ফকির লালন সাঁই

লালন ফকিরের আজব কারখানা

-ঝুমা গঙ্গোপাধ্যায়

How many roads must a man walk down
…Before you call him a man?
-Bob Dilan

একজন মানুষ, তার শতবর্ষের জীবনে, জীবনযাত্রায়, জীবন নদে একটাই অপার্থিব সম্পদ খুঁজে বেরালো- তার নাম মনুষ্য ধর্ম, মানবতাবাদ। তাঁর সারা জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ রাখলেন তিনি শুধুই মানুষ, তাঁর কোনো জাত ধর্ম নেই। তিনি বাউল ও ফকিরি সাধনার সংমিশ্রণে তৈরি এক অসাধারণ জীবনতায় বেঁধে দিয়েছিলেন তাঁর গানে।

ঠাকুর পরিবার, কাজী নজরুল থেকে অ্যালেন গিন্সবার্গ পর্যন্ত তাঁর গানে মুগ্ধ। তাঁকে বাউল সম্রাট আখ্যা দেওয়া হয়, অথচ অদ্ভুত ভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচরিত আমরা বিশেষ ভাবে খুঁজে পাই না।

হয়তো তিনি চাননি তাঁর বিগত দিনের জীবনধারার সাহায্যে তাঁকে কেউ পরিমাপ করুক, তাঁকে মাপবার মতো শব্দ বাক্যাবলী হয়তো সত্যি তৈরি হয়নি। তাই তিনি নিজেকে লালন ফকির বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর জীবনী অদ্ভুতভাবে অপ্রকাশিত থেকে গেল। হয়তো তাঁর এটাই ইচ্ছে ছিল।

লালন ফকিরের জন্মস্থান নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। প্রকাশিত কোনও তথ্য না পাওয়ায় এই বিতর্কের অবতাড়না। যতদূর জানা যায় তিনি ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলা ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আবার কেউ কেউ মনে করেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত উড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। আবার একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তিনি যশোর জেলায় ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

জন্মস্থান, তাঁর বেড়ে ওঠা, শৈশব, কৈশোর সম্পর্কে কোনও তথ্য আমরা কোথাও খুঁজে পাইনি। কারণ তিনি চাননি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচারণের মধ্যে মানুষ তাঁকে খুঁজে পাক। তিনি ছিলেন অতীন্দ্রিয় অনুভূতিসম্পন্ন এক মানুষ। তাই হয়তো তিনি আশ্চর্য এক সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন।

আর সারাজীবন সেই পরম সাধনায় মগ্ন হয়ে রইলেন তিনি। সারাজীবন ধরে তিনি যা বলে গেছেন তা বহু শিক্ষিত কবি সাহস করে বলে উঠতে পারেন না। জাত কথাটাই তাঁর কাছে ‘আজব কারখানা’

যথাসম্ভব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কথা মনগ্রাহী, “লালন ধর্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।”

একটা মানুষের জাত ধর্মের বিশ্বাসই কি বড় এ প্রশ্ন তাকে অতলান্ত গভীরতার মতো ছুঁয়েছে। তিনি যে সময় জন্মেছিলেন বেড়ে উঠেছিলেন সে সময়টাই অদ্ভুত জটিল এক সময়।

একদিকে ইংরেজদের তৈরি সাম্রাজ্যবাদ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে তৈরি করা দ্বন্দ্ব উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের বৈষম্য অন্য দিকে সহজ সরল এক মানুষ তার অনাড়ম্বর বিদ্বেষহীন, উন্মুক্ত জীবনযাত্রার সাহায্যে সবাইকে কাছে টেনে নিতে চাইলেন। এও কি কম কথা!

