বিশ্বাসীদের দেখা শুনা - লালন

বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- দ্বিতীয় কিস্তি

-দ্বীনো দাস

এই অংশে স্রষ্টা বিরহ বিয়োগ দেবে না। দিবে মিলনের অপার আনন্দ। এই শেষ ধাপে তিনি সমস্ত বিরধের মধ্যে একটা সুন্দর সামঞ্জস্যতা সৃষ্টি করবেন। প্রয়োজনে প্রলয় কাণ্ড ঘটাবেন। এই ধাপটা বা অধ্যয়টা এখনো বাকী রয়েছে।

এই অংশটুকু হবে আমাদের জ্ঞানের জীবন, আলোর জীবন, দিব্যজীবনের পালা। সেদিন স্রষ্টার অপার কৃপায় পূর্ণচেতনা জ্ঞানের অন্ধকার কেটে যাবে তখন থাকবে না কোন বৈষম্য হামাহানি। কারবার হবে সত্যের সাথে সত্যের।

তখন হবে দিব্যজ্ঞানের উচ্চতর অতি মানস চেতনা। সেই উচ্চতর চেতনার রাজ্য এইতো সামনে- স্রষ্টা তার পঞ্চম ধাপে সেটা দেখাবেন এবং তিনি প্রস্তুত ও বটে পঞ্চম অধ্যায় শুরু করার জন্যে।

এর আগের ধাপগুলো স্রষ্টা দেখিয়েছেন তাদের নিয়ে যারা বিবেক ও মন-বিহীন পুতুলের মত পুতুল খেলা। এবার মন-বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চরিত্র নিয়ে হচ্ছে একটু গণ্ডগোল। নাট্যকার চাচ্ছে একরকম, আর অভিনেতারা তার উল্টো রোল প্লে করছে। আর তার জন্যই দেরী হয়ে যাচ্ছে পঞ্চম ধাপের বা অধ্যায়ের শুরুটা।

তাই আমাদের উচিত এই ধাপের আমাদের সক্রিয় সহযোগীতা করে দিব্যজীবন অভিব্যক্ত হবার প্রয়াস করতে হবে যাতে আমাদের চেতনার প্রস্ফুটন হয়। আর এতেই আমাদের দুঃখ ঘুচে যেয়ে জীবনে আসবে অপার এক দিব্য আনন্দের পালা।

আর এর জন্য আমাদের করতে হবে কিছু গুরুমুখী কর্ম। আর অভ্যন্তরীণ সত্তা অন্তর আত্মাটির জাগরণ তার জন্য সর্ব প্রথম দরকার স্রষ্টার প্রতি অটুট বিশ্বাস।

সহজ মানুষ ভজে
দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে।।

আছছালাতুল মিরাজুল মমেনিন
জানগে যা ঐ নামাজের বেনা,
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা
লালন কয় এই ভুবনে।।

-ফকির লালন সাঁইজি

বিশ্বাস

এই ব্যাপারটায় প্রথমে আসা যাক। আসলে এই বিশ্বাসের ব্যাপারটাই অনুশীলন খুবই প্রয়োজন। আমাদের অন্তরে এই বিশ্বাসটা স্থাপন করা অতীব জরুরী।

বিশ্বাস আমাদের অন্তরে আছে কিন্তু তাকে প্রকাশ করা দরকার। নিজ নিজ জীবনটায় খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, স্রষ্টা কতোনা সুনিপুণভাবে কাজ করে চলেছে। এই ভাবনাটুকু ভাবলে অন্তরে বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। স্রষ্টার লীলা বা গোপন কারবার খুব সামান্য সংখ্যক লোকেই অনুভব করতে পারে বা দেখতে পারে।

বেশিরভাগ মানুষ এই ভেবে থাকে- স্রষ্টার কারবার স্বাভাবিক ও প্রকৃতির নিয়মে চলছে। কিন্তু ওরা নিজ অন্তরে ও বাইরে প্রকৃতির স্রষ্টার সৃষ্টির যে নিগূঢ় খেলা তা তারা কখনোই দেখে না বা প্রার্থনা করে না।

প্রার্থনা দ্বারা যে জীবনের কত বড় মৌলিক পরিবর্তন করা যায় তা ভাবাই যায় না। তবে সে প্রার্থনা হতে হবে নি:স্বার্থ জাগতিক কোন সুখ শান্তি অভাব অনটনের জন্য নয়। সেটা হতে হবে নিজ আত্মা জাগরণের জন্য, আত্মশুদ্ধির জন্য, বিশ্বাসকে দৃঢ় করার জন্য- তাই প্রথমেই বিশ্বাস।

স্রষ্টা সম্বন্ধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আইনষ্টাইন বলেছেন, ‘যদি তোমার অতীন্দ্রিয় সমন্ধে কোন বিস্ময় বা শ্রদ্ধা না থাকে। যদি সেই দুর্ভেদ্য ও চরম প্রজ্ঞার অস্তিত্ব সমন্ধে তোমার মনে কোন ভাবের সাড়া না থাকে। তাহলে তুমি মৃতবৎ।

