রসের ভুবন

রসের ভুবন: দশম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: রস : রসের ভুবন: দশম পর্ব

আধ্যাত্মিকতা তেমনি বিজ্ঞানের মতোই কিছু সূত্রকে প্রাথমিকভাবে মেনে নিয়ে। কিছু বিষয়ের মান ধরে যেমন ‘এক্স-ওয়াই-জেড’ ধরে নিজের সাধন বলে নিজেকেই নিজে প্রমাণ করে করে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানও তাই করে কিন্তু বিজ্ঞান তা করার জন্য দৃশ্যগত বস্তুকে প্রাধান্য দেয়। তার জন্য জাগতিক যন্ত্রপাতি অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে।

অন্যদিকে আধ্যাত্মবাদ একটি সূত্রে হাঁটলেও তার গবেষণাগার হলো দেহ। জ্ঞান হলো ব্রহ্মাণ্ড আর অনুষঙ্গ হলো ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, সংস্কার ইত্যাদি ইত্যাদি। বিজ্ঞান যেমন একটা পর্যায়ে অনেক পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর একটা আবিষ্কার গণ মানুষ বুঝতে পারবে-নিতে পারবে এমন পর্যায়ে পৌঁছালে তা প্রকাশ করে।

আধ্যাত্মিকতাও তদ্রূপ রসের যখন সন্ধান পায়। যা মানুষকে বলা যায়-বোঝানো যায় তখন তা প্রকাশ করে। তা শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ যে কোনো মাধ্যমেই হতে পারে। তবে রস এমনি এক ইন্দ্রিয়, এমনি এক বিষয় যাতে না ডুবলে প্রকৃত রসের স্বাদ পাওয়া যায় না।

কেবল সেই স্বাদের ষড়রস বা কাব্যতত্ত্বের নবরষেরই ডুবে থাকতে হয়। আদৌতে রস আরো গভীর বিষয়। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ই তাই। তবে রস তার মাঝে এমনি এক মাধুর্য পুঞ্জিভুত করে রেখেছে যে। একে বুঝতে গেলে এতে তলাতে হয়।

এ এক অতল যাত্রা। আর তল-অতলের কথা যখন উঠলো তখন রসের সাথে সম্পর্কিত একটা শব্দের কথা এই যাত্রায় একটু ছোট করে বলে নেই। শব্দটা হলো ‘রসাতল’।

যাক সে কথা আবার ফিরি যে কথা বলছিলাম। সেই ধারাবহিকতায় রূপে বা গন্ধে যখন রস আসে তখন কি হয় সেটা নিয়ে কি আর কিছু বলাবার আদৌ প্রয়োজন আছে? আমার তো মনে হচ্ছে যে কয়টা নিয়ে কথা হলো সেই ভাবে ভাবলে বাকিগুলো আপনারা সহজেই ধরতে পারবেন।

রসের ভুবনে রসের আলোচনায় সে শব্দটা এসে যায় তা হলো ‘রসাতল’। সোজা ভাষায় আমারে যাকে বলি গোল্লায় যাওয়া তাকেই একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে বলা হয় ‘রসাতল’ বা ‘রসাতলে যাওয়া’। কিন্তু এই রসের অতলে যাওকে কেনইবা গোল্লায় যাওয়া বোঝায় সেটাও তো একটু বুঝে নেয়া দরকার তাই নয় কি?

রস হচ্ছে এমন একটা ইন্দ্রিয় যার গ্রহণ, অবস্থান ও প্রকাশ তিনটি অবস্থাতেই ভিন্নতার ভাব জাগতে পারে। এই একে ইন্দ্রিয়ের মধ্যে বিভ্রান্তির শিরোমণি বললেও সম্ভবত ভুল হবে না। আর এই রসের খেই হারালে ডুবে যেতে হয় অতলে। রসাতলের সাধারণ অর্থ অধ:পাত, অধোগতি।

আবার ভারতীয় পুরাণে যে সপ্তপাতালের কথা বলা হয়েছে। তার সর্বশেষ পাতাল বা ভূতল হলো রসাতল। যথা- অতল, বিতল, সুতল, পাতাল, তল, তলাতল, রসাতল। এই অর্থে রসাতলে যাওয়া মানে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছানো। আরো সহজ ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, রসাতল মানে তলানীতে গিয়ে ঠেকা।

