ভবঘুরে কথা
বিনিদ্র সাধু

একদিন সত্যসত্যই গুরুদেবকে আমি অকৃতজ্ঞভাবে এই কথাগুলি বলে বসলাম, “গুরুদেব! অনুগ্রহ করে আমায় হিমালয়ে যেতে অনুমতি দিন। সেখানে অখণ্ড নীরবতার মধ্যে আমি নিত্য ভগবৎসঙ্গ লাভ করব বলেই মনে করি।”

মাঝে মাঝে সাধকরা যেমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভ্রান্তিতে প্রলুব্ধ হন, সেইরকমভাবে আমিও আশ্রমের কাজকর্মে এবং কলেজের পড়াশুনার উপর ক্রমশঃই অধৈর্য হয়ে পরছিলাম। দোষ লাঘবের একটা ক্ষীণ যুক্তি খাড়া করা যায় এই বলে যে, শ্রীযুক্তেশ্বরজীর সঙ্গে পরিচিত হবার মাত্র ছ’মাস বাদেই আমি ঐ প্রস্তাব করি।

তখনও পর্যন্ত আমি তাঁর গগনস্পর্শী ব্যক্তিত্বের পরিমাপ করে উঠতে পারি নি। গুরুদেব ধীরে ধীরে অথচ অত্যন্ত সহজভাবে উত্তর দিলেন, “হিমালয়ে তো অনেক পাহাড়ী থাকে; কই তাদের ত’ ঈশ্বরলাভ হয় না। জড় পাহাড়ের চেয়ে যার সত্য সত্যই ঈশ্বরোপলব্ধি হয়েছে, তেমন লোকের কাছ থেকেই জ্ঞানান্বেষণ করা ভাল নয় কি?”

তিনিই আমার শিক্ষাদাতা, পাহাড় নয়, গুরুদেবের সামান্য ইঙ্গিত উপেক্ষা করে আমার প্রার্থনার পুনরাবৃত্তি করলাম। শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী আর কোনো উত্তর প্রদান করলেন না। আমি তার মানে “মৌনং সম্মতিলক্ষণং” বলেই ধরে নিলাম, লোকে যেমন অনিশ্চিত মানেটা নিজের সুবিধামতই আগে চট করে ধরে নেয়।

কলকাতার বাড়িতে এসে সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমি যাবার উদ্যোগে ব্যাপৃত হলাম। একটা কম্বলের মধ্যে গোটাকতক জিনিস বাঁধাছাঁদা করবার সময় মনে পরল ঐরকমই আর একটা পুটুলির কথা, বছরকয়েক আগে যা চিলেকোঠার জানালা থেকে লুকিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছিলাম।

ভাবছিলাম এটাও না আবার সে’বারকার হিমালয়ে পলায়নের মত নিষ্ফল যাত্রা হয়ে বসে? প্রথমবারে আমার আধ্যাত্মিক উদ্দীপনা ছিল খুবই বেশি; কিন্তু আজ রাতে গুরুদেবকে পরিত্যাগ করে যাবার চিন্তায় বিবেক দংশন হচ্ছিল। তার পরদিন সকালে আমি আমাদের স্কটিশচার্চ কলেজের সংস্কৃতের অধ্যাপক বিহারী পণ্ডিত মহাশয়কে খুঁজে বার করলাম।

দেখা হতে বললাম, “পণ্ডিত মশাই! আপনি আমায় বলেছিলেন যে লাহিড়ী মহাশয়ের একজন খুব বড় শিষ্যের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব আছে। তাঁর ঠিকানাটা একটু দয়া করে যদি দেন!”

