ভবঘুরে কথা
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর

হরিনাম ভালবাসতেন ঠাকুর। নামকীর্তনে যোগদান করতেন। কিন্তু উদ্দণ্ড নৃত্য বা কোন বাড়াবাড়ি পছন্দ করতেন না। ভক্তরা যখন নামগান করতেন, ঠাকুর তখন একপাশে চুপচাপ বসে ধ্যান করতেন। ভক্তরা মুখে যাঁর নামকীর্তন করতেন, ঠাকুর সেই নামেরই ধ্যান করতেন চিত্তে। তাঁর কথা ছিল, ‘নাম নামী ভিন্ন নয়, ভজ নিষ্ঠা করি।’

তিনি বারবার বলতেন, নামের মধ্যেই বিরাজ করেন শ্রীহরি। তাঁর ধ্যানসমৃদ্ধ যোগনেত্রে তিনি নামীকে নেমে আসতে দেখতেন সেই নামের আসরে। ঠাকুর যেন স্পষ্ট দেখতে পেতেন, নামকীর্তনে যাঁর ভজনা করা হচ্ছে, সেই রাধাভাবদ্যুতিকান্তি কৃষ্ণস্বরূপ শ্রীগৌরাঙ্গ স্বয়ং সেই নামের আসরের একপাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

দেখতে দেখতে এক আশ্চর্য পুলকোদগমে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠত তাঁর নির্বোদাভিষিক্ত অঙ্গটি। এক দিব্যভাবে বিভোর হয়ে উঠতে তাঁর অনন্যযুক্ত আত্মা। কোন্ ভক্ত ভগবানের সবচেয়ে প্রিয় সে বিষয়ে গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, কারো প্রতি যাঁর কোন বিদ্বেষ নেই, কারো প্রতি যিনি বিশেষভাবে বন্ধুত্ববিশিষ্ট ও কৃপাবিশিষ্ট নন, যাঁর কোন কিছুতেই মমত্ববোধ নেই এবং অহংকারও নেই, যিনি সুখে দুঃখে সমানবুদ্ধি এবং সর্বদা সন্তুষ্ট, যিনি সহজেই অপরের দোষ ক্ষমা করতে পারেন, যাঁর মন সততসংযত এবং আমার প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হয়ে যিনি আমাতেই মন ও বুদ্ধি অর্পণ করেছেন, সেই ভক্তই আমার প্রিয়।

পরম ভক্তের এই সমস্ত লক্ষণগুলি সম্যকভাবে ফুটে উঠেছিল ঠাকুরের জীবনে। সমদর্শী ঠাকুর যে কোন অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। যে কোন জায়গায় গিয়ে সেখানকার মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে সহজভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতেন। কেমন এক মিষ্টি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন। বিদেশ বিভুঁই বা বিদেশী বলে কিছু ছিল না তাঁর কাছে। পরিব্রাজকরূপে স্বদেশের ও বিদেশের বহু জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছেন ঠাকুর।

১৯২৪ সালের পর প্রায় তিন বছর তাঁকে বাংলাদেশের কোথাও দেখা যায়নি। শোনা যায় ওই সময় তিনি মক্কা যান। এই সময় ভক্তরা শত চেষ্টাতেও তাঁর কোন খোঁজ পায়নি। অবশ্য ঠাকুর কখন যেতেন তা বলে যেতেন না। তারপর হঠাৎ একদিন ফিরে এলেন ঠাকুর। এতদিন কোথায় ছিলেন? কেমন ছিলেন? একের পর এক অজস্র প্রশ্ন শুরু করতে লাগল ভক্তরা।

কিন্তু এসব প্রশ্নের কখনো কোন উত্তর দিতেন না। প্রশ্নের উত্তর হিসাবে কিছু না বললেও কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে অনেক কথা বলে ফেললেন। তাতে একদিন তিনি সমুদ্র ও সমুদ্রতীরবর্তী জায়গার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তাতে লোহিত সাগরের কথা বোঝা গিয়েছিল।

