শ্রী শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী

শ্রী শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী

-প্রণয় সেন

“জিহ্বার লালসাতে যে ইতিউতি ধায়,
শিঞ্চোদর পরায়ণ কভু কৃষ্ণ নাহি পায়।।”

ঐশ্বর্যমন্ডিত সপ্তগ্রামের রাজার একমাত্র পুত্র হয়েছিলেন বৈষ্ণবকুলের চুড়ামণি শ্রী শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী। ইন্দ্রের মতো বিপুল ঐশ্বর্য হেলায় পরিত্যাগ করে, অপ্সরার মতো রূপসী পত্নীকে ত্যাগ করে, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অপ্রাকৃত মহিমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মহাপ্রভু যখন শান্তিপুরে এসেছিলেন, তখন পিতার অনুমতি নিয়ে শ্রী রঘুনাথ তাঁর দর্শন লাভ করতে যান। তখন মহাপ্রভূ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঘরে গিয়ে অনাসক্ত চিত্তে পিতার বিষয়-আশয় দেখাশোনা করতে হবে এবং তারই মাঝে নিষ্ঠা সহকারে শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের ভজনচর্চা চালিয়ে যাওয়া উচিত হবে। শ্রী রঘুনাথ তখনই মহাপ্রভুর আদেশ মেনে নিয়েছিলেন এবং পিতার বৈষয়য়িক কর্তব্য কর্ম ঠিক ঠিক মেনে চলতে থাকেন। কিন্তু মনের মধ্যে তাঁর সদা-জাগ্রত ছিল আরও ব্যাপকভাবে সেবার অভিলাস, শ্রীমহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ প্রভুর আরও সাক্ষাৎ সান্নিধ্য লাভের আকুলতা।

একদিন নিত্যানন্দ প্রভু পানিহাটি গ্রামে এসেছেন শুনে রঘুনাথ সেখানে যান, তাঁর দর্শনলাভের জন্য আকুল আগ্রহে। গঙ্গার তীরে যেখানে ভক্তদের সাথে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বসে ছিলেন, সেখানে তিনি উপস্থিত হয়ে দূর থেকে দেখলেন- গঙ্গাতটে আলোকিত করে একটি বৃক্ষমূলে ভক্তপরিবৃত হয়ে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বসে আছেন। শ্রীরঘুনাথ তাঁকে দেখেই দূর থেকে সাষ্টাঙ্গে দন্ডবৎ জানালেন। সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য জমিদার শ্রীগোবর্ধন দাসের পুত্র রঘূনাথ পানিহাটিতে এসেছেন, সেই খবর পেয়ে সারাগ্রামে সাড়া পড়ে গেল। ভক্তরা সেই সমাচার শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর শ্রীচরণে নিবেদন করেছিলেন। তিনি রঘুনাথের নাম শুনে বলে ওঠেন,  ‘ওরে চোরা! এতদিনে দর্শন দিলি! আয়, আয়, আজ তোরে দন্ড দেব।’

নিত্যানন্দ প্রভু এভাবে ডাক দিলেও শ্রীরঘুনাথ দ্বিধায় সঙ্কোচে দূরে দূরে থাকছিলেন। তখন শ্রীনিত্যানন্দ তাঁকে জোর করে কাছে টেনে এনে তাঁর মাথায় তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করে তাঁকে কৃপা করে বলেছিলেন, ‘নিকটে না আইস, চোরা, ভাগ’ দূরে দূরে। আজি লাগ পাঞাছি, দন্ডিমু তোমারে।’

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর চরণস্পর্শ লাভ করে শ্রীরঘুনাথ দাসের সব বন্ধন যেন কেটে গেল, দ্বিধাদ্বন্দ থেকে তিনি মুক্ত হয়ে গেলেন। হাসিমুখে শ্রীনিত্যনন্দ প্রভু বলেছিলেন শ্রীরঘুনাথ দাসকে-

“দধি চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।
শুনি ’আনন্দিত হৈল রঘুনাথ মনে।।”

