রূপের রহস্য ইন্দ্রিয়

রূপের রহস্য: দশম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: রূপ : রূপের রহস্য: দশম পর্ব

‘আইরিশ’ অনেকটা আংটির মত চেখের রঙিন অংশ। ‘পিউপিল’ আইরিশের মাঝের খোলা অংশ যেখান দিয়ে আলো লেন্সে প্রবেশ করে। ‘লেন্স’ রেটিনার উপর আলোক রশ্মি কেন্দ্রীভূতকারী। ‘ভিট্রেয়াস হিউমার’ লেন্সের পিছন থেকে রেটিনা পর্যন্ত জেলির মত থাকা পদার্থ।

‘কোরয়েড’ স্ক্লেরা ও রেটিনার মাঝের রঞ্জিত স্তর। ‘রেটিনা’ চোখের আলোক সংবেদী অংশ। ‘ফোবিয়া’ রেটিনার মাঝামাঝি খাঁজ। ‘অন্ধবিন্দু’ দর্শন স্নায়ুর প্রান্তবিন্দু। ‘দর্শন স্নায়ু’ দ্বিতীয় করোটিক স্নায়ু। এর মাধ্যমে চোখ থেকে আলোকসংবেদ মস্তিষ্কে পৌঁছায়।

এতো গেলো বিজ্ঞানের ভারী ভারী কথা। সে সব ব্যাখ্যা করতে গেলে আরো কথা বলা যায় কিন্তু তা মূল আলোচনার সাথে তেমন সম্পর্কযুক্ত না। তাই আবারো ফিরি দর্শনেন্দ্রিয় প্রসঙ্গে-

ধরুন আপনি ছোটবেলা থেকে তাজমহলের ছবি দেখেছেন। গল্প শুনেছেন। এমনকি প্রচুর ভিডিও দেখে তার সম্পর্কে এক ধরনের ধারণা আগে থেকে তৈরি করে রেখেছেন। যার ভিত্তিতে একটা ভাব আপনার মাঝে পূর্ব থেকেই সৃষ্টি হয়ে আছে।

কিন্তু তাজমহলের সামনে যখন আপনি সত্য সত্য সশরীরে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে দেখবেন। তখন তা হয়তো আপনার পূর্বের সকল অভিজ্ঞতা-অনুভুতিকে ছাপিয়ে অন্য একটা মাত্রায় নিয়ে যাবে।

রূপের রহস্য ভেদ করে আপনি তার আশ্চর্য সুন্দরের হয়তো বিমোহিত হবেন। আবেগে আপ্লুত হবেন। আবার যে লোকটা রোজ ঘুম থেকে উঠে তাজমহল দেখে। বা তাজমহলের খুব কাছাকাছি কোনো বস্তিতে জীবনের সংগ্রামে ব্যস্ত। তার কাছে তাজমহল হয়তো কোনো আবেদনই রাখে না।

তার কাছে তাজমহলও যা পাশের বাড়ির দালানও তা। এর মধ্যে বিশেষ ভেদ নেই। একেই বলা হয়- প্রতিদিন একই জিনিস দেখলে তার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।

একবার এক গ্রামে গিয়ে তাদের দরজার খিল দেয়ার লাঠিটা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। তারা কয়েক পুরুষ ধরে সেই লাঠিখানা তাদের বাড়িতে অবহেলায় পরে আছে। ঘটনাক্রমে তা এখন দরজার খিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অর্থাৎ নিজের অনুসারী বা নিজের রাষ্ট্রের জনগণের জন্য এক নীতি। আবার অনুসারীদের বাইরের মানুষ বা ভিন্ন রাষ্ট্রের জন্য করা হয় ভিন্ন নীতি। এর সহজ উদাহরণ দিয়ে গেলে বলতে হয় পৃথিবীর অঘোষিত শাসক ‘আমেরিকা’র কথা।

একটু ঘষাঘষি করতেই যখন তার অপূর্ব কারুকাজ বেড়িয়ে এলো তখন আমরা বিস্মিত। বোঝাই যাচ্ছিল সেটি কোনো প্রাচীন আসবাবের হাতল জাতীয় কিছু হয়তো ছিল। বহু ব্যবহারে তার অনেক অংশ মিশে গেলেও তার আভিজাত্য ঠিকরে বের হচ্ছিল।

সেটা যে বেশ প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বও রাখতে পারে বলে মনে হচ্ছিল। যদিও এর আগে তারা সেটিকে সেভাবে দেখেনি। তারপর যখন আমাদের মধ্যে কেউ বললো- জিনিসটার বেশ মূল্য হতে পারে। কারণ এটি কাঠ নয় বিশেষ কোনো পাথরের হতে পারে।