আরো বলেছিলেন মক্কার হেরা পর্বতের কথা। সেই পর্বতের বিভিন্ন কন্দরে বহু হিন্দু সন্ন্যাসীকে সাধনা করতে দেখেছেন ঠাকুর। মক্কার মুসলমান অধিবাসীরা নাকি খুব ধর্মপরায়ন এবং অতিথিবৎসল। তাদের অতিথেয়তায় প্রীত হয়েছেন ঠাকুর।

আর একবার কথাপ্রসঙ্গে ঠাকুর বলেছিলেন তাঁর দুটি আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা। বলেছিলেন বালখিল্যদের দেশ আর নারীরাজ্যের কথা। সে কথার অর্থ ভক্তরা কেউ বুঝতে পারেনি। ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের মুখ থেকে বালখিল্যদের রীতিনীতির কথা শুনে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় ভক্ত শ্রোতারা।

আরও বিস্মিত হয় নারীরাজ্যের কথা শুনে। কোথায় যেন ঠাকুর একবার বন্দী হয়ে পরেছিলেন। কিন্তু সে এক আশ্চর্য বন্দীত্ব। এক বিশাল মায়াকাননের মধ্য দিয়ে আচ্ছন্নের মত পথ চলছিলেন যেন ঠাকুর। সহসা কোথা হতে এল কুসুমভূষণা একদল সুন্দরী যুবতী। জটিল লতাজালে তারা বেঁধে ফেলল ঠাকুরকে। সে বাঁধন ছেঁড়ার ক্ষমতা ঠাকুরের নেই।

ঠাকুর একমনে একপ্রাণে ইষ্টমন্ত্র জপ করতে লাগলেন। পরে ঈশ্বরের দয়ায় মুক্ত হলেন সেই বন্দীত্ব থেকে। ঠাকুর বর্ণিত এই দুটি দেশের ভৌগলিক অস্তিত্বের কথা কারো জানা নেই। সুতরাং ঠাকুরের কথার অর্থ বোঝা সম্ভব নয়। তবু হয়তো রূপকাত্মক এই দুটি ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে দুটি বিশেষ সত্যকে বোঝাতে চেয়েছিলেন ঠাকুর।

আপাতদৃষ্টিতে কোন কিছু ছোট বলে মনে হলেই তা প্রকৃতপক্ষে ছোট নয়। ছোটর কাছেও অনেক কিছু শেখবার আছে আমাদের। ধর্মসাধনা অথবা সুস্থ সংসার জীবনযাপনের জন্য সংযম একান্ত প্রয়োজন। মনকে সংযত করতে না পারলে জীবনে কোন ভালো কাজই সম্ভব নয়। জীবন কিন্তু এই সংযমসাধনার পথে প্রকৃতি বিস্তার করে রেখেছে এই দুশ্ছেদ্য জটিল মায়াজাল। নারীরূপের মোহ বিকার সৃষ্টি করে আমাদের চিত্তে, আচ্ছন্ন ও বিকল করে দেয় আমাদের আত্মশক্তিকে। এই মোহ ও মায়াজাল হতে নিস্তার পাবার একমাত্র উপায় হলো গুরুমন্ত্র জপ বা ইষ্টের ধ্যান। এটাই হলো তাঁর নারীরাজ্যের অভিজ্ঞতার গূঢ় মর্মার্থ।

নরনারীর অবাধ মিলন কখনো পছন্দ করতেন না ঠাকুর। তিনি চাইতেন আশ্রমে বা বাড়িতে যে কোন জায়গায় কোন কারণে নারীপুরুষ সমবেত হলে তাদের মধ্যে একটি ব্যবধান থাকবে। পাহাড়তলীর আশ্রমেও তাঁর নির্দেশমত এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অনেক সময় অনেক নামকীর্তনে মেয়েপুরুষ অবাধে যোগদান করলে ঠাকুর কিছু বলতেন না।

