রসের ভুবন

রসের ভুবন: দ্বিতীয় পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: রস : রসের ভুবন: দ্বিতীয় পর্ব

রসের ভুবনে প্রাচীন ভারতীয় ভেষজবিদ্যায় এই ষড়রসের খাবারকে একটি ক্রম ধারাবাহিকতা মেনে আহার করার কথা বলা হয়েছে। রীতি মতো কোন রসের পর কোন রসের স্বাদের খাবার খেতে হবে সেই বিধি বেঁধে দেয়া হয়েছে। এই ক্রমটি হচ্ছে- তিক্ত, কটু, কষায়, লবণ, অম্ল ও মধুর।

আহার গ্রহণে এই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করার কথা বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বারবার। এর কারণ কেবল জিহ্বায় স্বাদ ধরে রাখা নয়। এর অন্যতম কারণ খাবার পরিপাকে সহজ হওয়া। এবং স্বাস্থ্য সম্মত জীবন গঠন।

অর্থাৎ এই ক্রমটি মেনে খাবার গ্রহণ করলে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়বার পাশাপাশি সহজে হজমে সহায়কও হয়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে আহারের বিধিটা অনেকটা এরকম-

প্রথম পাতে খেতে হয় তিক্ত স্বাদযুক্ত খাবার। অর্থাৎ শুক্তো, করল্লার ঝোল, নিম-বেগুন, পলতা, শিউলি পাতার ঝোলের মতো খাবারগুলো।

দ্বিতীয় পাতে কটু বা ঝাল স্বাদযুক্ত খাবার। অর্থাৎ মরিচ বা পিপুল দিয়ে রান্না করা সবজি। অর্থাৎ নিরামিষ ঝাল। ঝালের মাত্রা যে খাবারে বেশি দেয়া হয়েছে সেই খাবারটি এই ধাপে খাওয়ার বিধান।

তৃতীয় পাতে খেতে হয় কষায় স্বাদযুক্ত খাবার। কষা খাবারের মধ্যে থাকতে পারে- কাঁচকলার সবজি বা ভর্তা, কলার মোচার তরকারি, ডুমুরের ডালনা প্রভৃতি।

আর এই রস ধাপে ধাপে গিয়ে পরিণত হয় রতিতে। আর সাধককুল বলে এই দেহ হলো রস-রতির খেলা। যদিও সেই রসের অর্থ সেখানে ভিন্ন। সে আলোচনায় আসবো পরে। আগে আহারের রস ও তার ক্রম পরবর্তন নিয়ে কিঞ্চিৎ বাক্যালাপ করা যাক।

চতুর্থ ধাপে খেতে হয় লবণ স্বাদযুক্ত খাবার। এরমধ্যে পরে অচার, পাঁপড়, নোনতা পোলাও প্রভৃতি খাবার।

পঞ্চম ধাপে খেতে হয় অম্ল স্বাদযুক্ত খাবার। অম্ল স্বাদযুক্ত খাবারের মধ্যে বলা যায় চাটনি, আচার, তেঁতুলের আচার, তেঁতুল দিয়ে ডাল, জলপাই দিয়ে ডাল, করমচার ঝোল, ডালের সাথে বিলম্বী বা কাঁচা আমের ঝোল প্রভৃতি।

ষষ্ঠ ধাপে খাওয়ার নিয়ম মিষ্ট স্বাদযুক্ত খাবার। অর্থাৎ ভোজন শেষধাপটি হবে মিষ্টি। ভারতবর্ষে মিষ্টান্নের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চালের পায়েস, লাউয়ের পায়েস, সেমাইয়ের পায়েস, আতব চালের ক্ষীর, রসের পীঠা প্রভৃতি।

এতো গেলে ভিন্ন ভিন্ন রসের খাবারের ক্রমধারা। আবার আমরা যে কোনো খাবারই গ্রহণ করি না কেনো। তা আমাদের দেহে প্রবেশের পর সমস্তটাই প্রথমে দেহঅগ্নি তরলে রূপান্তরিত করে। অর্থাৎ সকল খাবার দেহে প্রথম যে অবস্থায় অবস্থানের সুযোগ পায় তা হলো রস।

দেহযন্ত্র এই কাঁচা রসের প্রয়োজনীয় অংশটুকু রেখে বাকি সমস্ত কিছুই মল-মূত্র-ঘাম সহ অন্যান্য মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে দেয়। বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় সকল কিছু দেহ থেকে বের করে দিয়ে দেহে খাবারের নির্যাসরূপে সঞ্চিত যা থাকে তাও হালো ‘রস’।

