সাধু নাগ মহাশয়

সাধু নাগ মহাশয়

-ফয়েজ আহমেদ

সাধু নাগমহাশয়। পুরো নাম দুর্গাচরণ নাগ। মহাপুরুষের জন্ম নরায়ণগঞ্জের দেওভোগে। বাংলা ১২৫৩ সনের ৭ ভাদ্র, ইরেজি ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট। তিনি ছিলেন পরম পূজনীয় ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গৃহীভক্ত। পিতার নাম দীনদয়াল নাগ, মাতার নাম ত্রিপুরা সুন্দরী। আদি নিবাস ছিল বরিশাল জেলার করাপুর গ্রামে। বংশগতভাবে তারা ছিলেন জমিদার। বরিশাল থেকে চলে যান বিক্রমপুরের তিলারদি। পরে আসেন দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জে। ছোটবেলাতেই নাগ মহাশয় তাঁর মাকে হারান এবং তখন থেকেই তাঁর পিসিমা ভগবতীদেবী তাঁকে বড় করেন। বিবাহ কি? সংসার কি? এসব বোঝার এগেই পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে মহাশয়ের সাথে বিক্রমপুরের রাইজািদিয়া গ্রামের জগন্নাথ দাসের কন্যা প্রসন্ন কুমারির সাথে প্রথম বিবাহ হয়। তিনি স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হবার মুর্হূতে আসলেই ভীত হতে্ন এবং সন্ধ্যা হলে গাছে উঠে বসে থাকতেন। পিসিমা নিজের সাথে থাকার অভয় দিলে তখন তিনি গাছ থেকে নামতেন। বিয়ের সময় স্ত্রীর বয়ষ ছিল ১১ বছর। দুজনেরই বালক-বালিকা বয়স। এই বালিকা বয়সেই রোগের কারণে স্ত্রীর অকাল মৃত্যু হয়।

নাগমহাশয় ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। তিনি কলকাতায় ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে দেড় বছর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তখন পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতার বিখ্যাত ডাক্তার বিহারীলাল ভাদুড়ীর কাছে ডাক্তারী শেখেন। এর পরবর্তিতে এই ডাক্তারি পেশায় নিযুক্ত হন। নাগ মহাশয় প্রথমত ব্রাহ্ম ভাবাপন্ন ছিলেন। নিয়মিত গঙ্গাস্নান, একাদশী পালন করতেন। তার চরিত্রের সবচেয়ে বড়গুণ ছিল, তিনি স্বধর্মের প্রতি আস্থা রেখেও বিরোধী মতকে গুরুত্বের  সাথে চিন্তা করতেন এবং শ্রদ্ধাশীলও ছিলেন বটে। আর তাই যাই কিছু তিনি আধ্যাত্ম সাধনায় পেয়েছেন সবই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পিতা তাকে পুনরায় বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। প্রায়শই দু:খ করে কান্নকাটি করতেন। একসময় পিতার মন রক্ষার্থে তিনি আবারও বিয়ে করার সম্মতি দেন। অবশেষে রামদয়াল ভুঁইয়ার প্রথমা কন্যা শ্রীমতি শরৎ কামিনীকে বিয়ে করেন। পিসিমা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন একবারও স্বামীর সোহাগ পাননি স্ত্রী শরৎ কামিনী দেবী। তাদের বিয়ের ৭ বছর পর পিসিমা দেহত্যাগ করলে নাগমহাশয় এতোটায় শোকাহত হয়ে যান যে, বারবার মূহ্যমান হয়ে চিতাভূমিতে যেয়ে পরে থেকে ভাবতেন মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়? কেনো জন্মে মানুষ? আবার কেনো মৃত্যু গ্রাস করে? মৃত্যু হলেই যদি পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক চুকে যায়। তবে এতো আমার আমার কেনো? দিনরাত কেবল ভাবতেন। তারপর তাদের কুলগুরু বঙ্গচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে স্বস্ত্রীক দীক্ষাগ্রহণ করেন। একবছর পর বঙ্গচন্দ্র দেহত্যাগ করেন।