নরনারীর বিবাহবন্ধনকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন ঠাকুর। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর সবাই বিয়ে করেছিলেন। বিয়ে করলেই সংসার বন্ধন হয়ে ওঠে না। আসক্তি ও অসংযমই বন্ধনের সৃষ্টি করে। তিনি এও বিশ্বাস করতেন দাম্পত্য প্রেমে ভগবান বাস করেন। তবে অসংযম উচ্ছৃংখলতা দাম্পত্য জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়।

সত্য ও সদাচারকে অবলম্বন করে সংসারজীবন যাপন করা ধর্মের একটি অঙ্গ। স্বামীস্ত্রীর‌ মতে সংযম মিলন এবং আত্মিক পবিত্রতা তাদের সংসারজীবনকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করে তুলবে, তাদের বৃহত্তর সাধনার পথে ঠেলে দেবে।

আর একটি আশ্চর্য কথা বলতেন ঠাকুর। এ কথার রহস্যও কেউ বুঝতে পারত না। বছরে একবার করে গুরুগণের সেবা করতেন ঠাকুর। এই গুরু কারা সেকথা খুলে বলতেন না কারো কাছে; এর জন্য কিছু খরচ চাইতেন শিষ্যদের কাছে। সেই টাকায় একটি মাটির হাঁড়ি কিনে তাতে অমৃত ভোগ করাতেন ঠাকুর।

তারপর রাত্রিবেলায় সেই হাঁড়িটি নিয়ে কোন এক অজ্ঞাত জায়গায় চলে যেতেন। কেউ তা জানতে পারত না। সারারাত সেইখানে কাটিয়ে সমবেত গুরুদের সেবায় পরিতৃপ্ত করে সকাল হলে ফিরে আসতেন ঠাকুর। শুধু এসে বলতেন গুরুরা সমবেত হয়েছিলেন এবং সেই ভোগ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।

ঠাকুরের এই গুরু কিন্তু বিশেষ কোন পরলোকগত পুরুষ নন। অতীতের যে সব মহাপুরুষ ধর্ম সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে গেছেন জীবনে, মোক্ষ লাভ করে গেছেন জীবদ্দশাতেই, গুরু বলে তাঁদেরই অভিহিত করতেন ঠাকুর, তাঁদের অমর আত্মাকেই আকর্ষণ করে পরিতৃপ্ত করতেন বছরে একবার।

উপনিষদ বলেছে, আনন্দই সব। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জয়ন্তে। আনন্দ থেকেই সর্বভূতের জন্ম। আনন্দের জন্যই তারা বেঁচে থাকে আবার আনন্দতেই তারা লয় হয়ে যায়। এই আনন্দই হচ্ছে ব্রহ্ম। যার থেকে আনন্দরূপ অমৃতের আলো ঝরে পড়ে নিরন্তর, তাই হচ্ছে ব্রহ্ম।

সদানন্দময় ঠাকুরও বলতেন, সংসার করবেন। নাম করবেন। আনন্দ করবেন। দীন দুঃখী গরীবদের কুঁড়েঘরে গিয়ে তাদের অপরিসীম দুঃখকষ্টের মধ্যেও ঠাকুর উপদেশ দিতেন, সবসময় আনন্দেতে থাকবেন। কখনো ভয় করবেন না। যখন যা পারেন করবেন। মনে রাখবেন, পরমানন্দরূপ পরমাত্মা হরি প্রাণরূপে সর্বঘটে সমান বিরাজ করছেন।

এই পরমানন্দরূপ পরমাত্মার সঙ্গে নিজের আত্মাকে সতত সংযুক্ত করে রাখতে পারলে কোন দুঃখই কখনো জাগবে না মনে। সবার সঙ্গে সব কিছুর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে দেখাতেই আছে পরম আনন্দ। নিজেকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেই যত দুঃখ। সাধারণ মানুষ মনে করে, আনন্দ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চিত্তবৃত্তি নয়।

