বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়

বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে- গীতায় প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে লেখা আছে, ‘ইতি ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন সংবাদে।’ এ থেকে বোঝা যায় গীতায় প্রতিটি অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের কথাই বলা হয়েছে। ভগবান কখনো অর্জুনকে কাঁদতে উপদেশ দেননি। বরং বলেছেন,

‘তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়’ অর্থাৎ হে কৌন্তেয়! দৃঢ়চিত্ত হয়ে ওঠ এবং যোগশাস্ত্রের মাধ্যমে আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য সাধন সমর কর। এই সাধন সমর করতে গেলে অস্ত্রের প্রয়োজন।

সেই অস্ত্র হলো ‘প্রাণায়ামো মহাধর্মো বেদানামপ্যগোচর’ অর্থাৎ প্রাণায়ামরূপ তীরধনুক বা গদার মাধ্যমে যুদ্ধ করে, সমস্ত শত্রুরূপী ইন্দ্রিয়দের পরাস্ত করে আমাকে জানো অর্থাৎ নিজেকে জানো অর্থাৎ আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে মুক্তি লাভ কর। এটাই মহাধর্ম।

ভগবান কৃষ্ণ কখনো অর্জুনকে ভগবানকে ডাকার উপদেশ দেননি। স্থূলপূজার মাধ্যমে আত্মজ্ঞান লাভের উপদেশ দেননি। পিতামাতা, স্ত্রী-পুত্র আপনজনদের ত্যাগ করে, সংসারত্যাগ করে, গেরুয়া কাপড় পরে মঠ-মিশনে গিয়ে থাকতেও নির্দেশ দেননি। বরং বলেছেন, ‘সস্ত্রীকো ধর্মমাচরেৎ’ অর্থাৎ সস্ত্রীক ধর্ম আচরণ কর।

শিবের স্ত্রী যেমন সতী, রামের স্ত্রী সীতা, কৃষ্ণের পাশে আছেন রাধা। সমস্ত দেবদেবী-মুনিঋষিরা বিবাহিত। আপন স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করতে ভগবান শিব দক্ষযজ্ঞ করেছেন, ভগবান রামচন্দ্র লঙ্কাকাণ্ড করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় ভারতীয় সংস্কৃতি বা সনাতন ধর্ম কখনো মানুষকে সংসারত্যাগ করে, সাংসারিক কর্ম বা জীবনযাত্রা ত্যাগ করে গেরুয়া কাপড় পরে মঠ-মিশনে থাকতে উপদেশ দেননি।

ভগবান শঙ্করাচার্যের পর থেকে ভারতে গেরুয়া এসেছে, তার আগে গেরুয়া ছিল না। ঐতিহাসিকরা জানেন, বৌদ্ধধর্ম ও শঙ্করাচার্যের প্রভাব থেকে ভারতে সংসার ত্যাগের প্রচলন এসেছে। সংসার ত্যাগ করা ভারতের সনাতন ধর্মের শিক্ষা নয়।

ভগবান যা করতে বলেননি, যা ভারতের ভাবধারা নয়, তাকেই প্রাধান্য দিয়ে ভারতবাসী সংসার ত্যাগ করাকে এবং গেরুয়াবসন পরিধান করাকে জীবনের মোক্ষ লাভের উপায় বলে মনে করছে। ভারতবাসী আজ আত্মজ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞান বা সনাতন ধর্মের আদর্শ থেকে বহুদূরে চলে গেছে।

আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভের যে সাধনা যুগ যুগ ধরে ভারতের বুকে চলে এসেছে, যার মাধ্যমে অগণিত ভারতবাসী মুক্তিলাভ করতো, যার মাধ্যমে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের জয় করে চিরশান্তি লাভ করতো, এখনকার সংসারত্যাগীরা সে পথের সন্ধান দেন না, কারণ তাদের অনেকে নিজেরাই তা জানেন না।

ভারতবাসীর ধমনীতে ফল্গুধারার মত লুকিয়ে আছে যে বিশাল সম্পদ, সেদিক থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে তাকে অধিক অর্থ রোজগার, সুখভোগ এবং ইন্দ্রিয়াশক্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। যাদের সংস্পর্শে আসলে মানুষ সত্যিকার ধর্ম লাভ করতে পারবে, তারাই তাদের ভুল পথে পরিচালিত করে। ধর্মপথের শিক্ষক যদি ধনলোভী, ভোগী ও ইন্দ্রিয়াসক্ত হন তাহলে তারা ধর্মপিপাসু মানুষকে ওই পথেই টানবে এতে আর আশ্চর্য কি?

