রসের ভুবন

রসের ভুবন: সপ্তম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: রস : রসের ভুবন: সপ্তম পর্ব

আর রসের ভুবনের এই রসের আলোচনায় যে বিষয়টা না করলেই নয় তা হলো- ‘রসনা বিলাস’। রসনা বিলাসে বাঙালীর এমন সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে যে সে বিষয়ে লিখতে গেলে কোনটা রেখে কোনটা বলি তা নিয়ে দিধা-দ্বন্দ্বে পরতেই হয়। তাই এ বিষয়ে খুব বেশি ঢুকতেই চাইনি।

তারপরও না বলে কি আর থাকা যায়। অনেকেই বলেন, বাঙালির চেয়ে রসনা বিলাসী এ পৃথিবীতে কেউ নাই। এর কথা কতটা সত্য বহন করে সেই তর্কে না গিয়েও এটুকু বলা যায় যে। দেহের ক্ষতি হবে জেনেও বাঙালী কেবল মুখে স্বাদ পাওয়া যাবে এমন সব খাবার নির্ধিধায় খেয়ে নিতে পারে। যা অন্য জাতির মধ্যে ততটা দেখতে পাওয়া যায় না।

জানা যায়, বাঙালীর অন্যতম আইকনিক চরিত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত ভোজন রসিক। খেতে এবং খাওয়াতে তিনি ভালবাসতেন। এরজন্য নাকি তিনি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ‘ভোজন সভা’ নামে একটি সংস্থা পর্যন্ত গড়ে তুলেছিলেন।

এই সংস্থার সভ্যদের কাজ ছিল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হঠাৎ দল বেঁধে গিয়ে খাওয়ার আবদার করা।

একবার এক বন্ধুর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার পর সংস্থার এক সভ্য পেটের অসুখে পরলো। বন্ধুরা তাকে করে উদ্দেশ্যে সবাই বললো, ‘এ বড়ো পেট-রোগা! ভোজনসভার সভ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। একে সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।’

তখন বিদ্যাসাগর হাসি হাসি মুখে বললেন বললেন, ‘না হে না, তোমরা ঠিক বলছি না, ওই তো আমাদের মধ্যে একমাত্র সভ্য যে আদর্শের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে উদ্যত । ওকে ভোজনসভা থেকে কোনো মতেই বাদ দেওয়া যায় না।’

আবার রস আস্বাদনের ইন্দ্রিয় জিহ্বার আরেক নাম রসনা। এই রসনাকে যেমন স্বাদের বিচারে দেখা হয়। তেমনি আবার একে আত্মিক বিশ্লেষণও করা হয়।

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ তার ‘লালসালু’ উপন্যাসে মজিদ বলছে- “মানুষের রসনা বড় ভয়ানক বস্তু, সে-রসন বিষাক্ত সাপের রসনার চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে। প্রক্ষিপ্ত সে-রসন তার বিয়ে পরিবারকে-পরিবার ধ্বংস করে দিতে পারে, নিমেষে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে সমস্ত পৃথিবীতে।”

সাধক কমলাকান্ত বিষয়টাকে আরো গভীর নিয়ে বলছেন-

কেমন ক’রে তরাবে তারা
তুমি মাত্র একা,
আমার অনেকগুলা বাদী গো
তার নাইকো লেখাজোখা,
কেমন ক’রে তরাবে তারা।

ভেবেছ মোর ভক্তিবলে
লয়ে যাবে বলে-ছলে,
অভক্তের ভক্তি যেন
পেত্নীর হাতের শাঁখা,
কেমন ক’রে তরাবে তারা।

নাম ব্রহ্ম বটে সার
সেও তো আমার পতি ভার,
মনের সঙ্গে রসনার
খাবার সময় দেখা।
কমলাকান্তের কালী
হৃদে বসো কোথায় বলি,
এবিষয়ে উচিত হয়
চৌকি দিয়ে থাকা।
কেমন ক’রে তরাবে তারা।

রস জগতের সকল কিছুতেই বিরাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যাক্তিতে। কোথাও সেটা তরল রস। কোথাও আবার ভাব রস। কোথাও আবার মনন রস। কোথাও বা স্বাদের। কোথাও আবার রস হয়ে যায় বোধ। যাকে আমরা বলি রসবোধ।

