ইলুমিনাতি

চুরাশির ফেরে: সতেরো : ইলুমিনাতি

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

‘ইলুমিনাতি’

ইলুমিনাতির উদ্ভব

জার্মানির দক্ষিণপূর্বের রাজ্য ব্যাভারিয়ার ইঙ্গলস্ট্যাড ইউনিভার্সিটির আইন ও ব্যবহারিক দর্শনবিদ্যার প্রফেসর ছিলেন জেসুইট অ্যাডাম ওয়েইশপ্ট (১৭৪৮-১৮৩০)। ইঙ্গলস্ট্যাড ইউনিভার্সিটিতে তিনি ছাড়া তার সকল সহকর্মীই ছিল পাদ্রী।

চার্চের দমননীতির প্রতি বিতৃষ্ণাবশত তিনি পাদ্রী হননি। এতে করে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধুরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখতো। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় চলতো চার্চের বিধানের ভিত্তিতেই। সেসময় খ্রিস্ট আইনকানুনের বাইরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায় ওয়েইশপ্ট এমন একটি সংঘ গঠনের কথা পরিকল্পনা করেন; যেখানে তার দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

প্রথমে তিনি ফ্রিমেসনরিতে যোগ দিতে চাইলে পরে মত পরিবর্তন করেন। তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটা সংঘ প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে তিনি মানুষকে আলোকিত বা এনলাইটেনমেন্ট করতে পারবেন।

ইলুমিনাতির বিকাশ

১ মে ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম ওয়েইশপ্ট তার চার ছাত্রকে নিয়ে এই সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রথমে এর নাম রাখেন ‘Bund der Perfektibilisten’ অর্থ ‘পূর্ণতার চুক্তি’। পরবর্তী এপ্রিল ১৭৭৮ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইলুমিনাতি দ্যা অর্ডার’। যা ইলুমিনাতি নামে পরিচিতি পায়। যার অর্থ ‘বিশেষভাবে আলোকিত বা জ্ঞানার্জনের দাবীদার সংঘ’। সে সময় এর সদস্য সংখ্যা ছিল ১২।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময় এ সংঘে সদস্য হতে পারতো সচ্চরিত্র, ধনী, শিক্ষানবিস, তরুণ, জ্ঞানানুসন্ধিৎসু ও মেধাবী খ্রিস্টানরা। অন্যদিকে ইহুদী ধর্মাবলম্বী, মূর্তিপূজারী, নারী, ধর্মগুরু এবং অন্য সিক্রেট সোসাইটির সদস্যরা ছিল নিষিদ্ধ।

১৭৮০ সালে অ্যাডলফ ফ্রাঞ্জ ফ্রেডেরিচ নিগেজ নামে একজন ফ্রিমেসনরি সংঘে যুক্ত হন। তিনি সংঘের অপেশাদার মনোভাব পরিবর্ধন-পরিমার্জনের কাজ শুরু করতে চাইলে এ্যাডামের সাথে মতোবিরোধ দেখা দেয়। যা সংঘে বেশ প্রভাব সৃষ্টি করে।

১৭৮২ সালের দিকে সংগঠনের সদস্যদের তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। সদ্য যোগ দানকারীরা প্রথম স্তর। মাঝারি পর্যায়ের সদস্যরা দ্বিতীয় স্তর। আর সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞানের অধিকারীরা সর্বোচ্চ অর্থাৎ তৃতীয় স্তরের সদস্য বলে বিবেচিত হতে শুরু করে।

অ্যাডাম চেয়েছিন সংগঠনের কথা গোপন রাখতে। যেন কোনোমতেই তা রসিক্রুসিয়ানদের কাছে ফাঁস না হয়। অপর গুপ্তসংঘ রসিক্রুসিয়ানরা ছিল ইলুমিনাতির বিপরীত। তৎকালীন ইলুমিনাতিরা বিশ্বাস করত সেকুলারিজমে, আর রসিক্রুসিয়ানদের বিশ্বাস ছিল জাদুবিদ্যাতে।