তাকে বাইরের কোন না কোন বস্তু বা ঘটনার উপর নির্ভর করতে হয়। যেমন মানুষ সাধারণতঃ অর্থ, যশ বা আকাঙ্ক্ষিত কোন প্রিয় বস্তু পেলেই আনন্দ পায়। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ আনন্দ হচ্ছে সত্য এবং নিত্য, তা কখনো বাইরের কোন অনিত্য, পার্থিব বস্তুর উপর নির্ভর করতে পারে না।

আসলে প্রকৃত আনন্দ মানুষের মনেই আছে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চিত্তবৃত্তিরূপে‌। বাইরের কোন বস্তু আনন্দ দিতে পারে না‌। আমরা যখন পাই, তখন আসলে আমরা আমাদেরই আনন্দময় সম্বিতকে আস্বাদন করি নতুনরূপে। ইচ্ছশক্তির দ্বারা আমরা আমাদের এই অন্তর্নিহিত আনন্দময় সম্বিতকে ক্রমশঃ ব্যাপক, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারি।

ভক্তদের সুখী দেখে নিজেও সুখ পেতেন ঠাকুর। তাঁর কাছে ভক্তরা যখন হৈ-হুল্লোড় করে আনন্দ করত তখন তা দেখে খুশি হতেন তিনি। মানুষকে যতদূর সম্ভব আনন্দ দান করবার চেষ্টা করতেন। তবে তিনি নিজে তাদের কোন আনন্দের উপকরণ না দিয়ে শুধু হরিনাম করবার উপদেশ দিতেন।

বলতেন, এই হরিনামই তোমাদের সকল দুঃখ ও অভাব দূর করবে। তোমাদের পরমানন্দ দান করবে। একবার একটি রুগ্ন ছাত্র ঠাকুরের কাছে এসে রোগমুক্তি চায়। ছেলেটি তখন কোন এক কলেজে বিএসসি পড়ে। অসহ্য পেটের ব্যথায় বহুদিন ভুগছে। বড় ডাক্তারের নির্দেশমত পেটের ফটো তুলিয়া অনেক চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তখনো দুঃসহ যন্ত্রণায় দিনরাত কষ্ট পাচ্ছে।

ঠাকুর তাকে বললেন, হরিনামই হচ্ছে এর একমাত্র ওষুধ। রোজ ঠাকুরঘরে বসে শুধু একমনে হরিনাম করবে, সব ভালো হয়ে যাবে। ঠাকুর ছিলেন সিদ্ধবাক পুরুষ। তাঁর মুখ থেকে একবার যা বার হয়ে যেত তাই সত্য হত। ছেলেটি তা জানত না।

কিন্তু তবু তার কি মনে হলো বাড়ি গিয়ে সেইদিন থেকে একমনে হরি নাম জপ করতে লাগল। রোজ সন্ধ্যার সময় ঠাকুরঘরে বসে অনুচ্চ কণ্ঠে সুর করে হরিনাম করত। দিনকতকের মধ্যেই এর ফল পেতে থাকে ছেলেটি। তার যন্ত্রণার উপশম হতে থাকে এবং রোগটি সেরে যেতে থাকে। পরে সে সুস্থ হয়ে হারানো স্বাস্থ্য আবার ফিরে পায়।

ঠাকুর বলতেন, নাম করবার সময় শরীর বা নাকের ভিতর দিয়ে যে শ্বাস প্রশ্বাস বয় তার দিকে কোন লক্ষ্য রাখবে না, শরীরের মধ্যে যে প্রাণ আছে, যে প্রাণ একই সঙ্গে দেহস্থিত ও দেহাতীত সত্তায় বিশ্বের সমস্ত চেতন পদার্থে প্রসারিত, সেই প্রাণের দিকে লক্ষ্য রেখে নাম করবে। ধীর হয়ে বসে কোন কথা না বলে ওই নাম মনে মনে উচ্চারণ করতে করতেই প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায়।

