সূফীবাদের গোড়ার কথা সুফি সাধক রুমি

সূফীবাদের গোড়ার কথা: আট

-কাজী দীন মুহম্মদ

হজরত রসুলে করীমের (সা) পরে বেশ কিছুকাল পর্যন্ত রাজ্য জয় ও ইসলাম প্রচারে কেটে গেল। তখন তাদের মধ্যে গভীর রহস্যবাদের বা গভীর চিন্তার সূক্ষ্ম বিচারে সময় খুব কম। ইসলামের ব্যবহারিক ও শরিয়তের দিকটিই তখন প্রকট হয়েছিল বেশি। কিন্তু তাই বলে সংসারত্যাগী দু’চারজন আল্লাহ্ ভক্ত ভাবুকের যে জন্ম হয়নি তা নয়।

প্রথম দিকে এরা বান্দা ও স্রষ্টার সম্পর্ক স্থাপন করেছিল প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কের মতো। সুফিমতের প্রেমের সম্বন্ধ আরো অনেক পরের। এদর সাধনার প্রধান অঙ্গ ছিল আত্মদমন, আত্ম-সংযম, শাস্ত্রনুবর্তিতা, শান্তিপ্রিয়তা, একান্তে বসে সাধনা, জপতপ, আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন, এবং ব্যর্থ আচার-নিষ্ঠতার বর্জন ইত্যাদি।

এদের মধ্যে খৃস্টীয় অষ্টম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আবু হাশিত শামী-ই সর্বপ্রথম সুফি নামে অভিহিত হন। পরে এর অর্থ আরো ব্যাপক হয়। ‘সুফি’ শব্দের অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। কিন্তু ‘পশম’, ‘পশমী কাপড়’ এবং পরে ‘পশমী কাপড়ধারী’ ওলী দরবেশ ভাবুক আল্লাহ্-প্রেমিককেই বোঝান হয়েছে।

শীতাতপ নিবারণ করার জন্য প্রথমে ধারণ করলেও পরবর্তীকালে ‘পশমী’ কাপড়, কম্বল বা আলখাল্লা সুফিদের নিজস্ব আবরণ ও আভরণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে লক্ষণ সেনের সভায়, যে ‘শেক’-এর আগমন কথা উল্লেখ ‘শেক শুভোদয়া’ গ্রন্থে দেখা যায়, তিনিও এ দরনের সুফিই ছিলেন।

একে ‘এনাম্বর ধর: শূর: শিরোবেষ্টন তৎপর:’ বলা হয়েছে। সুফিবাদ, সুফিইজমকে আরবীতে ‘তসাউওফ’ বলা হয়। এ থেকে দিব্যজ্ঞান, বিদ্যানুভূতি, আল্লাহ্ তত্ত্ব এসব অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

ইসলামের প্রথম পর্যায়ে খৃস্টীয় নবম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ পনের জন সুফি সাধকের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এ সময়েই তাপস রাবেয়া জীবিত ছিলেন। তিনি নবম শতকের প্রারম্ভে দেহত্যাগ করেন। ইনিই সুফিদের মধ্যে প্রথম প্রেম-ভক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

ফলাফল বা বেহেশত দোজখ নিরপেক্ষ প্রতিপালক প্রভুতে অনুরক্তিই এ সাধানার মূল কথা। এ সময়েই কয়েকজন ইরানী সুফির আবির্ভাব ঘটে। এখন থেকেই সুফি সাধনায় ইরাণীদেরও আবির্ভাব ও প্রতিষ্ঠা শুরু হয়।

সুফি মতবাদের দ্বিতীয় যুগের আরম্ভ হয় খ্রীস্ট্রীয় নবম শতকের শেষ অর্ধেক থেকে দশম শতকের প্রথম অর্ধেক পর্যন্ত। এ সময়ে আবু ইয়াজিদ বিস্তামী ও জুনায়দ বাগদাদী নামক দু’জন ইরাণী সুফি ইমামের অনুভূতিতেও শিক্ষায় সর্বপ্রথম সর্বভূতে আল্লাহর অধিষ্ঠান ‘অহং ব্রাহ্মাষ্মি’ বাদের প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠা হয়।

ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে সুফিবাদের সাধনায় এই প্রথম ‘আনাল হক’ : ‘আমি সত্য’ প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হতে থাকে। এ মাহবাক্য পরে হুসায়ন বিন মনসুর আল-হাল্লাজের মুখে প্রচারিত হয়ে শরিয়তপন্থীদের বিরাগের কারণ হয়ে দাড়ায় এবং এজন্য মনসুর আল-হাল্লাজের প্রাণ-দণ্ডাদেশ হয়।

আল্লাহর নিরানব্বইটি নামের মধ্যে ‘হক’ একটি। ইরানের দার্শনিক ও সুফিদের কাছে এ ‘হক’ নাম আল্লাহ নামের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে। ‘হক’ মানে সত্য ; আমি সত্য আমার আত্মা সত্য, আত্মার মূল নূরে মুহম্মদী সত্য, আল্লাহ্ সত্য, সত্য ছাড়া মিথ্যা নাই। এ ধারণা থেকেই ‘সত্য’ শব্দটি খুদা শব্দের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, ফারসিতে ‘খোদা’-খোদ (স্বয়ং)+আ(আসিয়াছেন), মানে সংস্কৃত শাস্ত্রে যাকে স্বয়ম্ভু বলা হয় তাই।

