ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়

ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়

বর্ধমানের বন্ডুলগ্রামে ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় জন্ম৷ ইনিই পরবর্তীকালের যোগীরাজ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস৷ কৈশোরে তাঁকে একটি পাগলা-কুকুর কামড়ায়৷ গ্রামে চিকিত্‍সায় সুস্থ না হওয়ায় চন্দননগরের পার্শ্ববর্তী নোঁদালপাড়ায় চিকিত্‍সার জন্য নিয়ে আসা হয়৷ তাতেও কোনও উপকার না পাওয়ায় তিনি হুগলিতে আসেন।

সেখানে এক দিন দেখেন এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী নিরন্তর গঙ্গার জলে ডুবছেন এবং উঠছেন আর গঙ্গাজল তাঁর সঙ্গে সঙ্গে স্তম্ভের মতো স্ফীত হয়ে উঠছে পড়ছে৷ সন্ন্যাসী বিখ্যাত জ্ঞানগঞ্জের পরমহংস নীমানন্দ স্বামী।

সন্ন্যাসী স্পর্শমাত্র ভোলানাথকে সুস্থ করেন এবং কিছু দিনের মধ্যে তাঁকে এক অলৌকিক উপায়ে জ্ঞানগঞ্জে নিয়ে আসেন যেখানে নীমানন্দের গুরু মহর্ষি মহাতপা, যাঁর বয়স ১২০০ বছরেরও অধিক, ভোলানাথকে দীক্ষাদানে শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন৷ জ্ঞানগঞ্জ উত্তরাপথের মধ্যে একটি অতি দুর্গম যোগাশ্রম ও সিদ্ধভূমি৷

এর অবস্থান তিব্বতীয় হিমালয়ের স্থলভূমিতে হলেও এ কোনও ভৌম স্থান নয়। লোকচক্ষুর অগোচরে এই অদৃশ্য যোগভূমি কোনও পর্যটকের দৃশ্য নয়৷ এখানকার অধিষ্ঠাতৃবর্গের আনুকূল্য ব্যতীত এই স্থান অগম্য।

এখানে থাকেন ব্রহ্মচারী যুবক, ব্রহ্মচারিণী, বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী এবং মহাশক্তিশালী সিদ্ধ পরমহংসগণ৷ পূর্ণকে পূর্ণতর এবং পূর্ণতম করার লক্ষ্যে অনন্ত অবস্থার ভিতর দিয়ে তাঁদের ক্রম-উত্‍ক্রমণ। এই দৃষ্টিতে জ্ঞানগঞ্জে ক্ষেত্র বা স্তর বিন্যাস৷ বিশ্ব-কল্যাণ এখানকার তৃতীয় ক্ষেত্রের লক্ষ্য৷

এই স্থানটি এত গুপ্ত যে সুদীর্ঘকালেও চিন ব্রহ্মদেশ ও আসামের বারো জন ছাড়া আর কেউ এই স্থানের সন্ধান জানত না৷ একজন গ্রিক পর্যটক বলেন যে এই মঠের মতো অদ্ভুত স্থান পৃথিবীতে কোথাও নেই৷ তাঁর মতে এটিই প্রকৃত ‘হেভেন্ অন্ আর্থ’৷ এর কথা বলেছেন চৈনিক ঐতিহাসিক Fengyliyan৷ পর্বতবেষ্টিত একটি উপত্যকার মাঝে সাত-আট মাইল বিস্তৃত আশ্রম৷ চতুর্দিকে জলপূর্ণ পরিখা।

যাতায়াতের জন্য আছে একটি ধনুরাকার সেতু৷ আশ্রমটি শিক্ষার ক্রম অনুসারে স্তরে স্তরে সাজানো। এখানে থাকেন ব্রহ্মচারী যুবক, ব্রহ্মচারিণী, বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী এবং মহাশক্তিশালী সিদ্ধ পরমহংসগণ৷ পূর্ণকে পূর্ণতর এবং পূর্ণতম করার লক্ষ্যে অনন্ত অবস্থার ভিতর দিয়ে তাঁদের ক্রম-উত্‍ক্রমণ৷ এই দৃষ্টিতে জ্ঞানগঞ্জে ক্ষেত্র বা স্তর বিন্যাস৷ বিশ্ব-কল্যাণ এখানকার তৃতীয় ক্ষেত্রের লক্ষ্য৷

