তুলসীদাস

কিন্তু ইষ্টদর্শন না পেয়ে তুলসীর মনমেজাজ ভালো ছিল না। তাই তিনি তাদের রেগে বললেন, চলে যাও এখান থেকে। নাচের কোন প্রয়োজন নেই। এই বলে কুটিরের ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। অনুতপ্ত হৃদয় তিনি ভাবতে লাগলেন নিশ্চয় তাঁর সাধনায় কোন ত্রুটি আছে‌। তা না হলে মহাবীরজীর কথা মিথ্যা হবে কেন।

সেইদিনই রামায়ণপাঠের আসরে গিয়ে ছদ্মবেশী মহাবীরজীকে চেপে ধরলেন। কই ইষ্টদেবের দর্শন ত তিনি পেলেন না। মহাবীরজী বললেন! সে কি কথা তুলসী, প্রভু রামচন্দ্র, মা জানকী, লক্ষ্মণ আর আমি- সবাই ত গিয়েছিলাম। আমি ছিলাম বানরের বেশে। প্রভু শ্রীরাম ও মা জানকী ছিলেন বেদ ও বেদেনীর বেশে।

তাঁরা তোমায় নাচ দেখাতে গিয়েছিলেন। লক্ষ্মণ ছিলেন ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে। তাঁরা তোমায় নাচ দেখাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তুমি তাঁদের তাড়িয়ে দিয়েছিলে। তোমার কুটিরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলে। চেয়ে দেখ, আমার গলায় এখনো দড়ির দাগ রয়েছে‌। তুমি আমাদের চিনতে পারনি।

তুমি প্রভুর জ্যোতির্ময় রূপ সহ্য করতে পারবে না। তাই ত প্রভু ছদ্মবেশে দর্শন দান করতে গিয়েছিলেন। এবার থেকে সাধনার গভীরে ডুবে যাও। প্রভুর চিন্ময় রাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে। আমি দ্বার ছেড়ে দিচ্ছি। নাম জপ, কঠোর তপস্যার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে ভজন আর অকাতর প্রার্থনা।

কিন্তু প্রভুর দর্শন কবে মিলবে তা জানেন না। এক একদিন ব্যর্থতার বেদনায় আকুলভাবে কাঁদতে থাকেন তুলসী। আর্তকণ্ঠে প্রার্থনা জানান,

সব সেবক কী প্রীতি রুচি রাখিহহি রাম কৃপালু।
উপল কিয়ে জলযান জেহি সচিব সুমতি কপি ভালু।।

অর্থাৎ হে কৃপালু শ্রীরাম! আমার মত শঠ সেবকের প্রতি রেখো তোমার প্রীতি। তুমি যেমন জলে শিলা ভাসিয়ে তাকে জলযান করলে, যেমন বানর ভালুককে তোমার বুদ্ধিমান মন্ত্রী বানালে, তেমনি আমার মত অযোগ্য অভাজনকেও করুণা করো।

ক্রমে নামসিদ্ধ হয়ে ওঠেন কঠোরতপা তুলসী। অবিরাম রামনামের দিব্য আলোকে চৈতন্যময় হয়ে ওঠে তাঁর সমগ্র সত্তা, তাঁর সমস্ত প্রাণ ও দেহগত অস্তিত্বের গভীরে অঙ্কিত হয়ে যায় রামনাম। তাই একটি দোহায় সেই রামনামের জয়গান গান-

রামনাম মণি দীপ ধরা জীহ দেহরীদ্বার।
তুলসী ভীতর বাহরাহু জৌচাহসি উজিয়ার।।

অর্থাৎ তুলসীর দেহ হয়ে উঠেছে দেবালয়, জিহ্বা তার দ্বার। সেই জিহ্বার উপর রামনামের মণি-দ্বীপ স্থাপন করেছেন তিনি। তাই উজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়ে উঠেছে তুলসীর ভিতর বাহির।

