মওলা পাগল

মওলা মহলের বার্ষিক সাধুসঙ্গ ও পাগল মেলা’২১

সাঁঈ সাঁঈ হক মওলা পাগল দয়াময়

গুরুর চরণে, ‘মওলা মহল’-এর পাঁচ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে জানুয়ারী’২০২১। মওলা মহল প্রতিষ্ঠা ও সাঁঈ মওলা পাগলের স্মরণে গত দু’বছর সাধুসঙ্গ হয়েছে।

এবারও মওলা মহলের পাঁচ বছর পূর্তি এবং সাঁঈ মওলা পাগলের স্মরণে তৃতীয় সাধুসঙ্গ ও পাগল মেলার আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। করোনাকালীন যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সাঁঈ সাঁঈ করে।

সকলে সাদরে নিমন্ত্রিত।

প্রসঙ্গ পাগল মেলা ও মওলা পাগল

ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁইজির ধামে মওলা পাগল দেহত্যাগেরও চার-পাঁচ বছর আগে বলেছিল ‘মওলা মহল’-এর কথা। তারপর অনেক চড়াই উতড়াই পাড়ি দিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের পাশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘মওলা মহল’। যাত্রাটা সহজ ছিল না মোটেও।

সাঁঈ সাঁঈ হক মওলা পাগল দয়াময়ের কৃপায় রুমানা আফরোজ এই দরবার চালিয়ে আসছেন মওলার নামে। পাগল মেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধুদের সঙ্গ যেটা বিধান অনুযায়ী চব্বিশ ঘণ্টায় করা হয়। অধিবাস থেকে পুন্যসেবা পর্যন্ত চারটা সেবা আছে। সেবা-ভক্তি-প্রেমের মাধ্যমে সাধুসঙ্গ শেষ হয়ে যায়।

রুমানা আফরোজ
রুমানা আফরোজ

পাগল মেলাও একই আঙ্গিকেই হয়। যেহেতু আমার মওলা লালন সাঁইজির সিঁড়ির সাধক। প্রথমে সাধক, খেলাফত, ফকির হয়ে পাগল রূপ নিলেন। আমি মওলাকে পেয়েছি লালন ধরেই। আমার যতটুকু জ্ঞান-বিবেক। আমি তাঁর মাধ্যমেই লালনকে চিনেছি।

আমি প্রথম থেকেই সাঁইজির বিধানটাকে শ্রদ্ধা করি। আমি শুরু থেকেই যখন থেকে তেমন কিছুই জানতাম না। তখন থেকেই সাঁইজির বিধিবিধান মানবার চেষ্টা করতাম। সেই বিধিবিধান মেনে সাধুসঙ্গ তো চলবেই। পাশাপাশি পাগল যারা আসবে তাদের তো নিয়মে বাধা যাঁয় না।

তারা তো নিজেই নিয়ম সৃষ্টি করে। তাদের সাধুর কাতারে ফেললে উভয় পক্ষেরই বিপদ। সেবায় যে সব নিয়ম সঙ্গে মানতেই হয় তা পাগলদের পক্ষে মানিয়ে নেয়া শক্ত হয়ে যায়। পাগলকে বিধান দিয়ে আটকাতে গেলে তার প্রকৃত রূপ হারায়।

আর আমার মওলা যেহেতু পাগল। তাই তার সঙ্গে পাগল তো আসবেই। হরেক রকম পাগল আসবে। বাবার তো পরিচিত শুধু দেশে নয়। বিশ্বব্যাপী। কোথা থেকে কোন পাগল আসবে তা বলা মুশকিল। তাই সাধুসঙ্গে সাধু যারা উপস্থিত হন তারা সাধুর নিয়ম মানবে।

আর পাগল যারা আসবে তাদের জন্য মওলা মহলে বিশেষ সেবার আয়োজন থাকে। তারা চাইলে সাধুর সেবাও নিতে পারে বা তারা তাদের মতো করে যখন তখন যেমন খুশি সেবা নিতে পারে। এই স্বাধীনতাটা পাগলদের প্রাপ্য। আমি তাই দেয়ার চেষ্টা করি।

আর আমি নিজেও ঘুরে দেখেছি অনেক সময় ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে যারা থাকে তাদের সময়মতো সেবা নেয়া হয় না। আমি যেহেতু সেবা দিতে ভালোবাসি। তাই আমার কাছে যখন যে আসে তখন সে যেন সেবা পায় সাধুসঙ্গেও সেই বিষয়টা নজরে রাখবার চেষ্টা করি।

অধিবাসের সেবার আয়োজন করতে করতে রাত বারোটা একটা হবেই। সন্ধ্যার রাখাল সেবায় মুড়ি জাতীয় শুকনা খাবার দেয়া হয়। কিন্তু যারা দূরদূরান্ত থেকে আসে তারাও যদি চায় তারা আগে সেবা নিবে। সেই আয়োজন থাকে পাগল মেলায়। সাধুদের জন্য সাধুসেবা তো থাকেই সাধু মতের নিয়ম মেনে।