যদি কোনো সংসারত্যাগী, গৃহীকে উপদেশের ছলে বলেন, ‘দেখো! আমি এক কথায় সংসারের সবকিছু ত্যাগ করে গেরুয়া পরে মঠ-মিশনে চলে এসেছি, তুমি কি তা পারবে?

বুদ্ধিমান সেই শাস্ত্রজ্ঞ গৃহী মানুষ যদি উত্তর দেন, আমি এ কাজ কখনই করবো না কারণ শাস্ত্র বলছেন ‘সস্ত্রীকো ধর্মমাচরেৎ’; সংসার ত্যাগ আরো এই কারণে করবো না যে যখন আমি ছোট শিশু হয়ে মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম, সেদিন আমার মা আমাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতেন তা হলে আমার কি হত? কিন্তু আমার মা তা করেননি।

সনাতন ভারতবাসী জন্মান্তরবাদকে মান্য করে। ধর্মকে ভালোবাসে। গীতাতে ভগবান্ বলেছেন, ‘হে অর্জুন! এই পৃথিবীতে তুমিও বহুবার এসেছ আমিও বহুবার এসেছি। তোমার সে সব মনে নেই, আমার মনে আছে।’ গীতা ভারতের প্রাণ। গীতাকে শ্রদ্ধাজ্ঞান করে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 

বরং তিনি বুকে তুলে নিয়ে, কোলে রেখে রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে, কত কষ্ট করে আমাকে বড়ো করে তুলেছেন। এই মাতাপিতাকে ত্যাগ করে মঠ-মিশনে গেলে আমার ধর্মলাভ হবে না। বিবাহ না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারি, সঙ্করজাতীয় মানুষ উৎপন্ন হবে, সস্ত্রীক ধর্ম আচরণ করা যাবে না, যা শাস্ত্র বিরুদ্ধ। কেউ যদি ভাবে মুক্তি চাই না, গেরুয়া চাই তবে তা ফাঁকিবাজি।’

ক্রিয়াযোগ হলো সেই গীতোক্ত ব্রহ্মবিদ্যা বা যোগশাস্ত্র। যারা আত্মজ্ঞান লাভ করতে চায় না, তারা পিতামাতাকে না দেখে মঠ-মিশন থেকে প্রচুর ধনদৌলত নিয়ে নাড়াচাড়া করুক। আর অসংখ্য গৃহী মানুষ যারা আত্মজ্ঞান লাভ ও মুক্তিলাভ করে মনুষ্যজীবন সফল করতে চায়, তারা ধনী-গরীব নির্বিশেষে সংসার থেকে স্বপার্জিত অর্থে জীবিকা নির্বাহ করে আপন গৃহকোণে বসে কঠোর সাধনায় নিয়োজিত থাক।

ভারতীয় ভাবধারার এই অনন্ত প্রবাহকে চিরকাল তারাই ধরে রেখেছেন এবং আগামী দিনে তারাই ধরে রাখবেন। এই উদ্দেশ্যেই মহাত্মা রামপ্রসাদ বলেছেন, ‘তোর সংসার ধর্ম বড়ো ধর্ম মা, তাই পারি না ছেড়ে দিতে।’ যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ও গৃহী জীবনযাপন করেন। সাধনার সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে বলেছেন,

‘চার আশ্রমের মধ্যে গার্হস্থ্য আশ্রম শ্রেষ্ঠ। গার্হস্থ্য আশ্রমের উপরেই বাকিঁ তিনটি আশ্রম নির্ভরশীল।’

যোগীরাজের এই মহান আদর্শ আপামর জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবার উদ্দেশ্যে মহারাষ্ট্রের পুনা শহরের অনতিদূরে দেগাঁও-নসরা পুরে যোগীরাজ শ্যামাচরণ সনাতন মিশনের মাধ্যমে স্থাপিত হল মানুষ তৈরির মন্দির। মানুষ এখান থেকেই খুঁজে পাবেন তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাম্য আত্মজ্ঞান বা মুক্তি লাভের পথ।