তুলসীর সাধনায় এবার প্রসন্ন হলেন মহাবীরজী। তিনি তাঁকে বললেন, তুলসী! এবার তুমি চিত্রকূট পর্বতে যাও। এই পর্বত থেকেই শুরু হয় শ্রীরামের অবতার লীলা। তাঁর পদস্পর্শে এখানকার ভূমি হয়ে উঠেছে পবিত্র। এখানকার পরিবেশও সাধনার পক্ষে বড়ই অনুকূল।

এখানে বসে তুমি কিছুদিন তপস্যা করো। কমললোচন প্রভু শ্রীরাম তোমায় দর্শন দান করে কৃতার্থ করবেন। চিত্রকূট পর্বতে তখন চলছিল সূর্যগ্রহণের মেলা। এই মেলায় বহু সাধুর সমাগম হয়েছে। নিরন্তন রামনাম ও রামায়ণগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে সেখানকার আকাশ বাতাস।

চিত্রকূট পর্বতের একধারে একটি ভজনকুটির নির্মাণ করে কিছুদিনের জন্য বাস করতে লাগলেন তুলসী। সাধনভজনে দিন কাটাতে লাগলেন।

মেলা শেষ হলে আবার নীরব নিস্তব্ধ হয়ে উঠল জনমানবশূন্য চিত্রকূটের সমগ্র পর্বতাঞ্চল। সেই নির্জন নিস্তব্ধ পরিবেশ আরো নিবিড় আরো কঠোর হয়ে উঠল তুলসীর তপস্যা। প্রতিদিন ভোরবেলায় ঝর্ণার জলে স্নান করে পূজার্চনা শুরু করেন। সারাদিন ধরে চলতে থাকে সাধনভজন। তারপর দিনের শেষে সামান্য কিছু ফলমূল আহার করেন।

একদিন সকালবেলায় পূজার আয়োজন করেছিলেন তুলসী। শিলায় চন্দন কাঠ ঘষছিলেন আপন মনে। এমন সময় সহসা সুন্দর সুঠাম চেহারার শ্যামবর্ণ এক বালক কোথা থেকে এসে দাঁড়াল তাঁর সামনে। বালকের সারাদেহে এক অপরূপ লাবণ্যের ঢেউ খেলে যাচ্ছে যেন। চোখে মুখে এক দিব্য দ্যুতি।

মাথায় জটাভার, পরনে বল্কল। আজানুলম্বিত বাহুতে একটি ক্ষুদ্রাকৃতি ধনু। বালকটি এসেই আব্দার করে বলল, তুমি নিজের হাতে আমায় চন্দন পরিয়ে দাও। মহাবিপদে পড়লেন তুলসী। যে চন্দন তিনি ইষ্টদেবের জন্য ঘষছিলেন, সেই চন্দনেই তার দেহ চর্চিত করতে চায় দুরন্ত ছেলেটি।

প্রথমে বিরক্তিবোধ করলেও পরে তুলসী ভাবলেন, চারিদিকে কোথাও ত কোন গ্রাম বা জনপদ নেই। তাহলে কোথা থেকে এল এই বালক? সহসা মহাবীরজীর কথাটি মনে পড়ে গেল তাঁর। রামনবমীর দিন প্রভু ছলনা করে ছদ্মবেশে দেখা দিতে এসেছিলেন।

কারণ প্রভুর জ্যোতির্ময় রূপ তিনি সহ্য করতে পারবেন না। তবে কি তাঁর সেই প্রাণপ্রভুই আবার ছলনা করে এই মনোহর বালকবেশে এসেছেন?

ভাবতে ভাবতে এক নিবিড় পুলকে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তুলসীর সর্বাঙ্গ। তিনি পরম প্রীতি ও ভক্তিভরে চন্দনের তিলক এঁকে দিলেন বালকের ললাটে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে বালক! আমার কথা শোন। তুমি কি শ্রীরামচন্দ্র, না অন্য কেউ?