সাধু নাগমহাশয় তন্ত্রমতেও সাধনা করতেন। তার সাধারণ আগ্রহ ছিল রাগমার্গে। এরপর নাগমহাশয় শ্রী রামৃকষ্ণের সন্ধান পেয়ে তার কাছে যান। প্রথম সাক্ষাতে ঠাকুর পদধুলী নিতে দেন নি। নাগমহাশয় খুব সহজেই বুঝেছিলেন এখনো সেই যোগ্যতা হয়নি তার। প্রথম সাক্ষাতে শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুর নাগমহাশয়কে বলেছিলেন, সংসারে থাকবে ঠিক পাঁকাল মাছের মতো। পাকাল মাছ পাঁকে থাকে, কিন্তু গাঁয়ে পাক লাগে না। গৃহে ঠিক তেমনি থাকবে। সংসারের ময়লা মনে লাগাবে না।”


একবার এক ভদ্রলোক নাগমহাশয়কে বললেন, ‘কোন মুক্ত পুরুষ দর্শন করেছেন কি? তৎখনাৎ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সাক্ষাৎ মুক্তিদাতা শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকেই দর্শন করেছি। আর তার প্রধান পার্ষদ শিবাবতার স্বামী বিবেকানন্দকে দর্শন করেছি।’

কিছুদিন পরে ঠাকুর নাগমহাশয়কে বললেন, ও হ্যা! তুমি না ডাক্তার? দেখতো আমার পায়ে কি হয়েছে? ভালো করে দেখ না, কি হয়েছে? তখন নাগমহাশয় বুঝলেন ঠাকুর আজ চরণ স্পর্শ করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বারবার ঠাকুরের চরণে নিজেকে সমর্পন করলেন, মস্তক ঠেকালেন অশ্রুস্বজল চোখে।

নাগমহাশয় বলতেন, ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ কল্পতরু, যেই তার কাছে প্রার্থনা নিয়ে গেছে, তাৎক্ষণিকভাবেই সে তা পেয়েছে। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ নাগমহাশয়কে একদিন সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার এই দেহ দেখে তোমার কি মনে হয়?’ নাগমহাশয় নমস্কারের ভঙ্গিতে বললেন, ‘ঠাকুর আমাকে বলতে হবে না! আমি আপনার কৃপায় জেনেছি- আপনিই সেই।’

এই উত্তর শোনার পর ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে গেলেন এবং এই অবস্থাতেই নাগমহাশয়ের বক্ষে দক্ষিণ পা আপন করলেন। তখন নাগমহাশয়ের দিব্য নয়ন খুলে গেলো। তখনই তিনি সমস্ত জন্মান্তর বুঝে গেলেন। একবার এক ভদ্রলোক নাগমহাশয়কে বললেন, ‘কোন মুক্ত পুরুষ দর্শন করেছেন কি? তৎখনাৎ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সাক্ষাৎ মুক্তিদাতা শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকেই দর্শন করেছি। আর তার প্রধান পার্ষদ শিবাবতার স্বামী বিবেকানন্দকে দর্শন করেছি।’

একদিন নাগমহাশয় ঠাকুর মুখে শুনতে পান, তিনি একভক্তকে বলছেন, ‘দেখ- ডাক্তার, উকিল, মোক্তার, দালাল এই পেশার লোকদের জন্য ধর্ম লাভ হওয়া বড় কঠিন।’

নাগমহাশয় আড়ালে শুনছিলেন, ঠাকুর বিশেষ করে ডাক্তার সম্পর্কে বলছিলেন, ‘এতটুকু ঔষধেও মন পরে থাকবে। তাহলে কি করে বিরাট ব্রহ্মান্ডের ধারণ হতে পারে।’

এই কথা শোনার পর তিনি ডাক্তারি পেশা ত্যাগ করেন। একদা নাগমহাশয়ের ভেতরে গৃহবাস অনাসক্তের ভাব দেখে কঠিন নির্দেশ চাপিয়ে দিলেন, ‘গৃহেই থেকো, যেনতেন করে মোটা ভাত, মোটা কাপড়ে চলে যাবে।’

তবুও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গৃহে কিভাবে থাকা যায়, পরের দু:খ-কষ্ট দেখে কিভাবে স্থির থাকা যায়?’

ঠাকুর বলেছিলেন, ‘গৃহে থাকলে তোমার কোনো দোষ হবে না। তোমায় দেখে লোক অবাক হবে।’

নাগমহাশয় বললেন, ‘গৃহাশ্রমে দিন কাটবে?’

ঠাকুর বললেন, ‘তোমার আর কিছু করতে হবে না, কেবল সাধুসঙ্গ করবে।’

নাগমহাশয় বললেন, ‘সাধু চিনব কি করে?’

