সূফীবাদের গোড়ার কথা সুফি সাধক রুমি

সূফীবাদের গোড়ার কথা: সাত

-কাজী দীন মুহম্মদ

আপাত: দৃষ্টিতে এ নতুন ভাবাধারায় চিন্তায় ধ্যানে আচারে আচরণে যখন শরিয়ত ও বিচিত্র বিকাশ প্রকট হয়ে উঠল, তখন শরিয়তপন্থীদের পক্ষে তা আরো অগ্রহণোপযোগী মনে হলো।

সুফি দর্শন ও চেতনায় পরোক্ষে এবং প্রত্যক্ষে গ্রীক ইরাণীয় মিশরীয় এমন কি ভারতীয় চিন্তা ও দার্শনিকতার প্রভাব একে কঠোর শরিয়ত পন্থা থেকে সরিয়ে অনেকখানি দূরে দুর্বোধ্য অথচ সহজ মারিফাত পন্থায় নিয়ে এসেছিল।

সহজ ও সরলবুদ্ধি মানুষের পক্ষে, কর্মী বাস্তবপন্থী মানুষের পক্ষে সরল সহজ পথের নির্দেশ গ্রহণ এবং ধর্মভীরু কর্তব্যপরায়ণ জনহিতৈষী ও আচারনিষ্ঠ সৎলোক তৈরি হওয়ার জন্য শরিয়ত এক অতি উত্তম পন্থা, সন্দেহ নাই। কিন্তু এর মধ্যে চিত্তকে অন্তর্মুখী করার, আত্মাকে অনুভূতির রংগে অনুরঞ্জিত করার ও বাবনার রসে অনুসিঞ্চিত করার কোনো বিধান আছে বলে আপাত: দৃষ্টিতে চোখে পড়ে না। হজরত মুসা ও হজরত ইসার প্রচারিত ধর্মেও অনুরূপ ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়।

তৌরাত বা Old Testament, ধর্মশাস্ত্র থোরাহ, মুসার পাঁচ কেতাব, ঐতিহাসিক ও বাববাগিদের রচিত ২১ খানি গ্রন্থ নেভীইম, প্রার্থনা স্তোত্র উপাখ্যান ইতিহাস ও ভবিষ্যদ্বাণী কেথুভিন- এসবের সমন্বিত রূপ।

তৌরাত ও তৌরাতপন্থীদের ব্যবহার এবং তামলুদগ্রন্থ বা তৌরাত ব্যাখ্যা শাস্ত্র ইত্যাদিতে বিধৃত জীবনধারা ও ইঞ্জিল বা New Testament-এ বিধৃত জীবন ব্যবস্থায় বেশ পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলাম এ দু-ধারাকে অস্বীকার করলো না। বরং এগুলোকেও ‘কেতাব’ বা ঐশী গ্রন্থ বলে গ্রহণ করে ইহুদী ও খৃস্টানদের জীবন-পদ্ধিতিকে সংশোধিক করে গ্রহণ করে তার নবতর রূপ দান করতে চেষ্টা করল।

এ দুটো গ্রন্থেই বিধৃত জীবন-পদ্ধতি কঠোর বহিরাচরণে সীমিত। ইসলাম এ সীমাকে অনেকখানি শিথিল করে প্রসারিত ও উদার করে দিয়ে জীবনের নব রূপায়ণের প্রয়াস পেল। তবে মূলত: এক আল্লাহরই স্বীকৃতি ও এবাদত এসব জীবন পদ্ধতির মূল বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে এর মধ্যে প্রক্ষেপ প্রবেশের সুযোগ পায়।

তারই ফলে, সংস্করণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ইসলাম সব পরিবর্তন ও সংস্করণ রহিত করে দিল। আর নতুন কোন ধর্মের প্রয়োজন রইল না। তাই নতুন ভাবধারা বাহ্যিক আচার ও নবতর রূপে ইসলামভিত্তিক বিশ্বাসে সুফি মতবাদের অণুপ্রবেশকে শরিয়তপন্থী মুসলিম সুনজরে দেখতে ভাবধারা গ্রহণ নয়।

