বিশ্বাসীদের দেখা শুনা - লালন সাঁইজি

বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- শেষ কিস্তি

-দ্বীনো দাস

তবেই এই তাকিয়ে থাকা আর আরাধনা করতে করতে একদিন তার আড়ালের পর্দাটা সরে যাবে। সেদিন ভেতরের দিকে পরমাত্মার আলো জ্বলে উঠবে। আর সেদিনই দেখা মিলবে পরম স্রষ্টা বা জগন্মাতা রূপে মহাস্রষ্টার।

তাই সাঁইজি ফকির লালন বললেন- ‘বিশ্বাসীদের দেখা শুনা, লালন কয় এই ভুবনে।’

অবিশ্বাসবাদীরা স্রষ্টাকে ও তার প্রেরিত পুরুষ অবতরগণকে কোন মতেই মানতে চায় নাই পূর্বে। আর চাইবেও না। তারা বলবে সবকিছু আপনা থেকেই হচ্ছে। আর হয়ে আসছে। তারা স্রষ্টার সৃষ্টির এত কিছু কাণ্ড দেখেও মানছে না। তারা সব দেখছে।

বিশ্বজোড়া সৃষ্টি তার নিয়ম সঙ্গতি। আকাশ নক্ষত্র পুঞ্জ প্রত্যেকে আপন নিয়মে চলছে বা ঘুরছে। অথচ কারো সাথে কারো ঠোকাঠুকি হচ্ছে না। জগতে এত বর্ণ ও সৌন্দর্য খেলা চলছে এত কিছু কোন শক্তি ঘটাচ্ছে? ওরা বলছে সব কিছুই ঘটছে শক্তির ক্রিয়াতে। এই শক্তির অস্তিত্ব আমরা মানি। এর বাইরে আর কিছু মানি না।

সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে বা সমন্ধে আমরা প্রত্যক্ষভাবে বেশী কিছু না জানলেও। অন্ততপক্ষে সিদ্ধপুরুষ বাকশুদ্ধ মহাপুরুষদের এই কথাগুলি বিশ্বাস করতে হবে। মেনে নিতে হবে। কারণ তারা আল্ আমিন রূপে ধরাধামে এসেছেন জীব উদ্ধারিতে। আমাদের নিজেদের ভেতর ঈশ্বরের কিছু মৌলিক বীজ লুকিয়ে আছে।

হায়রে অন্ধ অবিশ্বাসীর দল- ক্ষুদ্রকায় ক্ষুদ্র অ্যাটম ইলেকট্রনের ভেতরকার অলৌকিক শক্তির কাণ্ডকারখানা দেখেও কি মনে হয় না এতবড় শক্তির পেছনে নিশ্চয় কোন উৎস বা শক্তির মালিক প্রভু রয়েছে? স্রষ্টাকে বাদ দিলে তার অস্তিত্ব বাদ দিলে কোন প্রশ্নই মেলে না।

আর তাকে স্বীকার করলেই, অনেক রকম জটিল বিষয় প্রকাশ হয়ে যায়।

যুগে যুগে মহামনীষীরা বলেছেন-

যেমন শ্রী রামকৃষ্ণ বললেন- তোকেও যেমন স্পষ্ট দেখছি, মাকেও তেমনি স্পষ্ট দেখতে পাই।

যীশু খৃষ্ট বলেছেন- যারা স্রষ্টাকে দেখেনি তবুও বিশ্বাস করে তারা ধন্য।

এখানে অন্ধ বিশ্বাসিরাই ধন্য।

স্রষ্টার অস্তিত্ব যে কোন বস্তুর মতোই সত্য। যেমন চোখে দেখা, কানে শোনা ও ছুঁয়ে দেখার দ্বারা বোঝা যায়। তেমনি তার থেকেও অনেক বাস্তব তার অস্তিত্ব।

মনীষীরা আরো বলেছেন, জগতের সকল বিষয়েই তুমি সন্দেহ করতে পার, কিন্তু স্রষ্টাকে যদি সরল মনে সহজ হয়ে একান্তভাবে কামনা কর তবে তার সাক্ষাত মিলবেই মিলবে। এতে কোন সন্ধেহের অবকাশ নাই।

দিন যেমন অন্ধকার দূর করে আলো দেয়। আর রাত যেমন অন্ধকারের চাদরে আলোকে ঢেকে নেয়। রাত আর দিন যেমন সত্য। তেমনি স্রষ্টার অস্তিত্ব বা উপস্থিতি তার থেকেও বড় সত্য। তিনি সর্বদায় সর্বজায়গায় সর্বভূতে উপস্থিত আছেন।

