হাওয়া দমে

দমের বাতাস – বাতাসের দম

-মাসফিক মাহমুদ

নানান আদমের নানান রুপ। নানান রুপের আদমের মাঝ থেকে তাঁর আশেক হয়ে গড়ে ওঠার জন্যই হয়তো; তিঁনি এত রুপে আদমকে ধরাধামে পাঠিয়েছেন।

যদি মাছের দিকে তাকাই, তাদের পানিতে সাঁতার কাটতে দেখি। যদিও সব মাছ আবার সব পানিতে সাঁতারও কাটে না। মানব জাতিও কিন্তু প্রতিনিয়ত সাঁতরেই চলে। তবে তা জলে নয়। মানুষ সাঁতরায় বাতাসে-বায়ুতে।

চোখে দেখা যায় না বাতাস। চোখে দেখা যায় না সেই সাঁতার কাটা। তবুও তার অস্বীকারের উপায় নেই। এক জীবনে নানান রকমের বাতাসে সাঁতরে জীবন পার করে দেয় মানুষ। আবার এইসব নানান বাতাসের সংমিশ্রণে জীবন কখনো কখনো দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এসব ঘটে যায় অনেক সময় অজান্তেই।

মানুষ ক্রমশ আত্ম সন্তুষ্টি হারাচ্ছে। যে দমটা নিচ্ছে তাতে স্বস্তি বোধ না করে, পরের দমটাই বুঝি স্বস্তির ঠিকানা হবে এই প্রত্যাশায় দমে দমে আর স্বস্তি থাকে না। থাকে কেবল প্রত্যাশা। এটা খারাপ, পরেরটা ভালো হবে এই কামনা।

এ যেন কেবলই চাহিদা বাড়িয়ে যাওয়া। আর তা করতে গিয়ে দুর্বিষহ গোলেমেলে জীবন নিয়ে প্রতিযোগীতায় কেটে যায় অহর্নিশি। শেষ বেলায় শূন্য হাতে আদি নিবাসের পথে যাত্রার দিন গুনে যায়।

পরম তাঁর আশেকের বাহনকে সবসময় ফুলের বাগানের উপর দিয়া নেন না। তাঁর আশেককে দম নেওয়া শেখানোর জন্য, এক এক সময় এক এক পথে নেন। যেন তাঁর আশেক, তার ভক্ত, তার প্রেমিক দম নেওয়া শিখে ধরাধাম হতে আদি নিবাস পর্যন্ত এক সুন্দর পথের যাত্রা করতে পারে।

অথচ আমরা ভাবিই না, পরম চাইলে মানুষকে মানুষের সঠিক দমের ঠিকানার সন্ধান দিয়েই পাঠাতেন। তিনি তা করেন নি। তিনি আমাদের এক মহান কর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন। তা হলো- আদি নিবাসের চূড়ান্ত সুখে পৌঁছাতে ও সঠিক দমের সন্ধান করার জ্ঞান ও দায়িত্ব।

কোন কিছুতো আর সাধনা-ভজন ছাড়া সম্ভব নয়। এ ক্ষুদ্র জীবনে যতটুকু জেনেছি; তা হলো মিথ্যা, লোভ আর অহংকার অর্থাৎ রিপুকে পরাজিত করাই সবচেয়ে বড় সাধনা।

তবে এ সাধনা করতে চাইলেই তো আর করা যায় না। তার জন্য থাকতে হয় প্রেম ও ভক্তি। ভক্তি ও প্রেম নিয়েই নানান বাতাসে দম নেওয়া শিখতে হয়। যার মনে চূড়ান্ত প্রেম ও ভক্তি আছে, তাকেই তিঁনি নানান বাতাসে দম নেয়ার জন্য কোন না কোন পথ দেখিয়ে দেন।

আর তিনি যখন পথ দেখান তখন দম নেয়াটাও সহজ হয় কোন আক্ষেপ ছাড়া।

বাতাস হলো নানান আদম; আর বাহন হলো জীবন। বাহন তো আর নিজে চলে না; স্রষ্টাই তার সৃষ্টিকে চালায়। তাই তিঁনি তাঁর আশেকের বাহনকে নানান পথে নেন।