স্রষ্টাতে নিঃসংশয়ে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। তা না হলে এপথে এক কদম ও চলা যাবে না। সৃষ্টিকুলে আমরা মানুষসহ কোন সৃষ্টিই বড় নই। একমাত্র পরম করুণাময়ী স্রষ্টা সবার উপরে বড়। এ কথাটা মুখে নয় নিঃসন্দেহে বিশ্বাসের সহিত অন্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশ্বাস না থাকলে বড় রকমের কোন চেষ্টায় আসে না বা সফল হওয়া যায় না। তাই স্রষ্টাকে অন্তরে অনুভব করতে হবে। ভালোবাসতে হবে। এমন কি সব সময় তাকে অন্তরে জপ করতে হবে। সামান্য অবসর সময় পেলেই তার অসীম প্রেমময় ভাবধারায় আমাদের মনকে ডুবিয়ে রাখতে হবে।

চেষ্টা করতে হবে তার সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে কথা বলার। তিনি নিকট হতেও অতি নিকটে, প্রিয় হতেও অধিক প্রিয়তম। বখিল যেমন তার স্ত্রী-পুত্র হতে সম্পদকে অধিক ভালবাসে। নারী পুরুষের প্রেমে একে অপরকে যেমন পেতে চায়।

সাগরে ডুবে যাওয়া মানুষ যেমন শ্বাস নেবার জন্য খড়কুটো ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করে বাঁচার জন্য। তেমনি গভীর ভাবে ব্যাকুলভাবে তাকে স্মরণ করতে হবে। পাবার আশা করতে হবে। তবেই ঈশ্বর ধরা দিবেন আমাদের চিত্তে।

এই যে দেহের ভেতর হাওয়া আসা যাওয়া করছে। তাতে আমরা এক বাক্যে বিশ্বাস করছি। এতেই আমরা বেঁচে আছি এটা স্রষ্টার দান। তিনি যে আমাদের ভেতর স্বয়ং আছেন। এটা যদি আমরা সূক্ষ্ম জ্ঞান দিয়ে তাকিয়ে থাকি গভীরভাবে। আর তাকে পাবার আরাধনা করি।

স্রষ্টা সম্বন্ধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আইনষ্টাইন বলেছেন, ‘যদি তোমার অতীন্দ্রিয় সমন্ধে কোন বিস্ময় বা শ্রদ্ধা না থাকে। যদি সেই দুর্ভেদ্য ও চরম প্রজ্ঞার অস্তিত্ব সমন্ধে তোমার মনে কোন ভাবের সাড়া না থাকে। তাহলে তুমি মৃতবৎ।

প্রকৃত সত্য বা বিজ্ঞানের কাজ তোমার দ্বারা হতে পারে না। সেই যে প্রজ্ঞা শক্তি যার দ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এত অভাবনীয় অভিব্যক্তি ঘটছে। যাকে আমি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে থাকি। আর স্বীকার করি তাকেই আমি সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলি।’

আগে চায় বিশ্বাস তারপর প্রমাণ। বিশ্বাসটা আসলে অন্ধের মতই হওয়া চাই। আর তা না হলে আসল বিশ্বাসই করা হল না। বিশ্বাস হল অন্তরের ভেতরকার এক স্বতস্ফূর্ত দৃঢ়নিশ্চয় বোধ। যেটা কিনা কোন বিচার-বিতর্কের ধার ধারে না।

বিশ্বাস স্থাপনটা মানুষের জীবনে অপরিহার্য। এটা ছাড়া অজানার পথে অভিযান চালিয়ে এক পাও চলা বা অগ্রসর হওয়া যায় না। এই বিশ্বাসই হলো আধ্যাত্মিক বা দিব্যজীবনের প্রধান পাথেও। আবার অবিশ্বাস ও আমাদের ভেতর আছে এতে কোন সন্দেহ নাই।

এই যে দেহের ভেতর হাওয়া আসা যাওয়া করছে। তাতে আমরা এক বাক্যে বিশ্বাস করছি। এতেই আমরা বেঁচে আছি এটা স্রষ্টার দান। তিনি যে আমাদের ভেতর স্বয়ং আছেন। এটা যদি আমরা সূক্ষ্ম জ্ঞান দিয়ে তাকিয়ে থাকি গভীরভাবে। আর তাকে পাবার আরাধনা করি।

(চলবে…)

………..
বি.দ্র.
আমার এই লেখা কিছু ইতিহাস থেকে নেওয়া কিছু সংগৃহীত, কিছু সৎসঙ্গ করে সাধুগুরুদের কাছ থেকে নেওয়া ও আমার মুর্শিদ কেবলা ফকির দুর্লভ সাঁইজি হতে জ্ঞান প্রাপ্ত। কিছু নিজের ছোট ছোট ভাব থেকে লেখা। লেখায় অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।। আলেক সাঁই। জয়গুরু।।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………….
আরো পড়ুন:
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ১
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ২

বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ৩

…………….
আরো পড়ুন:
অবশ জ্ঞান চৈতন্য বা লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া
ঈশ্বর প্রেমিক ও ধৈর্যশীল ভিখারী
সুখ দুঃখের ভব সংসার
কর্ম, কর্মফল তার ভোগ ও মায়া
প্রলয়-পূনঃউত্থান-দ্বীনের বিচার

ভক্তি-সংসার-কর্ম

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন


লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই

লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই


মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস
লালন গানের বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
কে বলে রে আমি আমি
ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!