লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা

বন্ধুবর উপেন্দ্রমোহন চৌধুরী বেশ গম্ভীরভাবে একদিন বলল, জানো! কালরাত্তিরে এক ধর্মসভায় গিয়েছিলাম। দেখি, এক যোগী মাটি থেকে কয়েকফুট উঁচুতে শূন্যে অবস্থান করছেন!

উৎসাহব্যাঞ্জক হাসির সঙ্গে বললাম, বোধহয় আমি তাঁর নাম আন্দাজ করতে পারি। আচ্ছা, তিনি কি আপার সার্কুলার রোডের ভাদুড়ী মশাই?

উপেন্দ্র নতুন খবর আমদানি করার কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে একটু যেন ক্ষুন্ন হয়েই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। সাধু-সন্ন্যাসীদের ব্যাপারে আমার কৌতুহল বন্ধুবান্ধবদের বেশ ভালোভাবেই জানা ছিল; কাজেই নতুন কোনো সাধুর সন্ধান পেয়ে আমাকে তা জানতে পারলে তাদের খুব আনন্দই হত।

বললাম, উনি আমাদের বাড়ির খুব কাছেই থাকেন; তাই প্রায়ই ওঁকে দেখতে যাই।কথাটা শুনে উপেন্দ্রের মুখে বেশ একটা গভীর আগ্রহ ফুটে উঠলো দেখে আমি বলতে শুরু করলাম, আমি তাঁর অনেক অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ দেখেছি। পতাঞ্জলীর অষ্টাঙ্গ যোগের মধ্যে প্রাণায়ামের বিভিন্ন প্রণালী তিনি খুব দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ব করছেন।

একবার তিনি আমার সামনে ‘ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম’ এমন অত্যাশ্চর্য জোরের সঙ্গে করে দেখালেন যে, মনে হল বুঝি ঘরের মধ্যে সত্যিসত্যিই একটা প্রবল ঝড় উঠেছে। তারপর তিনি ঝোড়ো নিশ্বাস থামিয়ে উচ্চকোটির অতিমানস চেতনায় নিমগ্ন হয়ে গিয়ে একেবারে নিস্পন্ন হয়ে পড়লেন। ঝড়ের পর শান্তির স্বর্গীয় জ্যোতির ছটা যা তাঁর মুখে দেখা গেলো, তা ভোলবার নয়।

শুনেছি, সাধুটি নাকি বাড়ি থেকে কোথাও একটা বেরোন না?

সত্যিই তাই! তিনি আজ কুড়ি বছর ধরে বাড়ির মধ্যেই আছেন। পালপার্বণের সময়ই কেবল তাঁর এ নিয়মের কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে। সে সময় হয়তবা সামনের ফুটপাথে একটু বেড়ালেন, এই যা। তাঁকে দেখলেই ভিখিরির দল ছুটে আসে, কারণ ভাদুড়ী মশায়ের দয়ার কথা সকলেরই সুবিদিত।

আচ্ছা, প্রবল মধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়িয়ে কি করে তিনি শূন্যে ভাসমান থাকেন?

কতকগুলো প্রাণায়াম প্রক্রিয়া অনুশীলনের পর যোগীদের শরীরের ভর একেবারে কমে যায়; তাতে করে দেহ শূন্যে ভেসে থাকতে অথবা ব্যাঙের মত লাফিয়ে চলতে পারে। এমন কি সেই সব সাধু-সন্ন্যাসীরা, যাঁরা যোগপ্রণালীর কোন বিশেষ সাধনা আদৌ অভ্যাস করেন না, জানা গেছে যে ঈশ্বরের গভীর ধ্যানের সময় তাঁদেরও দেহ এমনতরো ভাসতে দেখা যায়।

তা হলে তো, এঁর সমন্ধে আরও কিছু জানার দরকার দেখছি। আচ্ছা, তুমি কি রোজই তাঁর সান্ধ্য সভায় যাও নাকি? উপেন্দ্রের চোখ দু’টি কৌতুহলে জ্বলজ্বল করে উঠলো।

হ্যাঁ, প্রায়ই আমি সেখানে যাই।

জিজ্ঞাসা করলো, দেখা করার কোনো কথা আগে থেকে ঠিক করা আছে কিনা। তাঁর গুরুদেব সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সময়ে এসে পরে আমায় পত্রপাঠ বিদায়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন।

