লালন ফকির

লালন ফকির ও একটি আক্ষেপের আখ্যান

-মূর্শেদূল মেরাজ

ফকির লালন সাঁইজি যে সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নের বীজ বপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তা কি চিরকাল সমকালীনই থেকে যাবে? একটা সুন্দর-বসবাসের উপযোগী সমাজ কি আসলেই আমরা কোনোদিন গড়ে তুলতে পারবো না? যে সমাজে মানুষেরা কেবল ‘মানুষ’ পরিচয় নিয়ে পাশাপাশি বসবাসের মর্যাদা পাবে?

এমন সব নানান প্রশ্ন নিয়ে বিচার-বিবেচনা করতে করতেই চলে এসেছে ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁইজির ১৩০তম তিরোধান দিবস। আসছে পহেলা কার্তিক সেই দিন, যে দিন সাঁইজি দেহত্যাগ করে আড়াল নিয়েছেন প্রকাশ্য জগৎ থেকে।

আমার মতো যারা দীক্ষা না নিয়ে বাইরে থেকে ফকির লালন সাঁইজিকে বুঝবার চেষ্টায় থাকি সাধুগুরুরা বলেন আমাদের ষোলআনাই ফাঁকি। লালন ঘরে প্রবেশ না করে লালনকে বোঝার কোনো পথ নেই। এটি গুরুমুখী বিদ্যা। গুরুই একমাত্র সেই পথের দিশা দেখাতে পারেন।

গুরু ধরলেই কি লালনকে বোঝা যাবে? নিজেকে বোঝা যাবে?? হবে স্বরূপের দর্শন??? এই কথার উত্তরে সাধুগুরুরা বলেন প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ভক্তি-গুণে তাঁকে বুঝতে পারবে; গুরু সহায়ক হিসেবে কাজ করে। গুরুর মধ্য দিয়েই পরমে প্রবেশ করতে হয়। সেটাই বিধি।

সাধুগুরুরা আরো বলেন, সকল কিছুরই একটা উসিলা লাগে। যেমন মামলা চালাতে গেলে একজন উকিল লাগে। যিনি বাদী-বিবাদীর পক্ষে-বিপক্ষে আদালতে মামলা চালিয়ে নেন। তেমনি গুরু-মুর্শিদ মধ্যস্থতা করেন স্রষ্টার আর সৃষ্টির মাঝে।

এই সূত্রকে মেনে নিলে আমাদের আর কোনো গতি অবশিষ্ট থাকে না। তবে আইনে আবার বলে- কেউ যদি উকিল রাখবার ক্ষমতা না রাখে। বা রাষ্ট্র যদি কাউকে উকিল দিতে সম্মত না হয়। কিংবা কোনো বিশেষ কারণে কোনো উকিল যদি কারো হয়ে মামলা না লড়ে।

তাহলে বাদী বা বিবাদী বিশেষ ক্ষমতাবলে নিজের আর্জি নিজেই আদালতে পেশ করতে পারে। তবে তার জন্য অবশ্য বিশেষ প্রকৃয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেজন্য তাকে প্রস্তুতি নিতে হয়। জেনে নিতে হয় আদালতের ভাষা-আদব-কায়দা রীতিনীতি।

তবে সে যেহেতু পেশাদার নয় তাই তার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও যেমন থাকে। তেমনি তার ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি আদালত দেখেও না দেখবার ভান করে অনেক সময়।

এমন্তাবস্তায় পথ দুটিই। এক হলো উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারীর সন্ধান করা। আর দুই হলো নিজেকে প্রস্তুত করা। প্রথমটি করাই তুলনামূলকভাবে সহজ ও সহজ পথ। একজন পথপ্রদর্শক থাকলে অবশ্যই সকল কাজ অনেকটাই সহজ যেমন হয়, তেমনি ভরসার জায়গাও তৈরি হয়।

এখানে একটি প্রশ্ন হলো মনের মতোন পথপ্রদর্শক না পাওয়া পর্যন্ত কি পথপ্রদর্শককে খুঁজে যাওয়াই রীতি? নাকি সকলেই যাকে সন্ধান করছেন সেই পরম আরাধ্য ফকির লালনকে সন্ধান করা সঠিক পথ? তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে… নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে যদি তিনি পথপ্রদর্শককের সন্ধান দেন। তবেই তার কাছে সমর্পণ করাই তো যথাযথ পথ হওয়ার কথা।

পথ প্রদর্শকের সন্ধান করার চেয়ে মূলের সন্ধান করাটাই সম্ভবত জরুরী, যতক্ষণ না যথাযথ গুরুর সন্ধান মেলে। তাঁর সন্ধান করতে গিয়ে… নিজেকে সন্ধান করতে গিয়ে… শুদ্ধ সাধন থাকলে… প্রয়োজন মতো সময়ে পথপ্রদর্শক তো মিলে যাওয়ারই কথা।

আর এখানেই প্রধান দ্বন্দ্বটার শুরু। তবে কাকে সন্ধান করবো ফকির লালনকে সাঁইজিকে? নাকি নিজ গুরুকে? নাকি নিজেকে???

