চুরাশির ফেলে প্রেতযোগ

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

‘প্রেতযোগ’

মুসলমান সমাজে জ্বীন জাতির সাথে যোগাযোগ এবং তাদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেয়ার কথা শোনা যায়। যদিও জ্বীন জাতিকে মানুষ সম্প্রদায়ে ফেলা যায় না। তারা মানুষের থেকেও সূক্ষ্ম ভিন্ন এক জাতি বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।

জ্বীন নামানোর এই আসরে একজনকে মিডিয়াম করে তার উপর জ্বীন ভর করিয়ে বা এনে প্ল্যানচেটের মতোই নানা প্রশ্ন করা হয়। জ্বীন ভর করলে মিডিয়ামের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। বিশেষ করে গলার স্বর এমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষাও পরিবর্তন হয়ে যায়। জ্বীন ভর করলে মিডিয়াম নিজ মুখ দিয়ে কিন্তু ভিন্ন স্বরে তাকে করা প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে।

অনেক সময় আহ্বানকারী আর মিডিয়াম একজনই হয়ে থাকে। নিজেই নিজের উপর জ্বীন এনে নিজেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। এই আসরের জন্য রাত, অন্ধকার কক্ষ, মোমবাতি-আগরবাতির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। সাথে নানাবিধ রীতিনীতি উপাচার-আচার-পদ্ধতি দিন-ক্ষণ-কাল গণনা তো রয়েছেই।

অনেকে জ্বীনের সাথে সরাসরি কথা বলার সক্ষমতা রাখেন বলেও দাবী করেন। তবে এই যোগাযোগের কার্যকলাপ বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকে বলেন যারা প্রকৃতপক্ষে এই যোগাযোগ করতে পারেন তারা তা জনসমক্ষে প্রকাশ না।

দুষ্টআত্মা বা প্রেতাত্মা ব্যবহার করে কার্য হাসিলের চর্চাকে বিশ্বাস না করলেও কঠিন সংকটে পরলে অনেককেই এর দ্বারস্থ হতে দেখা যায়। এতে মানুষের কতটা উপকার বা অপকার হয় সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এই বিদ্যা নানা দেশে নানা নামে নানা প্রকৃয়ায় প্রচলিত। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য- কুফরি কালাম, ডাকিনী বিদ্যা, ডাইনী, ভুডু, কালাজাদু, ক্যানডোমবল, ওবিয়াহ, উইজ প্রভৃতি।

কুফরি কালাম

কুফরি কালাম স্থানীয়ভাবে ‘বান মারা’ নামে প্রচলিত। মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ দুষ্টআত্মা বা জ্বীন দিয়ে অন্যের অনিষ্ট সাধনে এই ক্রিয়া করে থাকে। একে আমল বা তদবিরও বলা হয়। যদিও কুফরি কালাম বা কুফরি ইসলাম সমর্থন করে না। এর জন্য কঠিন শাস্তির বিধানও আছে। তারপরও অনেকেই এর চর্চা করে থাকে।

যার ক্ষতি করা হবে তার নাম, পিতার নাম, বংশ পরিচয়, ছবি, ব্যবহৃত জিনিস এমনকি দেহের নখ-চুল ইত্যাদি যিনি কুফরি করবেন তাকে সংগ্রহ করে দিতে হয়। সব কিছুর জোগান দেয়া হলে কুফরিকারী নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ-লগ্ন মেনে ওজু করে আমলে বসেন।

নানা ক্রিয়াকলাপ রীতিনীতি মেনে স্বচ্ছ কাগজের উপর জাফরান রং দিয়ে আরবী অক্ষর এবং বিভিন্ন সাংকেতিক নকশা আঁকেন। সেই নকশা কাটা কাগজ ভাঁজ করে ইট চাপা দিয়ে রাখলে কাগজ পঁচে যাওয়ার সাথে সাথে সেই মানুষটির ক্ষতি হতে থাকবে। বিশ্বাসীদের এমনই বিশ্বাস।

