রূপের রহস্য ইন্দ্রিয়

রূপের রহস্য: অষ্টম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: রূপ : রূপের রহস্য: অষ্টম পর্ব

রূপের রহস্য জগতে পণ্যের সাথে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনের নারীর রূপ-যৌবনকে বিজ্ঞাপন দাতারা বাণিজ্যিক স্বার্থে যুগে যুগে ব্যবহার করে আসছে। আর যেখানে প্রয়োজন আছে সেখানে তো কথাই নেই। রূপের বাণিজ্যিক ব্যবহারের ইতিকথা সকলেই জানা। সকলে এই মতকে সমর্থন না করলেও এর চাহিদা আকাশচুম্বী।

আর এই রূপের বাণিজ্য করতে গিয়ে নারীকে প্রায় সকল সময়ই করা হয়েছে পণ্য, এমনটা অনেক সচেতন মহল বলে থাকে। কিন্তু গ্ল্যামার ওর্য়াল্ড সেসব কথা বিশেষ আমলে নেয় না। তারা রূপকে আরো কত প্রকারে কিভাবে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করা যায় তার নব নব প্রথা-পদ্ধতি বির্নিমাণ করেই যায়।

তবে সাধুগুরু বলে, যে ভেতর থেকে শুদ্ধ নয় সে বহিরাবণে যাই করুক না কেনো। সে প্রকৃত রূপবান হতে পারে না। চিত্তের শুদ্ধতাই প্রকৃত সৌন্দর্য। সৌন্দর্য বহিরাবরণ বা গঠনে বা আকার-আকৃতিতে নয়; সৌন্দর্য থাকে মনে। অর্থাৎ অভ্যন্তরে। তাই বলা হয়- ‘নামে নয় গুনে পরিচয়’ বা ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’।

তাই ইন্দ্রিয় ‘রূপ’ প্রকৃত অর্থে কোথায় বিরাজ করে চোখে নাকি দৃষ্টিতে? নাকি দৃশ্যে? নাকি দ্রষ্টা রূপে? তা নির্ণয় করা কিন্তু সাধারণের কর্ম নয়। ফকির লালন সাঁইজি আক্ষেপ করে বলেছেন-

বাড়ির কাছে আরশি নগর।
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে।।

গেরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে,
মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।

কি বলবো সেই পড়শির কথা
তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা নাইরে,
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেতো দূরে,
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।।

কোরিয়ান পরিচালক কিম কি দুকের একটা চলচ্চিত্র দেখে আমি বারবার নতুন রূপে মুগ্ধ হই। চলচ্চিত্রটার নাম ‘স্প্রিং, সামার, ফল, উইনটার… অ্যান্ড স্প্রিং’।

যত বার দেখি তত বার এর মাঝে আরো গভীর তত্ত্ব খুঁজে পাই। একটা হ্রদের মাঝে চারটি ঋতুর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের দর্শনকে এতো সহজভাবে আগে কোনো চলচ্চিত্রে চিত্রিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

চলচ্চিত্র শিল্প যে একটা দেখবার শিল্প মাধ্যম তার সার্থক প্রয়োগ কিম কি দুকের ‘স্প্রিং, সামার, ফল, উইনটার… অ্যান্ড স্প্রিং’ চলচ্চিত্রটি। এরকম হয়তো অনেক সার্থক চলচ্চিত্রই আছে। তবে আমার কাছে বারবার এ উদাহরণটিই ফিরে ফিরে আসে।

এই চলচ্চিত্রির প্রতিটি দৃশ্যের, প্রতিটা ফ্রেমের, প্রতিটা চরিত্রের, প্রতিটা রঙের, প্রতিটা নড়াচড়ারও একটা ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থ আছে। যার সম্পূর্ণটাই সেলুলয়েডে কিম বন্দি করেছেন শব্দহীন ভাবে। আসলে এই চলচ্চিত্রের ভাষা এতো দৃশ্যমান যে দেখতে দেখতে কখনো মনেই হবে না এতে সংলাপ নেই।

বা এতে সংলাপের কোনো প্রয়োজন আছে বলেও মনে হবে না। রূপ সম্পর্কে আলোচনার জন্য অনেক অনেক চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গই টানা যেত। কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি বেছে নেয়ার অন্যতম কারণ হলো। এর শক্তিশালী দৃশ্যায়ন। যা দেখবার শক্তিকে বহুগুণে গুণান্বিত করে তোলে।

এই হাওয়া বদলের সাথে জলবায়ুর পরিবর্তন যেমন বিশাল ভূমিকা রাখে পাশাপাশি দৃশ্যে নির্মলতাও ততধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দৃশ্যের মায়াজালে মানুষ জড়িয়ে ভুলে যায় মনে পুষে রাখা ক্ষোভ-ঘৃণা-অস্থিরতা। সর্বপরি অসুস্থ চিন্তা থেকে সরে আসতে পারে। দৃশ্য মানুষকে অনেক সময়ই গিলে খায়।