যেখানে গেলে আর ফেরার পথ থাকে না। মানে গোল্লায় যাওয়া। আবার গোল্লার কথা যখন আসলোই তখন ‘রসগোল্লা’ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত না করলে তো এ লেখার সার্থকতাই থাকে না। পৃথিবীর বহুদেশের মানুষের কাছে বাঙালী বিখ্যাত তার রসগোল্লার জন্য।

যতদূর জানা যায়, ভারতবর্ষের বাংলা অঞ্চলে প্রথম রসগোল্লা প্রস্তুত করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ফুলিয়ার হারাধন ময়রা আদি রসগোল্লার জনক। ১৮৬৮ সালে কলকাতায় বাগবাজারের নবীনচন্দ্র দাসের হাতে আধুনিক স্পঞ্জ রসোগোল্লার সৃষ্টি হয়।

অনেকে দাবী করেন, রসগোল্লার আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে। বিশেষ করে, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় পর্তুগিজদের সময় সেখানকার ময়রাগণ ছানা, চিনি, দুধ ও সুজি দিয়ে গোলাকার একধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করেন যা ক্ষীরমোহন বা রসগোল্লা নামে পরিচিত।

পরবর্তীতে বরিশাল এলাকার হিন্দু ময়রাগণের বংশধর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা কিংবা ওড়িশায় বিস্তার লাভ করে।

ইতিহাস যাই বলুক বা এর প্যাটের্ন্ট নিয়ে যত কামড়াকামড়িই হোক না কেনো এক পেট ভূড়িভোজের পর দইয়ের উপরে অন্তত একখানা বিশাল সাইজের রসগোল্লা দেখলে বাঙালীর পরান শান্তি পায়। তখন সে দেহের সুগার লেভেলের কথাও মনে রাখতে পারে না।

যাক সে কথা আবার ফিরি যে কথা বলছিলাম। সেই ধারাবহিকতায় রূপে বা গন্ধে যখন রস আসে তখন কি হয় সেটা নিয়ে কি আর কিছু বলাবার আদৌ প্রয়োজন আছে? আমার তো মনে হচ্ছে যে কয়টা নিয়ে কথা হলো সেই ভাবে ভাবলে বাকিগুলো আপনারা সহজেই ধরতে পারবেন।

শুধু খেয়াল রাখতে হবে আপনি কি সামগ্রিক কল্যাণে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাবছেন? নাকি ব্যক্তি কল্যাণকে কেন্দ্র করে ভাবছেন? এটুকু খেয়াল রাখলেই ঠিক ঠিক জায়গা মতো চিন্তাটাকে নিয়ে যেতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। যদি সামগ্রিক কল্যাণের মতো করে কিছুটাও ভাবা যায়। যদিও বিষয়টা বেশ জটিল।

তারপরও যদি কিছুটা ভাবা যায় তাহলে চিন্তাটা ছোট্ট খুপড়ি থেকে বেড়িয়ে বৃহৎ একটা পরিষড়ে পরবে। তখন ভাবনা যেমন ডানা মেলে মুক্ত ভাবে ভাবতে শিখবে তেমনি আপনার ইন্দ্রিয়ের যথাযথ ব্যবহারও হতে শুরু করবে। আর যদি খুব ব্যক্তিগত কল্যাণের চিন্তা থেকে ভাবেন তাহলে হয়তো খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ভাবা হবে।

শেষ বিচারে কোন ভাবনাটা ভালো আর কোন ভাবনার দিকটা খারাপ সে বিবেচনা আপনার। কেউ আপনার উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিলেই তা মেনে নিতে হবে তা তো নয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব আপনার। ভাবনার স্বাধিনতাও আপনার।

পৃথিবীর তাবৎ তাবৎ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আপনার উচ্চারিত বা লিখিত শব্দকে রুখে দিতে পারে। কিন্তু আপনার ভাবনাকে কেউ আটকাতে পারবে না। যদি না আপনি সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিরাজ করতে শুরু করেন। কিংবা আপনিই সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নেয়ার মহান দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন-

“কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে!
মেলে দিলেম গানের সুরের এই ডানা মনে মনে।।”

আবার রসিক জন বলেন, পঞ্চেন্দ্রিয়ে অর্থাৎ শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ এবং দেহ ও মনে – রস কেবল আসলেই হবে না। তার সঠিক ব্যবহারও জানতে হবে। অর্থাৎ রস জাগ্রত হলেই হবে না। রস আস্বাদনের রস কি করে নিতে হবে তাও জানতে হয়।

এই বিচারে প্রশ্ন জাগে- রস কি রসোত্তীর্ণ হচ্ছে? নাকি তা কেবল ‘রস’ হয়েই থেকে যাচ্ছে? আবার ‘রস’ বিষয়টা কি কেবল স্বাদে? গন্ধে? রূপে? স্পর্শে? চিত্তে? চেতনায়? নাকি দেহে? নাকি সব মিলিয়ে সার্বিক একটা অনুভূতি? নাকি একটা প্রতিকৃয়া?? এ বিষয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলার উপায় নেই।

আবার সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে বলা যেতেই পারে। সবকিছু বুঝতেই হবে, তারই বা দিব্যি দিচ্ছে কে? তার দায়-ই বা নিবে কেনো সকলে? আমরা তো অঙ্গীকারে বদ্ধ নই কারো কাছে যে আমাদেরকে সত্যে পৌঁছাতেই হবে? নাকি কোনো অঙ্গীকার আছে!!

সেই সকল উত্তর খুঁজতে তোমাকে তোমার ভেতরেই ডুব দিতে হবে। জানতে-বুঝতে-শিখতে হবে নিজেকে। আর এই যাত্রায় ইন্দ্রিয়ের তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

বিশ্বাসীরা বলেন, স্রষ্টার কাছে সৃষ্টি অঙ্গীকারবদ্ধ। তাকে তার কাছে ফিরতেই হবে। সেই রূপেই ফিরতে হবে যেরূপ তার কাছে থেকে নেয়া হয়েছে। আর যতক্ষণ না সৃষ্টি স্রষ্টার রূপ দর্শন করে বা তার সাথে লীন হতে পারে ততক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের অন্য কোনো সুযোগ নেই।

গুণীজনরা বলেন, ইন্দ্রিয় দিয়ে তুমি কি অনুভূতি নিবে বা নেবে না সেটা তোমার ব্যক্তিগত অভিপ্রায় মাত্র। তুমি তোমার জন্মজন্মান্তরের সংস্করের ভিত্তিতে প্রতিকৃয়া দিয়েই আনন্দিত? নাকি যে গল্পটা তোমাকে জানাচ্ছে সভ্যতা তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েই তুমি প্রশান্ত; সেটা তোমার ব্যাপার।

সাধুগুরুমুনিঋষি, শিল্পীদার্শনিকবুদ্ধিজীবীরা যে বোধের কথা বলেন, যে প্রেমের কথা বলেন তাতে তোমার ভেতর যদি কোনো ক্রিয়া করে। যদি তোমাকে ভাবায়। যদি তুমি মনে করো এই পেন্সিরে আঁকা সভ্যতাকেই সত্য মেনে তুমি পথ চলবে তাহলেই বা কে তোমাকে আটকাচ্ছে?

কিন্তু কখনো যদি তোমার মনে এই প্রশ্নগুলো ক্রমাগত হন্ট করে চলে। যদি যা তোমাকে জানানো হচ্ছে বা যা তুমি জানো বলে ভাবছো; তার ভিত্তিতে যে উত্তরগুলো তোমার কাছে আসছে তাতে তুমি সন্তুষ্ট না হতে পারো তাহলেই বুঝতে হবে-

সেই সকল উত্তর খুঁজতে তোমাকে তোমার ভেতরেই ডুব দিতে হবে। জানতে-বুঝতে-শিখতে হবে নিজেকে। আর এই যাত্রায় ইন্দ্রিয়ের তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