ঠাকুর আরও বলেছেন, ভগবান সর্বজ্ঞ, সমভাব, নিরপেক্ষ শক্তি। তাঁর লীলা ক্ষুদ্র জীবের বোঝবার ক্ষমতা নেই। তিনি পরম মঙ্গলময়। তাঁকে ভুলেই মানুষ কর্তৃত্বাভিমানে জড়িয়ে পড়ে এবং নানা রকমের দুঃখভোগ করে থাকে। এই কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করে ভগবানের চিন্তায় প্রাণমন ডুবিয়ে দিতে পারলেই আত্মার শান্তি লাভ করা যায়।

প্রারব্ধ ভোগের জন্য কোনরূপ চঞ্চলতা প্রকাশ করতে নেই। অথবা ভয় করতে নেই। যে কোন অবস্থা আসুক না কেন, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে তা সহ্য করে যেতে হবে। প্রারব্ধের খণ্ডন হয়ে গেলেই দুঃখের অবসান হয়। একেই বলে অদৃষ্টচক্র।

মানুষ প্রারব্ধকে বুঝতে পারে না বলেই ভ্রান্তির বশে হা-হুতাশ করে অদৃষ্টের উপর দোষ দেয়। তার বোঝা উচিত, যে যা অতীতে কর্মফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা রেখে সকামভাবে করেছে, সেই কর্মের ফল ভোগ করছে শুধু।

হে প্রাণসখা, একবার দেখা দাও হরি। এত ডাকছি, এত কাঁদছি, তবু একবার কী দেখা পাব না? সাধারণতঃ হরিভক্তরা প্রায়ই এমনিভাবে এক আকুল প্রার্থনায় ফেটে পড়তে দেখা যায়। বুকভরা পিপাসা নিয়ে, অন্তরভরা শূন্যতা নিয়ে, কণ্ঠে সকরুণ কাতরতা নিয়ে সর্বত্র তাঁরা খুঁজে বেড়ান হরিকে।

ঠাকুরকে কিন্তু হরিকে এমন করে ডাকতে বা খুঁজতে দেখেনি কেউ কখনো। তিনি ছিলেন জন্মসিদ্ধ সাধক। সাধনা করতে না করতেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। চাইতে না চাইতেই সব পেয়ে গিয়েছিলেন।

কোথাও কখনো কোন দিকে হরিকে খুঁজতে হয়নি তাঁকে ব্যাকুলভাবে। যখন যেদিকেই তাকিয়েছেন, তখনই সেখানে তিনি হরিকে বিরাজিত দেখেছেন। দূর আকাশের অন্তহীন নীলিমায়, মর্ত্যমাটির প্রতিটি ধূসর ধূলিকণায়, প্রতিটি তৃণখণ্ড ও বৃক্ষপত্রের শ্যামলিমায়, প্রতিটি ফুলের বর্ণবৈচিত্র্য, প্রতিটি জীবদেহের স্পন্দনশীল প্রাণসত্তায় তিনি তাঁর হরিকে দেখেছেন বিচিত্ররূপে।

এই বিশ্বজগৎ ও জীবনের প্রতিটি ঘটনা ও বস্তুরূপের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন শ্রীহরিরই বিচিত্র ভাবলীলার মূর্ত প্রকাশ। ঠাকুর ছিলেন রাগানুরাগ পদ্ধতির সাধক। তাঁর অন্তঃকরণটি ছিল নারীসুলভ আত্মসমর্পণের নম্রমধুর সুরে বাঁধা। দেহটিকে তাই তিনি সবসময় ঢেকে রাখতেন চাদর দিয়ে।

বাইরে ঠাকুর সবসময় দীনহীন কাঙালের বেশে ঘুরে বেড়ালেও চাওয়ার কোন দীনতা ছিল না তাঁর জীবনে। এক পরম প্রাপ্তির অপার্থিব আনন্দে ভরপুর হয়ে থাকত তাঁর অন্তরাত্মা। সেই আনন্দের এক দিব্যবিভূতি আধ্যাত্মিক পূর্ণতার এক আশ্চর্য ঐশ্বর্য্য তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফুটে উঠত তাঁর আপাতদীন দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। যাঁকে পেলে জীবনে মরণে সব কিছু পাওয়া যায় ঠাকুর তাঁকে পেয়েছিলেন।