এই মহারাষ্ট্রই জন্ম দিয়েছে কিছু মহান ক্রিয়াযোগীকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন রামদাস স্বামী, মহাত্মা জ্ঞানেশ্বর, তুকারাম এবং যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের নিকট থেকে দীক্ষিত শিরডির সাঁইদাস বাবা।

সনাতন ভারতবাসী জন্মান্তরবাদকে মান্য করে। ধর্মকে ভালোবাসে। গীতাতে ভগবান্ বলেছেন, ‘হে অর্জুন! এই পৃথিবীতে তুমিও বহুবার এসেছ আমিও বহুবার এসেছি। তোমার সে সব মনে নেই, আমার মনে আছে।’ গীতা ভারতের প্রাণ। গীতাকে শ্রদ্ধাজ্ঞান করে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। গীতায় আরো বলা আচে, ‘বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি’ অর্থাৎ বহু বহু জন্ম অতিক্রমের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হতে হতে অবশেষে মানুষ হয়।

তাই সনাতন ধর্ম সত্যকারের প্রাণ বিজ্ঞান ও আত্মবিজ্ঞানের কথা বলেছেন। তাই সনাতন ধর্ম মূলতঃ কোন ধর্ম নয়, কোনোও সম্প্রদায়ও নয়। এ হলো পৃথিবীর চূড়ান্ত বিজ্ঞান। কারণ এই বিজ্ঞান মানুষ সৃষ্টি করে নি, এটা সৃষ্টির অনাদি কাল থেকে সৃষ্টির মধ্যেই রয়ে গেছে। তাই যতদিন অনন্ত সৃষ্টি থাকবে ততদিন এই প্রাণবিজ্ঞানও থাকবে।

তারপর খুনি, ডাকাত, চোর পকেটমার ইত্যাদি হতে হতে আরও পরিশুদ্ধ হয়ে রাজনীতিবিদ, বিচারক, শিক্ষাবিদ, উকিল, চিকিৎসক যারা সমাজের উচ্চশ্রেণীভুক্ত এইসব জন্ম অতিক্রম করতে থাকে। এ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে হিংস্রতা, দাম্ভিকতা কিছুটা থেকেই যায়। আরো পরিশুদ্ধতার জন্য জন্মগ্রহণ করতে করতে মানুষ শুরু করে তীর্থ ভ্রমণ, পূজাপাঠ, শাস্ত্রপাঠ, ধ্যানজপ, মালাজপ, নাম সংকীর্তন, আড়ম্বর পূর্ণবাহ্য পূজা ইত্যাদি।

তারপর শুরু হয় সংসার ত্যাগের পালা। জন্মক্ষেত্র সংসারকে মন্দ ভেবে, বৃদ্ধ মাতাপিতা, স্ত্রীসন্তান সকলকে ত্যাগ করে গেরুয়া বসন পরে মঠ মিশনে যাওয়া। তারপর কোন দেবদেবীর উদ্দেশ্যে শুরু হয় বাহ্য সাধনা। এ পর্যন্ত এদের দৃষ্টি স্থূল পূজার বাহ্যাড়ম্বর, লোক দেখানো ইত্যাদির দিকে নিবদ্ধ থাকে।

এ পর্যন্ত এদের জীবনে আত্মজ্ঞানের প্রকাশ হয় না। তারপর আরো অনেক জন্ম অতিক্রম করতে করতে জীবনের মোড় ঘুরে গিয়ে লক্ষ্য পরে আত্মজ্ঞানের দিকে। তখন তার ফেলে আসা বহু জীবনের নানাবিধ বাহ্যকর্মগুলিকে আর ভালবাসতে পারে না, কারণ সেসব তাদের অতীতের বহুজন্মের মাধ্যমে করা হয়ে গেছে। এখন তাদের নতুন কিছু করতে হবে যা তাদের করা হয় নি।