১৮০০ সালের পর থেকে ইলুমিনাতির হুজুগ কমতে শুরু করে। তবে নি:শেষ হয়ে যায় নি কখনোই। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকের কেন্দ্র করে তারা হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন সময় অতিরঞ্জিত করে লেখা ইলুমিনাতির গল্প-উপন্যাস-কাহিনী সবসময়ই ছিল বিক্রির শীর্ষে।

১৭৮৪ সালে ব্যাভারিয়ার ইলেকটর চার্লস থিওডর সকল গুপ্তসংঘের ওপর সমন জারি করেন। ইলুমিনাতির ব্যাপারেও শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান। তাদের কার্যালয়ে সাংকেতিক চিঠি, বইপুস্তক ও ক্যালেন্ডার পাওয়া গেলে তারা সন্দেহের তুঙ্গে ওঠে যায়। ইউরোপ জুড়ে রটে যায় ইলুমিনাতি একটি নাস্তিক সংঘ।

ফলে ১৭৮৭ সালে ব্যাভারিয়ার ডিউক আনুষ্ঠানিকভাবে ইলুমিনাতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং তাদের জব্দকৃত নথিপত্র প্রকাশ করে দেয়। ফলে সংঘের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর ইলুমিনাতির কী হলো তার সঠিক ইতিহাস আর জানা যায় না। তবে শুরু হয়ে যায় তাদের ঘিরে নানান কল্প-কাহিনী।

১৭৯৭ সালের শেষদিকে জন রবিসন তার ‘Proofs of a Conspiracy’ গ্রন্থে লিখেন ইলুমিনাতি বহাল তবিয়তে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বইটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এরপর থেকেই ইউরোপে ঘটে যাওয়া যে কোনো ষড়যন্ত্রকে ঘিড়ে ইলুমিনাতির নাম জড়িয়ে পরে। যা ছড়িয়ে পরে আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশে।

১৮০০ সালের পর থেকে ইলুমিনাতির হুজুগ কমতে শুরু করে। তবে নি:শেষ হয়ে যায় নি কখনোই। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকের কেন্দ্র করে তারা হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন সময় অতিরঞ্জিত করে লেখা ইলুমিনাতির গল্প-উপন্যাস-কাহিনী সবসময়ই ছিল বিক্রির শীর্ষে।

ইলুমিনাতির বিস্তার

ইলুমিনাতি সম্পর্কিত অধিকাংশ তথ্যই ধারণা প্রসূত। পরিষ্কার করে তাদের সম্পর্কে কেউ তেমন কিছুই বলতে পারে না। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মাথায় নিষিদ্ধ হলে সংগঠনের বেশকিছু কাগজ জব্দ করা হয়। মূলত সেগুলোই এর সম্পর্কে প্রাপ্ত প্রকৃত তথ্য-উপাত্য। যদিও সেগুলো বেশিভাগই ছিল সংকেতিক ভাষায় লিখিত।

পরবর্তিতে যা কিছু রচিত হয়েছে তার বেশিভাগই গল্প-উপন্যাস। তাত্ত্বিক আর বিশ্লেষকরা যে সকল নিবন্ধ রচনা করেছেন সেগুলোও বেশিভাগ সেই সব অতিরঞ্জিত কল্প-কাহিনীর যৌক্তিক-অযৌক্তিকতা নিয়ে। আর যে সকল তত্ত্ব দেয়া হয়ে তার প্রায় সবই ধারণাপ্রসূত বা সমকালীন অন্যান্য সংঘের বিধানের ভিত্তিতে।