প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক মানুষ ইচ্ছাশক্তি বলে, হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন এবং গ্রহণ করেন জীবনের মূল নির্যাস। যে নির্যাসের মূল কথা মানবতা। বহু গবেষক তাঁর নিরূপণে অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন।

কারণ তিনি জীবদ্দশায় কোনো ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করেননি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে যুক্ত না হবার জন্য তিনি নিজ ইচ্ছা বলে হিন্দু ও ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। হিন্দু, মুসলমান, বৈষ্ণব ধর্মের উদারতার জায়গাটুকুই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

এমন তিনি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন, তার সামান্য পরিমাণ ছিল, ঘরবাড়ি ছিল, তিনি সংসারী ছিলেন, স্ত্রী বিশাখা। তিনি প্রয়োজনে অশ্বারোহণ করতেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে তিনি যে আখড়া তৈরি করেন, সেখানে তিনি শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করতেন।

যথাসম্ভব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কথা মনগ্রাহী, “লালন ধর্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।”

লালনের পরিচয় প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, “কাঙাল হরিনাথ তাকে জানতেন, মীর মশার্‌রফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেন নি লালনের জাতপরিচয় বংশধারা বা ধর্ম।”

তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন এই রীতিনীতির থেকে দূরে থাকতে। প্রত্যেকটি ধর্ম যেখানে রীতিনীতি সর্বস্বতার কথা বলে, লালন তা বর্জনের পক্ষেই রায় দেন। রীতিনীতি বর্জিত আস্ত মানুষটাকেই তিনি গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন।

তিনি কি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন? ঘরবাড়ি ছিল? সংসারী ছিলেন?  কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। তিনি প্রয়োজনে অশ্বারোহণ করতেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে তিনি যে আখড়া তৈরি করেন, সেখানে তিনি শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করতেন।

সেখানে তিনি প্রতি শীতকালে একটি মহোৎসব (ভাণ্ডারা) করতেন। বহু দূর থেকে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতেন। কথিত আছে, তার দশহাজার শিষ্য সংখ্যা ছিল। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, কলকাতার ঠাকুর পরিবারের মতো মানুষরাও তার প্রভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

এবং এ কথা স্বীকার করতেই হয়— শিক্ষিত সমাজে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি তৈরি করেন এই ঠাকুর পরিবারই। শোনা যায়, তিনি মস্ত লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং সেদিন জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এতে মানুষ হিসেবে তাঁর গুণের পরিচয় মেলে।

লালন তাঁর গানে ছুঁয়ে গিয়েছিলেন মানুষের মন। তিনি বলতেন এই দেহের মধ্যেই মন অর্থে অচিন পাখির নিবাস। তবে দেহ নয় দেহোত্তর সাধনার কথা তিনি বলেছেন। মানুষের মনকে পড়াই তাঁর কাজ, তাঁর কাছে মানবতাবাদই মোক্ষ লাভ।

এছাড়া নজরুল ইসলাম ছাড়াও আর একজন কবি গিন্সবার্গ তাঁর দর্শনে প্রভাবিত। যে সময় লালন তাঁর উদার ধর্মবোধ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন ঠিক সে সময় পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়, সামাজিক বৈষম্য, অবিচার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতিভেদ সমাজের স্তরে স্তরে বিন্যস্ত।

বহু গানে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষ। দৃশ্যমান এই মানবশরীরেই বাস করে সে অচিন পাখি যাকে ধরা যায় না। আমাদের শরীরকে তিনি খাঁচার সমতুল মনে করেছেন বারবার তাই বলেছেন, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’— এ এক পরম বিস্ময় যা আজো এ শতাব্দীতেও আমাদের ভাবায়।

তাঁর কাছে মন বা আমার একটি বিশেষ মাহাত্ম্য আছে। আত্মাকে জানা অর্থে পরমাত্মার কাছে যাওয়া। এই আত্মা বাস করে দেহে তাই দেহকেও পবিত্র জ্ঞান করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। লালন তাঁর গানে জীবদ্দশায় নিজ ধর্ম পরিচয় গোপন রেখেছিলেন।

হয়তো বা সারাজীবনের বয়ে বেড়ানো যন্ত্রণার কারণে, তিনি মানবতাবাদী দর্শনে বিশ্বাস রাখতেন। সর্বত্র তিনি মানবমনের প্রতি আস্থা দেখিয়েছিলেন।