তখন সেই বাড়ির মানুষ বাড়ির কোনো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাচ্ছিল না তা গচ্ছিত রাখতে। সারারাত কারো চোখে ঘুম নেই। অথচ যে লাঠি এতো বছর ধরে দরজার খিল হয়ে তাদের ঘুম নিশ্চিন্ত করে আসছিল। সেই লাঠিই তার রূপ পাল্টে তাদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

তাই যা দেখা যায় তাই সত্য তা নাও হতে পারে। আবার ডুবতে ডুবতে যে সত্য পাওয়া গেলো সেটাই যে স্থায়ী সত্য তাও বা কে নিশ্চিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু সত্য প্রতিষ্ঠাই করা হয় মানুষকে ভিন্ন দিকে পরিচালিত করার জন্য।

যে চাঁদের রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি লেখে কবিতা। গায়ক গেয়ে উঠে। সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হয়। সাধুগুরুরা মেতে উঠে সাধনায়। বিক্ষুব্ধ মানুষও মুগ্ধ হয়ে তার রূপে ডুবে যায়। সেই চাঁদের গায়ে আবার কলঙ্ক খোঁজে বিজ্ঞান। অন্যদিকে সেই চাঁদই সুকান্তের কাছে তা ধরা দেয় ‘ঝলসানো রুটি’ রূপে।

পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে এমন সব মত প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে যে, তা দেখতে একরকম আর তার প্রয়োগ অন্য রকম। আবার বহু রাষ্ট্রের দ্বী-মুখি নীতিতে বিশ্বাস করে।

অর্থাৎ নিজের অনুসারী বা নিজের রাষ্ট্রের জনগণের জন্য এক নীতি। আবার অনুসারীদের বাইরের মানুষ বা ভিন্ন রাষ্ট্রের জন্য করা হয় ভিন্ন নীতি। এর সহজ উদাহরণ দিয়ে গেলে বলতে হয় পৃথিবীর অঘোষিত শাসক ‘আমেরিকা’র কথা।

আমেরিকার জনগণ যতবেশি গণতন্ত্র বা নাগরিক অধিকার ভোগ করে রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী। আমেরিকা অন্য রাষ্ট্রের বা অন্য রাষ্ট্রের জনগণের সাথে ঠিক তার বিপরীত আচরণ করছে গণতন্ত্রের নামেই। তাই আমেরিকা রাষ্ট্রের মাঝে যারা বসবাস করে তারা অনেকেই বুঝতেই পারে না, আমেরিকা অন্যদের সাথে কিরূপ আচরণ করছে।

আবার যারা আমেরিকার নানা নিপীড়ন-নির্যাতন ভোগ করছে তারা হয়তো সেই আমেরিকা যে নিজের জনতার জন্য কতটা উদার তা দেখতেই পায় না। কিন্তু দৃষ্টি দিয়ে রূপের গভীরে থাকা গুণ কয়জনায় আর দেখতে পারে। সেই দৃষ্টি খকয়জনে আর আয়ত্ব করতে পারে?

অনেকে বলেন, ‘দেখার মতো চোখ থাকলে নাকি সবই দেখা যায়’। এই দেখার মতো চোখ বা দৃষ্টি বা ইন্দ্রিয় ‘রূপ’ এ নিয়ে লিখা আমার পক্ষে একটা দৃষ্টতাই বলা যেতে পারে। তারপরও যেহেতু লিখে ফেলেইছি তাই শেষে ক্ষমাটুকুও চেয়ে নিচ্ছি।

যে চাঁদের রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি লেখে কবিতা। গায়ক গেয়ে উঠে। সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হয়। সাধুগুরুরা মেতে উঠে সাধনায়। বিক্ষুব্ধ মানুষও মুগ্ধ হয়ে তার রূপে ডুবে যায়। সেই চাঁদের গায়ে আবার কলঙ্ক খোঁজে বিজ্ঞান। অন্যদিকে সেই চাঁদই সুকান্তের কাছে তা ধরা দেয় ‘ঝলসানো রুটি’ রূপে।

রূপের বিষয়টাই তাই কার কাছে সে কোন রূপে প্রকাশিবে তা কেউ বলতে পারে না। আর এই আলোচনাও কোথাও শেষ হবে না।

এই শেষ না হওয়া আলোচনার ইতি টানা বরাবরেই মতোই কঠিন। তাই আবারো দেখার মতো চোখের কথা বলতে বলতে জীবনানন্দেরই সহায়তা নিলাম। জয়গুরু।।

