সাধনায় এগুতে গেলে গোষ্ঠ বোঝা জরুরী। এই গোষ্ঠগানের মাঝে লুকিয়ে আছে অনন্তের লীলা। যে ডুবে সেই বুঝতে পারে।

কিন্তু তিনি যেন পণ করছেন কোনোভাবেই আমার কথা মানবেন না। আমি অবশ্য গোয়ার্তুমি করছিলাম না। কিন্তু তিনি এমনভাবে গোষ্ঠকে বারবার অবজ্ঞা করায় আমার মাঝে তার সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ ঢুকে যাচ্ছিল। সন্দেহ ভাবটা মনে আসতেই নিজে নিজেই আৎকে উঠলাম। না ভাবনার গতিপথকে পাল্টাতে হবে। সন্দেহ নিয়ে শোনা যাবে না। দেখি না তিনি কিভাবে ভাবছেন। সেটা ধরার চেষ্টা করাই বরং ভালো। তাই সে ভাবনাটাকে পাশ কাটিয়ে তার কথা শুনতে মন দেবার চেষ্টা করলাম।

তবে একটা বিষয় বরাবরের মতোই আমাকে আবারো বেশ হতাশ করলো। যতক্ষণ আমি উনার কথা কোনো প্রতিবাদ না করে শুনছিলাম, ততক্ষণ উনি বেশ আগ্রহ নিয়ে বলছিলেন। কিন্তু আমি আমার একটা মতামত পোষণ করায় বিষয়টা তিনি কোনোভাবেই যেন নিতে পারছেন না।

মনে হচ্ছিল সে কারণেই তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার গোষ্ঠকে কি করে ছোট করা যায়, কি করে তুচ্ছ করা যায় বা আমার ভাবনাকে কি করে তুচ্ছ প্রমাণ করা যায় সে চেষ্টায় রত থাকলেন। আমি বারকয়েক কথা ঘুরাতে চাইলেও তিনি বেশ সচেতনভাবেই সেই কথাতেই ফিরতে চাচ্ছিলেন।

আমি বুঝছিলাম তার সাথে আর আলোচনা জমবে না। হয়তো উনিও বুঝেছেন ততক্ষণে। তাই হয়তো দুজনেই কথার ফাঁকে আখড়ার দিকে হাঁটা দিলাম। আসলে জ্ঞান সাধকদের এই এক সমস্যা। জ্ঞান অর্জন সাধককে গর্বিত করে তুলে। মনে জন্মায় অহঙ্কার-গড়িমা। যে জ্ঞান সাধকরা গড়িমাকে কাটিয়ে সাধনায় এগুতে পারে তারাই প্রজ্ঞার পথে হাঁটতে পারে। নইলে গড়িমা নিয়েই থমকে থাকতে হয়।

আর যারা এই থমকে থাকার দলে তারা জ্ঞানের গড়িমায় মেনে নিতেই পারে না, তারচেয়ে আরেকটু গভীরে কেউ ভাবতে পারে। বা ভাবনার আরেকটা প্রান্তও থাকতে পারে। এই গড়িমাই জ্ঞানের অন্তরায়। আর মজার বিষয় হলো জ্ঞান হলে তা জাহির করার গড়িমা জন্মাবেই।

তবে সিদ্ধ সাধকরা যারা সংখ্যায় খুবই কম তারাই এই গড়িমাকে পাশ কাটিয়ে জ্ঞানকে এগিয়ে নিতে পারে। তাদের মধ্যেই নমনীয়তা আসে-কোমলতা আসে। তাদের চোখে জ্ঞানের উজ্জ্বল্যের আভা থাকলেও অহঙ্কার প্রকাশ পায় না।

সাধকদের মাঝে এই গড়িমা ভাব বড়ই ভয়ঙ্কর। এতে সাধকের পথ রুদ্ধ হয়। জ্ঞানের সন্ধান হলো আলোর যাত্রা। এখানে থমকে গেলে জ্ঞানের প্রকাশ-বিকাশের পরিবর্তে অন্ধকার বাসা বাঁধে।

জ্ঞানকেও পরিচর্যা করতে হয়। লালন-পালন করতে হয়। ঘষেমেজে চকচক করে রাখতে হয়। তাকে খাঁচায় পুরে রাখলে বা মাঁচায় তুলে রাখলে তাতে কেবল ধুলোই জমে আলো ছড়ায় না। সাঁইজি বলেছেন-

বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা
আর এক কানা মন আমার।
এসব দেখি কানার হাট বাজার।।

এক কানা কয় আর এক কানারে
চল এবার ভবো পারে,
নিজে কানা পথ চেনে না
পরকে ডাকে বারং বার।।

পণ্ডিত কানা অহংকারে
মোড়ল কানা চোগলখোরে,
আন্দাজে এক খুঁটি গাড়ে
জানে না সীমানা কার।।

কানায় কানায় ওলামেলা
বোবাতে খায় রসগোল্লা,
তেমনি লালন মদনা কানা
ঘুমের ঘোরে দেয় বাহার।।

পরিতাপের বিষয় হলো বেশিভাগ মানুষই জ্ঞান অর্জন করে লোকের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বা জয়ী হওয়ার জন্য-অহমিকা প্রকাশের জন্য। খুব অল্প মানুষই জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে জানার জন্য-জগতে জানার জন্য। নিজেকে জানবার মধ্য দিয়ে বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডকে জানবার যে জ্ঞানের পথ তা সকল সময়ই ভক্তি ও শ্রদ্ধার মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয়। মাথা নোয়াতে না জানলে সেই জ্ঞান ধরা দেয় না বলেই সাধককুল বলেন।

সম্পূর্ণ বিপরীত হলেও একথা সত্য যে, জ্ঞানের সাথে অর্থ-সম্পদের একটা অন্তমিল রয়েছে। জ্ঞান অর্জনের মতো বেশিভাগ মানুষই ধনসম্পদ জড়ো করে অন্যকে দেখিয়ে বেড়াবার জন্য। গুটিকয়েক মানুষই অর্থ-সম্পদ উপার্জন করে জীবের সেবার জন্য-জগতের সেবার জন্য। যাতে করে ভালো থাকবে সকলে।

আসলে জীবনে যা কিছু উপার্জন তা দেখিয়ে বেড়াবার জন্য নয়, তা অনুভব করার। কাউকে কিচ্ছু প্রমাণ করার দায় নেই কারো। প্রমাণ করতে গেলেই গোলে পরতে হয়। মানুষ্য রূপে জন্ম নেয়ার মূল সত্যকে পাশ কাটিয়ে উদ্ভ্রাণ্ডের মতো দিনাতিপাত করতে হয়।

এই রহস্যে ঘেরা বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের রহস্যকে বুঝতে না পারলে-ধরতে না পারলে-তাকে অনুভব করতে না পারলে ; এই যাপিত জীবনের যে বৃহৎ সত্য তা ছুঁয়ে দেখা হয় না। আর তা না করা গেলে জীবনের প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলে না কখনো। হাহাকারটা টেনে যেতে হয় আমৃত্যু।

জ্ঞান বা অর্থ যেটাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য করুক না কেনো মানুষ যদি সে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে না পারে। মানুষ রূপে কেনো জন্মেছে এই ভেদের কথা জানার আগ্রহ যদি অর্জিত করতে না পারে তাহলে সকলই মুখ থুবড়ে পরে সাধন পথে। অর্থ উপার্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এই বিষয়টা কয়েক দশক আগেও বাংলা অঞ্চলে সর্বময় প্রতিষ্ঠিত ছিল না।

সমাজে যারা এ পথে ছুটতো মানুষ তাদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিতো না। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে এখন তারাই হয়ে উঠেছে সমাজের সংখ্যাগুরু। আমরা যখন পুরান ঢাকায় বড় হয়ে উঠছিলাম তখনো এইরকম চিত্র আমরা দেখতে পাইনি। অন্তত আমি দেখিনি।

তখন কিন্ডারগার্টেনে পড়ি। যতদূর মনে পরে ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে ধনী পরিবারের সন্তান ছিল রাহি আর সজল। তাদের ছিল বিশাল বাগান বাড়ি-দামী গাড়ি আরো কতো কি। এই যে তাদের এতো ঐশ্বর্য তা যেন কোনোভাবেই প্রকাশ না পায় তা নিয়ে তারা সকল সময়ই ব্যতিব্যস্ত থাকতো। এই ধনসম্পদের কারণে সবসময়ই কেমন যেন একটা সংকোচ কাজ করতো তাদের মাঝে।