তাই যখন অন্তরঙ্গ ও গভীর খোদা-প্রীতি, সৃষ্টি ও স্রস্টার অভেদত্ব ও সঙ্গে সঙ্গে পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মা বা আল্লাহর সঙ্গে বান্দার প্রেমের সম্বন্ধ, আল্লাহকে প্রেমিকা ও মানবাত্মাকে প্রেমিক বা প্রেমাসম্পদরূপে বর্ণনা, এরূপ বোধ কল্পনা ধ্যান-ধারণা সাধনা ও আরাধনা নিয়ে যখন ইরানে নবম-দশম শতাব্দীর দিকে সুফি সাধনার চরম বিকাশ ঘটল, ধর্মসাধনার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সৃষ্টি হলো তখন শরিয়তবাদী তাকে উগ্রতা মনে করে অতি-ভাববাদিতা বেশ রায়ী বলে আখ্যা দিলেন এবং তথাকথিত শরিয়তহীন সুফিবাদকে বরদাশত করতে চাইলেন না।

যা হোক, বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের একটি অন্তরঙ্গ সাধনার একটি লক্ষণীয় পথ হিসেবে তসাউওফ এদেশেও আসে। সুফি-পীর দরবেশরা দেশের নানা স্থানে খানকাহ্ বা আশ্রম তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন ও ইসলাম প্রচার করেন। এর ফলে স্বেচ্ছায় বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করে।

প্রকৃত প্রস্তাবে এর মূল শিকড় হজরতের কাল থেকে থাকলেও এর প্রসারিত ও বিস্তৃত ও কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত রূপ ধর্মসাধনার ইতিহাসে এক আলোড়ণের সৃষ্টি করল। আগেই উল্লেক করেছি, এ মতবাদ গঠনে ও ক্রমবিকাশে নানা জাতির উপাদান আহূত ও সঞ্চিত হয়ে এতে প্রভাব বিস্তার করেছিল।

আরবীয় তথা সেমেটিক বিশ্বাস ও ইসরামী সংস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে তার সংস্কৃত ভাবধারা, গ্রীক দার্শনিক আফলাতুন ও তার অনুবর্তী নব্য প্ল্যাতোনিক দার্শনিকদের ঐশ্বরিক সভ্য ও কার্য বিষয়ে চিন্তা ও বিচার, ইরানের জয়থুস্ত্রীয়বাদের নিষ্ঠা ও তৎসম্বন্ধে আকাঙ্খা, সত্যান্বেষণ ও নৈতিকক একাগ্রতা, মধ্য যুগের ইরানী সভ্যতার নাগরিকতা, ভাবকতা, সৌন্দর্য-প্রীতি ও রোমান্সবাদ সবকিছু মিশে এক মনোমুগ্ধকর অন্তরের আবেগময় অতীন্দ্রিয় কল্পলোকের সৃষ্টি করলো। ইসলাম-আশ্রিত এ ভাবাবেগের মধ্যে সুফিদের এ কল্পলোকের বিকাশ বিশ্বমানবের পক্ষে সাগ্রহে গ্রহণ যোগ্য হয়েছিল।

সুফি দর্শন ও অনুভূতির দ্বারা আরবদের মধ্য থেকে আরম্ভ হয়ে বিস্তার লাভ করেছিল বলে এর প্রথম দিককার ইতিহাসের খোঁজ আরবীয় সাধকদের মধ্যেই পাওয়া যাবে। বিভিন্ন ভাবধারায় সঞ্জীবিত সুফি মতের দুইজন প্রধান আরবীয় সাধক ও ইমাম শরফুদ্দীন এবনুল ফরীদ ও মুহীউদ্দীন মুহম্মদ বিন আলী ইবনে আরাবী দ্বাদশ শতকে বর্তমান ছিলেন।