বিভিন্ন সময় পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া যে সব ষড়যন্ত্রের পেছনে ইলুমিনাতির ভূমিকার কথা এসেছে তাও ধারণা প্রসূত। যাদের নাম জড়িয়েছে ইলুমিনাতির সাথে তারও কোনো দালিলিক প্রমাণ কেউ প্রকাশ করতে পারেনি। তাই অনেকে মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে ইলুমিনাতি বলে পৃথিবীতে কিছুই বিরাজ করে না। সবই অতি উৎসাহীদের কাল্পলিকতা মাত্র।

অনেকে বলেন, তারা শয়তানের উপাসক। তারা শয়তানের কাছে নিজের আত্মাকে সমার্পিত বা বিক্রি করে তার বিনিময়ে শক্তি অর্জন করে অন্যের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। আর সিদ্ধপ্রাপ্ত অর্থাৎ শয়তানের শক্তিতে বলিয়ান সদস্যরা সকলে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে পরস্পর যোগ স্থাপন করে সম্মিলিত শক্তিতে যে কোনো ঘটনা যেমন ঘটাতে পারে; তেমনি যে কারো আত্মাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইলুমিনাতি গত প্রতিটি শতকে বহুবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। বেশিভাগ মানুষ সেগুলোকে মুখরোজক আড্ডার বিষয় বলে উড়িয়ে দিলেও; অনেকে আবার একে জুড়ে দেখতে চেয়েছেন এমন এক শক্তির সাথে যা পৃথিবীর ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

অনেকে মনে করেন, ইলুমিনাতি মূলত শয়তানের পূজারি একটি গুপ্তসংঘ। যারা বাইবেলে উল্লেখিত কথিত ‘দাজ্জাল’ এর পূজা করে। শয়তানের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে পৃথিবীর নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

অনেকে ভাবে, ইলুমিনাতি ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত নতুন পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে নিজস্ব দর্শন ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য সৎ। তারা তাদের সকল সদস্যের শক্তিকে এক ফিকোয়েন্সিতে এনে পৃথিবীর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। পৃথিবী যে বড় বড় সমস্যা থেকে বিভিন্ন সময় নিষ্কৃতি পেয়েছে এসব তাদেরই অবদান।

অনেকে বলেন, তারা শয়তানের উপাসক। তারা শয়তানের কাছে নিজের আত্মাকে সমার্পিত বা বিক্রি করে তার বিনিময়ে শক্তি অর্জন করে অন্যের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। আর সিদ্ধপ্রাপ্ত অর্থাৎ শয়তানের শক্তিতে বলিয়ান সদস্যরা সকলে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে পরস্পর যোগ স্থাপন করে সম্মিলিত শক্তিতে যে কোনো ঘটনা যেমন ঘটাতে পারে; তেমনি যে কারো আত্মাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।

অনেকের মতে, ইলুমিনাতি বিশ্বের সকল রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এদের মূল লক্ষ্য সকল প্রভাবশালী-ক্ষমতাবান ধর্মীয়, মানবিক, সামাজিক এমনকি ব্যক্তিগত অস্তিত্বের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করা।

ইলুমিনাতির আলোচিত ষড়যন্ত্র

গত কয়েক শতকে সংগঠিত বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পেছনে ইলুমিনাতের হাত আছে বলে অনেকে দাবী করেন। সেসবের দালিলিক কোনো প্রমাণ না থাকলেও যুগ যুগ ধরে এ খবর সংবাদ ও বিনোদন মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের উল্লেখযোগ্য ষড়যন্ত্র-

১. ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের সূচনা।
৩. নেপোলিয়নের ওয়াটারলু যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ।
৪. আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কেনেডির হত্যা।
৫. ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ ত্বরান্বিত করা।
৬. হলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দখল।
৭. ক্লোন টেকনোলজি।

ইলুমিনাতির আধুনিক সংস্কৃতিতে

প্যারডি উপন্যাস সিরিজ ‘The Illuminatus! Trilogy’ এবং পরবর্তীতে ড্যান ব্রাউনের ‘অ্যাঞ্জেলস অ্যান্ড ডিমন্স’ উপন্যাসের ফলেই মূলত ইলুমিনাতি আধুনিক সংস্কৃতিতে আগ্রহের নতুন সূচনা তৈরি করে।