স্কুল থেকে অনেক দূরে একটু আড়ালে তাদের গাড়ি অপেক্ষা করতো তাদের জন্য। আমাদের সাথে হেঁটে হেঁটে অনেকটা দূর আসতো রাহি। সজলের বাড়ি ছিল আমাদের বাসার উল্টো দিকে। অনেকটা পথে এসে আমরা যারা সোজা চলে আসবো রাহি আমাদের বিদায় দিয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতো। তারপর গাড়িতে গিয়ে উঠতো।

পুরান ঢাকার চিত্রটা আমাদের ছোটবেলায় এমনটাই ছিল। ধনী-দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান ছিল সত্য। কিন্তু তাতে দারিদ্রতাকে অবজ্ঞা করা হতো না। ধনীরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে সর্বক্ষণ তা দেখিয়ে বেড়াতো না তার অর্থ-বৃত্ত আছে। বরং তারা তা লুকিয়ে রাখতে চাইতো। যাতে সম্পর্ক সহজ থাকে।

কোরবানী ঈদের সময় বিশাল আকারের পশু যারা কিনতো তারা আবার যারা কয়েকজন মিলে ভাগে যে কোরবানী দিতো তাদের সাথে ভাগ বসাতো। আমরা তখন সেসব বুঝতাম না। পরে বুঝেছি তারা সামাজিক পারস্পরিক সম্পর্ককে অনেকবেশি মূল্য দিতো। আমার অনেক আছে তা আমি দেখিয়ে বেড়াবো এটা তারা সেভাবে ভাবতোই না। বরঞ্চ পরিবারের ছোটদের শেখাতো যাতে তারা বাড়াবাড়ি না করে ফেলে।

সমাজের বৈষম্য যাতে দৃশ্যমান না হয় তার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য কত কি যে বাঙালী করতো তার হিসেব দিতে বসলে এই লেখার গতিপথ পাল্টে যাবে। এই বাঙালী আর সেই বাঙালীকে মেলানো মুশকিল হয়ে যাবে। যাক সে কথা। মোদ্দা কথা হলো- অর্থ-বিত্ত বা জ্ঞান তা কেবল অর্জন করলেই হয় না। তার ব্যবহারবিধিও জানতে হয়। অল্প বিদ্যা যেমন ভয়ংকরী-নব্য ধন-সম্পদও তেমনি প্রলয়ংকারী। সাঁইজি বলেছেন-

অজান খবর না জানিলে কিসের ফকিরি।
যে নূরে নূর নবী আমার
তাহে আরশ বাড়ি।।

বলব কি সে- নূরের ধারা
নূরেতে নূর আছে ঘেরা,
ধরতে গেলে না যায় ধরা
যৈছেরে বিজরি।।

মূলাধারের মূল সেহি নূর
নূরের ভেদ অকূল সমুদ্দুর,
যার হয়েছে প্রেমের অঙ্কুর
ঝলক দিচ্ছে তারি।।

সিরাজ সাঁই বলে রে লালন
করগে আপন দেহের বলন,
নূরে নীরে করে মিলন
থাক রে নেহারি।।

গত শীতেরই কথা। সাধুসঙ্গ যাব বলে বের হয়েছি। কিন্তু শীতের দিন টুপ করে কখন যে ডুব দেয় সূর্য তার হিসেব রাখা মুশকিল। বাস-লঞ্চ-রেল-বাস করে এগিয়ে যেতে যেতে দিন প্রায় শেষের দিকে। যদিও হিসেব ছিল সন্ধ্যার আগেই পৌঁছাবো। কিন্তু পথের কথা কি আর আগে থেকে বলা যায়?

বাস থেকে নামতে নামতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের দিকে যাত্রা করেছে সময়চক্র। অন্ধকারের মাঝে আমাকে একা নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেছে। একমাত্র খোলা দোকানে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। সেখানে দুই একজন বসে আড্ডা দিচ্ছে। একপাশে একমাত্র রিকসা ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। অনেকদূরে যেতে হবে। তার উপর রাস্তা খুবই খারাপ। তাই সন্ধ্যা হলে এই পথে কোনো ভ্যান যেতে চায় না।

অমাবস্যার অন্ধকার রাতে এই পথে যাওয়ার জন্য ভ্যানচালককে রাজি করানো সহজ হবে না মোটেও। অনেকটা পথ এই অন্ধকারে হেঁটেও যাওয়া সম্ভব হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে তিন দিকে খোলা ছোট্ট দোকানখানার দিকে এগিয়ে গেলাম। দোকানীর সাথে আলাপ করতে যেয়ে জানতে পারলাম দোকানের অন্ধকার কোণে বেঞ্চিতে বসে থাকা প্রথমজনই ভ্যানচালক।