ঠাকুর বললেন, ‘ওগো তোমায় সাধু খুঁজে নিতে হবে না। তুমি ঘরে বসে থাকবে। যথার্থ সাধুরা স্বেচ্ছায় এসে তোমার সঙ্গে দেখা করবেন।


একবার পিতাপুত্র বাজার থেকে ফেরার পথে বাড়ির কাছে বাঁশঝাড়ের কাছে হঠাৎ কোনো দৈবসত্ত্বাকে দেখতে পেলেন। আনন্দিত হয়ে পুত্রকে বললেন, ‘তুমি বুঝি এমন সব সময়ই দেখ?’

একসময় নাগমহাশয়ের পিতা দিনদয়ালের আক্ষেপ ছিল যে দূর্গাচরণ আয় করলে হিন্দু সমাজের সকল পূজার্চনা নিজ বাড়িতে করতে পারতেন। তাই নাগমহাশয় সেই ব্যবস্থা করতে লাগলেন। দূর্গাপুজা এলেই নাগমহাশয় জিনিসপত্র কিনতে কলকাতা যেতেন এবং তখন ঠাকুর রামকৃষ্ণ ভক্তদের দেখে আসতেন। এতে তাদের কেউ কেউ নাগমহাশয়ের বাড়িতেও আসতেন। নাগমহাশয়ও তাদের কাউকেই না খাইয়ে বাড়ি থেকে যেতে দিতেন না, এই মধুর ব্যবহার সারা গায়ে প্রচার হয়ে দিয়ে ছিল। ক্রমেই বাড়িতে অনেক বড় বড় লোক আশা শুরু হয়ে গেল।

ঠাকুর বলতেন, ‘ফুল ফুঁটলে আর ভ্রমরকে ডাকতে হয় না।’ এই কথা তখন বাস্তব হলো। দূর থেকে মুনসেফ, ডেপুটি, উচ্চ রাজকর্মচারী অনেকেই আসতো।

একবার পিতাপুত্র বাজার থেকে ফেরার পথে বাড়ির কাছে বাঁশঝাড়ের কাছে হঠাৎ কোনো দৈবসত্ত্বাকে দেখতে পেলেন। আনন্দিত হয়ে পুত্রকে বললেন, ‘তুমি বুঝি এমন সব সময়ই দেখ?’

নাগমহাশয় বলেছিলেন, ‘ভক্তি থাকলে, ঈশ্বরে মন থাকলে, আরো কতকিছু দেখতে পাবেন।’

পিতার জীবনের শেষদিকে ইচ্ছা হয়েছিল গঙ্গাস্নানের। সবাই তৈরি হলো কিন্তু চৌকা পাওয়া যাচ্ছিল না, এই সময়ে তাদের বাড়ির মন্দিরের পাশ থেকে মাটি ফেটে প্রচুর জলধারা প্রবাহিত হওয়া শুরু হলো।

নাগমহাশয় বললেন, ‘মা গঙ্গা দেবী আমার বাড়িতে পদধূলি দিতে এসেছেন, জয় রামকৃষ্ণ, জয় রামকৃষ্ণ।’ বলে ভুমিষ্ট হয়ে প্রণাম করলেন। কারো কোনো অসুখে সেই জল খেলে ভালো হয়ে যেত।

স্বামী বিবেকানন্দ এই ঘটনা শুনে বলেছিলেন, এমন মহাপুরুষের দ্বারা আরো অনেককিছু সম্ভব। সাধু নাগমহাশয় নিজেকে খুবই দ্বীনহীন ভাবতেন, সবার প্রতিই একবার তাঁর বাড়িতে অভাবের ঘরে তার বোন লাউয়ের চারা লাগিয়েছিলেন। পাশেই একটা গরু বাঁধা ছিল। সে সদ্য ফোটা চারা খেতে চাচ্ছিলো কিন্তু গলায় রশি থাকার কারণে খেতে পারছিল না, তাই দেখে তার খুব মায়া হলো এবং গিয়ে রশি খুলে দিলেন। গরু সমস্ত চারা খেয়ে নিল। যদিও এই ঘটনা দেখে তাঁর বাবা তাকে অনেক কথা শুনিয়েছিলেন। আর একবার রামকৃষ্ণ উৎসবের দিন একটি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করা হলে তিনি তাতে উঠতে না করে বলেন, তিনি হেঁটে যাবেন। উপেন বাবু জানতেন যে, তার কারণ ছিল গাড়োয়ান যদি ঘোড়াকে চাবুক মারে নাগমহাশয়ের অন্তরে খুবই ব্যথা লাগবে। সেই অনুষ্ঠানে পৌঁছে তিনি নিষেধ করা সত্ত্বেও অতিথি সবাইকে বাতাস করতে থাকলেন। ফেরার পথে তাকে আর গাড়িতে উঠানো যায়নি। তাই সবাই হেঁটেই বাড়ি পৌছায়। জীবিত থাকতে এটাই তার শেষ কলকাতা যাওয়া। নাগমহাশয় কাউকে মন্ত্রদীক্ষা দেননি।