সেটা হলো আত্মজ্ঞান লাভের জন্য কঠোর তপস্যা। এই প্রকারের শুদ্ধ পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মন ধাবিত হয় প্রাণের নিশ্চলতার অভিমুখে। এই নিশ্চল প্রাণকেই ভগবান্, আত্মা, ব্রহ্ম বলে। এটাই মানুষের গন্তব্যস্থল। কোন সুদূর অতীতে নিশ্চল ব্রহ্ম থেকে চঞ্চলতা প্রাপ্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ জন্ম অতিক্রমের মাধ্যমে সে যাত্রা শুরু করেছিল উৎসস্থলে মিশে যাবার জন্য।

এই যে তার অনন্তপথ চলা এটা সে ইচ্ছা করুক বা না করুক প্রকৃতি তাকে অবশভাবে করিয়ে নেবে। এটার গীতার উপদেশ।

কাজেই আত্মজ্ঞান লাভের পথে যাব না এ চিন্তা ভুল। সকলকেই যেতে হবে। প্রকৃতি অবশভাবে টেনে নেবে। এটাই সকলের পরিণতি। সনাতন ধর্ম জন্মান্তরবাদের গভীরে প্রবেশ করে, মানুষের প্রাণের অনন্ত তরঙ্গের হিসাব করে উৎসস্থলে পৌঁছবার যে হিসাব দিয়ে গেছেন তার উপরে আর কোন বিজ্ঞান হতে পারে না।

তাই সনাতন ধর্ম সত্যকারের প্রাণ বিজ্ঞান ও আত্মবিজ্ঞানের কথা বলেছেন। তাই সনাতন ধর্ম মূলতঃ কোন ধর্ম নয়, কোনোও সম্প্রদায়ও নয়। এ হলো পৃথিবীর চূড়ান্ত বিজ্ঞান। কারণ এই বিজ্ঞান মানুষ সৃষ্টি করে নি, এটা সৃষ্টির অনাদি কাল থেকে সৃষ্টির মধ্যেই রয়ে গেছে। তাই যতদিন অনন্ত সৃষ্টি থাকবে ততদিন এই প্রাণবিজ্ঞানও থাকবে।

প্রাণের দুটো অবস্থা। যেটার ওপরে আমরা বেঁচে আছি, চলাফেরা করছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঝগড়া করছি, যা কিছু করছি, তা প্রাণের চঞ্চল অবস্থা থেকে। কিন্তু এটা ক্ষণস্থায়ী। তাহলে প্রাণের আর একটা উল্টো অবস্থা আছে। সেটা হচ্ছে স্থির। অর্থাৎ স্থির প্রাণ, সেটাই ব্রহ্ম, ভগবান্, যাই বলো। শেষ কথা। সে হচ্ছে প্রাণের স্থিরাবস্থা, আর চঞ্চল প্রাণ জীবাবস্থা।

অতএব মনে রাখ মানুষ, ‘সনাতন ধর্মের মধ্যে কোনও হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, মুসলমান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ইত্যাদি যতপ্রকার ধর্ম বলে প্রচলিত, যা মানুষের তৈরিতে তা নেই। মানুষের স্থাপিত যত সম্প্রদায় তাদের বিনাশ আছে। কিন্তু সনাতন বিজ্ঞানের কখনও বিনাশ সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক মানুষের তৈরি সম্প্রদায়গুলো কি বলে তা নিয়ে। তারা বলে, তাদের স্থাপিত সম্প্রদায়গুলি এক একটা ধর্ম। যদি তাদের কথা মানতে হয় স্বীকার করতে হবে ধর্ম বহু এবং সে ধর্ম কেবলমাত্র মানুষের জন্য। এই পৃথিবীতে কি কেবল মানুষই বাস করে? মানুষ ছাড়া পৃথিবীর আর যা কিছু তাদের কি ধর্ম নেই! তারা কি ধর্মহীন?