যখন এই উপলব্ধি হবে তখন তখন জগতের সব থেকে বড় সত্য বলে প্রমাণিত হবে। সেই পরম অস্তিত্বের অতি সামান্য মাত্র প্রকাশ ও এতোই তীব্র জ্যোতির্ময় যে, তাঁর কাছে বস্তু জগতের সব কিছু অতি নগণ্য ম্লান হয়ে যায়। পার্থিব জগতের সব আকর্ষণই তার কাছে নগণ্য প্রতীয়মান হয়।

সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে বা সমন্ধে আমরা প্রত্যক্ষভাবে বেশী কিছু না জানলেও। অন্ততপক্ষে সিদ্ধপুরুষ বাকশুদ্ধ মহাপুরুষদের এই কথাগুলি বিশ্বাস করতে হবে। মেনে নিতে হবে। কারণ তারা আল্ আমিন রূপে ধরাধামে এসেছেন জীব উদ্ধারিতে। আমাদের নিজেদের ভেতর ঈশ্বরের কিছু মৌলিক বীজ লুকিয়ে আছে।

ছোটকালে যখন বুদ্ধি বেশী হয় নি তখন সবার ভেতর একটা সরল বিশ্বাস ছিল। কেউ কেউ বলবে আমি ওসব বিশ্বাস করি না। নিজে যা বুজবো তাই করবো। এই কথাটা সম্পূর্ণ ভুল। বিশ্বাসটা হল মনোবৃত্তির মূল। মানুষের মধ্যে প্রথম চেতনা আসার সঙ্গে তা অতি সঙ্গোপনে ঢুকে পড়ে।

অবিশ্বাসীরা বলেন, বুদ্ধিই মানুষের মনের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কিন্তু তার থেকেও একটা বড় জিনিস আছে। যার থেকে আলো না পেলে যত বড় বুদ্ধি হোক না কেন তারা চলতে পারবে না। আর সেই আলোকিত বস্তুটি বিশ্বাসীদের অন্তরে তার নাম ‘বোধি’।

যেমন সদ্যোজাত শিশু নিতান্ত অসহায় অবস্থায় যখন দেখে তার মা তাকে যত্ন সহকারে স্তন দিয়ে সদাসতর্ক রক্ষা করছে। ঐ শিশুর তখন বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বুদ্ধি কিছুই হয়নি। কিন্তু আপনা হতেই তার মায়ের প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। নির্ভরতা জন্মায়। আর এটা অন্তরের ভেতর থেকেই জন্মায়।

মাকে দেখলেই শিশু তৎক্ষণাৎ নিশ্চয়তা পায় বা শান্ত হয়। এটাই হলো বিশ্বাসের প্রথম বীজ রোপন। যা স্রষ্টা হতে আগমন। আর যখন থেকে অবিশ্বাস শুরু হয় তখন থেকে শিশু বড় হবার পর। সরল বিশ্বাসে পরিবারও সমাজ থেকে ঠকতে থাকে তখন হয় অবিশ্বাসের জন্ম।

অবিশ্বাস নিয়ে কেউ জন্মায় না। বরং বিশ্বাস নিয়ে জন্ম হয় প্রতিটি শিশুর। জীবন চলার পথে ঠকতে ঠকতে মানুষের এত অবিশ্বাস জন্ম হয়। যে বিশ্বাসটা পুরা চাপা পড়ে যায় অবিশ্বাসের আবরণে। অবিশ্বাস যতই বাড়ুক বিশ্বাস তাতে পরিপূর্ণ লোপ পাবে না।

একদিন এই বিশ্বাস জন্মাবে। দুনিয়ায় সবাই তাকে ঠকাচ্ছে কিন্তু স্রষ্টা তাকে কোনদিন ঠকায় না বা ঠকাবে না। যদি তার দিকে আমরা মন প্রাণ সপে দিয়ে থাকি বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে। আমরা অনেক কিছু সত্যকে সত্যিকারভাবে চেনা যায় না। উপলব্ধি করা যায় না। সত্যকে চেনা যাবে ভেতরকার বোধের দ্বারা।

