পুনর্জন্ম

পুনর্জন্ম

-মোতওয়াল্লী চিলু ভূঁইয়া জালালী

‘জালালী উপাসনা বা দর্শন’

পুনর্জন্ম বুঝিতে চাইলে প্রথমে যে বিষয়টি সম্মুখে আসে সেটা আর কিছু নয় আমাদের আত্মা বা রূহ-এর কি গতি বা পরিণতি ঘটে অর্থাৎ মৃত্যুর পরে ইহারা কোথায় অবস্থান করেন! কেন না চোখের সামনেই মৃত্যুর কিছু পরে এই জড় দেহটি যে ধ্বংস হয়ে যায়, ইহাতে কারও অবিশ্বাসের কারণ দেখি না। কিন্তু রূহকে সহজে দেখা যায় না।

জালালী মতে, মৃত্যুর পরে পশু-পাখি, গাছ-বৃক্ষ, তরু-লতা, মানব-দানব অর্থাৎ জীবের একই গতি বা পরিণতি ঘটে! জীবের আত্মার শক্তির রূপরেখা ভিন্নতর নয়। কেবল অন্যান্য জীবেরা যে রকম জ্ঞান মন্থনে সামর্থ্য থাকে, মানুষের ইহার চেয়ে বেশি আছে। সকল জীবের আত্মা আছে কিন্তু সকল জীবে আত্ম মৈথুন করতে জানে না।

প্রত্যেক জীবন্ত সত্ত্বার মৃত্যু অনিবার্য। ‘প্রতিটি মানুষই মহাজাগতিক নিয়ম রাজ্যে একরূপ হইতে অন্যরূপে রূপান্তরিত হইতেছে। যাহা খণ্ড থেকে খণ্ডিত হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রূপ নিয়ে আসিতেছে।’

জগৎ অনিত্য। যদিও প্রত্যেক কিছু পরিবর্তনীয়, কোন কিছু ধ্বংস হয় না। শুধু এর আকৃতি পরিবর্তন হয়। কঠিন তরল এবং বায়ুবীয়তে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু কোন কিছুই পুরোপুরি ধ্বংস হয় না।

সামাজিক ধর্মগুলো দেহের বা বহিরাঙ্গের উপাসনাতেই বেশি জোর দেয়। দেহ তো ধ্বংস হয়ে যায়। আত্মার বা রূহের উপাসনা সবগুলো সামাজিক ধর্মের পুস্তকে এই বিষয়ে কম বেশি বলা আছে। কিন্তু ইহাদের পুরোহিতরা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে সেই বিষয়ে কেন তুলে ধরছে না, ইহা আমার বোধে আসে না।

যদিও অনেক ধর্মের পুস্তকে পুনর্জন্ম নিয়ে যে প্রকারে বলছে, জালালী মতে ইহা ভিন্ন প্রকারে বলে। পুনর্জন্ম কেবল মাত্র ভক্তের রূহের বা আত্মার উপাসনার স্তর ভেদে ইহার গতি বা পরিণতি প্রাপ্ত হয়। ইহা সর্ব সাধারণের জন্যে নয়।

এক কোটির মধ্যে নিরানব্বই লাখ লোক মৃত্যুর পরে শব্দময় ব্রহ্মাণ্ডেই থাকে। ইহার ঊর্ধে উঠতে পারে না। এই আত্মা একটি শব্দময় শরীর নিয়ে চেতনা হীন হয়ে এই বায়ুময় ব্রহ্মাণ্ডেই থাকে। ইহার বিকাশের গতিরুদ্ধ হয়ে যায়। শব্দময় ব্রহ্মেই সে লীন হইয়া যায়।

জালালী মতে, পরকাল ও পুনর্জন্ম দুটোই আছে। দুটোই স্ব- স্ব কৃতকর্মের উপর নির্ভরশীল। তোমার কর্ম দ্বারাই তোমার রূহকে উন্নত স্তরে পৌঁছিয়ে নিতে পার। আবার কর্ম দ্বারাই রূহ নিম্নগতি প্রাপ্ত হয়।

তুমি যদি এই দেহ জীবিত থাকতে রূহ বা আত্মার জ্ঞান অর্জন না কর; রূহ বা আত্মাকে শক্তিশালী করে গড়তে না পার তবে তোমার পরিণতি হবেটা কি? অন্যান্য জীবাদির মতই হবে ইহা কি নিশ্চিতরূপে জানো না?

নিজের সাধন নিজে করতে যদিও অনেক কঠিন, তবে ভাগ্যে যদি অতীন্দ্রিয় আত্মজয়ী গুরুর দয়া থাকে তিনি-ই তোমার রূহকে জিন্দা রাখতে পারেন। মৃত্যুকালে অতীন্দ্রিয় সত্তার অধিকারী গুরুই তোমার আত্মায় বা রূহতে প্রবেশ করবে; কৃষ্ণ তার ভক্তে, বুদ্ধ তার ভক্তে, যীশুখ্রিস্ট তার ভক্তে।

অর্থাৎ যাঁর যার উপাস্য প্রভুই তোমার সূক্ষ্ম রূহ বা আত্মময় স্বভাবময় ভক্তের সূক্ষ শরীরটাকে নিজ জ্ঞানময় শরীরে ধারণ করবে। আবার তোমার যদি আত্মজ্ঞান অর্জনের কর্ম বাকি থেকে যায়, মৃত্যুর পরে গুরু পুনর্জন্ম দিতে পারে জ্ঞানময় ব্রহ্মে পৌঁছনোর জন্যে।

জ্ঞানময় ব্রহ্মাণ্ডে সাধনা বা গুরু কৃপায় পৌঁছিলে আর গুরু বা মা কালীর দেহে থাকার প্রয়োজন হয় না। পরকালের মুক্তি ও পুনর্জন্মের সম্ভাবনা ভক্তের কর্মের উপরেই নির্ভরশীল। কর্মই কারণ।

…………………………
আরো পড়ুন…
মৃত্যু ও পরকাল

সৃষ্টিতত্ত্ব
পুনর্জন্ম
স্বর্গ

…………………………..
-জালালী উপাসনা বা দর্শন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!