আর এই রস ধাপে ধাপে গিয়ে পরিণত হয় রতিতে। আর সাধককুল বলে এই দেহ হলো রস-রতির খেলা। যদিও সেই রসের অর্থ সেখানে ভিন্ন। সে আলোচনায় আসবো পরে। আগে আহারের রস ও তার ক্রম পরবর্তন নিয়ে কিঞ্চিৎ বাক্যালাপ করা যাক।

আমরা যখন যে কোনো খাবার আহার হিসেবে গ্রহণ করি। তা আমাদের খাদ্য নালীতে প্রবেশের পর দেহযন্ত্র তাকে রসে পরিণত করে। এই রস থেকে হয় রক্ত। রক্ত থেকে হয় মাংস বা কোষ। আর মাংস থেকে হয় মেদ। মেদ থেকে হয় হাড়।

হাড় থেকে হয় মজ্জা। আর মজ্জা থেকে হয় রতি বা বীর্য। আর এই এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে যেতে মোটামুটি পাঁচ থেকে সাত দিনের মতো সময় লাগে।

আর রস থেকে রতি হওয়ার পুরো প্রকৃয়াটি ঘটে মোটামুটি ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে। আহার গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই প্রকৃয়াটিকে চলমান থাকে দেহে। আর এই প্রকৃয়াটি যত সুচারুরূপে সম্পূর্ণ হয় দেহ ততটা স্বাভাবিক আচরণ করে।

এই প্রকৃয়ার যে ধাপ বাঁধা প্রাপ্ত হয় বা দ্রুত হয়ে যায় সেই পরিবর্তনটা তখন স্বাভাবিক সচলতা হারায়। আর এতে নানা রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয় দেহে। আর দেহে রোগ বাসা বাধলে মনেও তা গ্রাস করে। আর মন অস্থির থাকলে ইন্দ্রিয় যে অনুভূতি গ্রহণ করে। তার সঠিক প্রতিকৃয়া দেয়া তার জন্য সহজ হয় না।

স্বাদের ভিত্তিতে রসকে এভাবে দুই, চার বা ছয় ভাগ করা হলেও ভারতীয় নাট্য, কাব্য ও অলঙ্কার শাস্ত্রে রসের রূপ ভিন্ন। এখানে নানান শাস্ত্রে রসকে নানাভাগে ভাগ করা হয়েছে প্রতিকৃয়ার ভিত্তিতে। ভরতের নাট্যশাস্ত্র বিচারে রস ৮ প্রকার।

নাট্যশাস্ত্রের শান্তরসকে করুণ রসের অন্তর্গত ধরা হলেও কাব্যশাস্ত্র এ দুটিকে আলাদা রস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসেবে কাব্যশাস্ত্র মতে রস ৯ প্রকার। কথাসাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তার ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘শাস্ত্রমতে কাব্যরস হলো অমৃত’।

রসতত্ত্বের আদিগুরু ভরতমুনিও নাট্যরস প্রসঙ্গে লিখেছেন-

‘নহি রসাদ ঋতে কশ্চিদ্ অর্থ: প্রবর্ততে।
তত্র বিভুনাভাব ব্যাভিচারি-সংযোগাদ্ রস নিষ্পত্তি।। (নাট্যশাস্ত্র ৬/৩৪)

অর্থাৎ রস ভিন্ন কোনো বিষয়ই প্রবর্তিত হয় না। নাট্য বিষয়ে বিভাব, অনুভাব ও ব্যাভিচারি ভাবের সংযোগ রসের নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।

কাব্যশাস্ত্রের নয় প্রকার রস হলো-

১. শৃঙ্গার বা আদিরস (the erotic): শৃঙ্গ শব্দের অর্থ কামদেব। সহজ ভাষায় শৃঙ্গের আর (আগমন) হয় যাতে, তাই শৃঙ্গার। নরনারীর দৈহিক মিলনের ইচ্ছায় অনুরাগে এই রস সৃষ্টি হয়। প্রেম ভাব প্রকাশের জন্য কাব্যে এই রসের উপস্থিতি অধিক লক্ষ্য করা যায়।