অনেকে ইট চাপা দেয়ার বদলে সেই কাগজ তাবিজ বানিয়ে যার ক্ষতি করা হবে তার বাড়ির নির্দিষ্ট জায়গায় পুতে বা ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়ে থাকে। এটি সাধারণ বিধি। এছাড়াও নানা ক্রিয়াকলাপ করা হয় এই কুফরি বিদ্যায়।

প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে এই প্রথা। আরবের বাদশাহ সলোমন যুগে জাদুর ব্যাপক প্রচলন ছিল।

ডাকিনী বিদ্যা

এটিও একটি গুরুমুখী বিদ্যা। সম্ভবত ‘ডাকা’ থেকে ডাকিনী শব্দটি এসেছে। অর্থাৎ ডাক দেয়া বা আহ্বান করা। সাধারণত নির্জন স্থানে বিশেষ করে লোকালয়ের বাইরে শ্মশান, কবরস্থান বা ঘনজঙ্গলের ভেতরে আগুন জ্বেলে বেশ কয়েকজন মিলে আগুনকে ঘিরে গোল হয়ে বসে। পশু-পাখি এমনকি মানুষের মাংস-রক্ত সহ নানাবিধ উপকরণের সমাহারে ধুপধুনি দিয়ে এই সাধনকার্য শুরু হয়।

বিভিন্ন তন্ত্র করে মন্ত্র পড়ে আত্মাকে ডাকা হয়। সাধকরা আগুনে নানা উপকরণ ছিটিয়ে দিতে দিতে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে। ডাকতে ডাকতে মাতোয়ারা হয়ে দুই হাত দিয়ে মাটি তুলে হাওয়ার মধ্যে ছুড়তে শুরু করে। আত্মা উপস্থিত হলে চারপাশে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি, প্রচণ্ড বাতাস বা ধুলা ঝড় শুরু হয়ে যায়।

এ সময় সাধকরা উঠে দাঁড়িয়ে আগুনের চারপাশে নৃত্য করতে শুরু করে। আত্মা উপস্থিত হলে, সে নিজেই বিকট শব্দে তার উপস্থিতি জানান দেয়। এই ক্রিয়ার যোগীরা বলেন, ভোগের জন্য দেয়া জীবিত পশুপাখিকে মেরে তার রক্ত চুষে খায় উপস্থিত আত্মা।

ডাইনী বিদ্যা

‘উইক্কা’ থেকে উইচ শব্দটির আর্বিভাব হয়েছে। যার বাংলা ডাইনী। একসময় এর অর্থ ‘বুদ্ধিমান নারী’ বুঝালেও কালের বিবর্তনে তা অভিশপ্ত নারীতে রূপ নিয়েছে। প্রাচীন মিশর ও ব্যবিলনে জাদুকর ও ডাইনীদের জন্য আলাদা আইন ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব আঠার শতকের হামুরাবি কোড মতে- “যদি একজন মানুষ আরেকজনের ওপর জাদুটোনা করে ও তা যদি প্রমাণিত হয়; তবে যার ওপর জাদু প্রয়োগ করা হয়েছে সে পবিত্র নদীর কাছে যাবে ও নদীতে নামবে। নদী যদি তাকে ডুবিয়ে ফেলে তবে তার বাড়ীর মালিকানা পাবে ঐ জাদু প্রয়োগকারী ব্যক্তি। যদি সে পবিত্র নদীতে না ডোবে তবে ঐ জাদুকরকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে ও তার বাড়ির মালিকানা পাবে ঐ জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি।”

সম্ভবত ৭৮৫ সালে প্রথম চার্চ অব প্যাডেরবর্ন ডাকিনীবিদ্যা নিষিদ্ধ করে। পরবর্তী ১৩২০ সালে জন পোপ ডাইনী দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেন। ১৫-১৬ শতকে ডাইনী বিচার শুরু হয়। ইউরোপ জুড়ে প্রায় বারো হাজার ডাইনী বিচারের ঘটনা ঘটেছিল। এরপর এই চর্চা কমে আসে।