এডওয়ার্ড আলরিচ তার ‘A Summary of the Secret Society the ‘Illuminati’, Drawn from the Works of Henry Makow’ নিবন্ধ উল্লেখ করেন- ইলুমিনাতি মূলত বিভিন্ন শক্তিশালী ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠন ও সরকার ব্যবস্থার মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এবং মিডিয়া ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও কর্তৃত্ব গ্রহণ করে বিশ্বকে বিশৃঙ্খলতার মধ্যে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টায় লিপ্ত।

…ইলুমিনাতি গণতন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বংশগত অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতার মাধ্যমে। …ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ছিল সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ইলুমিনাতির বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার একটি ছদ্মরূপ। একই কারণে, উনিশ শতকে জার্মানি গড়ে ওঠার পর তারা দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়ন করে, তারপর আরও একটি লাভজনক স্নায়ু যুদ্ধের সূচনা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে।

আর এখন তাদের লক্ষ্য, আমেরিকার ঘাড়ে ভর করে সকল ক্ষমতা তথাকথিত বিশ্ব সরকার ব্যবস্থার কাছে হস্তান্তর করা যা কিনা পুরোটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে।

…ইলুমিনাতি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল খ্রিষ্ট ও রাজতন্ত্রের বিনাশ, বিশ্ব সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, পারিবারিক বন্ধন এবং বিবাহ ছিন্ন করা, উত্তরাধিকার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রদ করা এবং সর্বোপরি জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলা।

…ইলুমিনাতি কখনোই নিজের নামে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে না। নিজেদের পর্দার আড়ালে রেখে অন্যের দ্বারা কাজ করিয়ে নেয়। এডাম ওয়াইশপট লিখেছেন, ‘আমাদের কর্মকাণ্ডের শক্তি হচ্ছে আমাদের লুকায়িত পরিচয়। একে কখনো-কোথাও উন্মোচিত করো না। সকল কাজ অন্যের নামে ও অন্যকে দিয়ে করিয়ে নাও’।

ইলুমিনাতির মিডিয়ায় আধিপত্য

বিশ্লেষকরা বলেন, সাধারণ মানুষকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে ইলুমিনাতি বরাবরই বিশ্ব বিজ্ঞাপন ও বিনোদনজগৎকে ব্যবহার করেছে। তার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডিয়া ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এরজন্য তারা বহু সেলিব্রেটিকেও ব্যবহার করেছে বিভিন্ন সময় এমনটাও প্রচারিত আছে।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময় বহু সেলিব্রেটির নাম জড়িয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। অনকে সেলিব্রেটিদের কর্মকাণ্ড, আচরণ, পোশাক, সাজসজ্জা, প্রতীক, ট্যাটু ইত্যাদি দেখে তাদের সাথে ইলুমিনাতির যোগসূত্র আছে বলে দাবী পেশ করেন। তবে সে সবের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

টেইলর সুইফট, বব ডিলান, জিম ক্যারি, জেই-জি, কিম কার্দেশিয়ান, ক্যানি ওয়েস্ট, রিহান্না, ম্যাডোনা, প্রিন্স, লেডি গাগা সহ আরও বহু জনপ্রিয় বিশ্ব তারকা ইলুমিনাতির সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন অনেকে। অনেকে বিশ্বাস করেন, মাইকেল জ্যাকসন, বব মার্লে, জন লেনন, হিথ লেজারের মৃত্যুকে স্যাক্রিফাইস হিসেবে উৎসর্গ করে ইলুমিনাতি।