যাঁকে জানলে সব কিছু জানা যায় আর মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়, ঠাকুর তাঁকে জেনেছিলেন। তাই কোন কিছু চাইতেন না ঠাকুর। তাই কখনো মৃত্যুকে ভয় করতেন না ঠাকুর। ১৯৪৬ সালে দেশে যে ঐতিহাসিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার আগুন জ্বলে ওঠে, ঠাকুর তার কিছুটা নিজের চোখে দেখেছেন। ১৯৪৭ সালে একই সঙ্গে দেশভাগ এবং দেশের স্বাধীনতালাভও দেখেছেন।

কিন্তু মৃত্যুসন্ধুক্ষিত এই দেশ ও জাতির চরম বিপর্যয় বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি ঠাকুরের চিত্তকে। যে কোন অবস্থাতেই ঠাকুরকে চিত্তটি ছিল অচল অটল। অথচ দেহটি তাঁর এক জায়গায় কোথাও স্থির হয়ে বেশীদিন বসে থাকত না। প্রায়ই তিনি এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতেন।

অনেকে মনে করতে পারে, ঠাকুরের এই গতিশীলতা তাঁর অন্তরের চঞ্চলতা অপূর্ণতারই প্রতীক। কারণ যা কিছু পূর্ণ তা স্থির এবং অচঞ্চল ; আর যা কিছু অপূর্ণ তাই এগিয়ে চলে। গতি মানেই অপূর্ণতা।

কিন্তু ঠাকুরের গতিটা ছিল কেবল বাইরে। কেবল দেহটাই তাঁর এগিয়ে চলত এখান থেকে সেখানে। কিন্তু গতিশীল দেহটার অন্তঃস্থলে এক অপরিসীম প্রজ্ঞায় পূর্ণতায় ও শান্ত স্থিতিশীলতায় স্তব্ধ অচল হয়ে থাকত তাঁর আত্মা। নদীর স্রোতটা থাকে কেবল উপরে, নদীতে ডুব দিয়ে যতই তার তলদেশে যাওয়া যায় ততই দেখা যায় অচঞ্চল স্থৈর্যে স্থিতিশীল হয়ে আছে সেখানকার জল।

তাছাড়া ঠাকুরের আত্মা চঞ্চল বা সচল হবেই বা কি করে! যা সর্বব্যাপী তা কখনো নড়তে বা কোথাও চলাফেরা করতে পারে না। আকাশ সব জায়গায় ছেয়ে আছে বিশ্বকে; তাই সে নড়তে পারে না। মাটি সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে পৃথিবীতে, তাই সে চলতে পারে না। ঠাকুরের মন একই সময়ে সারা বিশ্বে এক সর্বব্যাপী চেতনায় ব্যাপ্ত হয়ে থাকত বলেই সে মনের এগিয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

দেহটি ক্ষুদ্র এবং খণ্ড বলেই তা চলাফেরা করতে পারে। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল। কিন্তু হাঙ্গামার আগুন নিভে না গিয়ে আরও ছড়িয়ে পড়তে লাগল দিকে দিকে। বহু হিন্দু দেশ ছেড়ে পশ্চিমবাংলায় চলে এল। ঠাকুরের অনেক ভক্তও চলে এল। ঠাকুরকে নিয়ে আসবার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করতে লাগল। ঠাকুর কিন্তু একেবারেই নির্বিকার।

তিনি প্রাণভয়ে কোথাও যাবেন না। যে নোয়াখালিতে হাঙ্গামার আগুন সবচেয়ে প্রবল হয়ে জ্বলে উঠেছিল সেই নোয়াখালিতেই রয়ে গেল ঠাকুর। অন্য কোন জেলাতেও সরে গেলেন না। চারিদিকে হাঙ্গামা দেখে অনেক ভক্ত মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পরত। ধর্ম ও ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলত অনেক মানুষ।