তারপরও ঘুরে ফিরে আগের কথার পুনরাবৃত্তি করতে হয় যে, কার যে কোন দৃশ্য ককন ভালো লাগবে সেটা বলা কঠিন। কেউ হয়তো ভূত বিশ্বাস করে না, কিন্তু ভূতের চলচ্চিত্র দেখে ভয় পেতে ভালোবাসে। কেউ হয়তো প্রচণ্ড মারামারি, ধ্বংসলীলা, রোমহর্ষক দৃশ্য দেখে পুলকিত হয়।

কেউ বা প্রেমের দৃশ্য পছন্দ করে। আবার কেউ বা কেবলই বিনোদন খোঁজে। এভাবে বিষয়ের যেমন শেষ নেই। তেমনি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মনস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভালো লাগারও শেষ নেই। আবার সব দৃশ্য সকলে সহ্য করতে পারে না। যেমন নৃশংস দৃশ্য কেউ কেউ অবলীলায় দেখতে পারলেও অনেকেরই তা সহ্যের বাইরে।

আবার অধিক সৌন্দর্যও অনেক সময় বেশি সময় দেখা যায় না। যেমন মানুষ মুগ্ধ হয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে নেয়। আদতে চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যের মূল স্বাদ গ্রহণ করতে চায়। আবার কখনো কখনো এমন দৃশ্য চোখের সামনে চলে আসে যা দেখে মানুষ অসুস্থ হয়ে পরে।

আবার এমন দৃশ্যেরও অবতারণা হয় যা দেখে অসুস্থ মানুষও সুস্থ হয়ে উঠে। চিকিৎসকরাও বলেন, ‘কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বইরে বেড়িয়ে আসুন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে’। কেউ আবার একে বলে ‘হাওয়া বদল’।

এই হাওয়া বদলের সাথে জলবায়ুর পরিবর্তন যেমন বিশাল ভূমিকা রাখে পাশাপাশি দৃশ্যে নির্মলতাও ততধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দৃশ্যের মায়াজালে মানুষ জড়িয়ে ভুলে যায় মনে পুষে রাখা ক্ষোভ-ঘৃণা-অস্থিরতা। সর্বপরি অসুস্থ চিন্তা থেকে সরে আসতে পারে। দৃশ্য মানুষকে অনেক সময়ই গিলে খায়।

তাই গাড়ি টানা প্রাণীদের অনেক সময় চোখের বাইরের দিকটা আবদ্ধ করে দেয়া হয়। যাতে সে কেবল সামনের দিকে দেখে এগিয়ে যায়। আশপাশে মনোযোগ না দিতে পারে। তেমনি আবার মানুষের সামনে অদৃশ্য এক মূলা ঝুঁলিয়ে তাকে দিয়ে করিয়ে নেয়া হয় নানান কাজ।

এই যে অদৃশ্য মূলা অর্থাৎ যা দেখা যায় না তাও কেউ কেউ দেখতে পায় বিবেচনার সক্ষমতায়। তাই দেখা মানে এই নয় যে চোখ খুললাম দেখলাম আর হয়ে গেলো। দেখতে হলেও সেই একই প্রকৃয়ায় যেতে হয়। যা প্রতিটা ইন্দ্রিয়ই করে থাকে।

অর্থাৎ ই্ন্দ্রিয় কেবল অনুভূতি নেয়। তারপর তা পাঠিয়ে দেয় মনের কাছে। মন তা পাঠায় বুদ্ধির কাছে। আর বুদ্ধি তা সংস্কারের সঞ্চিত ভাণ্ডারের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়। আগের ইন্দ্রিয়ের আলোচনায় এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বলে এখানে আর তা পুনরাবৃত্তি করলাম না।

পণ্য বিক্রেতারা তার সৌন্দর্যচর্চার উপকরণের কাটতি বাড়তে বিজ্ঞাপনের ভাষায় ব্যবহার করে ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র’। আবার সচেতন সমাজ এই কথার বিরোধীতা করে বলে সকলের অধিকারই সমান। কিন্তু শত কথার পরও সুন্দর যে একটা বিশেষ মর্যাদা পায় সর্বত্র তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

দেখবার বিষয়টাই এমন। এটা সহজ কোনো ইন্দ্রিয় নয়। বেশ জটিল এক ইন্দ্রিয় এই রূপ দর্শন। কথায় বলে, বটগাছকে পুরোটা দেখতে হলে অনেক দূর থেকে দেখতে হয়, এর তলায় বসে এর ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। তেমনি আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনার যে রূপ আপনি দেখে নিশ্চিত হচ্ছেন।