“ওঃ! তুমি রামগোপাল মজুমদারের কথা বলছ? তাঁকে আমি বলি ‘বিনিদ্র সাধু’। সর্বদাই তিনি ব্রহ্মানন্দে মগ্ন। তারকেশ্বরের কাছে রণবাজপুরে তাঁর বাড়ি।”

পণ্ডিত মশাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাড়াতাড়ি তারকেশ্বরের ট্রেন ধরলাম।

নির্জন হিমালয়ে গিয়ে ধ্যানধারণায় নিজেকে নিযুক্ত রাখবার বিষয়ে সেই বিনিদ্র সাধুটির কাছ থেকে অনুমোদন লাভ করে মনের সংশয় দূর করব বলে আশা করেছিলাম। বিহারী পণ্ডিত মশাই আমায় বলেছিলেন- রামগোপাল মজুমদার মহাশয় বাংলাদেশে নির্জন গুহায় বহু বৎসর “ক্রিয়াযোগ” সাধনের পর দিব্যজ্ঞান লাভ করেছেন।

তারকেশ্বরে এক প্রসিদ্ধ মন্দির আছে। খ্রীস্টান ক্যাথলিকরা ফ্রান্সের পবিত্র তীর্থস্থান লুর্ডসের প্রতি যেমন ভক্তি প্রদর্শন করে, হিন্দুরাও তারকেশ্বরকে তেমনি ভক্তি করে। কত অসংখ্য লোক দৈবকৃপায় এখানে আরোগ্য হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই; তার মধ্যে আমাদের পরিবারেরও একজন ছিলেন।

আমার বড়পিসিমা একদিন আমায় বলেছিলেন, “তারকেশ্বরে গিয়ে একবার আমি একসপ্তাহ ধরে ‘হত্যে’ দিয়ে পরেছিলাম। নির্জলা উপোষ করে তোমার খুড়ামশায় সারদাবাবুর একটা পুরনো জটিল রোগ নিরাময়ের আশায় আমি ‘হত্যে’ দিয়েছিলাম। সাত দিনের দিন হাতের মুঠোয় একটা ওষুধ পেয়ে গেলাম। তার পাতা সিদ্ধ করে তোমার খুড়ামশায়কে খাওয়াতেই রোগ একদম সেরে গেল, আর কখনও হয় নি।”

পবিত্র তীর্থ তারকেশ্বরের মন্দিরে প্রবেশ করলাম। মন্দিরের বেদীতে গোলাকার প্রস্তরমূর্তি ছাড়া আর কিছুই নেই। অনাদিলিঙ্গ মহাদেব যথার্থই অনন্তের প্রতীক। ভারতে অশিক্ষিত চাষাভুষোরাও বিমূর্ত রূপকে বুঝতে পারে যা পশ্চিমের লোকেদের কাছে একান্তই অবাস্তব ও উপহাসের বস্তু।

আমার মনের ভাব তখন এমনই উগ্র ছিল যে, পাথরের মূর্তির সামনে মাথা নোয়ানর আর ইচ্ছা হল না। ভাবলাম, আত্মার মধ্যেই শুধু ঈশ্বরের অনুসন্ধান করা উচিত। নতজানু হয়ে প্রণাম না করেই মন্দির ত্যাগ করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম দূরবর্তী রণবাজপুর গ্রামের দিকে যাত্রার জন্যে।

আমি পথ চিনতাম না। রাস্তার এক পথিককে জিজ্ঞসা করতে, সে ত’ মহা ভাবনায় পরে গেল‌। যাক, শেষ পর্যন্ত দৈববাণীর মত করেই সে বললো, “রাস্তার মোড়ে পৌঁছে ডান দিকে বেঁকে সোজা চলতে থাকবে।”

লোকটার কথামত যে রাস্তা ধরে চললাম, সেটা একটা খালের ধার দিয়ে গেছে। রাত নেমে এল; গাঁয়ের ধারে বনেজঙ্গলে জোনাকির মেলা; চার ধারে শিয়ালের হুক্কাহুয়া। চাঁদের ক্ষীণ আলো কোনই সাহায্যে এলো না। ঘণ্টা দুই ধরে হোঁচট খেতে খেতে এগোতে লাগলাম। গরুর গলার স্বাগত ঘণ্টার ধ্বনি শুনতে পেলাম। বারম্বার চিৎকার করে ডাকতে এক কৃষকপুঙ্গব তো পাশে এসে উদয় হলেন। বললাম, “এখানে রামগোপাল বাবু কোথায় থাকেন, জান?”