জীবনানন্দ দাশের কবিতা‎ জনান্তিকে-

তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই- তবু,
গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই- তুমি
আজো এই পৃথিবীতে র’য়ে গেছি।
কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ;
বহুদিন থেকে শান্তি নেই।
নীড় নেই
পাখিরো মতন কোনো হৃদয়ের তর।
পাখি নেই।
মানুষের হৃদয়কে না জাগালে তাকে
ভোর, পাখি, অথবা বসন্তকাল ব’লে

আজ তার মানবকে কী ক’রে চানাতে পারে কেউ।
চারিদিকে অগণন মেশিন ও মেশিনের দেবতার কাছে
নিজেকে স্বাধীন ব’লে মনে ক’রে নিতে গিয়ে তবু
মানুষ এখনও বিশৃঙ্খল।
দিনের আলোর দিকে তাকালেয় দেখা যায় লোক
কেবলি আহত হ’য়ে মৃত হ’য়ে স্তব্ধ হয়;
এ ছাড়া নির্মল কোনো জননীতি নেই।
যে-মানুষ- যেই দেশে টিঁকে থাকে সে-ই
ব্যক্তি হয়- রাজ্য গড়ে- সাম্রাজ্যের মতো কোনো ভূমি
চায়। ব্যক্তির দাবিতে তাই সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে
তারই পিপাসায়
গ’ড়ে ওঠে।
এ ছাড়া অমল কোনো রাজনীতি পেতে হ’লে তবে
উজ্জ্বল সময়স্রোতে চ’লে যেতে হয়।
সেই স্রোত আজো এই শতাব্দীর তরে নয়।

সকলের তরে নয়।
পঙ্গপালের মতো মানুষেরা চরে;
ঝ’রে পড়ে।
এই সব দিনমান মৃত্যু আশা আলো গুনে নিতে
ব্যাপ্ত হ’তে হয়।
নবপ্রস্থানের দিকে হৃদয় চলেছে।
চোখ না এড়ায়ে তবু অকস্মাৎ কখনো ভোরের জনান্তিকে
চোখে থেকে যায়
আরো-এক আভাঃ
আমাদের এই পৃথিবীর এই ধৃষ্ট শতাব্দীর
হৃদয়ের নয়- তবু হৃদয়ের নিজের জিনিস
হ’য়ে তুমি র’য়ে গেছ।

তোমার মাথাত চুলে কেবলই রাত্রের মতো চুল
তারকার অনটনে ব্যাপক বিপুল
রাতের মতন তার একটি নির্জন নক্ষত্রকে
ধ’রে আছে।
তোমার হৃদয়ে গায়ে আমাদের জনমানবিক
রাত্রি নেই। আমাদের প্রাণে এক তিল
বেশি রাত্রির মতো আমাদের মানব্জীবন
প্রাচারিত হ’য়ে গেছে ব’লে-
নারি,
সেই এক তিল কম।
আর্ত রাত্রি তুমি।

শুধু অন্তহীন ঢল, মানব-খচিত সাঁকো, শুধু অমানব নদীদের
অপর নারীর কণ্ঠ তোমার নারীর দেহ ঘিরে;
অতএব তার সেই সপ্রতিভ অমেয় শরীরে
আমাদের আজকের পরিভাষা ছাড়া আরো নারী
আছে। আমাদের যুগের অতীত এক কাল
র’য়ে গেছে।
নিজের নুড়ির ’পরে সারাদিন নদী
সূর্যের- সুরের বীথি, তবু
নিমেষে উপল নেই- জলও কোন্‌ অতীতে মরেছে;
তবু নবীন নুড়ি- নতুন উজ্জ্বল জল নিয়ে আসে নদী;
জানি আমি জানি আদি নারী শরীরিণীকে স্মৃতির
(আজকে হেমন্ত ভোরে) সে কবের আঁধার অবধি;
সৃষ্টির ভীষণ অমা ক্ষমাহীনতায়
মানবের হৃদয়ের ভাঙা নীলিমায়
বকুলের বনে মনে অপার রক্তের ঢলে গ্লেশিয়ারে জলে
অসতী না হয় তবু স্মরণীয় অনন্ত উপলে
প্রিয়াকে পীড়ন ক’রে কোথায় নভের দিকে চলে।

(সমাপ্ত)

<< পরবর্তি পর্ব: জ্ঞানেন্দ্রিয়: রূপ : রূপের রহস্য : প্রথম পর্ব 

…………………………
আরো পড়ুন:
রূপের রহস্য: পর্ব-১
রূপের রহস্য: পর্ব-২
রূপের রহস্য: পর্ব-৩
রূপের রহস্য: পর্ব-৪
রূপের রহস্য: পর্ব-৫
রূপের রহস্য: পর্ব-৬
রূপের রহস্য: পর্ব-৭
রূপের রহস্য: পর্ব-৮
রূপের রহস্য: পর্ব-৯
রূপের রহস্য: পর্ব-১০

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!