লালনের গান কেন শুনতে হবে? কেন শোনাতে হবে?

লালনের গান কেন শুনতে হবে? কেন শোনাতে হবে?

লালনের গান কেন শুনতে হবে? কেন শোনাতে হবে?

-নজরুল জাহিদ

লালনের গান কেন ভালো লাগে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার অধিবাসী হিসাবে এই ভাললাগায় আমার কোন ব্যক্তিগত পক্ষপাত আছে কি না, লালনের গানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, অর্থ ও উচ্চারণ জানা থাকায় আমার বাড়তি সুবিধার কারণে এই ভালো লাগা কি না।

কিংবা অতি শৈশব থেকে সাধুগুরুদের আখড়ায় বসে গান শোনার, তাঁদের সাথে আলাপ-আড্ডার কারণে আমার মনে কোন অযৌক্তিক ভালবাসা তৈরি হয়েছে কি না ইত্যাদি নিয়ে অনেক ভেবেছি। সেই সব ভাবনার ফলাফল নিয়েই আজকের এই লেখা।

লেখাপড়া, চাকরি আর পারিবারিক কারণে বারবার বিদেশে গেছি, থেকেছি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সাথে মিশেছি। অজান্তেই তুলনা করেছি নিজেদের সাথে। কী আছে আমাদের যা ওঁদের নেই? কী আমাকে আলাদা উচ্চতা দিয়েছে ? অনেককিছুর মধ্যে যে বিষয়টা প্রধান বলে মনে হয়েছে তা হলো বাংলার লোকজ সম্পদ।

এই লোকজ সম্পদই বাঙালির শক্তির আধার। সম্প্রীতির এবং আত্মোন্নতির অমীয় বাণীসমৃদ্ধ ভাববাদী ভক্তিগীতি বা দেহতত্ত্বের গানগুলি হলো এই লোকজ সম্পদের মধ্যে অন্যতম।

এই সম্পদই বাঙালিকে পৃথিবীর অন্য সকল জাতি থেকে বিশেষ করে রেখেছে। আর পদকর্তা লালন শাহ ফকির হলেন বাংলার সেই শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের প্রধানতম অংশভাক্।

লালনের অনুসারী বাউলদেরকে আমাদের গ্রামে বলা হতো ‘নাড়ার ফকির’। আমার চাচির ভাই এখন ‘নাড়ার ফকির’ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে চাচির আড়ালে অন্যরা যখন কথা বলতো তখন যে সেই সব আলাপে তাঁর জন্যে খুব একটা শ্রদ্ধা দেখেছি তা নয়।

কিন্তু উনি যখন বোনের বাড়িতে আসতেন, সাদা আলখেল্লা পরা, কাঁধে একটা ঝোলা, হাতে একটা একতারা, সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে থাকতো। আমার সাথে এমনভাবে কথা বলতেন যেন আমি একজন প্রপ্তবয়স্ক মানুষ। শিশুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুব আশ্চর্যের ছিল।

আমি তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি বাড়িতে এলে ভালো লাগতো। গানের গলা ভালো ছিলো না কিন্তু সারাক্ষণই প্রায় গান গাইতেন। পরে জেনেছি এই সব গানকে ভক্তিগান, ভাবগান, বাউলগান যে নামেই ডাকি না কেন, সাধুগুরুদের জীবনে এগুলি এক অনিবার্য উপাদান।

খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, অর্থ বা সম্মানের জন্য তাঁরা গান করেন না। তাঁরা গান করেন আরাধনা বা সাধনার মাধ্যম হিসাবে, জীবনাচরনের অংশ হিসাবে। গানই তাদের মন্ত্র, স্তোত্র বা ধর্মবাণী।

জীবন কেমন ভাবে যাপন করা হবে, মনুষ্যজন্মের উদ্দেশ্য বা পরিণতি কী, ভালো বা মন্দ কী দিয়ে নির্ধারিত হবে-এমন দার্শনিক বিষয় ছাড়াও এমনকি আহার নিদ্রা মৈথুন সংক্রান্ত প্রাত্যহিক জীবনের নানান প্রশ্নের জবাবও তাঁরা গানের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেন।

তাই দেখা যায়, নিছক আনন্দ বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে গান গাইতে বসেও ভক্তি আর উপলব্ধির আবেশে সাধুগুরুদের চোখ জলে ভরে ওঠে; ভক্তিরসের স্রোতধারায় আনন্দ আর বেদনার অপূর্ব মিলন ঘটে।

সেই আমার লালনের গান শোনা শুরু। আলমডাঙ্গার দিদার শাহ, রইচ উদ্দিন সহ অনেকের গান শুনতাম। আমাদের বাড়ির পাশেই মতলেব নামে এক সাধুর ছোট খুপড়ি ঘরে প্রায় সন্ধ্যায় গানের আসর বসত। আমিই ছিলাম সেই আসরের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য।