অত্যন্ত দরিদ্র মানুষগুলির মধ্যে বিরল প্রভাব বিস্তার লাভ করেছিলেন তিনি। শুধু অশিক্ষিত, দরিদ্র, বঞ্চিত মানুষরা নন, বিশ্ব সাহিত্যের বড় বড় কবি, লেখকও তাঁর গানে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বহু গান রচনা করেছিলেন বিভিন্ন বক্তৃতায় বহু সময় তিনি লালনের প্রসঙ্গ টেনে আনতেন।

এছাড়া নজরুল ইসলাম ছাড়াও আর একজন কবি গিন্সবার্গ তাঁর দর্শনে প্রভাবিত। যে সময় লালন তাঁর উদার ধর্মবোধ নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন ঠিক সে সময় পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়, সামাজিক বৈষম্য, অবিচার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতিভেদ সমাজের স্তরে স্তরে বিন্যস্ত।

ঠিক যে সময় তাঁর উদার ধর্মমত ও দর্শনের প্রতি বঞ্চিত মানুষের এই টান স্বাভাবিক। বাহ্যিক কোনও ধর্মাচারে তিনি কখনোই মনঃসংযোগ করেন নি। অস্পৃশ্যতার ও জাতিভেদের ঊর্ধ্বে তিনি বলেন-

“জাত না গেলে পাই না হরি,
কি ছার জাতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলি বলিয়ে?
লালন কয় জাত তাতে গেলে
পুরাতাম আগুন দিয়ে।।”

তাঁর বাউল দর্শন, বাউল সংগীত বহু কৃতী মানুষদের আকৃষ্ট করে। এদের মধ্যে অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি শুধু বাউল গান শুনে মুগ্ধ হননি তাঁর ভেতরে প্রবেশ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তিনি তাঁর কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে বাউল দর্শন এনেছেন।

লালনের মনের মানুষকে তিনি নিজের অন্তরেও খুঁজে বেরিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের দেখা হয়েছিল কিনা এ নিয়ে সংশয় থাকলেও, শিলাইদহে তিনি লালনের গান সংগ্রহে উদ্যোগ নেন। ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে গানের খাতা আনিয়ে ২৯৮টি গান নকল করিয়ে নেন।

যদিও রবীন্দ্রনাথ বারবার লালন এর কথা উল্লেখ করেছেন ও বলে গেছেন তাঁর শক্তিশালী গান লেখা ও প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে। তিনি আজো প্রণম্য, আজো মনের মানুষ।

পৃথিবীর অসুস্থ অবস্থায় তিনি এসেছিলেন মানুষরূপী ওষধি হয়ে। তিনি ছিলেন হিন্দু ও মুসলিমের মিলিত এক মানুষ। একমেবদ্বিতীয়ম্‌।

………………………
আরো পড়ুন:
ফকির লালন
লালন মতাদর্শ
ফকির লালন প্রসঙ্গে

…………………………………..
চিত্র:
ফকির লালন সাঁইজির প্রকৃত কোনো ছবি নেই। লেখাতে ব্যবহৃত ছবিটি লালন ফকিরের কাল্পনিক একটি ছবি মাত্র। বহুল ব্যবহৃত হলেও এই ছবির সাথে লালন সাঁইজির আদৌ কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন

লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই
লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই

লালন সাধনায় গুরু : এক
লালন সাধনায় গুরু : দুই
লালন সাধনায় গুরু : তিন

লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা: এক
লালন-গীতির দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা: দুই

ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁইজি
চাতক বাঁচে কেমনে
কে বলে রে আমি আমি
বিশ্ববাঙালি লালন শাহ্ফকির লালন সাঁইজির শ্রীরূপ
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন
বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?
লালন ফকিরের আজব কারখানা
মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
লালন ফকির ও একটি আক্ষেপের আখ্যান
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
লালন অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমা বিচ্ছিন্ন এক নক্ষত্র!
লালনের গান কেন শুনতে হবে? কেন শোনাতে হবে?
লালন গানের ‘বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি’
‘গুরু দোহাই তোমার মনকে আমার লওগো সুপথে’
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস

 

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!