নিজেকে জানার এই যাত্রায় কাকে বোঝার-খোঁজার-জানার চেষ্টা করবো? লালনকে সাঁইজিকে?? নাকি নিজ গুরুকে??? নাকি স্বয়ংকে????

গুরুবাদীরা প্রশ্নটা এককথায় খারিজ করে দিয়ে বলবেন- গুরুকেই সন্ধান করতে হবে। গুরুই বাকিটা পথ দেখাবেন। কারণ- ‘গুরু বিনে সন্ধান কে জানে’। গুরু বিনে মনের অন্ধকার দূরীভূত হবে না। তাই গুরুই এই পথের কাণ্ডারী। গুরুকেই সন্ধান করতে হবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য।

অবশ্য আমার মতো অবোধ-অবুঝরা তা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। আমরা বরাবরই নিজেকে খুঁজতে গিয়ে… লালন সাঁইজিকেই সন্ধান করে বেড়াই। হয়তো আমরা ভ্রান্তিতে বাস করি। হয়তো আমার বা আমাদের ভাবনার গোড়াতেই গলদ।

তারপরও মনের মতো গুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত যে কাউকেই তো সেই মহান আসনে বসিয়ে দেয়া যায় না। যার জন্য এতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা। চট করে প্রেম না হয়ে গেলে কি আর নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়?

গুরুকে খুঁজতে গিয়ে গড্ডালিকায় না ডুবে লালনকে খোঁজাই ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে, আমার জন্য সহজ মনে হয়। কারণ তাঁকে খুঁজতে গেলে… তিঁনি যদি মনে করেন তাহলে তিঁনিই গুরুর সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। আর সেই গুরুই তখন উকিলের দায়িত্ব পালন করবেন। তার চরণই তখন আশ্রয় হবে।

তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা না ঘটছে অর্থাৎ মন মতো মধ্যস্থতাকারী বা উকিল পাওয়া না যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কি আর্জি পৌঁছানো যাবে না তাঁর কাছে? নিজের কাছে??

বিধি-বিধান যাই বলুক না কেনো চেষ্টা তো নিতে হবেই। যদিও ব্যাতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে মানা হয় না। কিন্তু ব্যাতিক্রমতাই যে উদাহরণ সৃষ্টি করে তারও তো নজির রয়েছে। সেটাই আপাতত ভরসা।

তাই নিজেকেই প্রস্তুত করতে হবে আমাদের মতো পতিতদের-যবনদের। যাতে আদালত বা দরবার পর্যন্ত আর্জি পেশ করার সক্ষমতা লাভ করার কোনো উপায় বের করা যায়।

মনের মতো উকিল না পেলে বা কোনো পথপ্রদর্শক আর্জি দরবারে পেশ করবার রাজি না হলে বিকল্প তো এটাই থাকে। নইলে আর্জি পেশের তো সুযোগই তৈরি হবে না। আবার মনে মনে মিল না হলে গুরুই বা ধরি কি করে?

আমার আর্জি যে বুঝবে তাকেই তো ধরতে হবে। তাকে যতক্ষণ পাচ্ছি না। ততক্ষণ তারজন্য অপেক্ষার আক্ষেপ না করে দরবারে উপস্থিত হয়ে নিজের আর্জি নিজে পেশ করার মনোবল গঠন করাও বিকল্প পথ হিসেবে মন্দ হওয়ার কথা নয়।

তবে বিষয়টা অসৌজন্যমূলক হলে- ‘ভাবার প’রে মুগুর পরার’ সম্ভবনাও আছে। তাই বিষয়টি করতে হবে পূর্ণ প্রেম-ভক্তি-বিনয়-শ্রদ্ধাপূর্বক। নইলে আত্ম অহমিকায় ভাসতে হবে। হাপুর হুপুর ডুব পাড়াই সারা হবে।

তাই সকল সাধুগুরুর চরণে ভক্তি দিয়ে আর্জির ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবার জন্য তোমার দরবারে এই নিবেদন।