কিন্তু ইরানেই সুফি সাধনার উৎকর্ষ ঘটে। শ্রেষ্ঠ কবি দার্শনিক চিন্তাশীল ও দীক্ষদাতা ইরানেই জন্মগ্রহণ করেন। সেইজন্য অনেকের ধারণা, সুফিবাদ ইরানেই বিশেষ ধর্মধারী, ইসলামে প্রক্ষিপ্ত ভাবাধারা অনুযায়ী সৃষ্ট ভাবধারায় উজ্জীবিত সুফি-সাধক আবু ইয়াজিদ বিস্তামী, জুনায়দ বাগদাদী, হুসায়ন বিন মনসুর আল-হাল্লাজ, সুফি কবি ও দার্শনিক আবু শাঈদ ইবন আবী-ল খয়র, আবুল মজদ মজদুদ সানাই, ফরীদুদ্দীন আত্তার, জালালুদ্দীন রুমি, এবং তার গুরু শামস-ই তাব্রিজী, দার্শনিক আবু হামিদ মুহম্মদ আল-গাজ্জালী, মুহম্মদ শামসুদ্দীন হাফিজ, নূরুদ্দীন আবদুর রহমান জামী, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসী, সাদী -এরা সকলেই ইরানী ছিলেন।

যা হোক, বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের একটি অন্তরঙ্গ সাধনার একটি লক্ষণীয় পথ হিসেবে তসাউওফ এদেশেও আসে। সুফি-পীর দরবেশরা দেশের নানা স্থানে খানকাহ্ বা আশ্রম তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন ও ইসলাম প্রচার করেন। এর ফলে স্বেচ্ছায় বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করে।

এ সুযোগে উপমহাদেশীয় ধর্মীয় চিন্তা ও সাধনায়, আধ্যাত্মিক জীবনে ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রকাশক কাব্য সাহিত্যেও সুফিবাদ প্রভাব বিস্তার করে। উপমহাদেশের মধ্যযুগের ভক্তিমূলক সাধনায, সমার্গীয় বৈরাগী ও সাধুদের চিন্তায় গৌড়ীয় মতের বৈষ্ণব প্রমুখ প্রেমাশ্রয়ী ধর্ম সম্প্রদায়ে ও সাহিত্যে সুফি অনুভূতির প্রভাব ও সুফি সাহিত্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পরবর্তী বাংলা-পাক-ভারতীয় সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন সাধনে সহায়ক হয়েছিল।

(চলবে…)

………………………..
আরো পড়ুন:
সূফীবাদের গোড়ার কথা: এক
সূফীবাদের গোড়ার কথা: দুই
সূফীবাদের গোড়ার কথা: তিন
সূফীবাদের গোড়ার কথা: চার
সূফীবাদের গোড়ার কথা: পাঁচ
সূফীবাদের গোড়ার কথা: ছয়
সূফীবাদের গোড়ার কথা: সাত
সূফীবাদের গোড়ার কথা: আট

সূফীবাদের গোড়ার কথা: নয়

…….
১. Maxmuller, Indian Philosophy, page 895
২. ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহি- আল কোরান।
৩. ওয়া ইজা আরাদা শাইয়ান আঁইয়াকুলা-লাহু কুন ফাইয়াকুন- আল কোরান।
৪. রবীন্দ্রনাথ।
৫. lower self এবং higher self কথাগুলো পাশ্চাত্য দর্শনের। আমাদের বিবেচনায় এ দুটোও প্রমাদপূর্ণ। কারণ self, self-ই। এর lower এবং higher নাই। যা আছে তা aspect এর বিভিন্নতা।
৬. আল-হাদিস
৭. আল কোরান।
৮. আনাল হক: আমিই সত্য; অহং ব্রহ্মাষ্মি : আমিই ব্রহ্ম; সো অহং : সেই আমি, আমিই সে।
৯. যুগে যুগে সম্ভবামি: গীতা।
১০. ইনি ৮৩০ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
১১. ইনি ৮৬০ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!