একসময় খোদাবক্স সাঁই এঁর স্নেহ-সান্নিধ্য পেলাম। লালন গবেষক ডক্টর ক্যারল সলোমনের সাথে আমেরিকায় বন্ধুত্ব হলো। তাঁর আমেরিকার বাসায় মকছেদ আলী সাঁই এঁর রেকর্ডেড গান শুনলাম। এই সব সোনার ধানে আমার জীবনের গোলা ভরে গেল।

লালনের গানকে প্রতিদিন যেন নতুন ভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে বুঝলাম এই গানের সুর ও বাণীর ভেতর দিয়ে নিজস্ব জীবন দর্শন ও ভাববাদী ঔদার্যমণ্ডিত অসাম্প্রদায়িক উদার মানবতাবাদ প্রচারিত হয়েছে।

গানের মধ্যে লালন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক-দৈহিক সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন, করেছেন মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের জয়গান।

লক্ষ্য করলাম এই গানের মাহাত্ম্য দেশী-বিদেশী গবেষকদের মনোযোগ আগেই আকর্ষণ করেছে। শাহরিক সমাজেও এই গান জনপ্রিয় হচ্ছে। জনপ্রিয়তা বাড়াতে গানগুলি নিয়ে ফিউশন ম্যাশআপ জাতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হচ্ছে।

দেশে বিদেশে একটা বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে। উচ্চ প্রযুক্তি ও উচ্চ তাল-লয়-মাত্রা প্রয়োগ করা হলেও গানগুলি থেকে ভক্তিরস আর মরমী ঔদার্য যেন হারিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য করেছি যে, লালনের গানের কথা আর সুরের পরিবর্তন হচ্ছে।

দীর্ঘকাল কপিরাইট থাকার কারণে রবীন্দ্রসংগীতের একটা মান বা স্ট্যান্ডার্ড দাঁড়িয়ে গেছে, আমাদের কান তৈরি হয়ে গেছে, তাই বেসুরো রবীন্দ্রসংগীত ‘বাজার’ পায় না। কিন্তু লালনের গান ছাপার অক্ষরে সংকলিত এবং স্বরলিপিতে নিবন্ধিত না থাকায় গানের কথায় গরমিল দেখা যাচ্ছে। নিবেদনের ভাব, ভঙ্গী বা সুরেও পরিবর্তন হচ্ছে।

এছাড়া, লালনের গানে যশোহর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের বেশকিছু আঞ্চলিক শব্দ আঞ্চলিক উচ্চারণে ব্যবহত হয়েছে যা অন্য কারো দ্বারা সহজে উচ্চারণ করা কঠিন, ঠিকভাবে লেখাও সম্ভব না এবং ঐ বিশেষ শব্দ বা শব্দমালার অর্থ জানা না থাকায় এইসব শব্দ ঠিকভাবে গীত বা উচ্চারিত হচ্ছে না বিধায় পুরো গানের রসভঙ্গ এবং অনর্থ ঘটছে।

এই প্রেক্ষাপটে শুদ্ধ শ্রোতা ও সমর্থক তৈরি করা এবং সত্যিকারের সাধুগুরুদের পরিবারে গান যেভাবে চর্চিত এবং গীত হয়, তা শোনার অভ্যাস গ’ড়ে তোলা দরকার বলে মনে হয়।

এর পাশাপাশি আরো দুটি কাজ শুরু করা দরকার। প্রথমটি হলো; সাধুগুরুদের সম্পর্কে অনেকে ভাবেন যে, তাঁদের সংসার নেই, তারা অবৈজ্ঞানিক, অস্বাস্থ্যকর, নেশাসক্ত, আয় উপার্জনহীন পরাশ্রয়ী এবং অসামাজিক ও অযাচারী।

এমনকি তাঁদের পোশাক আশাক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও ভুল ধারণা আছে যেমন তাঁরা কমলা বা গেরুয়া রঙের আলখেল্লা ধরনের কাপড় পরেন এবং তাঁদের লম্বা চুল বা মাথায় জট আছে। আসলে এরকম ধারণা ভুল। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তাঁদের জীবন আমাদের আর সকলের মতই।

কেউ কৃষি করেন, কেউ চাকরি বা ব্যবসায়, তাঁদের ঘর সংসার সমাজ সামাজিকতা সব আছে। সাধারণ গৃহী অবাউলদের তুলনায় তাঁরা বরং সমাজের জন্য উপকারী এই কারণে যে, তাঁরা যুগে যুগে কেবল আক্রান্তই হয়েছেন কখনো আক্রমন করেননি।