প্রথম যুগের সুফিরা কতকগুলো নতুন ধারণা নিয়ে এলেন। বাগদাদের সুফি মারুফ আল-করথী একজন মস্তান বা দিব্যোন্মাদ সাধক পুরুষ ছিলেন। ইনি নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে ৯১৫ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। ইনি ইরানী বংশোদ্ভূত আরবী ভাষাভাষী পণ্ডিত ছিলেন।

‘হক’ শব্দের অত্যধিক প্রয়োগ ইরানী সুফিদের মধ্যে যে লক্ষ্য করা যায় এর কারণ আছে। স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আগে ইরাণীদের মধ্যে যে জয়থুস্ত্রীয় ধর্ম প্রচলিত ছিল তার উৎস দ্বৈতবাদমূলক। দুনিয়ায় নেক ও পাপ, সত্য ও মিথ্যা, আহুরমজদা ও আহরিমান- এদের দ্বন্দ্ব সব সময়ই লেগে রয়েছে।

মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তার কর্তব্য সজ্ঞঅনে সত্যের জন্য, নেকের জন্য আহুরমজদের পক্ষ নিয়ে, মিথ্যা ও পাপের বিরুদ্ধে, আহরিমানের বিরুদ্ধে লড়াই করা। নেকী-বাদীর যুদ্ধে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে মানুষ মাত্রই সত্যের সৈনিক।

পরবর্তীকালে ইসলাম এলে তার মধ্যেও এ দ্বৈতভাবের আবিষ্কার কিছুমাত্র আয়াসসাধ্য কাজ বলে বিবেচিত হয় নাই। কোরানেও আল্লাহর পথের বিরোধী শক্তিকে ইবলিস বা শয়তানকে বেশ ক্ষমতার অধিকারী বলে উল্লেখিত হয়েছে।

শয়তান চিরকাল মানুষকে বিপথে নিতে চেষ্টা করবে, কুপথ বিপথ মনোরম বলে দেখাবে আর মানুষ সজ্ঞানে তার বিরোধিতা করে আল্লাহর পথে চলতে চেষ্টা করবে। এ দ্বন্দ্বই জীবন সংগ্রাম।

অতএব ইসলাম আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আহুরমজদ ও আল্লাহ এবং আহরিমান ও শয়তান এক না হলেও ধারণার দিক থেকে এদের বিরুদ্ধবাদিতা স্বীকার করে নেওয়া হল। সুতরাং ‘আল্লাহর’ ‘হুকুক’ বা সত্যতা ‘হক’ শব্দে ‘বাতিল’ অনর্থ শব্দের প্রতি বিরোধী ধারণা প্রকট হল।

প্রথম যুগের সুফিরা কতকগুলো নতুন ধারণা নিয়ে এলেন। বাগদাদের সুফি মারুফ আল-করথী একজন মস্তান বা দিব্যোন্মাদ সাধক পুরুষ ছিলেন। ইনি নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে ৯১৫ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। ইনি ইরানী বংশোদ্ভূত আরবী ভাষাভাষী পণ্ডিত ছিলেন।

তিনি তপস্যা ও কৃচ্ছ্র সাধন অপেক্ষা অনুভূতির দিকে বেশি নজর দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ভক্তিই মুক্তির পথ, কিন্তু তা মানুষের সাধানায় মিলে না, তা আল্লাহর দান, তিনি যাকে করুণা করেন তাকে দান করেন। উপনিষদেও অনুরূপ বাণী রয়েছে- নায়মাত্মা প্রবচনে লভ্যো, ন মেধয়া, ন বহুনা শ্রুতেন; যমেবৈধবৃনুতে তেল লভ্যস্তশ্যেষ আত্মা বিবৃনুতে তনুং স্বাম্।

(চলবে…)

………………………..
আরো পড়ুন:
সূফীবাদের গোড়ার কথা: এক
সূফীবাদের গোড়ার কথা: দুই
সূফীবাদের গোড়ার কথা: তিন
সূফীবাদের গোড়ার কথা: চার
সূফীবাদের গোড়ার কথা: পাঁচ
সূফীবাদের গোড়ার কথা: ছয়
সূফীবাদের গোড়ার কথা: সাত
সূফীবাদের গোড়ার কথা: আট

সূফীবাদের গোড়ার কথা: নয়

…….
১. Maxmuller, Indian Philosophy, page 895
২. ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহি- আল কোরান।
৩. ওয়া ইজা আরাদা শাইয়ান আঁইয়াকুলা-লাহু কুন ফাইয়াকুন- আল কোরান।
৪. রবীন্দ্রনাথ।
৫. lower self এবং higher self কথাগুলো পাশ্চাত্য দর্শনের। আমাদের বিবেচনায় এ দুটোও প্রমাদপূর্ণ। কারণ self, self-ই। এর lower এবং higher নাই। যা আছে তা aspect এর বিভিন্নতা।
৬. আল-হাদিস
৭. আল কোরান।
৮. আনাল হক: আমিই সত্য; অহং ব্রহ্মাষ্মি : আমিই ব্রহ্ম; সো অহং : সেই আমি, আমিই সে।
৯. যুগে যুগে সম্ভবামি: গীতা।
১০. ইনি ৮৩০ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
১১. ইনি ৮৬০ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!