আর যার ভূমিকা নেই তাকেই আগে পূর্ণরূপে জেনে তবেই তার নিক্রিয়াতার ভাষাটি বুঝে নিতে হবে। নইলে এই ইন্দ্রিয় তোমাকে সর্বক্ষণ নাড়িয়ে চলবে। তোমাকে প্রবেশ করতে দেবে না নিজের ভেতরে। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই রসকে রসোত্তীর্ণ বা শব্দকে শব্দাত্তীর্ণ; স্পর্শকে স্পর্শাত্তীর্ণ, গন্ধকে গন্ধাত্তীর্ণ করার প্রশ্ন আসছে।

ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

ভালো এক জলসেঁচা কল
পেয়েছো মনা,
ডুবারু জন পায় সে রতন
তোর কপালে ঠনঠনা।।

ইন্দ্রিয় দ্বারে কপাট যে দেয়
সেই বটে ডুবারু হয় নইলে হবে না,
আপা সেচা কাদা খচা
কি এক ভূতের কারখানা।।

মান সরোবর নামটি গো তাঁর লালমতি আছে
অপার তাঁয় ডুবতে পারলে না,
ডুবতে যেয়ে খাবি খেয়ে
সুখটা বোঝো তৎক্ষণা।।

জল সেচে নদী শুকায় কার বা
এমন সাধ্য হয় পায় পরশখানা,
লালন বলে সন্ধি পেলে
যায় সমুদ্র লঙ্ঘনা।।

আর এই সূত্র ধরে বলা যায়, পঞ্চেন্দ্রিয়কে উত্তীর্ণ হওয়া গেলে একসময় মনকেও হয়তো উত্তীর্ণ হওয়ার একটা পথ পাওয়া গেলেও যেতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ বিচারেও একটা সম্ভাবনা উন্মুক্ত হওয়ার পথ খুলতে পারে বলে মনে হয়।

কারণ আমরা কম বেশি সকলেই মানি যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষুদ্রতম কোনো বিদ্যা যদি আমরা রপ্ত করতে শিখি সে আমাদের নতুন কোনো দিগন্তে নিয়ে দাঁড় করাবেই করাবে।

আর এই ক্রমাগত চাহিদার তালিকা বাড়াতে থাকায় আমরা সভ্যতার ক্রীতদাস হয়েই রয়ে যাচ্ছি জন্মের পর জন্ম। এ জন্ম, বিশ্বাসীদের ভাষায় নতুন দেহের জন্ম হতে পারে। আবার এক জনমেও নানাভাবে আমরা যে নিজেকে আবিস্কারের মধ্য দিয়ে নব জন্ম লাভ করি তাও হতে পারে।

মনকে বাগ মানানোই বড় ব্যাপার। মোটামুটি ভুলিয়ে ভালিয়েও যদি তাকে কথা শোনানোর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলেই প্রাথমিক কাজগুলো সেরে নেয়া সহজ হয়ে যায়। আর যদি মনকে উত্তীর্ণ করা যায় তাহলে তো ‘কেল্লাফতে’। তবেই যাওয়া যাবে সেই দেশে, যে দেখে আমরা প্রকৃতরূপে বসত করি।

সেই দেশেই আমরা থাকি। কিন্তু সেই দেশের পথ আমরা ঠিক চিনে উঠতে পারি না। নানান সব সংস্কারে বেড়াজ্বালে আমাদের ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিগুলোকে এমনভাবে আবদ্ধ করে রাখে-এমন সব শৃঙ্খলের বন্ধনে বেঁধে রাখে যে যথাযথ ভাবে আমরা তেমন কিছুই বুঝে উঠতে পারি না।

একটা মায়ামোহে আবিষ্ট হয়ে যে যার মতো করে ভেবে ভেবে দিন শেষে হয়রান-পেরেশান হচ্ছি। কেউ জানি না এতো এতো নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে আমরা আদতে কি করবো? তারপরও আমরা প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণের জন্য এর সংখ্যা বাড়িয়েই চলছি।