অনেকে বলেন, সমাজ থেকে অনেকটা একঘরা থাকায় ঘটে যাওয়া যে কোনো অপঘাতকেই তাদের নামে চালিয়ে দেয়া হতো। এবং চালানো হতো চরম নির্যাতন। এতে সমাজের প্রতি তাদের একটা বিতৃষ্ণা ছিল। তাতেই তারা নানা সময় মানুষকে সাহায্য করেছে অন্যকে ক্ষতি করতে।

১৬৮২ সালে ইংল্যান্ডে শেষ ডাইনী সন্দেহে নারীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৭১২ সালে জ্যানি ওয়েনহ্যাম ছিল প্রথাগত ডাইনী বিচারের শেষ ঘটনা। পরবর্তী নানা সময় ডাইনী আখ্যা দিয়ে আফ্রিকা, ভারত, আমেরিকার মতো দেশে বহু নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

একসময় এই বিদ্যা অর্জনকারী নারীরা যুক্তরাজ্যের মতো জায়গায় বিশেষ মর্যাদা পেত। রোগ-বালাই থেকে মুক্তি, ছোটখাটো সমস্যা থেকে নির্বৃত্তি এবং জাদু-টোনার কাজে লোকজন তাদের ডেরায় ভিড় করতো। তাদের ব্যবসা তখন ছিল জমজমাট। কিন্তু ডাইনীদের সমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করায় আইন করে তাদের নিষিদ্ধ করতেও সময় লাগেনি বেশি।

তারপরও যারা গোপনে এর চর্চা চালিয়ে গেছে তাদের ধরতে পারলে কঠিন বিচারের মুখোমুখি করা হতো। এমনকি ফাঁসি দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে কিংবা বর্বর নির্যাতনে তাদের হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। তাই বলে এই বিদ্যা চর্চা থেমে থাকেনি। গোপনে আজও এই বিদ্যা পৃথিবীব্যাপীই চলে।

কল্পকথায় ডাইনীদের নানাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উড়তে পারে এমনটাও বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায় তারা মূলত দুষ্টআত্মার পুজারী এবং কালা জাদুতে পারদর্শী। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এই চর্চাকারীদের ঘিরে গড়ে ওঠা গল্পগুলোর বেশিভাগই অতিকাল্পনিক বলেই গবেষকরা মনে করেন।

অনেকে বলেন, সমাজ থেকে অনেকটা একঘরা থাকায় ঘটে যাওয়া যে কোনো অপঘাতকেই তাদের নামে চালিয়ে দেয়া হতো। এবং চালানো হতো চরম নির্যাতন। এতে সমাজের প্রতি তাদের একটা বিতৃষ্ণা ছিল। তাতেই তারা নানা সময় মানুষকে সাহায্য করেছে অন্যকে ক্ষতি করতে।

ভারতের বহু অঞ্চলেও এর প্রচলন আছে। এই বিদ্যায় পারদর্শী নারীরা আত্মাকে ডেকে তার কাছে ভবিষ্যত জানার ক্ষমতা রাখে। আত্মাকে কাজে লাগিয়ে করে নানা কার্যসিদ্ধি। তবে প্রকাশ্যে এই বিদ্যা চর্চা বা প্রয়োগ কোনোটাই এখন আর হয় না। গুরুমুখি এই বিদ্যা তাই চলে কঠিন গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে।

ভুডু

‘ভুডু’ অর্থ আত্মা। সম্ভবত শব্দটির উৎপত্তি ইউই সম্প্রদায়ভুক্ত ফন জাতি থেকে। আফ্রিকার বেনিনের দক্ষিণাংশ, টোগো এবং নাইজেরিয়ায় বর্তমানেও ফন নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠী বসবাস আছে। কৃষিভিত্তিক সমাজের মানুষ ফনরা নিজস্ব ফন ভাষায় কথা বলে। তারা ভদুন ধর্মে বিশ্বাস করে। তাদের দেবতার নাম ভদু।