“ও নামে এ গাঁয়ে কেউ থাকে না।” জবাবটা রুক্ষ আর কিছু ছড়া! “আপুনি মশাই বোধ হয় একটি টিকটিকি, মিছেমিছি ভাঁড়াচ্ছ!”

কি আর করি, তখনকার তার রাজনৈতিক হাঙ্গামাসন্ত্রস্ত মনের সন্দেহ দূর করবার আশায় আমার দুর্ভোগের কথা তার কাছে কাতরস্বরে ব্যাখ্যা করলাম। লোকটার কি দয়া হল, তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভালরকম অতিথি সৎকার করল। যেতে যেতে বলল, “রণবাজপুর এখান থেকে বহুদূর। চৌরাস্তাটার মোড়ে আপনি বা ধারে গেলেই পেতে, ডান ধারে নয়।”

হা ভগবান! সখেদে ভাবতে লাগলাম যে, অচেনা পথে চলার সময় পথিকদের কাছে আগের লোকটা কি রকম একটা মূর্তিমান দুর্গ্রহ আর বিপদজনক! যাই হোক, অবশেষে মোটা চালের ভাত, মুসুরির ডাল আর তার সঙ্গে আলু-কাঁচকলার ঝোল দিয়ে পরম পরিতৃপ্তি সহকারে রাতের ভোজনক্রিয়াটি সুসম্পন্ন করে ত’ উঠানের পাশে একটি ছোট্ট কুঁড়ের মধ্যে শয়ন করা গেল।

দূরে গ্রামবাসীরা খোল আর করতালের সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে কীর্ত্তন করে চলেছে। সে রাতে ঘুম সামান্যই হল। ভগবানের কাছে গভীরভাবে প্রার্থনা করতে লাগলাম, যাতে করে গুপ্তযোগী রামগোপাল বাবুর কাছে পৌঁছতে পারি।

ভোরে ঊষার প্রথম আলোর রেখা আমার কুঁড়ের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি রণবাজপুরের দিকে রওনা দিলাম।

এবড়ো-খেবড়ো ধানের ক্ষেত, কাস্তে দিয়ে কাটা কাটাগাছের গোড়া আর শুকনো মাটির ঢিপির উপর দিয়ে মন্থরগতিতে এগিয়ে চললাম। মাঝে মাঝে দু’একজন চাষার সঙ্গে দেখা হলে, আর কতদূর জিজ্ঞাসা করলেই বলে, “এই কোশটাক, বেশী দূর নয়!”

ভোর থেকে হাঁটা শুরু করে মাথার উপর সূর্য এসে পরল, বেলা দুপুর হয়ে গেছে, তবুও সেই ‘কোশটাক’ পথ আর ফুরোয় না। রণবাজপুর বরাবর একক্রোশ দূরেই রয়ে গেল! বেলা তিন প্রহর গড়িয়ে গেল, সামনে তবুও সেই অন্তহীন ধানের ক্ষেত! খোলা আকাশ থেকে গ্রীষ্মের দারুণ দাবদাহ; আমার তো ধাত ছেড়ে যাবার উপক্রম।

এমনসময় দেখলাম গদাইলস্করী চালে একজন লোক এগিয়ে আসছে। আর কতদূর আছে জিজ্ঞাসা করলাম অতি ভয়ে ভয়ে, পাছে ঐ লোকটাও সেই একঘেয়ে জবাবই দিয়ে বসে, “এই আর কোশখানেক হবে আর কি!”