আমি জানি তুমি প্রথমেই প্রশ্ন তুলবে কেনো আমি উকিল খুঁজে পাইনি। উকিলের তো অভাব হবার কথা নয়। কারণ এ সমাজ তো মামলাবাজ সমাজ। এখানের মানুষিকতা তো সর্বক্ষণ বিচার দেয়া। বিচার চাওয়া।

তাহলে উকিলের ঘাটতি তো থাকবার কথা নয়। তবে কেনো উকিল না ধরে সরাসরি নিজের কথা নিজেই বলতে দরবারে উপস্থিত। আসলে সাঁইজি সেই আক্ষেপের আখ্যানই বলতে তোমার দরবারে আজ উপস্থিত। আসিনি কোনো বিচার-আচার-আবদার নিয়ে। নয় কোনো মামলার নথি পত্র হাতে।

হে কৃপাসিন্ধু! হে দ্বীনবন্ধু! প্রথমেই ক্ষমা করো। নতজানু হয়ে নতশিরে প্রথমেই ক্ষমা চাইছি তোমার পদ দিয়েই-

‘অগতির না দিলে গতি
ঐ নামে রবে অখ্যাতি,
লালন কয় অকুলের পতি
কে বলবে তোমায়।।’

হে অগতির গতি… তোমার চরণে ভক্তি। আমাদের মতো হীন জন, যারা দূর থেকে তোমাকে বুঝবার ধৃষ্টতা করি। তাদের পক্ষ হতে অগ্রবর্তী হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা-ভিক্ষা চাইছি এই অপচেষ্টার জন্য। তোমাকে বুঝবার জন্য আমি তোমাতেই লীন হতে চেয়েছি বরাবর।

এরজন্যই হয়তো কোনো গুরু এখনো দৃশ্যমান হয়নি আমার চর্মচক্ষুর সম্মুখে। হয়তো বা আমার চোখ এখনো উপযুক্তই হয়নি তাঁকে দেখবার জন্য। তাই হয়তো আজো ভক্তি-প্রেম-বিনয়-শ্রদ্ধা কিছুই জাগ্রত হয় নি প্রাণে। আমি যতই চেষ্টা চালাই ভক্তিতে-প্রেমে তোমার সন্ধান করতে; ততই যুক্তি আমাকে পেছনে টেনে ধরে।

অন্যদৃষ্টিতে আবার সকল সাধুগুরুকেই আমার ভালো লাগে তাদের নিজস্বতা নিয়ে। কারো কাছে পাই প্রেম, কারো কাছে শিখি বিনয়। কারো কাছে ভক্তি। কারো কাছে জ্ঞান। কারো কাছে গানের জ্ঞান। কারো কাছে তত্ত্ব। কারো কাছে জীবনবোধ।

সকল সাধুগুরুর চরণেই ভক্তি। কিন্তু এতশত সাধুগুরুর মাঝে আমার মনের মানুষ, মনপাখিকে খুঁজে পাইনি আজো। সকলকে দেখলেই শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-ভক্তি-প্রেম জাগে। কিন্তু পূর্ণ সমর্পণ করার মতো সেই ভাবের উদয় হয়নি আজো কোনো এক অজ্ঞাত কারণে।

কেনো যে হয়নি সেটাই প্রশ্ন। হয়তো সেই শুদ্ধতা আমি ধারণই করি না; যে শুদ্ধতার বলে গুরু মেলে। যে শুদ্ধতার চর্চা হয়তো আমার শুরুই হয়নি। যে শুদ্ধতার বলে গুরু আমাকে চাইবে শিষ্য করে নিতে।

তাই হয়তো ঘরে ঘরে তোমাকে খুঁজতে গিয়ে বারবারই আমাকে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। সেখানে গুরু-শিষ্য পেয়েছি কিন্তু পরম্পরা সেভাবে পাইনি আজো। এই দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে সেই আদি প্রশ্নটা ক্রমশ: বৃহৎ থেকে বৃহৎতম হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন-

যুগে যুগে তোমার মতাদর্শতে যারা নানাবিধ তত্ত্ব সংযোজন-বিয়োজন করেছে বা করে চলেছে। তার মাঝে কি তোমাকে খুঁজবো? তোমার মতাদর্শে ‘যা ক্ষুদ্রাকারে ছিল’ তাকে প্রধান ও একমাত্র করার যে কট্টরতাবাদী প্রবণতা চলছে, তা কি মেনে নেবো? নাকি, তুমি যা বলেছো সেই সন্ধান করবো??