শ্রী শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী অনেক পিড়াপিড়ি করেছিলেন দীক্ষা দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি দেননি। শরৎ বাবু একবার নাগমহাশয়কে দেখতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। ঢাকা থেকে ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ যান। স্টেশন থেকে দেওভোগ যেতে নৌকা প্রয়োজন কিন্তু নেই। তাই জলে ঝাঁপ দিলেন এবং সাঁতরে নাদাবাড়ি পৌঁছে দেখেন নাগমহাশয় তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তখন ঘরে শুকনো লাকড়ি নেই। তাই নাগমহাশয় সকল নিষেধ উপেক্ষা করে ঘরের খুঁটি কেটে লাকড়ি বানালেন রান্নার জন্য।

এই শরৎবাবু একবার অনেকদিন নাগমহাশয়কে না দেখে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে গিয়ে তার কানে বাজলো, ‘আগামীকাল সকালেই নাগমহাশয়ের সাথে দেখা হবে।’ আর ঠিক ঠিক পরদিন সকালে ঘুম থেকেই শুনতে পেলেন নাগমহাশয় তাকে ডাকছেন। দৌঁড়ে গিয়ে প্রণাম করলেন।


শরৎবাবু পঞ্জিকা দেখে বললেন, ১৩ পৌষ ১০টার পর বেশ ভালো দিন আছে। শরৎবাবু বোঝেন নি নাগমহাশয় মহাযাত্রার কথা ইঙ্গিত করেছেন। দিন তারিখ শুনে নাগমহাশয় বলেছিলেন, ‘আপনি যদি অনুমোতি করেন তো ঐদিনই আমি মহাযাত্রা করব।’

তাকে দেখে নাগমহাশয় বললেন, ‘আপনি কি কি করছেন ভেবে ভেবে আমাকে কলকাতয় আসতে হলো। ভয় কি? ভাবনাই বা কিসের? যখন ঠাকুরের রাজ্যে এসে পড়েছেন আর ভাবনা নেই। আত্মনাশ মহাপাপ।’ নাগমহাশয়ের শ্বাশুড়িকেও তার ভক্ত হিসেবে ধরা যায়। একবার তিনি স্বপ্নে দেখলেন, ‘মহাদেব বৃষ বহনে তার শিয়রে এসে বলছেন, তোমার পুজার প্রয়োজন নেই। আমি প্রসন্ন হয়েছি।’ এরপর থেকে তিনি শিব পুজা বন্ধ করে নাগমহাশয়কে শ্রদ্ধা করতে শুরু করলেন। নাগমহাশয় মহাপ্রয়ানের পর তিনি লোক পেলেই বলতেন, ‘ওগো আমার শিব জামাই লীলাসাঙ্গ করে চলে গেলো।’ নাগমহাশয় মহাসমাধি লাভের মাত্র তিনদিন আগে শরৎবাবুকে ডেকে বললেন, যাত্রা দিন ঠিক করতে। শরৎবাবু পঞ্জিকা দেখে বললেন, ১৩ পৌষ ১০টার পর বেশ ভালো দিন আছে। শরৎবাবু বোঝেন নি নাগমহাশয় মহাযাত্রার কথা ইঙ্গিত করেছেন। দিন তারিখ শুনে নাগমহাশয় বলেছিলেন, ‘আপনি যদি অনুমোতি করেন তো ঐদিনই আমি মহাযাত্রা করব।’