বালক স্মিত হাসি হেসে মধুরকণ্ঠে উত্তর করল, সফল শ্রীরাম অবতার। এই বহু আকাঙ্ক্ষিত ইষ্টদেবের দর্শন লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে এক অপার আনন্দের সর্বাত্মক অনুভূতির উচ্ছাসে আত্মহারা হয়ে উঠলেন তুলসী। সে আনন্দানুভূতির বেগ সহ্য করতে পারলেন না তিনি। চৈতন্য হারিয়ে ফেললেন।

জ্ঞান ফিরে দেখলেন, বালকবেশী তার প্রাণপ্রভু কোথায় চলে গেছেন, কণ্ঠে তখন ফুটে উঠল বিরহের আর্তি। চোখে ঝরতে লাগল অবিরল অশ্রুধারা। কিন্তু সেই ক্ষণেই লিখে রাখলেন তাঁর ইষ্টদর্শনের ঘটনা-

চিত্রকূট কে ঘাট পর ভই সন্তন কা ভীড়।
তুলসীদাস চন্দন ঘসৈ তিলক দেই রঘুবীর।।

কিন্তু ক্ষণিকের জন্য এই দর্শনলাভে মন ভরে না। এক অব্যক্ত প্রশ্নের আলোড়নে সমগ্র অন্তরাত্মা আলোড়িত ও আন্দোলিত হয় প্রবলভাবে, প্রভুর এই ছলনাময় ক্ষণলীলাবিলাস কেন সত্যকারের নিত্যলীলায় পরিণত হয় না?

অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে তাই বলেন, হে পরমপ্রভু! একি তোমার ছলনা লীলাময়! তুলসীর জীবনে তুমি অনন্ত লীলাবিলাস সহকারে কেন বিরাজ কর না?

প্রভু আর একদিন কৃপা করে তুলসীর সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন, তুলসীদাস! তুমি ভেবো না। আমায় তুমি পাবে। আমার লীলা চিরকাল জাগরূক হয়ে থাকবে তোমার হৃদয়ে। এবার আমার লীলাকাহিনীকে জনসমাজের সামনে তুলে ধরো।

তোমার ভাবৈশ্বর্যের ধারা সে কাহিনীকে এক অপরূপ কাব্যসুষমায় মণ্ডিত করে সমাজের সর্বস্তরে বিতরণ করো। কলির কলুষ মোচনের জন্য কলির উপযোগী করে আমার নব রামায়ণ রচনা করো। প্রভুর কাছ থেকে রামলীলা প্রচারের আদেশ পেয়ে তুলসী এবার চিত্রকূটের পর প্রভুর অন্যতম লীলাস্থল দণ্ডকারণ্য পরিক্রমা করতে চলে গেলেন। প্রভুর পদধূলিতে ধন্য এই দণ্ডকবন এক পরম তীর্থ তাঁর কাছে।

এই দণ্ডকবন পরিক্রমাকালে তাঁর ইষ্টদেব শ্রীরামচন্দ্রের স্মৃতি ও লীলামাহাত্ম্য জীবন্ত হয়ে উঠল তুলসীর হৃদয়ে। এই লীলামাহাত্ম্যের অনুভূতিকে এক অপূর্ব কাব্যরূপ দান করলেন। যে কাব্যরূপের অর্থ হলো, এই দণ্ডকারণ্যের শোভা সত্যিই অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রভু।

এই দণ্ডক একটিমাত্র বন হলেও তার নাম অগণিত মানুষের মনোবলকে পবিত্র করেছে। সেদিন রঘুনন্দন রাক্ষসকুলকে দলিত করেছিলেন। আজ তাঁর নাম কলির কলুষ বা পাপরূপ রাক্ষসদের দলিত করছে।

এবার এক নূতন রামায়ণ রচনার জন্য মনে প্রাণে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন ভক্ত কবি তুলসীদাস। এজন্য তাঁর সর্বসত্তাকে রামময় করে তুলেছেন তিনি। ইষ্টদেব শ্রীরামের নাম জপে চিত্ত তাঁর বিভোর হয়ে থাকে সদাসর্বদা। প্রভুর ‘মঞ্জুল-মঙ্গল-মোহময়’ মূর্তি অঙ্কিত হয়ে আছে মনসপটে। প্রভুর ‘নীলকঞ্জ’ প্রভ নয়নের জ্যোতি লিপ্ত করে দিয়েছে কে যেন তাঁর দুচোখে।