আর রসবোধে বাঙালী সব সময়ই এগিয়ে। কথায় যেমন বলে ‘মাছে-ভাতে বাঙালী’ তেমনি আবার বাঙালির আরেকটি পরিচয় আছে ‘রসিক বাঙালী’ বলে। গুছিয়ে গুল মারার অভিজ্ঞতা বাঙালীর অতুলনীয়। আর এই গুল মারার নানান চরিত্র যেমন আমাদের চারপাশে দেখতে পাই।

তেমনি সাহিত্যের পাতায় পাতায়ও নানা রসিক চরিত্র যুগে যুগে আমাদের কাছে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আর এই সব শত-সহস্র চরিত্রের মাঝে যাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। তারা হয়েন- লালমোহন বাবু ওরফে জটায়ু, ঘণাদা, টেনিদা প্রমুখ।

আবার অনেক শিল্পী সাহিত্যিক তাদের রসবোধের জন্য পেয়েছেন রীতিমতো ‘রসরাজ’-এর খেতার পর্যন্ত। এরমধ্যে আছেন নাট্যকার অমৃতলাল বসু ও সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী প্রমুখ। আবার মতুয়া সাধক গীতিকার কবি তারকচন্দ্র সরকারও পেয়েছেন রসরাজের উপাধি।

স্যাটায়ার বিষয়টি যাকে ঘিরে করা হচ্ছে তার বিষয়টি নিশ্চয়ই ভালো লাগবার কারণ নেই। অনেকে সেই রসও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। আবার সমাজ-রাষ্ট্র ও প্রভাবশালীদের নানাবিদ বাঁধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে স্যাটায়ার শিল্পীদের।

নাট্যকার ও অভিনেতা অমৃতলাল বসু (১৮৫৩-১৯২৯) হাস্যরসাত্মক নাট্যরচনার জন্য স্বদেশবাসীর কাছে ‘রসরাজ’ উপাধি পেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের যুবরাজের আগমন উপলক্ষে উকিল জগদানন্দের বাড়িতে অনুষ্ঠিত ঘটনাকে ব্যঙ্গ করে রচিত নাটিকা পরিচালনার জন্য আদালতে দণ্ডিত হন। এই ব্যাপারে সরকার মঞ্চাভিনয়ের জন্য ১৮৭৬ সনে আইন রচনা করে।

আবার এই তালিকায় সুকুমার রায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় সহ আরো অনেকেই রয়েছেন। যারা সাহিত্য হাস্যরসের মারাত্মক একটা দিক উন্মোচন করছেন। যা হাস্যরস হলেও তার সাথে একটা রাজনৈতিক সচেতনতাও বিদ্যমান।

সৈয়দ মুজতবা আলীর রসবোধ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় তার সকল লেখাতেই। একটা সাধারণ কথাকেও কি করে হাস্যরসে ফেলা দেয়া যায় তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখছেন-

“জজ সাহেব চোরকে জিগেস করলেন- তোর লজ্জা করেনা, আমি এই চেয়ারে বসে, তিন তিন বার তোর বিচার করছি। চোর খুব লজ্জিত মুখে মাথা নিচু করে বলল- হুজুরের প্রমোশন না হলে আমার কি করার আছে বলুন।”

আবার বাংলা সাহিত্যে স্যাটায়ারের উপস্থিতিও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। স্যাটায়ার মূলত এমন একধরণের হাস্যরস যা সমাজ বা ব্যক্তি বিশেষকে ব্যঙ্গ করে রচিত। এই স্যাটায়ার শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। তা উদ্ভাসিত হয়েছে গান, নাটক, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র, কার্টুন সব নানাবিধ শিল্পে।

আমরা যে রসের আলোচনায় আছি তাতে বাঙালীর রসবোধটাই মানানসই বলে আর বিশ্ব দরবারে এ প্রসঙ্গে প্রবেশ করলাম না। যদিও সেখানেও এর সন্ধান করতে গেলে খনির পর খনি পাওয়া সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে আলোচনাটা ভিন্নরূপ নিতে পারে। যাক সে কথা।