আবার সকালে বাল্যসেবায় যে বাচ্চাদের খাবার মানে মিষ্টি জাতিয় খাবার দেয়ার বিধান। তাও অনেক পাগল নিতে পারে না। অনেকে অসুস্থ থাকে। তাই বাল্য সেবাতেও অন্ন সেবার আয়োজন থাকে। যদি কেউ নিতে চায় তো নিতে পারে। সকলে তো পুন্যসেবা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না। সেটা তো হতে হতে বারোটা একটা।

এইটুকুই আর কি। সাধুসঙ্গ আর পাগল মেলায় আহামরি কোনো পরিবর্তন আছে তা নয়। আসলে পরিবর্তন কিছুই না। সাধুগুরু যারা তারাও তো পাগলই। পাগল ছাড়া ঐ গুরুজ্ঞান-ঐ পরমজ্ঞান কেউ প্রাপ্ত হয় না।

আর আমার মওলাকে নিয়ে যদি কিছু বলতে হয়। তাহলে বলবো- আমি আমার সারাজীবনে যত সাধুগুরু দেখেছি। তারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে একটু সুখ ভোগ করে। একটু সুখ তাদের হয়। একটু হলেও হয়। কিন্তু আমার পাগলকে নিয়ে এরকম কিছু আমি দেখি নি।

বাবা ওয়াইজ কুরোনি যেমন মাকে নিয়ে সারাজীবন বনেই কাটিয়ে দিলেন। এই লোকও সারাজীবন বনেই কাটিয়ে গেছেন। উনি শান্তিপুরে যাননি। এমনিতেও গরীবের ঘরে জন্ম হয়েছিল তাঁর। কাজ করেই জীবনটা পার করেছেন। ছোটবেলা থেকেই নানা চক্রান্তের স্বীকার হয়েছেন বারবার।

প্রভাবশালীদের নানা অভিযোগ-অনুযোগে নির্যাতিত হয়েছেন। তারপরও নিজ পরিবারের কর্তব্যে অবহেলা করেন নি। তার মাঝেই আজমপুর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত টানা পয়ত্রিশ বছর গুরু বেহাল শাহ্ কাছে সংগীত ও যন্ত্রপাতির তালিম নেন। তিনি খালি পায়েই চলাচল করতেন।

আমার দাদা গুরু বেহাল সাঁইয়ের সাথে তিনি গানও করেতেন। পালাগান। পালাগানের শিল্পীরা যখন দাদাগুরুর কাছে হেরে বসে যেতেন। দাদার সাথে পালায় পারতেন না কেউ। দাদার কথার উত্তর দিতে পারতেন না কেউ। প্রতিপক্ষ বসে গেলে তখন সকলে বলতো এখন গুরু-শিষ্য পালা করো।

অর্থাৎ গুরুর বেহাল শাহ্ আর শিষ্য মওলা পাগলের পালা শুনতে চাইতো সকলে। এটা নাকি সকলে খুব উপভোগ করতো বলে আমি শুনেছি।

মজার বিষয় হলো যে গ্রামে নানা অপবাদে মওলাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি সেখানেই শুয়ে আছেন। যারা একসময় বিরোধীতা করেছিল। আজ তারা মওলার প্রেমে মেতেছে। মওলার ভক্তদের দেখভাল করে। আসলে সব পাগলই তো নিজেকে আড়াল করে রাখে।

এই আড়াল করায় এক একজন পাগলের এক এক রকম হাতিয়ার। এক এক পাগল এক এক রকম। কেউ জালালী পাগল, কেউ মজ্জুব পাগল। আমার বাবা ছিলেন জালালী পাগল। এক এক পাগল আসলে এক এক রকম। এগুলো আসলে তাদের একটা আবরণ।

এই তো এর বেশি কিছু না। সকলকে আমন্ত্রণ থাকলো। এসে দেখে যাও মওলা কেমন মহল সাজাইছে। সাঁঈ সাঁঈ হক মওলা পাগল দয়াময়

সাধুসঙ্গ ও পাগল মেলার তারিখ :
৯ ও ১০ জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ।
২৫ ও ২৬ পৌষ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ।
শনিবার অধিবাস ও রবিবার পূন্যসেবা।

স্থান:
মওলা মহল আখড়াবাড়ি
আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, বাংলাদেশ।

: যাতায়াত (ঢাকা থেকে) :

বাস সার্ভিস (যমুনা সেতু দিয়ে)
ঢাকা শহরের গাবতলী, কল্যাণপুর ও সায়দাবাদ থেকে চুয়াডাঙ্গা গামী যে কোনো বাসে করে রওনা দিতে হবে। নামতে হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনে। স্টেশনে নেমে ‘মওলা মহল আখড়াবাড়ি’-এর কথা বলে সকলে চিনিয়ে দেবে। স্টেশনের কাছাকাছি তাই বিশেষ ঝামেলা পোহাতে হবে না।

ট্রেন সার্ভিস
ঢাকা থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও চিত্র এক্সপ্রেসে যাওয়া যায় আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা। সুন্দরবন এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকাল সোয়া আটটায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায়। বুধবার বন্ধ থাকে। আর চিত্রা এক্সপ্রেস সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় ঢাকার কমলাপুর থেকে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!