তাঁর জ্ঞানোপদেশের সরসতা আমায় ভারি তৃপ্তি আর আনন্দ দেয়। মুশকিল হলো এই যে, মাঝে মাঝে আমার উচ্চৈঃস্বরে হাসি সভার গাম্ভীর্য নষ্ট করে ফেলে। তাতে সাধু বিরক্ত হন না বটে, কিন্তু ওঁর শিষ্যরা রাগে অগ্নশর্মা হয়ে ওঠে।

সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় ভাদুড়ী মশায়ের আশ্রমের পাশ দিয়ে আসতে আসতে একবার তাঁকে দর্শন করে আসবো বলে মনস্থ করলাম। সাধারণ লোকদের সেখানে প্রবেশ লাভ দুরূহ। জনৈক শিষ্য একতলায় থেকে গুরুর নির্জনতা যাতে ভঙ্গ না হয়, সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখে।  শিষ্যটি দারুণ কড়া, সহজে কাউকে তাঁর কাছে ঘেঁষতে দেয় না।

জিজ্ঞাসা করলো, দেখা করার কোনো কথা আগে থেকে ঠিক করা আছে কিনা। তাঁর গুরুদেব সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সময়ে এসে পরে আমায় পত্রপাঠ বিদায়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন।

ভাদুড়ী মশাই চোখদুটি মিট মিট করে বললেন, মুকুন্দর যখনই ইচ্ছা হবে, তখনই আসবে। আমার নির্জনে থাকার ব্যবস্থা আমার নিজের আরামের জন্যে নয়, বাইরের লোকেদের জন্যে, বুঝলে? সংসারি লোক সরলতা চায় না, তাতে করে তাদের মোহ ভঙ্গ হয়! সাধুরা যে কেবল বিরল তাই নয়, দূর্বোধ্যও বটে। শাস্ত্রেও তাঁদের চালচলন একটু খাপছাড়া ধরণেরই বলে মনে হয়।

আমি ভাদুড়ী মশায়ের সঙ্গে উপরতলায় তাঁর অত্যন্ত সাদাসিধে আস্তানায় গিয়ে পৌঁছলাম। সেখান থেকে কদাচিৎ তিনি কোথাও যেতেন। সাধারণ পার্থিব সুখদুঃখের মিছিল সাধুসন্তরা প্রায়ই উপেক্ষা করে চলেন। এসব তাঁদের সৃষ্টির বাইরেই থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা যুগসিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। সাধু-ঋষিগণের যারা সমসাময়িক, তারা এই সঙ্কীর্ণ বর্তমানেতে সীমাবদ্ধ নন।

বললাম, মহর্ষি! আমার পরিচিত যোগী ঋষিদের মধ্যে একমাত্র আপনাকেই দেখলাম, যিনি সর্বদাই গৃহান্তরালে থাকেন।

ভগবান সময় সময় সাধু-সন্ন্যাসীদের একেবারে ভারি অপ্রত্যাশিত স্থানে এনে ফেলেন, যাতে না আমরা ভেবে বসি যে, তিনি একটা বিধিনিয়মের প্রতীক ছাড়া আর কিছুই নন!

ভাদুড়ী মহাশয় তাঁর তেজোদীপ্ত দেহটিকে পদ্মাসনে আবদ্ধ করলেন। সত্তর বছর বয়সেও বার্ধক্যজনিত অথবা তাঁর স্থির শান্ত জীবনের অপ্রীতিকর কোন চিহ্নই দেখতে পেলাম না।

বলিষ্ঠ ঋজু শরীর ভাদুড়ী মশায় সকল বিষয়েই আদর্শ স্থানীয়। শাস্ত্রবর্ণিত প্রাচীন মুণিঋষিদের মতই তাঁর প্রসন্ন আসন। জ্ঞানোন্নত

শ্বশ্রূমন্ডিত মুখমণ্ডলী তিনি সর্বদা ঋজু ভঙ্গীমায় উপবেশন করেন দৃষ্টি তাঁর ঈশ্বরে নিবদ্ধ।

আমরা দুজনে ধ্যানে বসলাম। ঘন্টাখানেক পরে তাঁর মধুর শান্তস্বরে আমার ধ্যান ভঙ্গ হলো।

সাধারণ লোকেরা ‘ধ্যানযোগে’র চেয়ে ‘জলযোগে’র কথাটাই বেশি বোঝে, বুঝলে? তাঁর এই যৌগিক রসিকতা আমায় হাসিতে উচ্ছ্বসিত করে তুলল।