অপরিচিত লোকটি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পরল। বেঁটে আর রোগাগোছের চেহারা-দৃষ্টি আকর্ষণ করবার মত বিশেষ কিছুই নেই। কেবল একজোড়া অসাধারণ উজ্জ্বল আর কালো চোখ ছাড়া!

বিস্ময়স্তম্ভ মুখের সামনে আঙ্গুলি নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল, “রণবাজপুর ছাড়বার মতলব করেছিলাম, কিন্তু দেখলাম যে তোমার উদ্দেশ্য ভাল; তাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তুমি ভারি চালাক, না? ভেবেছিলে যে, না বলেকয়েই তুমি এসে আমায় পাকড়ে ফেলবে? বেহারী পণ্ডিতের কি দরকার ছিল তোমায় আমার ঠিকানা দেবার?”

সেই মহান সাধুটির সামনে আত্মপরিচয় দেওয়া তখন নিতান্তই বাহুল্য জ্ঞান করে চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইলাম। আমার অভ্যর্থনার ধরণ দেখে খানিকটা আহতও হলাম। তার পরের প্রশ্নটা আচমকাই এলো, “আচ্ছা! বল তো, ভগবান কোথায় আছেন বলে তোমার মনে হয়?”

“আজ্ঞে!, তিনি আমার ভিতর আর সর্বত্রই তো রয়েছেন।” উত্তর দিলাম, কিন্তু তখন আমার চেহারাতেও মনের বিহ্বল ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল।

“এ্যাঁ! সর্বব্যাপী তিনি, কি বল?” সাধুটি হেসে বললেন, “তা হলে বাছা কালকে তারকেশ্বরের মন্দিরে তুমি সর্বব্যাপী ভগবানের প্রস্তরমূর্তির সামনে মাথা নোয়ালে না কেন হে?”

‘যে, কোন কিছুর সামনে মাথা নত করে না, সে নিজের ভারও নিজে বহন করতে পারে না।’ তোমার দম্ভের দরুণ ফল কি হল জান? রাস্তায় সেই লোকটা, যার ডাইনে বাঁয়ে জ্ঞান নেই, তার দ্বারা ভুলপথে চালিত হয়ে শাস্তি পেলে। আজকেও তুমি বেশ খানিকটা ভুগলে দেখছি।”

সর্বান্তঃকরণে আমিও তা সমর্থন করলাম। বিস্ময়ে অভিভূত হলাম এই ভেবে যে, আমার সামনে এ রকম একটা অত্যন্ত সাধারণগোছের শরীরের ভিতর কি করে এমন সর্বদর্শী চক্ষু লুকিয়ে আছে। সেই অদ্ভুত যোগীর কাছ থেকে কেমন একটা আশ্চর্য নিরাময়কারী শক্তি এসে আমায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। মাঠের মাঝখানে সেই আগুনের হল্কার মধ্যেই আমি সঙ্গে সঙ্গে বেশ স্নিগ্ধ আর সুস্থ হয়ে উঠলাম।

তিনি বললেন, “সাধক ভাবতে চায় যে, সে যে সাধনপথ বেছে নিয়েছে সেইটেই হচ্ছে ভগবানেরকে পাবার একমাত্র পথ। যে যোগের দ্বারা অন্তরে ঈশ্বরভাবের উদয় হয়, সেই যোগই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পথ তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। লাহিড়ী মহাশয়ও সেই কথাই আমাদের বলেছেন। অন্তরে ভগবানকে পেয়ে বাইরেও কিন্তু তাঁকে আমরা শীগগিরই পেতে পারি। তারকেশ্বর বা অন্যান্য তীর্থস্থানে লোকেদের যে এত ভক্তিশ্রদ্ধা তার কারণ ঐ স্থানগুলি হচ্ছে আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্রস্থল।”

সাধুবরের তিরস্কারের ভঙ্গী তখন আর ছিল না। চক্ষুতে স্নিগ্ধকোমল দৃষ্টি; সস্নেহে আমার কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “নবীন যোগী! দেখছি যে তুমি তোমার গুরুদেবের কাছ থেকে পালাচ্ছ। আরে, তোমার যা যা প্রয়োজন সবই তো তাঁর আছে, তোমার আর ভাবনা কি? তাঁর কাছেই ফিরে যাও। পর্বত কি কখনো গুরু হয় নাকি?”