ভুডু বর্তমানে ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যা হিসেবে পরিচিতি পেলেও এটি মূলত একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। ফনদের ভদু দেবতা থেকেই ভুডু ধর্মের বিকাশ মনে করা হলেও। বর্তমানে ভুডু বলতে হাইতির জাদু বিদ্যাকেই বোঝায়। সম্ভবত এই বিদ্যা হাইতেতে ১৭১৯-৩১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিকাশ লাভ করে।

ভুডু অনুসারীদের অনেক দেবতা। রোগ মুক্তির দেবতা ফ্লিমানি কোকু, হলো, বিদ্যুৎ-ব্রজের দেবতা হেভিও সো এবং সম্পদের দেবী মেমি ওয়াটা ইত্যাদি। দেবতাদের প্রতি তাদের অঘাত বিশ্বাস। তারা মনে করে, দেবতা সহায় হলে তাদের কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। দেবতারা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করে। প্রত্যেক কাজেই তারা আগে দেবতার নাম স্মরণ করে কাজ শুরু করে। দেবতাদের ভক্তি দিয়ে তবেই তারা বাইরে বের হয়।

দেবতার নামে ভুডুর অপর নাম বনডাই লোয়া। লোয়া অর্থ আত্মা। হাইতিতে ভুডু, ব্রাজিলে ক্যানডোমবল, জ্যামাইকাতে ওবিয়াহ নামে পরিচিত। অফ্রিকায় বিশেষ করে ঘানার ককুজান আদিবাসীদের মধ্যে এর চর্চা সবচেয়ে বেশি। বর্তমান সময়েও তারা যে কোনো সমস্যায় ভুডুর সাহায্য নিয়ে থাকে।

ভুডু ডল বা পুতুল দিয়ে এই বিদ্যার প্রয়োগ করা হয়। বলা হয়ে থাকে, ভুডু কলায় সিদ্ধরা অবিশ্বাস্য শক্তির অধিকারী হয়। তারা ইচ্ছা করলে যে কারো ক্ষতি সাধন করতে পারে। তারা মৃতের আত্মাকে জ্যান্ত করে দেহসহ তাদের আজ্ঞাবাহী করে রাখতে পারে এমন কথাও প্রচলিত আছে।

ভুডু বিদ্যার নানা উপকরণ বিশেষ করে তাদের ব্যবহৃত নানা আকার-আকৃতি-বর্ণের পুতুল নিয়ে যুক্তরাষ্টের নিউ অরলিন্স শহরে ভুডু জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।

রোজা

অলৌকিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, আত্মাকে ব্যবহার করে অপরের ক্ষতি করার সংস্কৃতি নতুন নয়। তাই এই বিদ্যার চর্চা প্রায় সকল সময়ই সকল সমাজেই দেখতে পাওয়া যায়। আর এই বিদ্যায় পারদর্শী ছিল রোজারা। তারা মানুষের ক্ষতি করতে নানা কলাকৌশল প্রয়োগ করতো।

আত্মার সন্তুষ্টির জন্য তারা নানা ক্রিয়া করতো। আত্মাকে দিয়েই তারা যাবতীয় কলাকৌশল প্রদর্শন করতো। তবে তাদের মানুষের আকৃতির ছোট্ট পুতুলের গাঁয়ে সুচ বিধিয়ে নির্যাতনের কৌশল ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। তারা তাদের বিচিত্র সাজসজ্জা ও পোশাকের জন্য বিখ্যাত ছিল।

রঙিন পোশাকের উপর বিভিন্ন পশুর চামড়া, মাথায় বিশাল বিশাল পালক, গলায় নানা পশুপাখির হাড়, দেহাবশেষ ঝুলিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে তারা চলাচল করতো বলে জানা যায়। মুখে মুখোশ ধারণ করতো কেউ কেউ। আবার অনেকে মুখে মাখতো বিচিত্র নকশার রং।