জানি তুমি সবই জানো… তাও আক্ষেপের সাথে বলতেই হচ্ছে, ১৩০ বছর পরও তোমার ভক্ত-অনুসারীকুল আজো একত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তো পারেই নি। এমনকি করবার চেষ্টাও করতেও দেখা যায়নি। এই না পারাটাও মহান এক দর্শনের আদর্শ হতেই পারতো। যদি সকলে সকলের প্রতি ভক্তি-প্রেম-শ্রদ্ধা-বিনয়পূবর্ক ধারণা পোষণ করতো।

কিন্তু তা আর দেখতে পাই কই। যারা জীবন দিয়ে তোমার পথ-মত বয়ে নিয়ে চলেছে, অত্যন্ত দু:খের সাথে বলতেই হয় তাদের মধ্যেও পারস্পরিক কোনা যোগাযোগ নাই। তারাও একে অপরের সাথে নিদেনপক্ষে সৌহাদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কও স্থাপন করে না।

তারাই যদি একে অপরের সাথে যোগ না তৈরি করে! তাহলে মহাযোগের ভাব উদয় হবে কি করে সাঁইজি!! যখন এই দুর্যোগ পরিস্থিতিতেও সকল জায়গাতেই নিয়মনীতি মেনে সকলে সকল কিছু করবার সুযোগই পাচ্ছে। অথচ তোমাকে ভক্তি জানানো যাবে না।

তোমার চরণে এক মুহূর্ত বসে বলা যাবে না- ‘চরণ ছাড়া করো না হে দয়াল হরি।’

ভাবতে অবাক লাগে, তোমার তিরোধানে তোমার ধামে সাধুসঙ্গ হবে না এ নিয়ে কারো কোনো বিশেষ মাথাব্যাথা নেই। সকলে ব্যস্ত নিজ নিজ ভক্তকুল নিয়ে। অথচ তুমি বলেছিলে সর্বজীবের কথা। সকলের কথা। মানব জাতির কথা। ব্রহ্মাণ্ডের কথা। কিন্তু ঘর-ঘারানারা আটকে রইলো নিজ নিজ ঘেরাটোপে।

তবে কোথায় গেলো তোমার মুক্তির বাণী? কোথায় তোমার নিজেকে জানার দর্শন?? কোথায় তোমার সেই মতাদর্শ যেখানে একই জলে সকলে সুচি হয়? কোথায় হারালো তোমার মতাদর্শ? তাহলে কি কায়দা করে শিষ্য ধরার কল তৈরি হচ্ছে চারপাশে?

তাহলে মুক্তি কোথায় সাঁইজি? কায়দা মতো লোক শুনিয়ে কবুল না বললে কি বিয়ে হবে না? চারজন সাক্ষী না করে দীক্ষা না নিলে কি তোমার ভক্ত হওয়া যাবে না? চাল-পানি না নিলে কি অচ্ছুৎ হবে? ধর্মের দৃষ্টিতে যেমন হয়??

কোথাও কি তবে একটা গলদ হচ্ছে সাঁইজি? নাকি এসবই আমার অতি কল্পনা। নাকি ১৩০ বছর পর সমাজ বাস্তবতায় এমনটাই হবার কথা ছিল? এমনটাই হওয়া উচিত ছিল? এমন সমাজের স্বপ্নই তুমি দেখেছিলে??

আমি পাপি-তাপি-পতিত-হীন জন। আমার শব্দ-বাক্য-ভাষা-ভাব সবই ভুল হতে পারে। কিন্তু একথা মানতে পারি না। সাধুগুরুরা সকলে নিয়ম মেনে যার যার আখড়ায় বসে থাকবেন। সকলেই সঙ্গ করবেন নিজ নিজ আখড়ায়। অথচ সকলে একযোগে বলবেন না-

আমরা নিয়ম মেনে সাঁইজির ধামেই সাধুসঙ্গ করবো। যারা দায়িত্ব নিয়েছেন তারা এর যথাযথ দায়িত্ব পালন করুন। নয়তো ধামের দায়িত্ব ফকিরদের হাতে দিয়ে দিন। মূলমঞ্চ-মেলার কোনো প্রয়োজন নেই। ছিলও না। আগামীতেও তার প্রয়োজন নেই।

সাধুসঙ্গ হোক। নিয়ম মেনেই হোক। যেখানে সবই হচ্ছে সবখানে। তাহলে লালনের সাধুসঙ্গ হওয়ায় বাঁধা কেনো? তবে কি কৌশলে লালন ফকিরকে একঘরা করা হচ্ছে বরাবরের মতোন??

