আর্যভট্ট

আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা

-প্রণয় সেন

পাটলিপুত্র রাজসভায় তখন উপস্থিত বিদগ্ধ সব পণ্ডিতেরা ! একটু থমথমে ভাব বিরাজ করছে ! তারই মধ্যে থাকা এক পণ্ডিত মাথা নত করে বসে আছেন ! নাম হরিহর শর্মা ! পাটলিপুত্রতে তখন হরিহর শর্মার মত পণ্ডিত কেউ ছিল না ! তিনি গণনা করেই মহারাজকে সূর্যগ্রহনের দিন-ক্ষণ জানিয়েছিলেন ! সেই গণনা মতই রাজা মৃগয়ায় গিয়াছিলেন ! কিন্তু ঘটনাচক্রে সেদিন সূর্যগ্রহণই হল না ! হল ঠিক তার পরের দিন !


গুরুদেবের গণনায় ভুল -এ কি করে হয় ! কিন্তু কেন হল ভুল ? কোথায় হল ভুল ? কিভাবে হল ভুল ? তবে কি জ্যোতির্বিদ্যারই ভেতর কোথাও গনিতের ভুল রয়েছে ? এসব হাজারো প্রশ্ন তার মনকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল !

রাজসভায় গুরুদেব হরিহর শর্মার মহাশয়ের হেঁট হয়ে থাকা মাথা দূর থেকে লক্ষ্য করছিলেন এক তরুন ! একটা অপমানবোধ আর লজ্জা তার গুরুদেবের চোখে মুখে অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল ! তরুনটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন ! গুরুদেবের গণনায় ভুল -এ কি করে হয় ! কিন্তু কেন হল ভুল ? কোথায় হল ভুল ? কিভাবে হল ভুল ? তবে কি জ্যোতির্বিদ্যারই ভেতর কোথাও গনিতের ভুল রয়েছে ? এসব হাজারো প্রশ্ন তার মনকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল ! হেঁট হওয়া মাথা তার হৃদয়ে এতটাই ব্যাথার সঞ্চার করেছিল যে সে মনে মনে ঠিক করলেন -এর সংশোধন তাকে করতেই হবে !

বিভিন্ন প্রশ্ন মনে তোলপাড় হতে হতেই তরুনটি ভাবলেন এর জন্য তার কিছু বলা দরকার ! কিন্তু মহারাজ যদি রুষ্ট হন ! তবুও গুরুদেবের সন্মানের কথা ভেবে তিনি এগিয়ে এসে বললেন -” মহারাজ ; আমি গুরুদেবের এক নগন্য শিষ্য ! নাম আমার আর্যভট্ট ! গুরুদেবের গণনায় কোথায় ভুল আছে তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন ! গুরুদেব নির্ভুল গণনা করতেই সক্ষম এবং তা বুঝতে পারবেন পরবর্তী চন্দ্রগ্রহনের দিনই ! প্রথমে মহারাজ বিস্মিত হলেন এবং পরক্ষনেই একটু সংযত ও বেশ উৎসাহিত হয়ে বললেন “বেশ ! তবে তাই হোক ! নতুন গণনা সেদিনই পরীক্ষিত হবে !”


গুরু সত্যিই তাকে চিনতেন, তার প্রতিভাকে জানতেন ও বিশ্বাসও করতেন ! তাই তিনি সেদিন এত বড় কথা ও এত বড় বোঝা তার মাথাতে চাপাতে পেরেছিলেন ! উপযুক্ত শিষ্য চেনার দূর-দর্শিতা সত্যিই গুরুদেবদের থাকে !