সেই নির্দেশ লাভ করে রঘুনাথ বৈষ্ণব- সেবার অধিকার অর্জনের পরামানন্দে তৎক্ষনাৎ গ্রামে গ্রামে লোকজন পাঠিয়ে দিলেন চিঁড়া, দই, দুধ, সন্দেশ, চিনি, কলা ইত্যাদি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এক মহামহোৎসবের সূচনা হয়েছিল সেইদিন। প্রতি গ্রাম থেকে অসংখ্য ব্রাহ্মণ এবং সজ্জন ব্যক্তিরা সমবেত হলেন। অলৌকিক অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও সেদিন সেখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই চিঁড়া-দধি ভোজনউৎসবটি দেখে সকলেরই মনে হচ্ছিল যে শ্রীকৃষ্ণেরই বনভোজন-লীলায় তাঁর সখাগণ চারিদিক থেকে এসে মিলিত হয়েছেন! বৈষ্ণব সেবা এবং সেই সাথে শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণের উপযোগী এমন পারমার্থিক তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব আজও পানিহাটিতে প্রতিবৎসর মহাসমারোহে উদ্যাপিত হয়ে থাকে এবং সকলেই উপলদ্ধি করে থাকেন যে, এই উৎসবের মাধুর্য উপভোগের অভিলাষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুসহ তাঁদের সমস্ত পার্ষদবর্গ আজও দন্ড মহোৎসবের দিনক্ষণে চিন্ময় রূপে অব্যশই উপস্থিত থাকেন।


পিতা জানতে পেরে কড়া পাহারা দিয়ে রাখতে লাগলেন। শ্ৰী রঘুনাথ নিরুপায় হলেন। ভাবতে লাগলেন কেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজ পাদপদ্মে আমাকে স্থান দিচ্ছেন না?

শ্রী রঘুনাথ দাসের বিবাহের একবছর কেটে গেল। শ্ৰী রঘুনাথ দাস আবার সংসার ছেড়ে পালাবার জন্য উদ্যোত হলেন। পিতা জানতে পেরে কড়া পাহারা দিয়ে রাখতে লাগলেন। শ্ৰী রঘুনাথ নিরুপায় হলেন। ভাবতে লাগলেন কেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজ পাদপদ্মে আমাকে স্থান দিচ্ছেন না?

তার জননী বলতে লাগলেন,’পুত্ৰ পাগল হয়েছে, বেঁধে রাখ।’

পিতা বললেন, বেঁধে রাখলেই বা কি হবে?

“ইন্দ্ৰসম ঐশ্বৰ্য্য, স্ত্ৰী অপ্সরা-সম।
এ সব বান্ধিতে নারি লোক যার মন।।
দড়ির বন্ধনে তারে রাখিবা কেমতে?
জন্মদাতা পিতা নারে ‘প্রারব্ধ’ খণ্ডাইতে।।
চৈতন্যচন্দ্রের কৃপা হঞাছে ইহারে।
চৈতন্য প্রভুর ‘বাতুল’ কে রাখিতে পারে?”
( চৈঃচঃ অন্ত্যঃ ৬৩৯- ৪১ )

গোবৰ্দ্ধন দাস একথা বলে পত্নীকে প্ৰবোধ দিলেন।

একদিন গভীর রাতে বাড়ির বিগ্রহ সেবকের খোঁজে এসে শ্রী রঘুনাথ পুরীর নীলাচল পথে রওনা হলেন। এদিকে সকালবেলা শ্ৰী রঘুনাথের খোঁজ আরম্ভ হল। গোবৰ্দ্ধন দাস তাড়াতাড়ি গুরু শ্ৰী যদুনন্দন আচাৰ্য্যের গৃহে এসে জানতে চাইলেন, রঘুনাথ কোথায়?

যদুনন্দন দাস রঘুনাথের পালিয়ে যাবার ঘটনা বললেন। এবার গোবৰ্দ্ধন দাস বুঝতে পারলেন, রঘুনাথ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে। গৃহে ক্ৰন্দনের রোল উঠল। তৎক্ষণাৎ চারিদিকে অনুসন্ধানের জন্য লোকজন জুটল। বহু অনুসন্ধান করেও রঘুনাথকে পাওয়া গেল না।

গোবৰ্দ্ধন দাস গৌড়ীয় ভক্তদের সঙ্গে নীলাচলের দিকে রঘুনাথ যাচ্ছে কিনা সন্ধান নেওয়ার জন্য কয়েকজন লোককে পত্ৰ লিখে শ্ৰী শিবানন্দ সেনের নিকট প্রেরণ করলেন। হিরণ্য- শ্ৰী শিবানন্দ সেনকে গােবৰ্দ্ধনের লোক নীলাচলের পথে গিয়ে ধরল এবং সব কথা বলল ও পত্ৰ দিল। শ্ৰী শিবানন্দ সেন সব কথা বুঝতে পারলেন। তিনি জানালেন তাদের সঙ্গে রঘুনাথ আসে নাই হয়ত অন্য পথে নীলাচলে গিয়েছে।