যেখানে সাধুগুরুরা সমাজ মানে না। সভ্যতা মানে না। সামাজিক রীতিনীতি মানে না। সামাজিক সম্পর্ক মানে না। সেখানে তারা একটা একাডেমী কর্তৃক পরিচালিত হওয়াকে কি করে মেনে নেয়? একটা একাডেমী কি আদৌ সাধুসঙ্গ পরিচালনার বা সাধুগুরুদের উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা রাখে?

আর যদি না রাখে তাহলে সাধুগুরুরা নিজেদের মধ্যে একত্ব প্রতিষ্ঠা করে কেনো বলতে পারেন না, এই ধাম আমাদের। আমাদের সাঁইজির ধাম আমরা চালাবো।

নাকি এই দায়িত্ব নিতে আমাদের বড় ভয়? আমরা চালাতে পারবো না সাঁইজির ধাম? আমরাও জড়িয়ে পরবো রাজনীতিতে? যদি তাই হয় তাহলে সারাজীবন ধরে শুদ্ধতার চর্চার কি মূল্য দাড়ালো? যদি তার কোনো প্রতিফলন না দেখা যায়??

নাকি সাঁইজিকে বিক্রি করে দোকান চালানো সবচেয়ে সহজ পথ? বিক্রি বাট্টা ভালো হলে তো আরো ভালো? ঘটনা কি তবে তাই??

আসলে কারো প্রতিই কোনো বিষেদাগার নেই। কেবল সাঁইজির দেহত্যাগের একশ ত্রিশ বছর পরও সাধুগুরুরা পারস্পর ঐক্য গড়ে তুলতে পারলো না সেটাই একটা আক্ষেপের বিষয়। একসাথে হয়ে বলতে পারলো না সাঁইজি আমাদের সকলের। আমার একার নয়।

আক্ষেপটা এখানেই। প্রশাসন বা একাডেমীর প্রতি কোনো আক্ষেপ নেই। নেই রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের প্রতিও। কারণ যারা জীবন দিয়ে লালনকে ধারণ করার দাবী রাখেন তারাই যখন সকল কিছু মেনে নিয়ে শিল্পকলায় সাধুসঙ্গ হবে বলে উল্লাস করে তখন সত্যিই আর কিচ্ছু বলার থাকে না।

তাই এই অভাজন মধ্যস্থতাকারীর সন্ধানে না গিয়ে তোঁমাকেই খুঁজে ফেরে। তুমি চরণে রেখো সাঁই। প্রতি নি:শ্বাসে যাতে তোমাকে স্বরণে রাখতে পারি সেই ভক্তি দিও-

আপন মনের গুণে সকলি হয়।
ও সে পিঁড়েয় বসে পেঁড়োর খবর পায়।।

রামদাস রামদাস বলে
সে তো মুচির ছেলে,
গঙ্গামায়ের এমনি লীলে
এলো চাম-কেটোয়ায়।।

জাতে সে জোলা কুবীর
উড়িষ্যায় তাহার জাহির,
বারো জাত তার হাঁড়ির
তুড়ানি খায়।।

না বুঝে ঘর ছেড়ে
জঙ্গলে বাঁধে কুঁড়ে,
লালন কয় রিপু ছেড়ে
যাবি কোথায়।।

জয়গুরু।।

…………………………………..
চিত্র:
ফকির লালন সাঁইজির প্রকৃত কোনো ছবি নেই। লেখাতে ব্যবহৃত ছবিটি লালন ফকিরের কাল্পনিক একটি ছবি মাত্র। বহুল ব্যবহৃত হলেও এই ছবির সাথে লালন সাঁইজির আদৌ কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন

লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই
লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই

লালন সাধনায় গুরু : এক
লালন সাধনায় গুরু : দুই
লালন সাধনায় গুরু : তিন

লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা: এক
লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা: দুই

ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁইজি
চাতক বাঁচে কেমনে
কে বলে রে আমি আমি
বিশ্ববাঙালি লালন শাহ্ফকির লালন সাঁইজির শ্রীরূপ
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন
বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?
লালন ফকিরের আজব কারখানা
মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
লালন ফকির ও একটি আক্ষেপের আখ্যান
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
লালন অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমা বিচ্ছিন্ন এক নক্ষত্র!
লালনের গান কেন শুনতে হবে? কেন শোনাতে হবে?
লালন গানের ‘বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি’
‘গুরু দোহাই তোমার মনকে আমার লওগো সুপথে’
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!