পরম তাঁর আশেকের বাহনকে সবসময় ফুলের বাগানের উপর দিয়া নেন না। তাঁর আশেককে দম নেওয়া শেখানোর জন্য, এক এক সময় এক এক পথে নেন। যেন তাঁর আশেক, তার ভক্ত, তার প্রেমিক দম নেওয়া শিখে ধরাধাম হতে আদি নিবাস পর্যন্ত এক সুন্দর পথের যাত্রা করতে পারে।

সব বাতাসেই তিনি তাঁর আশেক’কে ভ্রমণ করাবেন। দম নেওয়ার চতুরিও তিনি ঐ বাতাস থেকেই শেখাবেন। কিন্তু চতুরি করা যাবে না; এটাই তাঁর বিধান। চতুরি শিখবে; চতুরের চতুরি থেকে রক্ষার জন্য, তাহলেই আশেক হওয়া যাবে, আর আশেকের হলেই পরমে লীন হওয়া যায়।

জগতের নানান বাতাস, নানান আদম। নোনা বাতাস হলো, সমুদ্রের বাতাস; কৃপনের ধন আছে কিন্তু কারো কাজে লাগে না।

হালকা মিঠা বাতাস হলো, নদীর বাতাস। নয় ছয় করে হঠাৎ ধনী, খালি লোক দেখানোয় ব্যস্ত থাকে।

ভারী বাতাস হলো, আবর্জনা/পঁচা খালের বাতাস; বড় বড় কথা বলবে, কথায় না মিললে খুব বাজে কথা বলবে।

পাতলা বাতাস হলো, খোলা প্রান্তরের বাতাস; কোন কাজে নাই, শুধু বুদ্ধি দিবে।

বদ্ধ বাতাস হলো, ঘন গাছপালার মাঝে বাতাস; এই বাতাস; হবে না, পরবি না বলে শুধু ভয় দিবে।

মিঠা বাতাস হইলো, ফুল বাগানের বাতাস; জ্ঞানের বাতাস, যার যেমন দরকার তাকে তেমন দেওয়ার চেষ্টা করে; এ বাতাসের সন্ধান সহজে মেলে না। আদম যখন সকল বাতাসে ভ্রমণ করে লোভ মিথ্যা আর অহংকারকে পরাজিত করতে পারে, তখনই পরম এই মিঠা বাতাসের সন্ধান দেন।

সব বাতাসেই তিনি তাঁর আশেক’কে ভ্রমণ করাবেন। দম নেওয়ার চতুরিও তিনি ঐ বাতাস থেকেই শেখাবেন। কিন্তু চতুরি করা যাবে না; এটাই তাঁর বিধান। চতুরি শিখবে; চতুরের চতুরি থেকে রক্ষার জন্য, তাহলেই আশেক হওয়া যাবে, আর আশেকের হলেই পরমে লীন হওয়া যায়।

ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

কে বানালো এমন রঙমহলখানা।
হাওয়া দমে দেখে তারে আসল বেনা।।

বিনা তেলে জ্বলে বাতি
দেখবে যেমন মুক্তামতি,
জলময় তার চতুর্ভিতি
মধ্যে থানা।।

তিল পরিমান জায়গা সে যে
হদ্দরূপ তাহার মাঝে,
কালায় শোনে আঁধলায় দেখে
ন্যাংড়ার নাচনা।।

যে গড়েছে এ রঙমহল
না জানি তার রূপটি কেমন,
সিরাজ সাঁই কয় নাই রে লালন
তার তুলনা।।

.…………………………………………..
আরো পড়ুন:
সিজন : এক
লালন বলে কুল পাবি না: এক
লালন বলে কুল পাবি না: দুই
লালন বলে কুল পাবি না: তিন
লালন বলে কুল পাবি না: চার
লালন বলে কুল পাবি না: পাঁচ
লালন বলে কুল পাবি না: ছয়
লালন বলে কুল পাবি না: সাত
লালন বলে কুল পাবি না: আট

সিজন : দুই
লালন বলে কুল পাবি না: এক
লালন বলে কুল পাবি না: দুই

লালন বলে কুল পাবি না: তিন
লালন বলে কুল পাবি না: চার
লালন বলে কুল পাবি না: পাঁচ
লালন বলে কুল পাবি না: ছয়
লালন বলে কুল পাবি না: সাত
লালন বলে কুল পাবি না: আট

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!