অবিশ্বাসীরা বলেন, বুদ্ধিই মানুষের মনের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কিন্তু তার থেকেও একটা বড় জিনিস আছে। যার থেকে আলো না পেলে যত বড় বুদ্ধি হোক না কেন তারা চলতে পারবে না। আর সেই আলোকিত বস্তুটি বিশ্বাসীদের অন্তরে তার নাম ‘বোধি’।

যা কিনা সরাসরি সত্যের স্পর্শ নিতে জানে। বোধির সামান্য ভাবানুভুতিতে যে কাজ হবে। বুদ্ধির প্রশ্নে তার উত্তর বা কাজ হবে না। বিশ্বাসই কেবল এই বোধি সত্তাকে জাগ্রত করতে পারে। কোন সন্দেহবান বুদ্ধি তা পারে না। তাইতো বিশ্বাসীদের সাধনা এত দামী।

লালন সাঁইজির সেই অমূল্য বাণী-

বিশ্বাসিদের দেখা শুনা এই ভুবনে
সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন
দিব্য জ্ঞানে।।

এখানে সাঁইজি সেই সহজ মানুষ ভজতে বলেছেন। যিনি সরল, সহজ, সত্যবান, নিষ্কামী, নির্লোভ। যার সংস্পর্শে গেলে অন্তরে আনান্দ হয়। স্রষ্টার কথা স্মরণ হয়। যার ভেতরে কোন জটিলতা কুটিলতা নাই।ঘোর প্যাঁচ নাই। যাকে এক কথায় বলা হয় সহজ মানুষ।

আর এই সহজ মানুষ ভজতে বলা হয়েছে দিব্যজ্ঞানে। এবার আসি দিব্যজ্ঞান এই যে দিব্যজ্ঞান তা কিভাবে অর্জন সম্ভব সেই আলোচনার দিকে যাবো।

এই বিশ্বাসের ব্যাখা লিখতে গেলে পুরা একটা গ্রন্থ লেখা হয়ে যায়। তাও শেষ করা যায় না তদ্রূপ লালন সাঁইজির বাণীর একটা ব্যাখ্যা করতে গেলে একটা গ্রন্থ লেখা হয়ে যায়। যা হোক এবার যাবো দিব্যজ্ঞান বা দিব্যজীবন কাকে বলে তার অধ্যায়ে।।

(সমাপ্ত)

…………………….
আরো পড়ুন:
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ১
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ২

বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ৩

………..
বি.দ্র.
আমার এই লেখা কিছু ইতিহাস থেকে নেওয়া কিছু সংগৃহীত, কিছু সৎসঙ্গ করে সাধুগুরুদের কাছ থেকে নেওয়া ও আমার মুর্শিদ কেবলা ফকির দুর্লভ সাঁইজি হতে জ্ঞান প্রাপ্ত। কিছু নিজের ছোট ছোট ভাব থেকে লেখা। লেখায় অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।। আলেক সাঁই। জয়গুরু।।

…………………………..
আরো পড়ুন:
মাই ডিভাইন জার্নি : এক :: মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
মাই ডিভাইন জার্নি : দুই :: কবে সাধুর চরণ ধুলি মোর লাগবে গায়
মাই ডিভাইন জার্নি : তিন :: কোন মানুষের বাস কোন দলে
মাই ডিভাইন জার্নি : চার :: গুরু পদে মতি আমার কৈ হল
মাই ডিভাইন জার্নি : পাঁচ :: পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
মাই ডিভাইন জার্নি : ছয় :: সোনার মানুষ ভাসছে রসে
মাই ডিভাইন জার্নি : সাত :: ডুবে দেখ দেখি মন কীরূপ লীলাময়
মাই ডিভাইন জার্নি : আট :: আর কি হবে এমন জনম বসবো সাধুর মেলে
মাই ডিভাইন জার্নি : নয় :: কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি : দশ :: যে নাম স্মরণে যাবে জঠর যন্ত্রণা
মাই ডিভাইন জার্নি : এগারো :: ত্বরাও গুরু নিজগুণে
মাই ডিভাইন জার্নি : বারো :: তোমার দয়া বিনে চরণ সাধবো কি মতে
মাই ডিভাইন জার্নি : তেরো :: দাসের যোগ্য নই চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি :চৌদ্দ :: ভক্তি দাও হে যেন চরণ পাই

মাই ডিভাইন জার্নি: পনের:: ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই
মাই ডিভাইন জার্নি : ষোল:: ধর মানুষ রূপ নেহারে
মাই ডিভাইন জার্নি : সতের:: গুরুপদে ভক্তিহীন হয়ে

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!