এমনকি মার্কিন পপ তারকা বিয়ন্সেকে ‘ইলুমিনাতির রাণী’ বলেও দাবী করেন অনেকে। বিভিন্ন সময় তার পোশাক, সাজসজ্জা, প্রতীকে বারবার ইলুমিনাতি উপস্থিতি দেখা গেলেও ২০১৩ সালের দিকে ‘সুপারবল হাফটাইম পারফরমেন্স’ দেখে অনেকেই এ বিষয়ে একমত হন।

অনেকে বলেন, এই নতুন বিশ্ব গঠনে তারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা কমিয়ে মাত্র ২ বিলিয়নে নামিয়ে আনবে। আর তাদের নিয়েই যাত্রা শুরু করা হবে এক নতুন পৃথিবীর। যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইলুমিনাতি। ইলুমিনাতিরা যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করে না তাই অনেকে ধারণা করে তাদের ওয়ান ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মূলনীতি হবে মানবধর্ম।

ডিজনি-মার্ভেলের কমিক্স-কার্টুন-চলচ্চিত্র এমনকি সিম্পসন কার্টুনকে অনেকে সরাসরি ইলুমিনাতির মুখপাত্র বলে থাকেন। ভি ফর ভেনডেট্টা, ম্যাট্রিক্স, লুসি, ন্যাশনাল ট্রেজার, হ্যারি পটার, টুম্ব রাইডার, প্যান্ডামিক, ভেনম, দ্য ভিঞ্চি কোড সহ পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত অগণিত চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বহু গান-গল্প-উপন্যাস-বিজ্ঞাপন-টিভি-ওয়েব সিরিজসহ বেশকিছু ডিজিটাল মাধ্যম ইলুমিনাতির প্রতিনিধিত্ব করে বলে বারবার আলোচনায় এসেছে।

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইলুমিনাতির হাতে আছে উন্নত ক্লোন টেকনোলোজি। তারা সেটা ব্যবহার করে পূর্ববর্তী অনেক শয়তানের উপাসনাকারীদের নতুন করে ভিন্ন রূপে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় রত আছে। অনেকের মতে, টেইলর সুইফট আদৌতে ‘চার্চ অব স্যাতান’-এর ধর্মযাজিকা(১৯৮৫-১৯৯০ সাল) জিনা ল্যাভি।

ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বিশ্লেষকরা এও মনে করেন যে, ইলুমিনাতি নতুন বিশ্ব নেতৃত্ব গঠনের ছকে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এই ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এর ছক অনুযায়ী সমগ্র বিশ্ব থাকবে ইলুমিনাতির নিয়ন্ত্রণে। জীবিত সকলে হবে ইলুমিনাতি মতে বিশ্বাসী।

অনেকে বলেন, এই নতুন বিশ্ব গঠনে তারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা কমিয়ে মাত্র ২ বিলিয়নে নামিয়ে আনবে। আর তাদের নিয়েই যাত্রা শুরু করা হবে এক নতুন পৃথিবীর। যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইলুমিনাতি। ইলুমিনাতিরা যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করে না তাই অনেকে ধারণা করে তাদের ওয়ান ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মূলনীতি হবে মানবধর্ম।

ইলুমিনাতির সদস্য

ধারণা করা হয়, পৃথিবীর ক্ষমতাধর সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও পরিবারবর্গ ইলুমিনাতির অন্তর্ভুক্ত। তাদের ক্ষমতাধর হওয়ার নেপথ্যে কাজ করে ইলুমিনাতি। ১৭৯৮ সালের জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর বলেছিলেন, ‘ইলুমিনাতি তাদের মতবাদ পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে’।

আর আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘I am not bound to win, but I am bound to be true. I am not bound to succeed, but I am bound to live by the light that I have. I must stand with anybody that stands right, and stand with him while he is right, and part with him when he goes wrong’.

