সীতারাম

সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: চার

রাম রাম সীতারাম:
জঘন্য রোগগ্রস্ত হয়ে আমার এ জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেল। না ব্যর্থ নয়। রামের কৃপায় রোগ পেয়েছ।

‘মহারোগো, মহাশোকো মদনুগ্রহলক্ষণম্।’

অর্থাৎ মহারোগ, মহাশোক ঠাকুরের অনুগ্রহের লক্ষণ। কেবল রাম রাম কর। সব রোগের মূল পাপ, রাম রাম করলে সব পাপ দূর হয়ে যাবে, কেউ টেরও পাবে না। জীবনের সার্থকতা রামকে লাভ করা, রামের সাক্ষাৎ দর্শন। রাম আছেন, এখনও মানুষ তাঁকে দেখতে পায়। রামকে না দেখে ফিরে যাওয়াই হল জীবনের ব্যার্থতা।

প্রাণের প্রাণ, মনের মন তিনি যে সব, পঞ্চভূত তাও রাম। রামের ভেতর তুমি ডুবে আছ। তোমার ভেতরে বাইরে রাম- অবিরাম রাম রাম করে তা জেনে নাও। কেবল বল- রাম রাম রাম।

সংসারে বড় অভাব, আমার দারিদ্র্য কি রাম রাম করলে যাবে?
রাম রাম সীতারাম। ঠাকুর তোমাকে অনুগ্রহ করেছেন। তাঁর কথা-

‘যস্যাহমনুগৃহ্নামি হরিষ্যে তদ্ধনং শনৈঃ।’

অর্থাৎ যাকে আমি অনুগ্রহ করি, শীঘ্র তার ধন হরণ করে থাকি।

কেবল রাম রাম কর। তিনি সমস্ত ভার গ্রহণ করে, তোমায় একেবারে নিশ্চিন্ত করে দেবেন। তাঁর প্রতিজ্ঞা- অনন্যভাবে যারা আমার চিন্তা করে, তাদের যা নাই, তা এনে দিই- যা আছে তা রক্ষা করি। কোনও চিন্তা নাই- একটি নামও ব্যর্থ হবে না। তুমি যত পাপী, যত দুর্বল, যত অসংযত হওনা কেন তথাপি তোমার আশা আছে। কেবল রাম রাম কর, রোগ, শোক, অভাব, কামাদির অত্যাচার সব দূর হয়ে যাবে।

… … …

অপরের রোগ সীতারামের ভোগ:
১৩৬৫ সাল। মগরা আনন্দকাননে চাতুর্মাস্য উৎসব। হঠাৎ সীতারাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দিনরাতের কর্মসূচীর যা বাহার তাতে রোগীকে দায়ী করা অন্যায়। বড় বড় ডাক্তাররা দেখে যাচ্ছেন। রোগ একটু উপশম হয়েছে, কিন্তু ঘাড়ে অসহ্য ব্যথা। তবু সীতারাম সর্বদা হাসিমুখ, সকলকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

প্রখ্যাত ডাক্তার ভক্ত শ্রীনলিনীরঞ্জন সেনগুপ্ত কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। সীতারাম বললেন- ‘একটু সুস্থ কিন্তু ঘাড়ের যন্ত্রণা এখনও যায় নি। আর তিনি যাবেনই বা কেন? দিব্যি সেবা পাচ্ছেন, সকলে আহা উহু করছে। বড় বড় ডিগ্রীওলা ডাক্তাররা- কি ছুটোছুটিই না করছেন। এই অবস্থায় তিনি যেতে চান? তোরা শুধু সীতারামের কথাটাই ভাবিস!’

ভাবাবিষ্ট সীতারাম আরও বললেন- ‘দ্যাখ্ দেখি, চতুর্দিকে রোগশোকের কত জ্বালা কত যন্ত্রণা! সেদিন রাসমণি মার কালীবাড়ীতে এক মালী পায়ের তলায় এক ব্যাধিগ্রস্ত শিশু সন্তান ফেলে দিল। কি রোগ দিলিরে? জিজ্ঞাসা করতে, সীতারামের আশীর্বাদ ভিক্ষে করে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। যাক্ ভোগটা শিগগির হয়ে গেল। আবার পাপ নেবার সামর্থ্য এল।

-নব নব রূপে এসো

… … …

মনকে বশ কর:
দেখো, মন একটি দুষ্ট বালক-প্রহার করিলে তাকে বশ করিতে পারিবে না। প্রথমে, তাহার বশে যাইতে হইবে, অন্যায় করিলে বুঝাইতে হইবে, দিবারাত্র তাহাকে পাহারা দিতে হইবে। শ্বাস-প্রশ্বাসরূপ প্রহরী দুইটার হাতে জপরূপ চকচকে হাতিয়ার খানা দাও, তাহারা মনের শরীর রক্ষা করুক।

কিছুদিন পাহারা দিবার পর মন যে চক্ষু লইয়া ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ করে, সে চক্ষু দুইটি আপনা আপনি নষ্ট হইয়া যাইবে। একটি নূতন চক্ষু ফুটিবে, তখন সে শান্তশিষ্ট হইয়া যাবে। হৃদয়ে, কণ্ঠে, ভ্রূমধ্যে, সহস্রারে যে স্থানে রাখিবে, সেই স্থানেই স্থির ভাবে থাকিবে।

চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক- ইহারা জ্ঞানেন্দ্রিয়। বাক্, পানি, পাদ, পায়ু, উপস্থ- ইহারা কর্মেন্দ্রিয়। উভয় ইন্দ্রিয়ের রাজা মন। ইন্দ্রিয়গণ তোমার উপর কর্তৃত্ব করিতেছে। তুমি দেহ নও- সেকথা ভুলাইয়া রাখিয়াছে। সেই জন্য তোমার যাতায়াত নিবৃত্তি হইতেছে না।

চক্ষু দেখিল-তজ্জন্য পাপ পুণ্য চক্ষুর, কিন্তু চক্ষুর রাজা মন তোমায় বুঝাইয়া দিল-তুমি দেখিয়াছ, এ তোমার পাপ পুণ্য। এই অভিমান হেতু তোমার যাতায়াত নিবৃত্তি হয় না। তাহারা কর্তৃত্ব করিয়া বড় কষ্ট দিতেছে। চক্ষু, কর্ণ এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়গণও এইরূপ করিবে আর ইন্দ্রিয়ের রাজা মন, সে তোমাকে নষ্ট করিবার জন্য ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করিবে।

তাই মনকে আগে বশ করিতে হইবে। মন যখনই কোন অন্যায় করিয়া বলিবে- এ পাপ তোমার, তুমি অমনি বলিবে- আমি তো জড়, আমার তো কোনো শক্তি নাই, তুমি বলাও তাই বলি, তুমি করাও তাই করি, এ পাপ-পুণ্য তোমার, এ বোঝা আমার কেন নাথ! এই বলিয়া মনের বোঝা ভগবানের চরণে ফেলিয়া দাও- পাপ-পুণ্যের বন্ধন আসিবে না। এইরূপে মন অবিরত ভগবদসঙ্গ করিলে সেও ভগবান হইয়া যাইবে এবং স্বরূপে বিশ্রান্তি লাভ করিবে।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!