এই কাজে তিনি অনেকদূর অগ্রসরও হয়েছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর গুরুবর্গের হস্তক্ষেপে তাঁর প্রচেষ্টা পূর্ণতা লাভে অসফল হয়। নবমুণ্ডি আসনের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও ছিল জগতের হিতসাধন।

ভারতীয় যোগমার্গে শ্রী শ্রী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেব এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। যোগৈশ্বর্যে অনন্য তো বটেই, তাঁর অসাধারণত্ব প্রকাশ পেয়েছে বিশেষ দুটি কারণে – এক দীর্ঘ কুড়ি বছরের নিরলস সাধনার দ্বারা কাশীতে নবমুণ্ডি আসনের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যটি হল সূর্যবিজ্ঞান। সূর্যবিজ্ঞান বলতে কেউ যেন বর্তমানের সোলার সায়েন্স না বোঝেন।

এই সূর্যবিজ্ঞান হল জগতে প্রচলিত অতি প্রাচীন ব্রহ্মবিদ্যা এবং এই বিদ্যার দ্বারা করা যায় না, এমন কিছু জগতে প্রায় বিরল। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ শ্রী শ্রী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেবের কাছে সূর্যবিজ্ঞানের প্রয়োগে এক বস্তুর আরেক বস্তুতে রূপান্তর, গন্ধ সৃষ্টি প্রভৃতি একাধিক ঘটনা চাক্ষুষ দর্শন করেছেন এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকাতে এই বিষয়ে অনেক লেখাও বেরিয়েছে।

পরমহংসদেবের ইচ্ছা ছিল একটি সূর্যবিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করবার যার দ্বারা যেকোন আরোগ্যের মাত্র বাইশ মিনিটে নিরাময় সম্ভব হত। এই কাজে তিনি অনেকদূর অগ্রসরও হয়েছিলেন কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর গুরুবর্গের হস্তক্ষেপে তাঁর প্রচেষ্টা পূর্ণতা লাভে অসফল হয়। নবমুণ্ডি আসনের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও ছিল জগতের হিতসাধন।

নবমুণ্ডি আসনের তত্ত্ব অতি গূঢ় এবং বহু বহু অসাধারণ শাস্ত্রবিদদেরও বোধের অগম্য। অতি স্থূল দৃষ্টিতে বলা যায় যে মা নবমুণ্ডির কাছে সকাম ও নিষ্কাম উভয় প্রকার প্রার্থনাই সফলকাম হয়।

গুরুবর্গের নির্দেশানুসারে এইসময়ে তিনি সংসার প্রতিপালনের জন্যে চিকিৎসা এবং যোগজ্যোতিষের চর্চা করতেন। বাবাজি তাঁর যোগদৃষ্টিতে রোগের মূল সহজেই বুঝতে পারবার কারণে রোগীদের সকলেই নিরাময় লাভ করতেন। যেসকল রোগীর বাঁচবার উপায় নেই, তাদের চিকিৎসার ভার তিনি গ্রহণ করতেন না।

বাবাজির (শ্রী শ্রী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেব) জীবন ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায় যে তিনি যোগমার্গে এক অক্লান্ত কর্মী ছিলেন এবং বরাবরই তাঁর শিষ্যদেরও কর্মের ওপর জোর দিতে বলতেন। কর্ম বলতে যোগক্রিয়ার কথাই বলা হয়েছে। কর্ম ও কৃপা একে অপরকে আশ্রয় করে থাকে – এই হল শাস্ত্রের অভিমত।

কিন্তু বিনা কর্মে কৃপার দ্যাখা মেলে না। অহৈতুকি কৃপার উল্লেখ আছে বটে শাস্ত্রে তবে তারও মূলে অবশ্যই কর্ম আছে – যা বর্তমান লৌকিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাও হতে পারে। গুরু আদেশের অমান্যতায় বিশেষ দুর্গতি হয়। বাবাজি ছিলেন এতোই মমতাময় যে পাছে তাঁর আদেশ অমান্য করায় শিষ্য এবং ভক্তদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি যাতে না হয়, তাঁর জন্যে তিনি আদেশের পরিবর্তে উপদেশ প্রয়োগ করতেন।