অনেক বলে কয়ে কয়েকগুণ ভাড়া দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি করানো গেলো। এতে অবশ্য আমার চেয়ে দোকানীই বিশেষ ভূমিকা রাখলেন। তারপরও চালক গাইগুই করতে লাগলেন। এই ভাঙ্গা রাস্তায় রাতে ভ্যান চালাতে কষ্ট হয়; সময়ও অনেক লাগে। তার এখন বাড়ি যাওয়ার সময়। তাকে আবার পুরোটা পথ একা ফিরতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভালোই ক্ষিদে লেগেছে ততক্ষণে। মনে পরলো সারাদিন তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। সেই দোকান থেকেই কয়েক টাকার ছোলা কিনে চালকের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে পরলাম। ঘন অন্ধাকার পথ ধরে ভ্যান চলতে শুরু করলো।

শীত শীত ভাবটা ক্রমশ বাড়ছে। ভ্যান চালকের সাথে আড্ডা জমাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু ভদ্রলোক বড্ড বেশি বেরসিক। জবাবে কেবল উত্তর দিয়ে থেমে যায়। ভ্যানের হেডলাইটের আলোটা বেশ দুর্বল তাই এই ভাঙ্গাচূড়া রাস্তায় এগিয়ে যেতে আরো সময় লাগছে। বুঝলাম চালকও নতুন। কিছুতেই সে জোড়ে টানবে না। তাতে গাড়ির ক্ষতি হবে।

কিছুটা এগিয়ে একটা বাঁক ঘুরতে একজন সাইকেল চালককে পাশে পাওয়া গেলো। তার টর্চের আলোটা অনেক বেশি তীব্র। আমাদের চলতে সাহায্য হলো। সাইকেল চালক ভ্যান চালকের পরিচিত। তাদের কথা শুনে তাই মনে হলো। খানিকটা এগিয়ে ভ্যানচালক আমাকে দেখিয়ে সাইকেলওয়ালাকে বললো, ভাইজান ফকির বাড়িতে যাইবো, সেইখানে নাকি গান আছে রাতে। যাবি নাকি?

এই কথা শোনা মাত্র সাইকেলচালক দূরত্ব কমিয়ে ভ্যানের পাশে পাশে চলতে শুরু করলো। এবার ভদ্রলোক স্পষ্ট হলো। এতোক্ষণ কেবল কণ্ঠস্বর শুনছিলাম। বয়স বেশি হবে না। ছিপছিপে গড়ন। কথার ফাঁকে ফাঁকে রাস্তায় পানের পিক ফেলছে বেশ শব্দ করে। পাশাপাশি এসে চোখ বড় বড় করে আমাকে এক ঝলকে দেখে নিয়ে বলতে শুরু করলো, ভাইজান কি ফকিরের ভক্ত নাকি? আমি বললাম, গান শুনতে যাচ্ছি ভাই।

উনি এবার একটু গম্ভীর স্বরে বললেন, আপনারা শহরের শিক্ষিত মানুষ। আপনারা যে কেন ফকিরের আখড়ায় যান মাথায় ধরে না। এই সব ফকির-ফাকরার আখড়ায় কি ভদ্রলোকে যায়? আপনারা শহরের শিক্ষিত মানুষ হয়ে কেন যে এই সব করেন, বলেন তো?

তিনি বলেই চলছেন। ভদ্রলোক সূক্ষ্মভাবে আমাকে অপমান করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফকিরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেই যাচ্ছেন। তার কথা শুরুর কয়েক মুর্হূত পরেই মনের ভেতর একটা দাগা লেগেছিল। কয়েক বছর আগে হলে হয়তো ভদ্রলোককে কয়েক কথা শুনিয়েও দিতাম। তর্ক হতো।

কিন্তু আমি সেপথে গেলাম না। নিরবে শুনতে লাগলাম। সে ধরেই নিয়েছে আমি শহুরে শিক্ষিত মানুষ-ভদ্র লোক। ওকে কে বোঝাবে শহরে থাকলেই সকলে শিক্ষিত হয় না। আর আমি যে শহুরে মানুষ তাই বা সে ভাবছে কি করে? আমার এই পোশাক দেখে? আমার সস্তা দামের পোশাকও কি তবে আমার সাথে প্রতারণা করেই চলছে?