কিন্তু ঠাকুর তাদের বলতেন, আরও বেশি করে ধর্মাচরণ করবে। আরও বেশি করে ঈশ্বরকে ডাকবে। আপদকালেই ধৈর্য ও ধর্মের পরীক্ষা হয়। অনেকে আকুল হয়ে প্রশ্ন করত, ঠাকুর, যোগবলে আপনি এই হাঙ্গামা বন্ধ করতে পারেন না? ঠাকুর শান্ত কণ্ঠে উত্তর করেন, যা হবার তা ঠিক হবে; কেউ রদ করতে পারবে না।

আমি তো কোন্ ছার, শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছিলেন? সে কী লোকক্ষয়! তখন সেই সময় সারা ভারতের লোকই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সব কিছুই বিধিনির্দিষ্ট, যার যে ভাবে মৃত্যু ভাগ্যে আছে তা হতেই হবে। ঠাকুর আরও বললেন, মানুষের আত্মা হচ্ছে নিত্যশুদ্ধ নিষ্পাপ এবং অবিনশ্বর। সে কাউকে আঘাত করে না, কারো দ্বারা সে আহত হয় না। কে কাকে মারছে?

অবিদ্যাগ্রস্থ মায়াবদ্ধ মানুষের দেহগত একটা উদ্ধত আমিত্ববোধ অন্য কতকগুলো জৈবদেহকে আঘাত করছে। ঠাকুর তখন থাকতে নোয়াখালির অন্তর্গত চৌমোহনীতে ভক্ত উপেনবাবুর বাড়িতে। তাঁর দেহটি ক্রমেই অশক্ত ও অবসন্ন হয়ে আসছে। ক্ষীণ হয়ে আসছে চর্মচক্ষের দৃষ্টি।

তবু মনে কোন বিকার নেই। সারাদিন ধ্যান আর গুনগুন শব্দে আপন মনে নাম গান করেন। চারিদিকে মারামারি। তবু কোন ভয় নেই ঠাকুরের মনে। তবে একটা ব্যাপার আশ্চর্য হয়ে গেল সবাই। চারিদিকে ঘোর ধ্বংস চললেও ঠাকুর যেখানে থাকতেন, কোন অলৌকিক কারণে সেই অঞ্চলে কোন গোলমাল হলো না। উপেনবাবুর বাড়ির কোন ক্ষতি হলো না।

অবশেষে ১৯৪৮ সালের সেই দিনটি এসে গেল। কয়েকদিন ধরেই দেখা যেতে লাগল ঠাকুর একেবার ধ্যানস্থ হয়ে পড়লে ধ্যান আর তাঁর ভাঙ্গতে চায় না। সবাই বুঝতে পারল ঠাকুরের দেহ ত্যাগের ক্ষণটি চলে এসেছে‌। একদিন শুয়ে থাকতে থাকতে অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়লেন ঠাকুর।

সে নিদ্রা আর ভাঙ্গল না। আত্মা তাঁর অনেক আগেই মিশে গিয়েছিল পরমানন্দরূপ পরমাত্মার সঙ্গে। এবার তাঁর দেহটি মিশে গেল পঞ্চভৌতিক বিরাট বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, শ্রদ্দধানা, মৎপরমা ভক্তান্তেহতীব মে প্রিয়াঃ। অর্থাৎ যে আমার প্রতি একান্তভাবে শ্রদ্ধাশীল এবং আমাকেই একমাত্র আশ্রয় বলে জ্ঞান করে, সেই ভক্তই আমার প্রিয়। ঠাকুর ছিলেন ভগবানের সেই প্রিয় ভক্ত। এবার ভগবান তাঁর প্রিয় ভক্তকে ডেকে নিলেন নিজের কাছে।

………………………………………..
ভারতের সাধক ও সাধিকা
লেখক : সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ

পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!