তাদের জাদুকরী অঙ্গভঙ্গী, সম্মোহনী চাহনী ও কথা বলার ভঙ্গী, বিচিত্র সংগীত ও নৃত্যে মানুষ তাদের যেমন ভয় পেতো। তেমনি বিশ্বাস করতো তাদের ভালোমন্দ সকল কিছুই রোজাদের উপরই নির্ভর করে।

রোজারা রোগের উপসমের জন্য নানান গাছ-গাছড়া, লতাপাতা ব্যবহারের পাশাপাশি পানির ব্যবহার করতেন। তাদের পাথরসহ পানি ছিটিয়ে দেয়ার রেওয়াজ ছিল বেশ ব্যাতিক্রমী।

শামান

শামান বিদ্যা ভুডুর সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও তাদের দেবতায় বিশ্বাস নেই। তারা শুধু আত্মায় বিশ্বাস রাখে। তাদের কোনো ভগবান বা দেবতাও নেই। তাদের বিশ্বাস, আত্মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকে। শামানরা জাদুবিদ্যায় যেমন পারদর্শী তেমনি রোগের প্রতিকারেও তাদের জুড়ি মেলা ভার।

ভুডু বিদ্যা যেখানে মানুষের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা হয়; উল্টোদিকে শামান বিদ্যা ব্যবহৃত হয় ন্যায়ের পক্ষে। তারা সকল কাজই করে থাকে আত্মাকে ব্যবহার করে। মৃতের আত্মাকে বশ করার নানা কৌশল তাদের নথদর্পনে।

আত্মাদের মাধ্যমেই শামানরা সকলকিছু গণনা করে ভবিষ্যৎবাণী করে থাকে। তাদের সকল ক্রিয়াকলাপই আত্মাদের ঘিরে। তাদের কাছ থেকেই শামানরা রোগের প্রতিকার, ফলসের ফলন, জমির উর্বরতা সহ সকল তথ্য আগাম জেনে ভবিষ্যত বাণী করে থাকে।

মৃতের আত্মার কাছ থেকে জ্ঞান সংগ্রহ করে তারা। শামানরা আত্মার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে স্বাস্থ্য, খাদ্য, উর্বরতা বিষয়ক সব সমস্যারও সমাধান করে থাকে।

সম্ভবত শামান কথাটি এসেছে সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস ভাষী মেষপালকদের কাছ থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে শামান বিদ্যার কথা ছড়িয়ে পরে। শামানদের আদি বাসভূমি ছিল সাইবেরিয়া। যদিও সোভিয়েতদের অত্যাচারে শামানরা নিজ বাসভূমি সাইবেরিয়া ত্যাগে বাধ্য হয়।

শামানদের এই বিদ্যা সাইবেরিয়া, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, চিলি, উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এমনকি ভারতেও বিস্তৃত হয়েছে।

সোরা

সোরা আদিবাসীদের মধ্যে আত্মার চর্চা করে থাকে প্রধানত নারীরা। তাদের বিশ্বাসও শামানদের মতোই। তারাও দেবতায় নয় আত্মায় বিশ্বাসী। তবে মৃতের আত্মার সাথে যোগাযোগের ক্রিয়ায় তারা ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে।

এই নারী শামানদের ভূমিতে সমাহিত করা হয়। তাদের বিশ্বাস এতে নারী শামানের আত্মা চলে যায় ধারিত্রী এবং স্বর্গের মধ্যবর্তী স্থানে। সেখানে সে মৃত ব্যক্তির সাথে কথা বলে। উৎসাহী মানুষ ভিড় করে সমাধির চারপাশে শামান নারীর মৃতের সাথে আলাপচারিতা শোনে।

সোরারা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রা থেমে যায় না। তারা আশপাশেই অবস্থান করে। চাইলেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। আত্মারা নিজেরাও যোগাযোগে আগ্রহী হয়েই থাকে নতুন এক আদৃশ্য জগতে থেকে।