বর্তমানকালে অবশ্য নানা সংঘই ইলুমিনাতি নাম দিয়ে নিজেদের দাবি করে যে তারাই সত্যিকারের ব্যাভারিয়ান ইলুমিনাতি। সেসব ছেলেখেলা বলেই ভাবে বেশিভাগ মানুষ। তবে তাদের বেশি ঘাটাতে রাজি নয় কেউই। কারণ তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও অবিশ্বাস করা একটু কঠিন।

ইলুমিনাতির প্রতীক

১. প্রতিষ্ঠাকালে ইলুমিনাতির প্রতীক ছিল ‘আউল অব মিনার্ভা’ বা ‘গ্রিক জ্ঞানদেবী মিনারভার পেঁচা’।
২. ইলুমিনাতির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো পিরামিড বা ত্রিভুজের মধ্যে আঁকা চোখের চিহ্ন।
৩. শুধু তাকিয়ে থাকা একটি চোখের চিহ্ন।
৪. দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাথা এক সাথে ছুঁয়ে ত্রিভুজাকৃতি তৈরিকৃত প্রতীক।
৫. এক হাতে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাথা ছুঁয়ে আর মধ্যমাকে মাঝে দিয়ে চোখের আকৃতি দেয়া। অনেকটা ধ্যান মুদ্রার মতো প্রতীক।
৬. বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল খোলা রেখে বাকিগুলো বন্ধ করা চিহ্ন বিশেষ। একে ‘লানত’ এর চিহ্নও বলা হয়।

ইলুমিনাতি প্রচারে এক চোখের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যদিও এটি প্রকৃত ইলুমিনাতির প্রতীক নয় বলেই বিশ্লেষকরা ধারণা করেন।

আমেরিকার বর্তমান এক ডলার নোটে এমন একচোখা একটি পিরামিড দেখা যায়, যেটাকে বলা হয় ‘অল সিইং আই অফ গড’ বা ‘আই অফ প্রভিডেন্স’। অনেকে মনে করেন, এই এক চোখ প্রমাণ করে আমেরিকা ইলুমিনাতির দখলে।

ওই পিরামিডের নিচে লেখা ‘MDCCLXXVI’ রোমান সংখ্যায় এটি মূলত ‘১৭৭৬’। যা ইলুমিনাতির প্রতিষ্ঠা সাল হিসেবে লেখা হয়েছে বলে অনেকে বলে থাকেন। তবে বিশ্লেষকরা বলেন এটি আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের সাল ভিন্ন অন্য কিছুই নয়।

বিশ্লেষকরা এই ত্রিভুজের মধ্যে চোখকে ইলুমিনাতির প্রতীক মানতে নারাজ। তাদের মতে ইলুমিনাতি কখনো এই প্রতীক ব্যবহার করেনি। যদিও ফ্রিম্যাসন্সদের প্রতীকে চোখ চিহ্ন ছিল। তবে তা কোনো ত্রিভুজের মধ্যে ছিল না। তা ছিল মেঘের মধ্যে। এটি আধুনিক সময়ের প্রচার করা এক বিভ্রান্তি মাত্র।

আরো লিখা আছে লাতিনে E pluribus unum (Out of many, one) ও Novus ordo seclorum (New order of the ages)। এক ডলারের উপর এই চিহ্নি অংকিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বেনজামিন ফ্রাংকলিনের সময়কালে। বেনজামিন ফ্রাংকলিন ফ্রিম্যাসন্সর সদস্য ছিলেন বলে কথিত আছে। তিনি ফিলাডেলফিয়ার সেন্টজোন্সের ফ্রিম্যাসন্স লজের সেক্রেটারীও ছিলেন বলেও জানা যায়।

আবার ডলারের গায়ে তেরোটি তারা, ঈগলের পায়ে তেরোটি তীর ও তেরোটি জলপাই পাতা এবং লুকানো অবস্থায় থাকা পেঁচাকে ইলুমিনাতির উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। কারণ ইলুমিনাতিতে তেরোটি ধাপে উর্ত্তীণ হয়ে সংঘের শিখড়ে পৌঁছাতে হতো।