স্যাটায়ার বিষয়টি যাকে ঘিরে করা হচ্ছে তার বিষয়টি নিশ্চয়ই ভালো লাগবার কারণ নেই। অনেকে সেই রসও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। আবার সমাজ-রাষ্ট্র ও প্রভাবশালীদের নানাবিদ বাঁধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে স্যাটায়ার শিল্পীদের।

বাংলা সাহিত্যে স্যাটায়ার লিখে যারা সাড়া ফেলে দিয়েছেন তাদের দুই একজনের নাম না নিলেই নয়। তাদের মধ্যে- ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কালি প্রসন্ন সিংহ, দীনবন্ধু মিত্র, অমৃতলাল বসু, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, নবারুণ ভট্টাচার্য প্রমুখ। তবে স্যাটায়ার বা প্রহসন বেশিভাগ সময়ই মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানল থেকে বাঁচতে ছদ্মনামে লিখেছেন।

তবে সাহিত্যে প্রহসন যে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হয়েছে এমনটা ভাববার কারণ নেই। কারণ সংস্কৃতেও প্রহসনের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কৌতুকরত্নাকর (কবিতার্কিক, ১৭শ শতক), হাস্যার্ণব (জগদীশ, ১৮২২), কৌতুকসর্বস্ব (রামচন্দ্র তর্কালঙ্কার, ১৮২৮) প্রভৃতি।

সংস্কৃত প্রহসনের আদর্শে বাংলা প্রহসন রচনার পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় রামনারায়ণ তর্করত্নকে (১৮২২-৮৬)। তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রহসন হচ্ছে কুলীনকুলসর্বস্ব (১৮৫৪)।

বিশ্ব সাহিত্যের দরকারের যে সকল লেখকের রচনায় রস প্রাধান্য পেয়েছে সেসব দিয়ে আর তালিকাটা লম্বা করলাম না। কারণ সাহিত্যে রসবোধের যে জায়গাটা দখল করে আছে। তা কেবল হাস্যরসের সীমাবদ্ধ না থেকে। সেটা কোথাও একটা মারাত্মক সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতনায় নিয়ে গেছে।

আমরা যে রসের আলোচনায় আছি তাতে বাঙালীর রসবোধটাই মানানসই বলে আর বিশ্ব দরবারে এ প্রসঙ্গে প্রবেশ করলাম না। যদিও সেখানেও এর সন্ধান করতে গেলে খনির পর খনি পাওয়া সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে আলোচনাটা ভিন্নরূপ নিতে পারে। যাক সে কথা।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলশী চক্রবর্তী, সন্তোষ দত্ত ওরফে জটায়ু, খান জয়নুলের মতো অভিনেতারা হাস্যরসকে চলচ্চিত্রে যেমন দিয়েছেন ভিন্ন মাত্রা। তেমনি গোপাল ভাঁড় থেকে চার্লি চ্যাপলিন এমন অগনতি চরিত্র বিশ্বজুড়ে উদাহরণ হয়ে ছড়িয়ে আছেন।

(চলবে…)

……………………..
আরো পড়ুন:
রসের ভুবন: পর্ব-১
রসের ভুবন: পর্ব-২
রসের ভুবন: পর্ব-৩
রসের ভুবন: পর্ব-৪
রসের ভুবন: পর্ব-৫
রসের ভুবন: পর্ব-৬
রসের ভুবন: পর্ব-৭
রসের ভুবন: পর্ব-৮
রসের ভুবন: পর্ব-৯
রসের ভুবন: পর্ব-১০

………………………………
তথ্যসূত্র
কাব্যতত্ত্বঅন্বেষণা-নরেন বিশ্বাস।
সাহিত্য সন্দর্শন-শ্রীশ চন্দ্র দাশ।
বৈষ্ণব রস-প্রকাশ: ক্ষুদিরাম দাস।
বিশ্বকোষ : নগেন্দ্রনাথ বসু।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খন্ড): আশুতোষ ভট্টাচার্য।
উইকিপিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!