একথা শুনে শরৎবাবু হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। পিতার দেহত্যাগের তিন বছর পর ৫৩ বছর ৪ মাস ৭ দিন বয়সে নাগমহাশয় চিরনিদ্রায় শয়ন করেন। শ্রীমতি শরদকামিনী দেবী তার স্বামী নাগমহাশয়ের সাথে বিয়ের পর একসাথে ঘুমিয়েছিলেন বটে। কিন্তু বিরাট সংযম নিয়ে। শরৎকামিনী দেবী বলতেন, ‘আমি ঠাকুরকে (নাগমহাশয়কে) বিরক্ত করব কেন? তাকে আমি ছয় মাসের শিশুর মতো বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছি। একদিনের জন্যও আমার অন্যভাব আসে নি।’

নাগমহাশয় বলতেন, ‘অনেক অবতার মহাপুরুষরা স্ত্রী থাকাতে ভয় পেতেন, ভয়ে সংসার ছেড়ে গিয়েছেন। আর আমি ইচ্ছা করেই এ সংসারে রয়ে গিয়েছি, সাধ করেই থেকেছি। সর্বদাই মন বেরিয়ে যেতে চায় আমি যেতে দিইনি।’ স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, ‘গেরস্ত যদি কেউ হয় তো যেন নাগমহাশয়ের মতো হয়।’

স্বামীজী তার এক পত্রে লিখেছিলেন, ‘সমস্ত পৃথিবী ঘুরিলাম, নাগমহাশয়ের ন্যায় মহাপুরুষ কোথাও দেখিলাম না। সমুদ্রেরও জোয়ার ভাটা আছে, কিন্তু নাগমহাশয়ের মধ্যে কোনোরূপ ভাব বিপর্যয় দেখি নাই।’

শ্রী রামকৃষ্ণ নাগমহাশয়ের সাথে পরিচয়ের প্রথম থেকেই বলতেন, ‘এই লোকটা যেন আগুন-জ্বলন্ত আগুন।’


কারৈর চক্রে জন্ম-জন্মান্তরের কারণে জীবের যে কতদু:খ কষ্ট তা লাঘবের জন্য সহজ পথ খুঁজতে থাকেন। তাই সেই লক্ষেই বালকদের উদ্দেশ্যে, ‘বালকদের প্রতি উপদেশ’ নামে একটা আলোচনা গ্রন্থ লেখেন।

নাগমহাশয় চলে যাওয়ার পথে কোন মসজিদ, গির্জা কিংবা কোন বৌদ্ধ মন্দির দেখলে দাঁড়িয়ে পরতেন এবং নমস্কার করে সেখান থেকে আসতেন, নাগমহাশয়ের আমলে বাংলাদেশ হিন্দু প্রধান অঞ্চল ছিল। তিনি সামাজিক সকল বাঁধা উপেক্ষা করে মুসলমান বা অন্য ধর্মাম্বলম্বিদের খোঁজ নিতেন। তার বিশ্বাস ছিল, ‘একই ভগবান সর্বঘটে বিরাজ করছেন।’

পৃথিবী এবং দেশের প্রতি নাগমহাশয়ের ছিল অপরিসীম মায়া। কারৈর চক্রে জন্ম-জন্মান্তরের কারণে জীবের যে কতদু:খ কষ্ট তা লাঘবের জন্য সহজ পথ খুঁজতে থাকেন। তাই সেই লক্ষেই বালকদের উদ্দেশ্যে, ‘বালকদের প্রতি উপদেশ’ নামে একটা আলোচনা গ্রন্থ লেখেন।

১৪৮বছর রপরেও যে গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। এছাড়াও তিনি দেড় হাজার গান রচনা করেছিলেন। যার সবগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।  ১২৪৫টি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৭টি হরি বিষয়ক, ৪টি মণিক্ষা বিষয়ক, গুরু বিষয়ক ৬টি, শিব সংগীত ৭টি, বাকিগুলো শ্যামা সংগীত।

সব ধর্ম বিষয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। কোনো ধর্মকেই কখনোই খাটো করে দেখতেন না। সবশেষে নাগমহাশয়ের রচিত একটা গান দিয়ে শেষ করছি,

গুরুগো আর কিছু বাসনা নাই মনে,

কেবল এই এক নিবেদন শ্রীচরণে।।
যেন তব দত্তধন, সদা সর্বক্ষণ হৃদয় মাঝে রাখি পরম যতনে।।
যখন যা করি, নাম যেন না পাসরি, সদা মন যেন থাকে ঐ চরণে।।
গুরুগো তুমি দয়াময়, নিজগুণে হইয়া সদয়, এই আর্শিবাদ কর অকিঞ্চনে।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!