শ্রী রঘুনাথ ছত্রভোগের পথে না থেমে ও সময় নষ্ট না করে একমাসের পথ বারেদিনে অতিক্ৰম করে পুরীতে পৌঁছলেন। এর মধ্যে তিনদিন মাত্ৰ ভোজন করেছিলেন। পুরীতে পৌঁছে লোক-পরম্পরা জেনে মহাপ্রভুর নিকট এলেন। দূর থেকে শ্ৰী রঘুনাথ দাস প্ৰভুকে বন্দন করতেই মুকুন্দ দত্ত দেখলেন ও বুঝতে পারলেন। প্রভুকে বললেন, রঘুনাথ দাস দণ্ডবৎ করছে। একথা শুনে প্ৰভু বললেন, রঘুনাথ! রঘুনাথ! এস এস রঘুনাথ।’


বিষয় বাড়ান তাদের যাবতীয় সৎকাৰ্য্যের মূলে। বিষয়বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিরুপে তার সন্ধান রাখেনা। বিষয়ের এমন স্বভাব মনুষ্যের মন্দ প্ৰবৃদ্ধি এনে দেবেই। রঘুনাথ! এমন বিষয় থেকে তুমি মুক্তিলাভ করেছ

নম্ৰভাবে নিকট আসলেই প্ৰভু উঠে তাকে আলিঙ্গন করলেন। প্ৰভু স্নেহ-আলিঙ্গনে রঘুনাথের সমস্ত দুঃখ দূর হল। আনন্দে তার দু- নয়ন দিয়ে প্ৰেম অশ্রু পড়তে লাগল। প্ৰভু বললেন, রঘুনাথ! কৃষ্ণ বড় করুণাময় তোমাকে বিষয় বিষ্ঠাগৰ্ত্ত থেকে উদ্ধার করেছেন।

শ্ৰীরঘুনাথ দাস বললেন, প্রভু! আমি কৃষ্ণ কৃপা জানিনা। তোমার কৃপায় উদ্ধার হয়েছি এ মাত্ৰ জানি।

তখন প্ৰভু হাস্য করতে করতে বললেন, ‘তোমার বাপ জ্যেঠা বিষয়টাকে সুখ বলে মনে করে। ব্ৰাহ্মণের সেবা করে। পূণ্য করে। অভিমান করে আমি বড়দানি। তারা শুদ্ধ বৈষ্ণব নন, বৈষ্ণবপ্ৰায়। বিষয় বাড়ান তাদের যাবতীয় সৎকাৰ্য্যের মূলে। বিষয়বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিরুপে তার সন্ধান রাখেনা। বিষয়ের এমন স্বভাব মনুষ্যের মন্দ প্ৰবৃদ্ধি এনে দেবেই। রঘুনাথ! এমন বিষয় থেকে তুমি মুক্তিলাভ করেছ।

তোমার বাপ-জ্যেঠাকে আমার মাতামহ শ্ৰী নীলাম্বর চক্ৰবৰ্ত্তী ভায়ের মত দেখেন সে সম্পর্কে তোমার বাপ-জ্যেঠা আমার দাদু হন।

তাই পরিহাস করে তোমাকে এ সব কথা বললাম।

অতঃপর মহাপ্ৰভু শ্ৰীস্বরুপ-দামোদরকে সম্বোধন করে বললেন, “রঘুনাথকে তোমায় দিলাম। পুত্ৰ বা ভৃত্য জ্ঞানে একে অঙ্গীকার কর। আজ থেকে ও ‘স্বরুপের রঘু’ বলে এর খ্যাতি হবে।”

তারপর প্রভু তাকে শীঘ্রই সমুদ্ৰস্নান ও জগন্নাথ দৰ্শন করে এসে প্ৰসাদ গ্ৰহণ করতে বললেন। শ্ৰী রঘুনাথ দাস সমুদ্ৰস্নান ও জগন্নাথ দৰ্শন করে এলে শ্ৰীগোবিন্দ প্ৰভুর ভোজন অবশেষ পাত্ৰটি তাকে দিলেন। শ্ৰী রঘুনাথ মহানন্দে প্ৰভুর অবশেষ পেয়ে সমস্ত ক্লেশ থেকে মুক্ত হলেন। নিজেকে ধন্যাতিধন্য মনে করলেন। পাঁচদিন শ্ৰী রঘুনাথ প্ৰভুর নিকট ভোজন করলেন। নিরন্তর সাধন-ভজন করতেন। রাত্ৰে সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে মেগে খেতেন। অন্তৰ্যামী প্ৰভু তা জানতে পেরে একদিন সেবক গোবিন্দকে ভঙ্গী করে জিজ্ঞাসা করলেন রঘুনাথ প্ৰসাদ নিচ্ছে কি? গোবিন্দ বললেন, এখানে প্ৰসাদ নেওয়া বন্ধ করে রাত্ৰে সিংহদ্বারে মেগে খায়।