যদিও বেশিভাগ মানুষ এ সকল ক্রিয়াকলাপকে বুজরুকিই ভাবে। তাদের সাথে দ্বিমত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। শুধু একুটু বলতে চাওয়া যে, আত্মা যে অন্তহীন যাত্রার যাত্রী হতেও পারে সেই প্রশ্নটা জাগলেই হলো। অবশ্য না জাগলেও সমস্যা নেই।

ভারতবর্ষেও সোরা আদিবাসীদের দেখতে পাওয়া যায়। তারাও মৃত আত্মার সাথে যোগাযোগের নানা ক্রিয়াকৌশল করে থাকে। আত্মাতেই তাদের একমাত্র বিশ্বাস। তাদেরও কোনো ভগবান-দেবতা নেই। এরা আত্মাকে বশে এনে বিভিন্ন কাজ আদায় করে নেয়।

এছাড়া বাঙালা অঞ্চলেও সোরাগোল নামে এক ধরনের চর্চা দেখা যায়। তারা সাধারণ অনাবৃষ্টি হলে দল নিয়ে বের হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে বাদ্য বাজিয়ে নেচে গেয়ে তারা বৃষ্টির কামনা করে। তারাও আত্মার চর্চা করে বলে কথিত আছে। তাবে প্রকাশ্যে তারা তা স্বীকার করে না।

বৃষ্টি কামনার তন্ত্র-মন্ত্র ছাড়াও তারা নানা তুকতাক, ঝাড়ফুক, চিকিৎসা, তাবিজ-কবজ দিয়ে থাকে।

কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও অশরীরীর সাথে যোগাযোগের কিছু পদ্ধতির সামান্য ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হলো। আসলে মানবদেহের বাইরেও একটা অশরীরী অস্তিত্বের কথা মানুষ যুগে যুগে বিশ্বাস করে আসছে এবং তার সাথে যোগাযোগের নানা পদ্ধতি আবিস্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছে সেটা নিয়েই এই আলোচনা।

জন্মান্তর বুঝতে গেলে আত্মা’র যে দেহের বাইরেও অবস্থান থাকবার সম্ভবনা থাকতে পারে সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন জাগা আবশ্যক। আর তার জন্যই এতো আয়োজন।

যদিও বেশিভাগ মানুষ এ সকল ক্রিয়াকলাপকে বুজরুকিই ভাবে। তাদের সাথে দ্বিমত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। শুধু একুটু বলতে চাওয়া যে, আত্মা যে অন্তহীন যাত্রার যাত্রী হতেও পারে সেই প্রশ্নটা জাগলেই হলো। অবশ্য না জাগলেও সমস্যা নেই।

কারণ এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো কিছু প্রমাণ করা নয়। কারো বিশ্বাসে আঘাত দেওয়াও নয়। কেবল জানা বিষয়গুলো স্মরণ করে নেয়া এবং মিলিয়ে দেখা।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………………………..
সূত্র:
বাংলাপিডিয়া
উইকিপিডিয়া

…………………………………..
আরো পড়ুন:
চুরাশির ফেরে: এক
চুরাশির ফেরে: দুই
চুরাশির ফেরে: তিন : আত্মা-১
চুরাশির ফেরে: চার: আত্মা-২
চুরাশির ফেরে: পাঁচ : সৎকার
চুরাশির ফেরে: ছয় : কর্মফল-১
চুরাশির ফেরে: সাত : কর্মফল-২
চুরাশির ফেরে: আট : পরকাল-১
চুরাশির ফেরে: নয় : পরকাল-২

চুরাশির ফেরে: দশ : জাতিস্মর
চুরাশির ফেরে: এগারো : প্ল্যানচেট
চুরাশির ফেরে: বারো : ওউজা বোর্ড
চুরাশির ফেরে: তেরো : প্রেতযোগ
চুরাশির ফেরে: চৌদ্দ : কালাজাদু
চুরাশির ফেরে: পনের: গুপ্তসংঘ–১

চুরাশির ফেরে: ষোল: গুপ্তসংঘ–২
চুরাশির ফেরে: সতের: ইলুমিনাতি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!