ধ্যানের চেয়ে ভগবানকে আরও বেশি করে ভালোবাসতে স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যে বললেন, প্রায়ই’ত নীরবে ধ্যানে বস, কিন্তু প্রকৃত ঈশ্বর দর্শন লাভ তোমার হয়েছে কি? প্রক্রিয়াকে উদ্দীষ্ট বলে ভুল কোরো না।

ধ্যান শেষ হবার পর তিনি কয়েকটি আম আমায় খেতে দিলেন। গম্ভীর প্রকৃতির মধ্যেও কিন্তু তাঁর সরস মনের পরিচয় আমাকে আনন্দিত করে। সাধারণ লোকেরা ‘ধ্যানযোগে’র চেয়ে ‘জলযোগে’র কথাটাই বেশি বোঝে, বুঝলে? তাঁর এই যৌগিক রসিকতা আমায় হাসিতে উচ্ছ্বসিত করে তুলল।

বললেন, বাবা, তোমার কি হাসি!

তাঁর দৃষ্টিতে সকৌতুক স্নেহের দীপ্তি। তাঁর নিজের মুখ কিন্তু সদাই গম্ভীর, অথচ তাতে একটি স্বর্গীয় হাসির স্পর্শ রয়েছে। তাঁর দুটি পদ্মলোচন, অন্তর্গুঢ় দিব্যহাসিতে উজ্জ্বল। টেবিলের উপর রাখা কতকগুলো মোটা খাম দেখিয়ে তিনি বললেন, সুদূর আমেরিকা থেকে এই চিঠিগুলো এসেছে। সেখানকার কিছু সভাসমিতির সঙ্গে আমার পত্রালাপ চলে।

শাস্ত্রে ঈশ্বর একমাত্র সদার্থক সৃজন তত্ত্বরূপে বর্ণিত হয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট সত্ত্বা অক্রিয় ‘মায়া’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ঐ উত্তর শুনে সাধু  মীরাবাঈয়ের চরণাশ্রয় করেন (সারকথা একমাত্র তিনিই পুরুষ, আর আমরা সবাই প্রকৃতি)। মীরাবাঈ বহু ভক্তিরসাত্মক সঙ্গীত রচনা করে গেছেন, সেসব ভারতের সর্বত্র সদরে গীত হয়ে থাকে।

দেখছি তাদের সভ্যদের যোগসমন্ধে খুবই আগ্রহ। কলম্বাসের চেয়েও তাদের দিকনির্ণয়ের জ্ঞান সুক্ষ্ম; এরা ভারতবর্ষকে নতুন করে আবার আবিষ্কার করছে। আমি তাদের এ বিষয়ে সাহায্য করে খুব খুশি।

দিনের আলোর মত যোগের জ্ঞান যে চায়, তার কাছেই তা বিনামূল্যে অবারিত।

মানুষের মুক্তির জন্যে মুণিঋষিরা যা একান্ত প্রয়োজনীয় বোধ করেছিলেন, সেটা প্রাশ্চাত্যের লোকেদের জন্যে হাল্কা করে দিয়ে আর কাজ নেই। আত্মায় এক, কিন্তু বাইরের অভিজ্ঞতায় ভিন্ন হলেও কি পশ্চিম, কি পূর্ব, কেউই কিছুই উন্নতি করতে পারবে না, যদি না বিধি নিয়মানুযায়ী যোগাভ্যাস করা যায়।

সাধু মহাশয় তাঁর শান্তস্নিগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তখন বুঝতেই পারিনি যে, এই সব কথাগুলোর মধ্যে আমার ভবিষ্যতের এক গূঢ় ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে। আজ এই কথা লিখতে বসে বুঝতে পারছি যে, সময় সময় আমায় তিনি যেসব ইঙ্গিত করতেন, তার পরিষ্কার মানে এই ছিল যে, হয়ত কোনোদিন বা আমাকে ভারতের শিক্ষাবলী আমেরিকায় বহন করে নিয়ে যেতে হবে।

মহর্ষি, আমার বড্ড ইচ্ছে যে, আপনি জগতের উপকারের জন্যে যোগ সম্বন্ধে একটা বইটই কিছু লেখেন। তিনি বললেন, আমি শিষ্যদের সব তৈরি করছি। তারা আর তাদের শিষ্যেরাই হবে সব এক একটা জীবন্ত পুস্তক। তারা হবে কালের স্বাভাবিক ক্ষয় অথবা সমালোচকদের অস্বাভাবিক সমালোচনাজনিত ক্ষতির ঊর্ধ্বে।