রামগোপাল বাবু ঠিক সেই কথারই পুনরুক্তি করলেন যা শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজী দিন দুই আগে করেছিলেন। রামগোপাল বাবু আমার দিকে একটি রহস্যময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলতে লাগলেন, “বিশ্ববিধানে এমন কোন নিয়ম নেই যে গুরুদের কেবলমাত্র পাহাড় পর্বতেই বাস করতে হবে।

ভারত বা তিব্বতের, হিমালয়ের সাধুসন্তদের উপর কোন একচেটেয় অধিকার নেই। এ দু’জায়গা ছাড়া ভূ-ভারতে আর কোথাও যে মুনিঋষিদের পাওয়া যায় না, তা নয়। অন্তরের মধ্যে যে জিনিস পাবার জন্যে লোকে অস্থির হয় না, তারজন্যে চারধাম ঘুরে বেড়ালেও কোন কিছুরই দর্শনলাভ হয় না।

সাধক আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভের জন্য যদি পৃথিবীর শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যেতেও মনস্থ করে, অমনি দেখতে পায় যে, তার গুরু কাছেই এসে হাজির হয়েছেন।

নীরবে মনে মনে তাতে সায় দিলাম। মনে পরল, কাশীর আশ্রমে আমার প্রার্থনার উত্তরে জনাকীর্ণ গলিপথে শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজীর সঙ্গে সেই সাক্ষাৎ!

“একটা ছোটগাছের ঘর জোগাড় করে নিতে পারবে কি, সেখানে দরজা বন্ধ করে তুমি একলা থাকতে পার?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।” দেখলাম যে সাধারণ থেকে ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপারে সাধুমহাশয় অতি দ্রুতবেগে নেমে আসছেন।

“সেটাই হবে তোমার গুহা।” এই বলে আমার উপর তিনি যে জ্ঞানালোকদীপ্ত দৃষ্টিপাত করলেন তা আজও ভুলি নি। “সেটাই হবে তোমার পবিত্র গিরি, আর সেখানেই তুমি ভগবানকে খুঁজে পাবে বুঝলে?”

তাঁর সহজ কথাগুলো তৎক্ষণাৎ হিমালয়ের জন্য আমাদের জীবনব্যাপী দৌর্বল্য একেবারে দূর করে দিল। চিরন্তন তুষার আর পর্বতের স্বপ্ন থেকে আমি যেন সেই আগুনে ধানক্ষেতের মাঝে হঠাৎ জেগে উঠলাম।

“বৎস! তোমার ঈশ্বরলাভের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবিকই প্রশংসার যোগ্য। তোমার উপর আমার প্রগাঢ় স্নেহ জন্মেছে।” বলে রামগোপাল বাবু আমার হাত ধরে কাছেই জঙ্গলের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় একটি মনোরম কুটিরের ভিতর নিয়ে গেলেন। মাটির ঘর, নারকেলপাতা দিয়ে ছাওয়া, প্রবেশ পথে সদ্যফোটা ফুলের শোভা।

সাধুপ্রবর তাঁর ছোট্ট কুঁড়েঘরটির ভিতর একটি ছায়াশীতল বাঁশের মাচার উপর নিয়ে গিয়ে আমায় বসালেন। একখণ্ড মিছরি আর খানিকটা মিষ্টি লেবুর সরবত দিয়ে অতিথি সৎকার করবার পর আমরা মাটির রোয়াকে গিয়ে পদ্মাসনে বসলাম। ঘণ্টাচারেক ধ্যানে কাটল।