নব রামায়ণ রচনার কাজ শুরু করার আগে প্রভুর বিচিত্র লীলা লীলাকাহিনীর উপাদান সংগ্রহের জন্য উত্তর ভারতের তীর্থক্ষেত্রগুলি দর্শন করার মনস্থ করলেন তুলসীদাস। এছাড়া তীর্থদর্শনে ইষ্টদেবের প্রতি তাঁর মতি আরো গাঢ় হবে।

সর্বপ্রথম তিনি শ্রীরামের জন্মস্থান অযোধ্যায় গিয়ে সরযূ নদীর তীরে বাস করলেন কিছুকাল। এই সময় শ্রীরামচন্দ্রের কৃপা ও দিব্য দর্শন লাভ করেন বেশ কয়েকবার। ইষ্টদেবের চিন্ময় মূর্তির সঙ্গে তাঁর ভক্তিসিদ্ধ অন্তরাত্মার আনন্দলীলা চলতে থাকে।

অযোধ্যার পর আরো কয়েকটি তীর্থভ্রমণের পর বৃন্দাবনে এসে উপস্থিত হলেন তুলসীদাস। বৃন্দাবনের সব মন্দিরে শুধু রাধাকৃষ্ণের নামকীর্তন হয়। কিন্তু তুলসীর তাতে মন ভরে না। কারণ কোথাও তাঁর ইষ্টদেবতা শ্রীরামচন্দ্রের নাম কীর্তন হয় না।

কোন এক উৎসবের দিন তুলসীর এক বন্ধু এসে মদনগোপালজীর মন্দিরে নিয়ে গেলেন। উৎসব উপলক্ষে বিগ্রহকে অপরূপ রূপে সাজানো হয়েছে। মন্দিরের ভিতরে গিয়ে বিগ্রহকে প্রণাম করতে হবে। বেদীর সামনে এগিয়ে গেলেন তুলসী। কিন্তু বিগ্রহের এ রূপ দেখে ভক্তিভাব জাগে না তাঁর অন্তরে।

মাথা নত হতে চায় না। তাঁর প্রাণপ্রভু শ্রীরামের যে রূপের স্মৃতি ও অনুধ্যান তাঁর সর্বসত্তায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সে রূপ না হলে তাঁর মন ভরবে না। হৃদয় তৃপ্ত হবে না। তাই তিনি তখন বংশীধারী মদনগোপালের মূর্তির দিকে চেয়ে করজোড়ে নিবেদন করলেন-

কাহা কাহো ছবি আজকী ভলে বনো হৌ নাথ।
তুলসী মস্তক জব নবৌ ধনুষ বাণ লো হাথ।।

অর্থাৎ হে নাথ! আজকের তোমার এ মনোহরণ অপরূপ বেশের কি বর্ণনা আমি দেব? কিন্তু প্রভু, তুলসী যখন মাথা নত করবে তখন কিন্তু তোমার ধনুর্বাণ হাতে নিতেই হবে বংশীর পরিবর্তে। শোনা যায়, সেদিন মদনগোপাল এই পরমভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। সেকথা তুলসীদাস লিখে গেছেন-

ক্রীট মুকুট মাথে, ধর ধনুষ বাণ লিও হাথ।
তুলসী নিজ জন কারণে নাথ ভয়ে রঘুনাথ।।

অর্থাৎ নিজ ভক্তজন তুলসীদাসের আব্দার রাখার জন্য মদনমোহন রঘুনাথরূপে প্রকটিত হন। শিরে ধরেন রাজমুকুট, হাতে ধরেন বংশীর পরিবর্তে ধনুর্বাণ।

……………..
আরো পড়ুন:
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন

………………………..
ভারতের সাধক ও সাধিকা সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক-সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত-প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!