তাঁর মাতৃভক্তি ছিল অসাধারণ। অতি বাল্যকালেই তিনি তাঁর পিতাকে হারিয়ে জননী মা রাজরাজেশ্বরী দেবীর স্নেহে ও মমতায় বড় হয়ে উঠতে থাকেন। বাবাজির চরিত্রের বহুবিধ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল তাঁর অসাধারণ মাতৃভক্তি ঠিক তেমনই অপরদিকে ছিল তাঁর গুরুবর্গের প্রতি আজীবন প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলবার অনন্যসাধারণ প্রয়াস।

গুরু মহর্ষি মহাতপারই এক শিষ্য শ্রী শ্রী ভৃগুরাম পরমহংসদেবের ছায়ায় বালক ভোলানাথের (শ্রী শ্রী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসদেবের বাল্যকালের নাম) যোগশিক্ষা চলতে থাকে এবং জ্ঞানগঞ্জেরই অপর এক পরমহংস শ্রী শ্রী শ্যামানন্দ পরমহংসদেবের তত্ত্বাবধানে তাঁর সূর্যবিজ্ঞানের শিক্ষা চলতে থাকে।

বাবাজি তীর্থস্বামী অবস্থায় গার্হস্থ্যাশ্রমে প্রবেশ করেন এবং স্বীয় গুরু মহর্ষি মহাতপা পরমহংসদেবের নির্দেশে বিবাহ করে সংসারে মনোযোগ করেন। গুরুবর্গের নির্দেশানুসারে এইসময়ে তিনি সংসার প্রতিপালনের জন্যে চিকিৎসা এবং যোগজ্যোতিষের চর্চা করতেন। বাবাজি তাঁর যোগদৃষ্টিতে রোগের মূল সহজেই বুঝতে পারবার কারণে রোগীদের সকলেই নিরাময় লাভ করতেন।

যেসকল রোগীর বাঁচবার উপায় নেই, তাদের চিকিৎসার ভার তিনি গ্রহণ করতেন না। যোগজ্যোতিষ জ্ঞানগঞ্জের বহুবিধ প্রদত্ত শিক্ষার মধ্যে একটি। নির্ভুলভাবে ভবিষ্যতের কথা বলে দেওয়া সম্ভব একমাত্র যোগজ্যোতিষের দ্বারা।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে যখন তাঁর গুরু মহাতাপস বিষ্ণু স্বরূপোস্থিত মহর্ষি মহাতপা, বাবাজিকে দীর্ঘ সাধনার অন্তে সংসার জীবনে প্রবেশ করতে আদেশ করেন সেইসময় শ্রী শ্রী পরমহংসজি (যদিও সেই সময়ে তিনি পরমহংসাবস্থা লাভ করেননি) সবিনয়ে শ্রীগুরু সমীপে সংসার প্রতিপালনের যথাযথ উপায় জানতে চান। কারণ সংসার হল বস্তুজগত যা অর্থের ওপর নির্ভরশীল।

বাবাজি সেই সময়েই যোগপথে অত্যুন্নত যোগীরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেও বস্তুজগতের অর্থ লাভের উপায়ে ছিলেন অনভিজ্ঞ। এই অবস্থায় তাঁরা তাঁকে সংসারে ফিরে গিয়ে সংসার প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জনের জন্যে চিকিৎসা এবং যোগজ্যোতিষের চর্চা করবার আদেশ প্রদান করেন।

বাবাজি কথাপ্রসঙ্গে একজন ভক্তকে জানান যে শিষ্য করবার অভিপ্রায় মোটেও তাঁর ছিল না ( শিষ্য করে ভূতে) কিন্তু পরম শ্রদ্ধেয় দাদাগুরুদেব শ্রী শ্রী ভৃগুরাম পরমহংসদেবের আদেশেই শিষ্য গ্রহণ করা। বোধকরি সংসার জীবনে প্রবেশ তাঁর প্রারব্ধ ছিল এবং তাঁর প্রারব্ধের ভোগ সংসারের কত শতসহস্র পাপীতাপীকে আত্মস্থ হতে সহায়তা করেছে।

এই হল পরমপুরুষের খেলা। তিনিই জাল বুনেছেন আবার সেই জাল তিনিই বাবাজির মত মুষ্টিমেয় সুযোগ্য সন্তানের সাহায্যে কেটে চলেছেন।

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!