তা হতে পারে না। ধর্ম যদি বিজ্ঞান হয় তাহলে সে বিজ্ঞান সকলের। তাই সকলেই একই পদ্ধতিতে জন্মাচ্ছে, একই পদ্ধতিতে বেঁচে থাকছে, একই পদ্ধতিতে মরে যাচ্ছে, আবার একই পদ্ধতিতে পুনর্জন্ম লাভ করছে; আপন আপন উৎসস্থলে ফিরে যাবার জন্য। এই বিজ্ঞানের কথা এই পৃথিবীতে কেবলমাত্র সনাতন বিজ্ঞানই বলতে পেরেছে। কিন্তু যারা সম্প্রদায়ভুক্ত তারা পারেনি, কোনদিন পারবেও না।

এই অধ্যাত্মপথে অগ্ৰসর হওয়া সকলের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মানুষ এই বিজ্ঞানকে মেনে নিলে সুখি হবে, শান্তি পাবে, ইন্দ্রিয়দের বশীভূত করতে পারবে। তখনই তার ক্রোধ, হিংসা, লোভ, পরশ্রীকাতরতা, অহমিকা সবকিছুর অতীতে গিয়ে নিশ্চল প্রাণের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়দের চাহিদার অতীতে গিয়ে এক সুন্দর উৎকৃষ্ট মানুষে পরিণত হবে।

তখন ধর্মে ধর্মে বিভেদ থাকবে না। তখন এক পৃথিবী, এক ভগবান, এক মানুষ এবং এক ধর্ম বা এক বিজ্ঞান বজায়া থাকবে। তাই বিজ্ঞানবিহীন কোন ধর্ম হতেই পারে না। যে ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান নেই, কেবল আবেগের উপর নির্ভরশীল তা ধর্ম নয়। যদি কেউ বলে আমি ধর্মবিজ্ঞান মানি না; তাহলে সেটা মুর্খামি, কারণ প্রাণকে বাদ দিয়ে কিছু ভাবাই যায় না।

প্রাণই ভগবান্, প্রাণই মানুষ, প্রাণই জগৎ ব্রহ্মাণ্ড, প্রাণই ধর্ম, প্রাণই বিজ্ঞান। সাপের ভেতরেও যে প্রাণ ব্যাঙের ভেতরও সেই প্রাণ। কেবল প্রকাশের তারতম্য। অতএব যদি কেউ বলে ধর্ম মানি না তাহলেও সে বেঁচে আছে, আবার যদি বলে ধর্ম মানি তাহলেও বেঁচে আছে। তাহলে প্রাণধর্মকে বাদ দেবে কি করে?

প্রাণের দুটো অবস্থা। যেটার ওপরে আমরা বেঁচে আছি, চলাফেরা করছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঝগড়া করছি, যা কিছু করছি, তা প্রাণের চঞ্চল অবস্থা থেকে। কিন্তু এটা ক্ষণস্থায়ী। তাহলে প্রাণের আর একটা উল্টো অবস্থা আছে। সেটা হচ্ছে স্থির। অর্থাৎ স্থির প্রাণ, সেটাই ব্রহ্ম, ভগবান্, যাই বলো। শেষ কথা। সে হচ্ছে প্রাণের স্থিরাবস্থা, আর চঞ্চল প্রাণ জীবাবস্থা।

তাহলে ‘ব্রহ্ম হচ্ছে প্রাণের চূড়ান্ত স্থিরাবস্থা।’ আর জীব হচ্ছে প্রাণের চঞ্চলতার চূড়ান্ত অবস্থা। তাহলে এই দুটো চূড়ান্তের মাঝখানে কি আছে? ধরো, চূড়ান্তে নাই, আমি স্থিরত্বেও যেতে পারিনি। তাহলে কোথায় গেলাম? তা, হবে না। কারণ তোমার একশো শতাংশ যে স্থির, তুমি যদি নব্বই শতাংশকে স্থির করতে পারো তাহলে দশ শতাংশ চঞ্চল আছে।

এই প্রাণটা যতক্ষণ চঞ্চল হয়ে আছে আমাদের শরীরের মধ্যে ততক্ষণই আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু যেই প্রাণটা থেমে গেল অমনি মরে গেলাম। তাহলে জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য কি? না, জন্ম হচ্ছে প্রাণের চঞ্চল দিকে চলে যাওয়া, আর মৃত্যু হচ্ছে প্রাণের স্থিরত্বের দিকে চলে যাওয়া।

প্রাণের এই যে স্থিরাবস্থা, এটা আদি ও অনাদি। এর কোনো ক্ষয় নাই। এর কোনো উত্পত্তিও নাই, চিরশাশ্বত। তার থেকে যখন চঞ্চল হল প্রাণটা, তখন আমরা জন্মগ্রহণ করলাম এবং পৃথিবীতে আসলাম। প্রত্যেকটি প্রাণীর এই একই অবস্থা। সে মানুষ বলো, বাঘ বলো, হাতি বলো, মশা, মাছি, যাই বলো না কেন, সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম।