রতি ভাব থেকে শৃঙ্গার রসের উদ্ভব। অর্থাৎ ‘রতি’ স্থায়ীভাব থেকেই শৃঙ্গার বা আদি রসের উৎপত্তি। অলঙ্কার শাস্ত্রীয়দের মতানুসারে, শৃঙ্গার রস দুই প্রকার- সম্ভোগ ও বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গার রস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় শৃঙ্গার রস-

নাহি জানি কখন কী ছলে
সুকোমল হাতখানি লুকাইলো আসি
আমার দক্ষিণ করে কুলায় প্রত্যাশী
সন্ধ্যার পাখির মতো, মুখখানি তার
নববৃন্ত পুষ্পসম এ বক্ষে আমার
নমিয়া পড়িলো ধীরে। ব্যাকুল উদাস
নিঃশব্দে মিলিল আসি নিঃশ্বাসে সিঃশ্বাস।

ভাষা বিজ্ঞান নামক বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে- “শৃঙ্গার বা আদিরস কাম প্রবৃত্তির উত্তেজক। স্ত্রী পুরুষের পরস্পর আকাংক্ষণ, সঙ্গম চেষ্টা, সঙ্গম, বিলাস, বিরহ, মান, সাধনা অর্থাৎ একেও অন্তের প্রবৃত্তি উৎপাদন বা তদর্থে চেষ্টা বর্ণনা করাই এই রসের উদ্দেশ্য রূপ বর্ণন। কামোত্তেজক হইলে, তাহাও এই রসের অংশ গণ্য হয়।”

২. বীররস (the heroic): মূলত উৎসাহ বীর রসের স্থায়ীভাব। অলঙ্কার শাস্ত্রীদের মতে, ‘দয়া, ধর্ম, দান কিংবা মহত্তর কোনো সংগ্রামের হেতু মানুষের চিত্তে যে উৎসাহ জন্মে, সে ভাব থেকেই বীর রসের উদ্ভব।’ বলবীর্যময় রস যেখানে সাহস, শক্তি, তেজ এবং রণনিপুণতার বিষয় বর্তমান। এর প্রত্যেকটির ভেতরে জয়ী হবার ভাব থাকে।

এই রসের দ্বারা প্রতিকুল পরিবেশকে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার ভাব প্রকাশিত হয়। একই সাথে এতে থাকে বীরোচিত প্রতিজ্ঞা। এই রস ভায়নক ও শান্ত রসের বিপরীত। উৎসাহ ভাব থেকে বীর রসের উদ্ভব।

অনেকে বীর রসকে দানবীর, ধনবীর ও যুদ্ধবীর এই প্রকারে ভাগ করেছেন। কেউ ‘চার’ আবার কেউ ‘আট ‘প্রকার বীর রসের কথা ব্যক্ত করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বীর রস-

‘বল বীর-
বল উন্নত মমশির
শির নেহারি আমারি নত-শির ঐ শিখর হিমাদ্রির
বল বীর
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর
বল বীর
আমি চির উন্নত শির।’

ভাষা বিজ্ঞান নামক বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে- “বীর রস সাহস ও উৎসাহ উদ্দীপক। বীরগণের বল, সাহস, উৎসাহ, অস্ত্রশস্ত্র, অস্ত্র চালন নৈপুণ্য, ব্যুহ রচনা, সৈন্ত চালনা এবং তদুপযোগী বুদ্ধি, বক্তৃত, পরামর্শ, উদ্যোগ প্রভৃতি বর্ণনা করাই এই রসের উদিশু। রূপ বর্ণনা বলবীর্যের প্রকাশক হইলে তাহাও এই রসের অংশ গণ্য হয়।”

(চলবে…)

……………………..
আরো পড়ুন:
রসের ভুবন: পর্ব-১
রসের ভুবন: পর্ব-২
রসের ভুবন: পর্ব-৩
রসের ভুবন: পর্ব-৪
রসের ভুবন: পর্ব-৫
রসের ভুবন: পর্ব-৬
রসের ভুবন: পর্ব-৭
রসের ভুবন: পর্ব-৮
রসের ভুবন: পর্ব-৯
রসের ভুবন: পর্ব-১০

………………………………
তথ্যসূত্র
কাব্যতত্ত্বঅন্বেষণা-নরেন বিশ্বাস।
সাহিত্য সন্দর্শন-শ্রীশ চন্দ্র দাশ।
বৈষ্ণব রস-প্রকাশ: ক্ষুদিরাম দাস।
বিশ্বকোষ : নগেন্দ্রনাথ বসু।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খন্ড): আশুতোষ ভট্টাচার্য।
উইকিপিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!