প্ৰভু তা শুনে বললেন,

‘জিহ্বার লালসাতে যে ইতিউতি ধায়,
শিঞ্চোদর পরায়ণ কভু কৃষ্ণ নাহি পায়।।’

মহাপ্ৰভু জগৎকে শিক্ষা দিবার জন্য শ্ৰীরঘুনাথ দাসকে লক্ষ্য করে এ সমস্ত কথা বললেন।

শ্ৰী রঘুনাথ দাস বাস্তবত সৰ্ব্বত্যাগী নিষ্কিঞ্চন বৈষ্ণব। শ্ৰী রঘুনাথ দাস সামনাসামনি প্রভুর কাছে কোন কথা জিজ্ঞাসা করতেন না। শ্ৰীস্বরুপ গোস্বামী দ্বারা বা অন্য কারও দ্বারা জিজ্ঞাসা করতেন।

একদিন শ্ৰীস্বরুপ গোস্বামীর দ্বারা কর্তব্য আকর্তব্য সম্বন্ধে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করলেন। মহাপ্ৰভু তার উত্তরে বলতে লাগলেন,

‘গ্ৰাম্যকথা না শুনিবে, গ্ৰাম্যকথা না কহিবে।
ভাল না খাইবে- আর ভাল না পরিবে।।
অমানী মানদ হঞা কৃষ্ণনাম সদা লইবে।
ব্ৰজে রাধাকৃষ্ণ- সেবা মানসে করিবে।।’
( চৈঃচঃ অন্ত্যাঃ ৬২৩৬, ২৩৭ )

মহাপ্রভুর শ্ৰীমুখ থেকে শ্ৰী রঘুনাথ এই অমৃতময় উপদেশ শুনে প্ৰভুকে সাষ্টাঙ্গ বন্দনা করলেন। প্ৰভু শ্ৰী রঘুনাথ দাসকে স্বস্নেহে আলিঙ্গন করলেন। একদিন শিবানন্দ সেন শ্ৰী রঘুনাথ দাসের কাছে তাঁর পিতার যাবতীয় চেষ্টার কথা বললেন। রথযাত্ৰা উৎসব শেষ হলে গৌড়দেশের ভক্তগণ মহাপ্রভুর অনুজ্ঞানিয়ে দেশে ফিরে এলেন।

শ্ৰী গোবৰ্দ্ধন দাস মজুমদার প্রেরিত লোক শ্ৰী শিবানন্দ সেনের গৃহে এসে তার নিকট শ্ৰী রঘুনাথের সম্বন্ধে যাবতীয় কথা শ্ৰবণ করলেন। অতঃপর শ্ৰী গোবৰ্দ্ধন দাস শ্ৰীরঘুনাথের নিকট একজন ব্ৰাহ্মণ ও এক ভূত্য এবং প্রতি মাসে চারশত মুদ্ৰা প্রেরণ করলেন। শ্ৰীরঘুনাথ সে অৰ্থ স্বয়ং গ্ৰহণ না করে প্রভুর সেবার জন্য কিছু কিছু গ্রহণ করতে লাগলেন। মাসে দুদিন মহাপ্ৰভুসহ সব বৈষ্ণবদের আমন্ত্রণ করে মহাভোজন করাতে লাগলেন। দু’বছর এভাবে কেটে গেল। তারপর শ্রীরঘুনাথ মহাপ্রভুর নিমন্ত্ৰণ বন্ধ করে দিলেন।

একদিন শ্ৰীস্বরুপ দামোদর গোস্বামী শ্ৰীরঘুনাথকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহাপ্ৰভুর ভোজন আমন্ত্ৰণ বন্ধ করলে কেন?’