যে এলাকায় তাদের বসবাস সেখানকার থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যাবে কোনো সাধুগুরুর নামে মামলা বা অভিযোগ নেই, যে গ্রামে বা মহল্লায় তাঁদের বসবাস সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যাবে তাঁরা কোন ঝগড়া ফ্যাসাদে লিপ্ত নন, বরং তাঁরা নির্লোভ তাই নির্বিরোধী।

এমনকি পশুর গায়েও তাঁরা হাত তোলেন না। বরং একটি নির্মল জীবনধারার মধ্যে সংগীতের সুর আর পূর্ববর্তী গুরুদের রচিত গানের বাণীর নির্দেশনা মেনে তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেন।

তাঁদের জীবনের মূলমন্ত্র নির্মোহ তথা ‘জিন্দা মরা’ হয়ে জীবনকে উপভোগ করা এবং তা অনেকের সেবায় নিযুক্ত করে শুধু মানুষ হিসেবে নয়, প্রাণী হিসেবেও প্রকৃতির সংসারে মিশে থাকা।

সাধক ও লালন সঙ্গীতজ্ঞ খোদাবক্স সাঁইয়ের ভাষায়, “লালনের মূল কথা হলো মানবপ্রেম। মানুষ ভজতে হবে, গুরুর মাধ্যমে দেহ মোকামের খবর জানতে হবে, আমি কে কোথা থেকে এলাম কোথায় যাব- এসব বুঝতে হবে। মুর্শিদের স্বরূপ চিনে শুদ্ধ মানুষ হতে হবে।”

আরেকটি জরুরী কাজ হলো, হলো অশান্ত-অসুখী দেশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাধুগুরুদের জীবনাদর্শের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং তা প্রচার করে বিশ্বশান্তি অর্জনের পথ প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সবাই জন্মেই যুদ্ধ দেখেছি। আমাদের আগে যারা এই গ্রহে জন্মেছেন, তারাও যুদ্ধ দেখেছেন, যুদ্ধের শিকার হয়েছেন।

আমাদের ছেলেমেয়েরা এবং তাঁদের সন্তানও কি হিংসা, লোভ আর নির্যাতনের দুনিয়া থেকে রেহাই পাবে না? যুদ্ধই কি মানবজাতির নিয়তি, শান্তি নয়? বহুবার বহুভাবে পৃথিবীতে এই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে।

উনিশ পিপে নস্যি ফুরিয়েছে সেই কবে, জাতিপুঞ্জ জাতিসঙ্ঘ সহ হাজারো সংস্থার জন্ম হয়েছে, ব্যয়িত হয়েছে অজস্র অর্থ, রচিত হয়েছে ফরমুলা, খচিত হয়েছে তারকার পর তারকা, কিন্তু শান্তির ললিতবাণীর পাথরের মূর্তিতে প্রাণের প্রতিষ্ঠা হয়নি।

অবশেষে মানবজাতি উপলব্ধি করেছে যে, ব্যক্তিজীবনে লোভ হিংসা অহং বর্জন করে মানুষ যদি ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে পারতো, যদি অন্য মানুষ ও প্রাণীকূলের অধিকার মেনে নিত, তাহলে সামষ্টিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা পেত। তাই নানান শাস্ত্র-ধর্মের বিধান প্রয়োগ করে মানুষকে মানুষ বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্যক্তিজীবনে এবং ফলশ্রুতিতে সামষ্টিক জীবনে শান্তি আসেনি। এইখানেই সাধুগুরুদের সাফল্য। রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’-এর মত পাদপ্রদীপের বাইরে – যাকে আমরা ‘অন্ধকার’ বলি সেই অন্ধকারে থেকেই- বাংলার সাধুগুরু বাউল ফকিররা নিজেদের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

নারীর ক্ষমতায়ন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, সুস্থ-নীরোগ শরীরে দীর্ঘজীবী সকর্মক জীবন, আত্মউন্নয়ন- এই যদি বিশ্বশান্তির মৌলিক প্যারামিটার বা মানমাত্রা হয়ে থাকে, প্রতিটি ব্যক্তিজীবনে সুখসৃষ্টি করাই যদি অধুনা উন্নত নেতৃত্ব বা সংস্থার কর্মপরিকল্পনা হয়।

তাহলে এই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থান করেও, কেবল বাংলার সাধুগুরুদের মধ্যেই সেই কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছে। সাধুগুরুগণ অতি নীরবে নিজ জীবনে এবং ফলে তাঁর নিজ সমাজে, শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে সফল হয়েছেন – বিশ্বকে এই খবরটি জানিয়ে দেওয়াও আমাদের কর্তব্য বৈকি।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!