যেমন আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো বাড়িয়ে চলেছি। বিশ্বায়ন-বাজার অর্থনীতির ফাঁদে পরে যা কিছু আমাদের কোনো কালেই কোনো কাজে আসবে না তার তালিকাও আমরা আমাদের বাকেট লিস্টে টুকে রাখছি। আর সেসব পূরণের জন্য আমরা করতে পারি না এমন কিছুই নেই বলেও মাঝে মধ্যে অনুভব করি।

কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো বেশ ভালোভাবেই জানি সেসব আদৌ আমাদের প্রয়োজন নয়। সেসব স্রেফ লোক দেখানো। মানুষের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য আমরা নিজেকে যখন বিকশিত করতে পারছি না তখন অর্থ-বৈভব-ক্ষমতা প্রদর্শন করে তা পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছি।

আর এই ক্রমাগত চাহিদার তালিকা বাড়াতে থাকায় আমরা সভ্যতার ক্রীতদাস হয়েই রয়ে যাচ্ছি জন্মের পর জন্ম। এ জন্ম, বিশ্বাসীদের ভাষায় নতুন দেহের জন্ম হতে পারে। আবার এক জনমেও নানাভাবে আমরা যে নিজেকে আবিস্কারের মধ্য দিয়ে নব জন্ম লাভ করি তাও হতে পারে।

এর কোনটা কতটা বিবেচনাযোগ্য সে আপনার রস, রসবোধ সর্বোপরি রসাস্বনের উপরই নির্ভর করবে। তাই কোনো বিচারে না গিয়ে এই অন্তহীন লেখার যবনিকা এখানেই পতন ঘটাচ্ছি। যেতে যেতে মহর্ষি মনোমোহন দত্তের একটা গান তুলে দিচ্ছি যাতে ভাবনাটা একেটু প্রাণ পায়। ভুল-ত্রুটি নিজগুণে ক্ষমা করবেন। জয়গুরু।।

মহর্ষি মনোমোহন দত্ত লিখছেন-

শুন্ তোরে কই মনোমোহন।
তুই তিক্ত রসে লিপ্ত হলি ভুলে সুধার আস্বাদন।।
মহর্ষি মনোমোহন দত্ত লিখেছেন-

জন্মাবধি করে এত, শিখলি না তুই শিখার মত,
মন হলি না মনের মত, আর কত ঘুরাবি মন।।

সামান্য ধন পাবার আশে, ঘুরলি কেবল হুস বেহুসে,
নিধন কালে, সেধন কি তোর, ধনের কাম দিবেরে কখন।।

সাধ করে পেতে বিছানা, পুষেছ এক বাঘের ছানা,
সে যে রক্ত খেয়ে শক্ত হয়ে, নিল তক্ত সিংহাসন।।

ফচকা বাঁধের হেচকা টানে, মন আমার ঠেকেছ প্রাণে,
বুঝলি না তুই দিন যে গণে, দিন দুনিয়ার মহাজন।।

মন তোমার স্বভাব দোষে, আমি আমার মন মানুষে,
পারলেম্ নারে রাখতে হুসে, করতে পূজা মনের মতন।।

কই আমি মন তোমার কাছে, এখনও তোর সময় আছে,
ঠিক্ থাকিস্ তুই আগে পাছে, ঠিক রাখিস্ গুরুর চরণ।।

(চলবে…)

……………………..
আরো পড়ুন:
রসের ভুবন: পর্ব-১
রসের ভুবন: পর্ব-২
রসের ভুবন: পর্ব-৩
রসের ভুবন: পর্ব-৪
রসের ভুবন: পর্ব-৫
রসের ভুবন: পর্ব-৬
রসের ভুবন: পর্ব-৭
রসের ভুবন: পর্ব-৮
রসের ভুবন: পর্ব-৯
রসের ভুবন: পর্ব-১০

………………………………
তথ্যসূত্র
কাব্যতত্ত্বঅন্বেষণা-নরেন বিশ্বাস।
সাহিত্য সন্দর্শন-শ্রীশ চন্দ্র দাশ।
বৈষ্ণব রস-প্রকাশ: ক্ষুদিরাম দাস।
বিশ্বকোষ : নগেন্দ্রনাথ বসু।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খন্ড): আশুতোষ ভট্টাচার্য।
উইকিপিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!