পরে চোখ খুলে দেখলাম যে, জ্যোৎস্নাস্নাত যোগিবরের দেহ তখনও নিথর, নিস্পন্দ! উদরে তখন ক্ষুধার আগুন জ্বলছে, রক্তচক্ষু প্রদর্শনে উদরকে শাসন করে বোঝাচ্ছি-মানুষ কেবল অন্ন ভক্ষণ করেই বাঁচে না; হেনকালে রামগোপাল বাবু আসন ছেড়ে উঠে পরে বললেন, “আহা, দেখছি বড্ড খিদে পেয়েছে, না? আচ্ছা, খাবার শীগগিরই তৈরি হচ্ছে।”

রোয়াকের এককোণে মাটির উনুন জ্বেলে ভাত আর ডাল চটপট সিদ্ধ করে নামিয়ে কলাপাতায় বেড়ে দেওয়া হল। গৃহস্বামী রন্ধনকার্যে আমার সর্ববিধ সহায়তাই সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। কথায় আছে, “অতিথি নারায়ণ”। এ নীতি হিন্দুরা স্মরণাতীত কাল হতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করে আসছে।

পরবর্তীকালে বিদেশে ভ্রমণের সময় আমি দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম যে, বহু দেশেই গ্রামবাসীদের মধ্যে এই রকম অতিথিদের আদর আপ্যায়ন বা তাদের প্রতি সসম্মান ব্যবহার প্রচলিত আছে। শহরবাসীর অতিথিসেবার উৎসাহ, অগণিত অপরিচিত মুখের আবির্ভাবের কারণে ক্রমশই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

জঙ্গলের ভিতর সেই ছোট্ট ঘরটিতে যখন আমি যোগিবরের পাশে আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছিলাম, তখন হাটবাজারের শব্দ প্রায় অভাবনীয় দূরে বলেই মনে হচ্ছিল। সেই ছোট্ট ঘরটি এক রহস্যময় মৃদু আলোয় আলোকিত।

কতকগুলো ছেঁড়া কম্বল পেতে রামগোপাল বাবু আমার বিছানা করে দিলেন আর নিজে একটা মাদুরের উপর বসলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির চুম্বক আকর্ষণে অভিভূত হয়ে আমি ভরসা করে একটি অনুরোধ করে বসলাম, “মশায়, আমার ‘সমাধি’ লাভ করিয়ে দিন না কেন?”

“বাবা! ভাগবৎসঙ্গ লাভ করিয়ে দিতে পারলে আমি খুব খুশিই হতাম, কিন্তু তা করবার লোক তো আমি নই।” সাধুবর তখন অর্ধোন্মীলিতনয়নে আমায় নিরীক্ষণ করে বললেন, “তোমার গুরুদেবই সে অনুভূতি তোমায় শীগগিরই দেবেন। তোমার শরীর এখনও পর্যন্ত তেমনভাবে তৈরি হয় নি। ছোট ইলেকট্রিক বাল্বে যেমন অতিরিক্ত তড়িৎ চালালে তাক্ষুণি তা ফেটে যায়, তোমার তন্ত্রিকাগুলোও তেমনি সমাধিলাভের জন্যে এখনও উপযুক্তভাবে তৈরি হয়নি। তোমায় যদি আমি এখনই ব্রহ্মানন্দ উপভোগ করাই তা হলে তুমি এক্ষুণি জ্বলে শেষ হয়ে যাবে; মনে হবে যেন তোমার শরীরকোষের প্রতি অণুপরমাণুতে আগুন লেগে গেছে।”

চিন্তিতভাবে যোগীবর বলতে লাগলেন, “তুমি আমার কাছ থেকে ব্রহ্মজ্ঞান চাইছ! কিন্তু আমি ভাবছি, দীনাতিদীন আমি, সামান্য যেটুকু ধ্যানধারণা করতে পেরেছি – তা দিয়ে যদি আমি ভগবৎকৃপা লাভ করে থাকি, তাহলে শেষ হিসাবনিকাশের দিন তাঁর চোখে আমার কি মূল্য দাঁড়াবে, তাও তো বুঝে উঠতে পাচ্ছি নে!”