সন্ধ্যায় তাঁর শিষ্যরা না আসা পর্যন্ত আমি একলা তাঁর সঙ্গে বসে রইলাম। ভাদুড়ী মহাশয় তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে তত্ত্বকথা শুরু করলেন। শান্তির প্লাবনে তিনি শ্রোতৃবৃন্দের মানসিক জঞ্জাল সব ধুয়েমুছে দিয়ে যেন তাদের ভগবানের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে চললেন। রূপকচ্ছলে নীতিকথা তিনি বেশ নির্ভুল বাংলায় বলতেন।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় ভাদুড়ী মহাশয় মীরাবাঈয়ের জীবন সংক্রান্ত বিবিধ দার্শনিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা করছিলেন। মধ্যযুগের রাজকুমারী মীরাবাঈ ছিলেন একজন রাজপুতানী, যিনি সাধুসঙ্গ লাভের কামনায় রাজকীয় জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। একজন খুব বড়ো সাধু, সনাতন গোস্বামী, তাঁকে স্ত্রীলোক বলে দর্শন দিতে অস্বীকার করায় তিনি বলেছিলেন,

‘তোমার গুরুজীকে বোলো যে, এক ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ যে পুরুষ আছেন, তা আমি জানি না। তাঁর কাছে আমরা কি সবাই নারী (মায়া বা প্রকৃতি) নই?

শাস্ত্রে ঈশ্বর একমাত্র সদার্থক সৃজন তত্ত্বরূপে বর্ণিত হয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট সত্ত্বা অক্রিয় ‘মায়া’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ঐ উত্তর শুনে সাধু  মীরাবাঈয়ের চরণাশ্রয় করেন (সারকথা একমাত্র তিনিই পুরুষ, আর আমরা সবাই প্রকৃতি)। মীরাবাঈ বহু ভক্তিরসাত্মক সঙ্গীত রচনা করে গেছেন, সেসব ভারতের সর্বত্র সদরে গীত হয়ে থাকে। এখানে তারই একটি উদ্বৃত হল,

নিত নহানে সে হরি মিলে তো জলজন্তু হোই,
ফলমূল খাকে হরি মিলে তো বাদুড় বান্দরাই।
তুলসী পূজনসে হরি মিলে তো মৈ পূজু
তুলসী ঝাড়,
পত্থর পূজনসে হরি মিলে তো মৈ পুঁজু পাহাড়।।

তৃণ ভখনেসে হরি মিলে তো বহুত মৃগী অজা,
স্ত্রী ছোড়নসে হরি মিলে তো বহুত
রহে হৈ খোজা।।
দুধ পিনেসে হরি মিলে তো বহুত বৎস বালা,
মীরা কহে, বিনা প্রেমসে ন মিলে নন্দলালা।।

ভাদুড়ী মহাশয় সেখানে যোগাসনে বসেছিলেন, সেখানে তাঁর পাদুকার কাছে কয়েকজন শিষ্য কিছু প্রণামী রাখলেন। ভারতে প্রচলিত এইরূপ শ্রদ্ধানিবেদনের অর্থ এই যে, শিষ্য তাঁর পার্থিব সকল সম্পদ গুরুপদতলে সমর্পণ করলেন। কৃতজ্ঞ বন্ধুরা ভগবানের  ছদ্মরুপে নিজ সন্তানদের দেখাশুনা করেন। পিতৃপ্রতিম সেই মহর্ষির নিকট হতে বিদায় নিতে গিয়ে, একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে তাঁর এক শিষ্য উচ্ছ্বাসিত আবেগে বলে উঠলেন, গুরুদেব! আপনার তুলনা ভার।

ভগবানের খোঁজে আপনি ঐশ্বর্য্য, নিজের সুখ, সব ত্যাগ করে এসে আজ আমাদের জ্ঞান বিলোচ্ছেন, সত্যিই অদ্ভুত! সকলেই জানত যে, একান্ত মনে যোগমার্গ অবলম্বন করবার জন্য ভাদুড়ী মহাশয় বাল্যকাল থেকেই তাঁদের বংশের বিরাট ঐশ্বর্য্য অতি অবহেলায় ত্যাগ করে চলে এসেছেন।

সাধুপ্রবর মৃদুভৎসনার সঙ্গে বললেন, তুমি ঠিক উল্টো কথা বলছো বাপু। আমি সামান্য গোটাকতক টাকা আর তুচ্ছ কয়েকটা সংসার সুখ ত্যাগ করে চলে এসেছি বটে, কিন্তু তার বদলে কি পেয়েছি জানো, অপার ভূমানন্দের অনন্ত সাম্রাজ্য! তা হলে কি করে আমি সব ত্যাগ করলাম, বলো?