তবে ইতিহাস বলে এই তেরো সংখ্যাটি ব্যবহার করা হয়েছে মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ১৭৭৬ সালে স্বাধীন হওয়া যে তেরোটি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা তলে এসেছিল তাদের সম্মান প্রদর্শনে।

বিশ্লেষকরা এই ত্রিভুজের মধ্যে চোখকে ইলুমিনাতির প্রতীক মানতে নারাজ। তাদের মতে ইলুমিনাতি কখনো এই প্রতীক ব্যবহার করেনি। যদিও ফ্রিম্যাসন্সদের প্রতীকে চোখ চিহ্ন ছিল। তবে তা কোনো ত্রিভুজের মধ্যে ছিল না। তা ছিল মেঘের মধ্যে। এটি আধুনিক সময়ের প্রচার করা এক বিভ্রান্তি মাত্র।

কোডেক্স গিগাস

‘কোডেক্স গিগাস’ বা বিশাল পুস্তক। বলা হয়ে থাকে, বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রে তেরশ’ শতকের এক রাজা গুরুতর অন্যায়ের জন্য এক সন্ন্যাসী মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। সন্ন্যাসী আর্জি করেন যদি তাকে মুক্ত করে দেয় হয় তাহলে তিনি পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান সংকলন করে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেবেন।

রাজা বলেন যদি তা এক রাতে লেখা সম্ভব হয় তবেই তিনি মুক্তি পাবেন। সন্ন্যাসী রাজি হলেন। কিন্তু লিখতে লিখতে শেষ রাতের দিকে যখন বুঝতে পারলেন পাণ্ডুলিপি শেষ করা সম্ভব হবে না। তখন সন্ন্যাসী নরকের রাজপুত্র লুসিফারের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন।

লুসিফার প্রকট হয়ে বললেন সন্ন্যাসী যদি তার আত্মা তাকে উৎসর্গ করে তবে সে রাজি। নিরুপায় সন্ন্যাসী সম্মতি দিলে লুসিফার এক মুহূর্তের মধ্যে পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করে দিল।

কিন্তু তার স্বাক্ষরসরূপ পাণ্ডুলিপির ২০৯ পৃষ্ঠায় শয়তানের ছবি এঁকে দিলেন। লুসিফারের গায়ে মোটা উলের তৈরি রাজকীয় পোশাক ‘আরমিন কোট’ পরিহিত ছিল। যার মাধ্যমে তাকে ‘নরকের রাজপুত্র’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই ছবির কারণে এর নাম হয়ে গেলো ‘শয়তানের বাইবেল’। ইতিহাসবিদদের মতে, ল্যাটিন ভাষায় লিখিত কোডেক্স গিগাস একটি মধ্যযুগীয় বিশ্বকোষ।

…………………………………..
সূত্র:
বাংলাপিডিয়া
উইকিপিডিয়া

…………………………………..
আরো পড়ুন:
চুরাশির ফেরে: এক
চুরাশির ফেরে: দুই
চুরাশির ফেরে: তিন : আত্মা-১
চুরাশির ফেরে: চার: আত্মা-২
চুরাশির ফেরে: পাঁচ : সৎকার
চুরাশির ফেরে: ছয় : কর্মফল-১
চুরাশির ফেরে: সাত : কর্মফল-২
চুরাশির ফেরে: আট : পরকাল-১
চুরাশির ফেরে: নয় : পরকাল-২

চুরাশির ফেরে: দশ : জাতিস্মর
চুরাশির ফেরে: এগারো : প্ল্যানচেট
চুরাশির ফেরে: বারো : ওউজা বোর্ড
চুরাশির ফেরে: তেরো : প্রেতযোগ
চুরাশির ফেরে: চৌদ্দ : কালাজাদু
চুরাশির ফেরে: পনের: গুপ্তসংঘ–১

চুরাশির ফেরে: ষোল: গুপ্তসংঘ–২
চুরাশির ফেরে: সতের: ইলুমিনাতি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!