“মশায়! আপনি তো একমনে বহুদিন ধরেই ভগবানকে ডেকে আসছেন। তবে আর ভাবনা কিসের?”

“তা বটে, তবে বেশি আর আমি কি করেছি। বেহারী পণ্ডিত বোধহয় তোমায় আমার জীবনের কথা কিছু বলে থাকবে। বিশ বছর ধরে একটি নির্জন গুহায় আমি রোজ আঠার ঘণ্টা করে ধ্যানে বসতাম। তারপর ওখান থেকে চলে গিয়ে আমি আরও একটি দুর্গম গুহায় প্রবেশ করে সেখানে পঁচিশ বছর ধরে রোজ প্রায় কুড়ি ঘণ্টা করে যোগাভ্যাস করতাম। আমার ঘুমের দরকার হত না, কারণ আমি নিত্য ভগবৎসঙ্গ লাভ করতাম। সাধারণ অবচেতন অবস্থায় আংশিক শান্তির চেয়ে সমাধির পরিপূর্ণ শান্তির মধ্যেই আমার দেহ পূর্ণবিশ্রাম লাভ করত।

“ঘুমের সময় মাংসপেশীগুলো শিথিল হয়ে পড়ে; কিন্তু হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এবং রক্ত চলাচলের কাজ তো সর্বদাই চলেছে-তাদের কোন বিশ্রাম নেই। সমাধিলাভ হলে পর মহাজাগতিক শক্তির তড়িদাঘাতে শরীরের ভিতরের যন্ত্রপাতিগুলোর প্রাণশক্তি স্তম্ভিত অবস্থায় থাকে। এই উপায়েই বহুবৎসর ধরে আমি ঘুমের কোন প্রয়োজন বোধ করি নি।” তারপর বললেন, “একটা সময় আসবে যখন তুমিও ঘুম ত্যাগ করতে পারবে।”

“কি আশ্চর্য! আপনি এতদিন ধরে ধ্যানধারণা করে এলেন, তবুও বলেন যে ভগবানের কৃপালাভ করবেন কি না? তা হলে আমাদের মত অভাগা অকিঞ্চনদের কি গতি হবে?” বলে তো অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম।

“বাবা! এটা বুঝছ না কেন যে, ভগবান অনন্তস্বরূপ। তাঁকে মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর ধ্যান করেই সব বুঝে ফেলব – এ আশা একান্ত অসংগত নয় কি? যাই হোক, বাবাজী আমাদের এই বলে আশ্বাস দিয়েছেন যে, এমন কি সামান্যমাত্র ধ্যানেই মানুষের দারুণ মৃত্যুভয় ও পরলোকের ভয় নিবারণ হবে। দেখ, তোমার আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা সামান্য একটা ছোট্ট পাহাড়ে ধরে রেখ না। তাকে একেবারে অসীম ভগবৎপ্রাপ্তির নক্ষত্রলোকে তুলে ধর। কঠোর পরিশ্রম করলে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে পৌঁছতে পারবে।”

আশায় উল্লসিত হয়ে তাঁর কাছ থেকে আরও কিছু ঈশ্বরীয় কথা শুনতে চাইলাম।

তিনি লাহিড়ী মহাশয়ের গুরু, বাবাজী মহারাজের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের অদ্ভুত কাহিনী শোনালেন। মাঝরাতের কাছাকাছি রামগোপাল বাবু মৌনাবলম্বন করলেন, আর আমিও কম্বলের উপর শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই দেখলাম যে, চারধারে যেন অনবরত বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে; আমার ভিতরকার অনন্ত আকাশ যেন উজ্জ্বল জ্যোতিঃর বন্যায় প্লাবিত!