সম্পদ বিলিয়ে দেবার আনন্দ আমি জানি। সেটাকে কি ত্যাগ করা বলে? অদূরদর্শী সাংসারিক লোকেরাই বরং ত্যাগী। কারণ তারা সামান্য গোটাকতক সংসারের খেলনার লোভে তাদের অতুলনীয় দিব্য ঐশ্বর্য্য ত্যাগ করে বসে থাকে!

সাধকশ্রেষ্ঠ’র এই কথাগুলো ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ উপলদ্ধিজাত সত্য। বাহ্য নিরাপত্তার উপর বিশ্বাস করে সংসারী লোক অনিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকে। তাদের ক্লিষ্ট চিন্তাসকল তাদের কপালে কাটাদাগেরই মত ফুটে আছে।

ত্যাগের এই স্ববিরোধী ব্যাখ্যা শুনে আমি হাসতে লাগলাম। এ ব্যাখ্যার জোরে সাধুভিখারীরা কুবেরের ঐশ্বর্য্য পায় আর ধনগর্বিত কোটিপতিরা সব নিজেদের অজ্ঞাতসারে শহিদ হয়ে যায়। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, জানলে ঈশ্বর বিধানে, আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে যে কোন বীমা কোম্পানির চেয়ে বেশ ভালোভাবেই ব্যবস্থা করা আছে।

সাধকশ্রেষ্ঠ’র এই কথাগুলো ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ উপলদ্ধিজাত সত্য। বাহ্য নিরাপত্তার উপর বিশ্বাস করে সংসারী লোক অনিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকে। তাদের ক্লিষ্ট চিন্তাসকল তাদের কপালে কাটাদাগেরই মত ফুটে আছে।

যিনি আমাদের প্রথম নিশ্বাস নেবার সঙ্গে সঙ্গেই বায়ু, মাতৃদুগ্ধ প্রভৃতির ব্যবস্থা করে রেখেছেন, তিনি তাঁর ভক্তদের দিনের পর দিন কি করে রক্ষে করতে হয়, সে ব্যবস্থা জানেন বই কি।

স্কুলের ছুঁটির পর সেই সাধুর কাছে আমার রোজ যাতায়াত চলতে লাগল। নীরব উৎসাহ তিনি আমায় প্রত্যক্ষ ‘অনুভব’ লাভ সাহায্য করতেন। একদিন তিনি আমাদের বসতবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রামমোহন রায় রোডে উঠে গেলেন। তাঁর ভক্তশিষ্যগণ সেখানে নগেন্দ্র মঠ* নামে নূতন একটি আশ্রম স্থাপনা করেছেন।

যদিও এটা আমার এই কাহিনীর কয়েক বছর পরের কথা, তবুও ভাদুড়ী মহাশয়ের শেষ কথাগুলো এখানে একবার উল্লেখ করবো। পশ্চিমে যাবার অব্যাহতি পূর্বে আমি তাঁর কাছে বিদায় আশির্বাদ নেবার জন্যে নতজানু হয়ে বসতেই তিনি বললেন, বাবা, আমেরিকায় যাও; ভারতের প্রাচীন গৌরবই হোক তোমার বিজয়বর্ম। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তোমার কপালে বিজয়তিলক। দেশে বিদেশের মনীষীরা তোমায় সাদরে বরণ করে নেবেন, তা দেখে নিও!

…………………………………
* তাঁর পুরো নাম ছিল নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী।

সূত্র
যোগী-কথামৃত (Autobiography of a Yogi)
শ্রী শ্রী পরমহংস যোগানন্দ বিরচিত পূজনীয় ও পরমারাধ্য আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজের শ্রীকরকমলে অর্পিত।
মৎপ্রণীত ইংরাজী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ্ এ যোগী’র বঙ্গানুবাদে শ্রীমান ইন্দ্রনাথ শেঠের স্বেচ্ছা প্রণোদিত প্রয়াস ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ ও আশির্বাদ জানাই। -শ্রী শ্রীপরমহংস যোগানন্দ

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!