শ্ৰীরঘুনাথ দাস বললেন, ‘বিষয়ীর অন্নে প্ৰভুর মন প্ৰসন্ন হয়না। আমার অনুরোধে তিনি নিমন্ত্ৰণ স্বীকার করেন  মাত্ৰ। এ নিমন্ত্ৰণে মাত্ৰ প্ৰতিষ্ঠা ছাড়া কিছু নাই।’

মহাপ্ৰভু এ কথা শুনে সুখি হয়ে বললেন,  ‘বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন, মলিন মন হৈলে নহে কৃষ্ণের স্মরণ।’
( চৈঃচঃ অন্ত্যঃ ৬। ২৭৮ )

মহাপ্রভু বলেছেন, ‘আমি রঘুনাথের আগ্রহে কেবল আমন্ত্ৰণ স্বীকার করতাম।’


পূৰ্ব্বে শ্ৰীশঙ্করানন্দ সরস্বতী নামক একজন সন্ন্যাসী বৃন্দাবন ধাম থেকে এ শিলা ও গুঞ্জামােলা নিয়ে প্ৰভুকে বহু আগ্রহ করে ভেট দিয়েছিলেন। প্ৰভু স্মরণের সময় গুঞ্জামালাটি কণ্ঠে ধারণ করতেন।

শ্ৰী রঘুনাথ দাস কিছুদিন সিংহদ্বারে মেগে খাওয়ার পরিবর্তে ছত্ৰে গিয়ে মেগে খেতে লাগলেন। অন্তৰ্যামী প্ৰভু তা বুঝতে পেরে ছলপূৰ্ব্বক সেবককে জিজ্ঞাসা করলেন এখন রঘুনাথ কি সিংহদ্বারে মেগে খায়?’

সেবক বললেন, ‘রঘুনাথ সিংহদ্বারে মেগে খাওয়া বন্ধ করে ছত্ৰে গিয়ে মেগে খায়।’

তা শুনে প্ৰভু বললেন, ‘প্ৰভু কহে, ভাল কৈল ছড়িল সিংহদ্বার, সিংহদ্বারে ভিক্ষা বৃত্তি-বেশ্যার আচার’
( চৈঃ- চঃ ৬। ২৮৪ )

শ্ৰীরঘুনাথের আচরণে মহাপ্ৰভু পরম সুখী হলেন। অন্য এক দিবস শ্ৰী রঘুনাথকে ডেকে প্ৰভু গোবৰ্দ্ধন শিলা ও গুঞ্জামালা দিয়ে বললেন, ‘প্ৰভু কহে, এই শিলা কৃষ্ণের বিগ্ৰহ, ইহার সেবা কর তুমি করিয়া আগ্রহ।’
( চৈঃচঃ ৬/২৯৪ )

এই গোবৰ্দ্ধন শিলাটী মহাপ্ৰভু সাক্ষাৎ কৃষ্ণ জ্ঞানে কখন হৃদয়ে ধারণ, কখন অঙ্গ আঘ্রান করতেন, কখন বা নেত্ৰ জলে স্নান করাতেন। তিন বছর প্ৰভু এ শিলা সেবার পর প্রিয় শ্ৰীরঘুনাথ দাসকে অৰ্পন করলেন। পূৰ্ব্বে শ্ৰীশঙ্করানন্দ সরস্বতী নামক একজন সন্ন্যাসী বৃন্দাবন ধাম থেকে এ শিলা ও গুঞ্জামােলা নিয়ে প্ৰভুকে বহু আগ্রহ করে ভেট দিয়েছিলেন। প্ৰভু স্মরণের সময় গুঞ্জামালাটি কণ্ঠে ধারণ করতেন।

শ্ৰীরঘুনাথ দাস জল তুলসী দিয়ে সেই গোবৰ্দ্ধন শিলার সাত্তিক সেবা করতে লাগলেন। শ্ৰীস্বরুপ-দামোদর মহাপ্রভু জলের জন্য একটি কুঁজা দিলেন। শ্ৰী রঘুনাথ কিছুদিন এরুপ সাত্তিক সেবা করতে থাকলেন।

একদিন স্বরুপ-দামোদর প্ৰভু বললেন, ‘রঘুনাথ গিরিধারীকে কমপক্ষে আটটি কড়ির খাজা সন্দেশ প্ৰদান কর। সেদিন থেকে শ্ৰীরঘুনাথ আট কড়ির খাজা সন্দেশ গিরিধারীকে ভোগ দিতে লাগলেন।’

তিনি খুব নিয়মের সহিত সাধন-ভজন করতেন। সাড়ে সাত প্রহর ভজন-কীৰ্ত্তন অতিবাহিত করতেন। চার দণ্ড মাত্ৰ আহারের জন্য দিতেন। রাজপুত্র অভিমান ছেড়ে জীৰ্ণ বস্ত্ৰ পরিধান করতেন। গাত্ৰ- আবরণ ছিল এক ছেড়াকাথা।