এই পোশাক আমাকে শহুরে শিক্ষিত প্রমাণ করছে? আবারো হাসলাম মনে মনে। নাহ্ শেখ সাদীর সেই পোশাকী গল্প মনে করে না। এখনো আমি এই সব শহুরে পোশাক ছাড়তে পারি নি সেটা ভেবে নিজেই নিজেকে উপহাস করে হাসলাম।

হাসিটা সম্ভবত একটু জোড়ে হয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোক সম্ভবত তাতে কিছুটা আহত হলেন। গলার স্বর বাড়িয়ে কি সব যেন বলতে লাগলো। আমার কানে সেসব পৌঁছাচ্ছিল না। আমি ভাবছিলাম। আমি ফকির বাড়িতে যাচ্ছি তাই মানুষের এতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য। আর যে ফকির হয়ে বসেছে এই এলাকায় তাকে কতই না অপমান সহ্য করতে হয়েছে।

কখন যে সেই সাইকেল চালক কথার উত্তর না পেয়ে কেটে পরেছে খেয়াল করিনি। তবে ভ্যান চালক গল্পের মেজাজে চলে এসেছে। সে এখন বকে চলছে। ফকিররা কি কি অপকর্ম করে সে বিষয়ে বয়ান দিচ্ছে অনর্গল। আমার আর খারাপ লাগছে না। ভালোই লাগছে।

জীবনে কি আসলেই কোনো মান্যতা আর্জন করেছি? যার জন্য অপমান গায়ে লাগবে? যার মান নাই তার আবার অপমান। তর্ক তো চাইলেই করা যায়। তর্কে হয়তো হারিয়েও দেয়া যেত। কিন্তু এখন আর তর্ক করতে ভালো লাগে না। বরঞ্চ শুনতে ভালো লাগে। মানুষ মানুষকে নিজে কি ভাবে-কিভাব ভাবে এসব শুনতে বেশ লাগে। ভালো সময় কাটে।

যে মানুষ আমার মতো মূর্খকে সস্তা দরের প্যান্ট-শার্ট পরা দেখেই ভেবে নেয় আমি শহুরে শিক্ষিত মানুষ তার সাথে কি তর্ক চলে? আর দু-চার পাতা যা পড়েছি তাও যে বাতিল মাল; তা হাড়ে হাড়ে টের পাই এখন প্রতি মুহূর্তে। সেসব শিখে কেবল অহমিকাই অর্জন করেছি। তা দূর করতেই তো এত তপস্যা-এত সাধনা। আর এতো দিনে বুঝতে শুরু করেছি, যে বিষয়গুলো পড়ার ছিল-জানার ছিল তা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষাই মনে করে না। সাঁইজি খুব কায়দা করে বলেছেন-

সাঁইর নিগূঢ় লীলা বুঝতে পারে এমন সাধ্য নাই
সাঁইর নিরাকারে স্বরূপ নির্ণয়,
একদিন সাঁই নৈরেকারে ভেসেছিল ডিম্বুভরে
ডিম্বু ভেঙ্গে আসমান-জমিন গঠলেন দয়াময়।।

নূরের দিরাকের পরে
নূর নবীর নূর পয়দা করে,
নূরের হুজরার ভিতর
নূর নবির সিংহাসন রয়।।

যে পিতা সেই তো পতি
গঠলেন সাঁই আদম ছবি,
কে বোঝে তার কুদরতি
কেশের আরে পাহাড় লুকায়।।

ধরাতে সাঁই সৃষ্টি করে
ছিলেন সাঁই নিগুম ঘরে,
লালন বলে সেহি দ্বারে
জানা যায় সাঁইয়ের নিগূঢ় পরিচয়।।

অর্থ উপার্যনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না এটা যে শিক্ষাব্যবস্থা-জীবনব্যবস্থা-সমাজব্যবস্থা ভাবতে শেখায় না; সেসকল ব্যবস্থা নিয়ে আমার তেমন আর মাথাব্যাথা নেই। রাজশাহীর সামসুল ফকির একবার হতাশ কণ্ঠে আমাকে বলেছিল, “বুঝলা বাবা! আমার এক ভক্ত আমারে বললো, সাঁইজি একটু দোয়া করবেন যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয়।

আরে আমি হইলাম ফকির মানুষ। আমি কি দোয়া করবো বলো? তাও ভক্ত ছেলে বলছে কি আর করা। সাঁইজিকে জানাইলাম। তাতে কি হইছে জানি না। তবে তার ব্যবসা-বাণিজ্য এখন এতোই ভালো হইছে যে গুরুর বাড়ির অনুষ্ঠানেও সে আসার সময় করতে পারে না। বলো এইবার তুমিই।”

আসলে বিষয়টা এমনই। যার জন্য বা যার মধ্যমে তুমি জীবনের নতুন দিশা খুঁজে পেলে-ভ্রহ্মাণ্ডের সত্যকে চিনতে শিখলে তার জন্য তুমি কি করলে? এটা কি ভেবে দেখেছো? দেখছো?? দেখবে??? শুধু মাথা ঠেকিয়ে নম: নম: করে বেড়িয়ে আসলেই কি আর সব হয় পাগল?

নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেই ভাবছো তুমি ভালো আছো-সুখে আছো। বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। চিত্তের আনন্দ নিজে ভালো থাকার মধ্যে বা পরিবারকে ভালো রাখার মধ্যে নিহিত না। তুমি যদি জীবে সেবা করতে না শিখো তবে চিত্তের প্রকৃত সুখ কি তা বুঝতেই পারবে না। যাপিত জীবনের যত ঋণ তা তোমাকে জীবনকালেই শোধ করে যেতে হবে। তা তুমি মানো বা না মানো। সাধককুল তাই বলে।

এই তো সেবার সাত্তার ফকির বলেছিল, “শোন! তুই যে ফকিরের বাড়ি থেকে আসলি সেটা তো দালান বাড়ি। আমার হইলো বেড়ার ঘর। নিচে মাটি। মাটির উপর খেড় দিছি যাতে ঠাণ্ডাটা কম লাগে। তার উপর চট। শীতের মধ্যে পারবি থাকতে এইখানে? খাইতে হইবো ডাল-ভাত। আর কিছু নাই। পারবি।”

এমনভাবে ভালোবাসতে পারে কেবল সাত্তার ফকিরই। অবলীলায় মনের সকল কথা মুখে বলে ফেলতে পারে। অধিকার নিয়ে বলতে পারে তোর কাছে কত আছে দিয়া যা। এই ভালোবাসার জন্য খড়ের উপর কেনো মাটির উপরও থাকতে রাজি আমি।

এতে তোমাদের সভ্য সমাজে হয়তো ক্রমশ অসভ্যে পরিণত হচ্ছি আমি-আমার চিন্তা-আমার চেতনা। তোমাদের সেই সব উত্তাল আড্ডাতে হয়তো আমি চিরকালের মতো বেমানান হয়ে যাচ্ছি ; তাতে আমার কোনো আফসোস নেই-অভিযোগ নেই-অনুযোগ নেই।

আমার গুরু নেই… গুরু ঘর নেই… তাতে আমি হতাশ হই না…। বরঞ্চ আমি ভাবতে শিখেছি এই নেই থেকেই সকল কিছুর সৃষ্টি। যেখানে নেই সেখানেই থাকবার সমূহ সম্ভবনা থাকে। যেখানে আছে সেটাতো পূর্ণ সেখানে নতুন করে কিছু যুক্ত হওয়া বড় কঠিন।

গুরু নেই বলে সব গুরুই আমার গুরু। সব গুরুঘরই আমার গুরু ঘর। সেটা কেউ মানুক না মানুক আমি মানি। বহুদিন পর দেখা হলেও সাধুগুরুরা যখন চিনতে পারে। যখন ভক্তি নেয়। যখন ভালোবাসা দেয়। প্রেম দেয়। যখন খোঁজখবর নেয়। তখন আর শূন্যতা থাকে না।

তারপরও যখন কেউ আকুল হয়ে-ভালোবেসে-করুনা করে জানতে চায়, ভাই আপনার গুরুপাঠ কোথায়? তখন কিছুই বলবার থাকে না। ইচ্ছে হয় সাঁইজির ভাষাতেই বলি-

দাসের যোগ্য নই চরণে ।
নইলে দশা ঘটতো না আর
মোর জীবনে।।

পদে যদি দাসী হতাম
চরণে রাখতেন গুনধাম,
ঘটতো না আর অসত্য কাম
দূরে যেত ভয় শমনে।।

জানা গেল বেদ পুরাণে
ভক্তের বাক্য সবায় মানে,
তোমা বিনা যাই কোনখানে
পদে রেখ দ্বীনহীনে।।

কেঁদে বলে বংশীধারী
ভক্তের ভার কি এতই ভারি,
লালন বলে দেখবো তারি
দেখবো রে স্বরূপ সাধনে।।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!