চোখ মেলে বাইরে চাইলাম, দেখলাম যে সেই একই চোখঝলসানো আলো! অন্তশ্চক্ষুতে দেখতে পেলাম, সমস্ত ঘরটা যেন সেই অনন্ত মহাকাশের একটা অংশ হয়ে গেছে!

“ঘুম আসছে না, নাকি?”

“কি করে ঘুমাই বলুন, চোখ বুজলেই বা কি আর খুললেই বা কি, চোখের সামনে যদি অনবরত বিদ্যুৎ চমকায়, তাহলে ঘুম আসবে কি করে, বলুন?”

রামগোপাল বাবু সস্নেহে বললেন, “যাক! তোমার ভাগ্য ভাল, এ রকম অনুভূতি লাভ করলে। এ রকম আধ্যাত্মিক জ্যোতিঃর দর্শন সহজে কারোর ভাগ্যে হয় না।”

ভোরবেলা হতেই রামগোপাল বাবু আমায় এক টুকরো মিছরি দিয়ে বললেন, “এবার স্বস্থানে প্রস্থান কর!” তাঁর কাছ হতে বিদায় নিয়ে আসতে আমার এতদূর অনিচ্ছা হচ্ছিল যে, দুই গাল বেয়ে অশ্রুধারা অজস্রধারে গড়িয়ে পরতে লাগল।

রামগোপাল বাবু তখন অত্যন্ত কোমলস্বরে বললেন, “যাক! নেহাৎ শুধুহাতে তোমায় আজ আর ফেরাব না, একটা কিছু তোমার জন্যে করতে হবে।” এই বলে একটু মৃদু হেসে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল, আর নড়তেচড়তে পারলাম না।

যোগিবরের কাছ হতে নিঃসৃত শান্তির তরঙ্গ আমার সকল সত্তাকে পরিপ্লাবিত করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার পিঠের একটা বেদনা একদম আরাম হয়ে গেল; বেদনাটা বহুবছর ধরে মাঝে মাঝেই আমায় কষ্ট দিচ্ছিল।

অপরূপ জ্যোতির্ময় আনন্দসাগরে স্নান করে উঠে যেন নবজন্ম পেলাম, আর কাঁদলাম না! সাধু রামগোপাল মজুমদারের চরণ স্পর্শ করে জঙ্গলের রাস্তা ধরলাম। তারপর নানা ঝোপঝাড় আর ধানের ক্ষেত পার হয়ে অবশেষে তারকেশ্বরে এসে পৌঁছালাম।

সেই পবিত্র তীর্থস্থানে আবার দ্বিতীয়বার দর্শনের জন্য গিয়ে হাজির হলাম। এবার বাবা তারকেশ্বরের সামনে দণ্ডবৎ হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম। অন্তর্দৃষ্টির সামনে দেখতে পেলাম, গোলাকার প্রস্তরখণ্ডটি যেন ক্রমশঃই বর্ধিত হয়ে ব্রহ্মাণ্ডে পরিণত হলো। চক্রের মধ্যে চক্র, অঞ্চলের পর অঞ্চল, সবই যেন আধ্যাত্মিক সম্পদে পরিপূর্ণ।

ঘণ্টাখানেক বাদে প্রফুল্ল চিত্তে কলকাতার ট্রেন ধরলাম। এবার আমার ভ্রমণের শেষ হলো উচ্চ পর্বতমালার মধ্যে নয়, হিমালয়ের মত সুমহান আমার গুরুমহারাজের সামনে!

…………………………………………
যোগী-কথামৃত ( Autobiography of a Yogi ) শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত

পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।

মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -পরমহংস যোগানন্দ

পুণঃপ্রচারে বিনীত : প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!