যদিও অনেকে নাকে রুমাল চেপে ভীড় করে নদর্মা পরিস্কারের দৃশ্য দেখেও আনন্দ পায়। আবার একই ঘটনার বিভিন্ন খণ্ডিত রূপ দেখে দৃষ্টি আমাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়। তার কোনটা সঠিক বা কোনটা ভুল সেটা ভিন্ন আলোচনা। তবে বিষয়টা বলতে গলে একটা খুব সামাজিক গল্প বলা যেতে পারে।

ধরুন আপনি দেখলেন কোন একজন লোক সকলের অগোচরে কিছু একটা লুকিয়ে নিয়ে নিচ্ছে। চোখের দেখায় আপনি প্রথমেই তাকে চোর ভেবে নিলেন। যথারীতি আপনার চিৎকার চেচামিচিতে সকলে জড়ো হয়ে তার কোনো কথা না শুনে গণপিটুনি দিতে লাগলো।

আপনিও হয়তো দৃশ্যে মিশে গিয়ে দু’চার ঘা দিলেন। চোরের শাস্তি হয়েছে ভেবে আনন্দে আপনার চোখ ঝলমল করে উঠলো। কিন্তু গণপিটুনিতে মৃত লোকটার পাশে ছোট্ট বাচ্চাটা যখন বাবা বাবা বলে ডাকছে তখন আপনি নতুন একটা দৃশ্যে প্রবেশ করলেন। আপনার পূর্বের দেখার অভিজ্ঞতা পাল্টাতে শুরু করবে।

আবার যদি জানতে পারেন লোকটা মোটেও চোর ছিল না। শিশুটির ঘুম যাতে না ভাঙে তাই চোরের ভঙ্গিতে নিজের জিনিসই নিচ্ছিলেন। তখন কিন্তু আর দেখা পুরো অভিজ্ঞতাটাই উল্টো হয়ে যাবে। আপনার চোখ ঝলমলের বদলে ছলছল করে উঠবে।

দেখবার বিষয়টাই এমন। এটা সহজ কোনো ইন্দ্রিয় নয়। বেশ জটিল এক ইন্দ্রিয় এই রূপ দর্শন। কথায় বলে, বটগাছকে পুরোটা দেখতে হলে অনেক দূর থেকে দেখতে হয়, এর তলায় বসে এর ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। তেমনি আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনার যে রূপ আপনি দেখে নিশ্চিত হচ্ছেন।

কাল ঘটনার অর্ন্তরালের ঘটনা জানতে পারলে হয়তো আপনার দেখবার বা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টা আর চূড়ান্ত মনে হবে না। আপনার দীর্ঘদিনের পরিচিত কারো সম্পর্কে হয়তো মুর্হূতে এমন কোনো দৃশ্য দেখে সকল বিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে। আবার তার বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে।

আধুনিক বাবা-মায়েরা চায় না তাদের মধ্যে যে সমস্যা তা যে ছোট সন্তানের সমানে প্রদর্শিত হয়। তাই তারা সন্তানের সাথে মেকি একটা সুন্দর সম্পর্ক দৃশ্যায়ন করে। সন্তানও ভাবে বাবা-মায়ের মধুর সম্পর্ক।

কিন্তু কোনোদিন যদি উত্তেজনায় সেই অপ্রীতিকর ঘটনা সন্তানের সামনে ঘটে যায় সন্তান তখন তার পূর্বের চোখে দেখা অভিজ্ঞতাকে আর বিশ্বাস করতে পারে না।

আবার যে বাবা-মা বা পরিবারে বা সমাজের বড়রা সকলের সামনেই তাদের দ্বন্দ্বগুলো প্রকাশ্যে করে তা দেখলেই যে মানুষের দেখবার অভিজ্ঞতা একই থেকে যায় বিষয়টা তেমনও নয়। আসলে বাস্তবের পরেও আরো অনেক ব্যাপার থাকে। এর একটা ব্যাপার তো বেশ জনপ্রিয়। যা পরিচিত পরাবাস্তব নামে।

(চলবে…)

পরবর্তি পর্ব: জ্ঞানেন্দ্রিয়: রূপ : রূপের রহস্য : নবম পর্ব >>

…………………………
আরো পড়ুন:
রূপের রহস্য: পর্ব-১
রূপের রহস্য: পর্ব-২
রূপের রহস্য: পর্ব-৩
রূপের রহস্য: পর্ব-৪
রূপের রহস্য: পর্ব-৫
রূপের রহস্য: পর্ব-৬
রূপের রহস্য: পর্ব-৭
রূপের রহস্য: পর্ব-৮
রূপের রহস্য: পর্ব-৯
রূপের রহস্য: পর্ব-১০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!