শ্ৰীরঘুনাথ দাস গোস্বামী কিছুদিন ছত্ৰে মেগে খাওয়ার পর তা বন্ধ করে বাজারের পরিত্যক্ত পঁচা অন্ন-প্ৰসাদ এনে জল ধুয়ে লবণ দিয়ে সে প্ৰসাদ গ্ৰহণ করতে লাগলেন।

একদিন শ্ৰীস্বরুপ-দামোদর প্রভু শ্ৰীরঘুনাথের ভজন কুটিরে এসে সেই প্ৰসাদ এক মুষ্টি মেগে খেলেন। খুব তৃপ্তি পেলেন। তিনি মহাপ্ৰভুর কাছে এলেন এবং প্রভুর কাছে সে প্ৰসাদের স্বাদের কথা বললেন। তা শুনে রঘুনাথের সে প্ৰসাদের প্রতি মহাপ্রভুর মনে বড় লোভ হল। একদিন গোপনে প্ৰভু শ্ৰীরঘুনাথের ভজন-কুটিরে এসে সে- অন্ন প্ৰসাদ গ্ৰহণ করতে লাগলেন।

শ্ৰী রঘুনাথ দেখে হায় হায় করে ছুটে এলেন এবং প্রভুর হাত থেকে সে প্ৰসাদ কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘হে প্রভু! এ সব আপনার খাবার যোগ্য নয়।’

মহাপ্ৰভু বললেন, ‘খাসা বস্তু খাও সবে মোরে না দেহ কেনে?’

মহাপ্রভুর শ্ৰীচরণে পরে শ্ৰীরঘুনাথ কঁদতে লাগলেন। মহাপ্ৰভু বারবার শ্ৰীরঘুনাথকে আলিঙ্গন করে বলতে লাগলেন,

“’মহাপ্রভুর ভক্তগন বৈরাগ্য প্রধান,
যা দেখে খুশী হন- স্বয়ং ভগবান।”

শ্ৰী রঘুনাথের বৈরাগ্য দেখে প্ৰভু অন্তরে বড়ই সুখ লাভ করলেন। শ্ৰী রঘুনাথ দাস গোস্বামী প্রভুর করুণা-ধারায় নিত্য স্নান করতে করতে যেন পরমসুখে প্রভুর শ্ৰীচরণে কালাতিপাত করতে লাগলেন।

অনন্তর অকস্মাৎ পৃথিবী অন্ধকার করে শ্ৰীগৌরসুন্দর অন্তধার্ন হলেন। প্রভুর বিচ্ছেদে ভক্তগণের হৃদয়ে দারুণ বিরহ-অনল জ্বলে উঠল। শ্ৰী রঘুনাথ দাসসে বিরহ-অনলে দগ্ধ হতে হতে প্ৰভুর নিৰ্দেশ মাথায় করে এলেন শ্ৰীব্ৰজধাম। পূৰ্ব্বেই শ্ৰীসনাতন শ্ৰীরুপ শ্ৰীগোপাল ভট্ট, শ্ৰীরঘুনাথ ভট্ট, শ্ৰীলোকনাথ শ্ৰীকাশীশ্বর ও শ্ৰীভূগৰ্ভ গোস্বামী প্ৰভৃতি শ্ৰীবৃন্দাবন ধামে প্ৰভু নিৰ্দেশমত অবস্থান করছিলেন। প্রভুর অন্তৰ্ধানে সকলে বিরহ-দাবানলে দগ্ধিভূত হতে লাগলেন। তথাপি বহু কষ্ট ধৈৰ্য্যধারণ পূৰ্ব্বক সকলে সমবেতভাবে শ্ৰীমহাপ্রভুর শিক্ষা সিদ্ধান্ত বাণী প্রচারে ব্ৰতী হয়ে গ্ৰন্থাদি লিখতে লাগলেন। এরা সকলে মহান পণ্ডিত ছিলেন।

এদের গুণ-মহিমাতে আকৃষ্ট হয়ে তদানীন্তন ভারতের বড় বড় সাহিত্যিক কবি ও রাজন্যবৰ্গ ব্ৰজধামে আগমন করতে লাগলেন।

ব্ৰজধামে শ্রীরঘুনাথকে পেয়ে বৈষ্ণব স্মৃতিতে এক সুবৰ্ণ- যুগের উদয় হল।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!