তাই সকলের মধ্যে, এই চঞ্চল অবস্থায় থাকার দরুণ, আমাদের পেটে ক্ষুধা আছে, হিংসা আছে, লোভ আছে, ক্রোধ আছে। মানে, যত ইন্দ্রিয় সব এই চঞ্চল অবস্থার মধ্যে আছে। যদি আমরা স্থিরাবস্থায় যেতে পারি, তাহলে কিছুই নাই। এখানেই ক্রিয়াযোগের মাহাত্ম।

তাহলে যেটা বলছিলাম, আমরা যখন মরে গেলাম তখন প্রাণের সেই স্থিরাবস্থায় চলে গেলাম। এটা কে এই শ্যামাচরণ গ্রন্থটার মধ্যে পরিস্কারভাবে দেওয়া আছে যে, যখন একটা প্রাণী মারা গেল, সে মানুষ হোক, আর যে কেউই হোক, তখন সে প্রাণের চঞ্চলতার দশ শতাংশে চলে গেল। একশো শতাংশে এখন চঞ্চল, সে তখন দশে চলে গেল।

যদি একেবারের শূণ্য হয়ে যেত, শূণ্য শতাংশে, তাহলে কিন্তু তার আর পুনর্জন্ম হতো না। তাহলে বিজ্ঞানটা থেকে এটা পাচ্ছি, আমরা যদি মুক্তি চাই তাহলে আমাকে শূণ্য শতাংশে যেতেই হবে। তাহলে ক্রিয়াযোগের এখানেই মাহাত্ম। ক্রিয়াযোগ আমাকে সেই শূণ্য শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া পৃথিবীতে আর কারো কোনো ক্ষমতাই নাই। এই কারণে যোগিরাজ বলেছেন, ‘ক্রিয়া সত্য আর সব মিথ্যা।’

তাহলে ‘ব্রহ্ম হচ্ছে প্রাণের চূড়ান্ত স্থিরাবস্থা।’ আর জীব হচ্ছে প্রাণের চঞ্চলতার চূড়ান্ত অবস্থা। তাহলে এই দুটো চূড়ান্তের মাঝখানে কি আছে? ধরো, চূড়ান্তে নাই, আমি স্থিরত্বেও যেতে পারিনি। তাহলে কোথায় গেলাম? তা, হবে না। কারণ তোমার একশো শতাংশ যে স্থির, তুমি যদি নব্বই শতাংশকে স্থির করতে পারো তাহলে দশ শতাংশ চঞ্চল আছে।

তাহলে, ক্রিয়া করে যদি কোনো মানুষ, এই জীবনে দশ শতাংশে চলে যেতে পারে, তাহলেও ‘পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’; কিন্তু কেউ যদি একদম একশো শতাংশ স্থিরাবস্থায় ফিরে গিয়ে দেহ ত্যাগ করতে পারে, তার তো কোটি কোটি বছরের মধ্যে আর জন্ম নাই, সে জন্মরহিত হয়ে গেল। আর তার জন্ম নাই।

কিন্তু দশ শতাংশে গেলেও এই মিনিমাম, হয়তো হাজারের মধ্যে এক শতাংশ চান্স্ – জন্মের – থাকে। সাধারণতঃ চান্স থাকে না। তাহলে তো গীতা মিথ্যা হয়ে যাবে। এটা একটা বিচারে পাওয়া যাচ্ছে।

তো, সেইজন্যে ব্রহ্ম তাহলে কি? ব্রহ্ম আমাদের সকলের ভিতরেই আছে, প্রাণের স্থিরাবস্থা।

জীবাবস্থা কি? প্রাণের চঞ্চল অবস্থা। পার্থক্য এইটুকু। আর কিছু নাই। সেই নিয়ে এই বক্তব্যটা রাখা হয়েছে। (ক্রিয়াবানের প্রতি) এবার তাহলে পরিস্কার হয়েছে?

……………………………………..
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়
(প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ যোগিরাজ শ্যামাচরণ সনাতন মিশন)

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!