বাইরে বেরিয়ে এসে বিমর্ষ গুরুদেবকে আর্যভট্ট বললেন, আপনি আকুল হবেন না গুরুদেব ! আমরা আবার সঠিক গণনার মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করব এবং আগামীদিনে জ্যোতির্বিদ্যাকে আরও শক্তিশালী করব ! বিমর্ষ গুরুদেবের মনে যেন প্রাণসঞ্চার ঘটল ! তিনি অত্যন্ত তুষ্ট হলেন এবং আর্যভট্টকে বললেন, তুমিই পারবে আর্যভ (এই নামেই ডাকতেন ), আর তোমার হাত ধরেই ঘটবে জ্যোতির্বিদ্যার নব সূচনা ! গুরু সত্যিই তাকে চিনতেন, তার প্রতিভাকে জানতেন ও বিশ্বাসও করতেন ! তাই তিনি সেদিন এত বড় কথা ও এত বড় বোঝা তার মাথাতে চাপাতে পেরেছিলেন ! উপযুক্ত শিষ্য চেনার দূর-দর্শিতা সত্যিই গুরুদেবদের থাকে !


তাই পৃথিবীও একটি গ্রহ ! ক্রমশ এসব তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ! তাই শুধু নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য এসমস্ত তিনি নথিবদ্ধ করতে লাগলেন !

এরপর আর্যভট্ট হিসাব কষতে কষতে দেখলেন একজায়গায় গানিতিক ভুল রয়েছে ! আর এই জন্যই গ্রহণের সময়কাল নির্ণয়ে কিছু ত্রুটি থেকেই যাচ্ছে ! সব কিছুর মূল উৎস এই ব্রহ্মসিদ্ধান্ত বা বেদাঙ্গ-জ্যোতিষ ! তাই অত্যন্ত প্রাচীন এই গ্রন্থগুলির সংশোধন প্রয়োজন না হলে ঘটবে বারবার ভুল !

এরপর আর্যভট্ট ডুবে গেলেন গবেষনায় ! দেখলেন সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে আছে সূর্য আর তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে সবকিছু ! তাই পৃথিবীও একটি গ্রহ ! ক্রমশ এসব তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ! তাই শুধু নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য এসমস্ত তিনি নথিবদ্ধ করতে লাগলেন !

গুরুদেবের অপমান, ব্যাথা এসবকে তিনি অস্ত্র বানিয়ে এক নিক্ষেপ করলেন তার গবেষনায় ! দিন বয়ে চলল, রাত বয়ে চলল তিনি লিখেই চলেছেন তার বই ! সূর্যকেন্দ্রিক সৌরমণ্ডল, পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য দিনরাত্রি- এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করে চলেছেন ! কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগছে, এসব তত্ত্ব যদি কেউ না মানে ? দ্বিধাগ্রস্ত হলেও তিনি ঠিক করলেন তার আবিষ্কৃত সত্যকে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরবেন !


সেদিন সকাল থেকেই রাজপুরী তে সাজসাজ রব ! সভায় সকলে উদগ্রীব ও অপেক্ষামান ! আর্যভট্ট উঠে দাঁড়ালেন ও গ্রহণএর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন ! অবশেষে উক্ত দিনে সঠিক সময়ে শুরু হল চন্দ্রগ্রহণ ! ছিল নিখুঁত হিসাব ! প্রণাম করলেন আর্যভট্ট তার গুরুদেব হরিহর শর্মাকে !

তার বইয়ের নাম দিলেন “আর্যভটীয়” ! বইটিকে তিনি চারটি খণ্ডতে ভাগ করলেন – দশগীতিকা, গণিতপাদ, কালক্রিয়াপাদ এবং গোলপাদ ! এই বইয়ে তিনি উল্লেখ করলেন পৃথিবীর আহ্নিক গতি, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহনের বৈজ্ঞানিক কারণ ! একটি দিন হয় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪:০৯১ সেকেণ্ড সেটাও উল্লেখ করলেন ! এছাড়া “পাই”এর মান, ত্রিকোনামিতির বিভিন্ন সুত্রও তিনি আবিষ্কার করেন ! লিখলেন তিনি বিখ্যাত ” আর্যসিদ্ধান্ত” ! ক্রমে ক্রমে আর্যভট্টর নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল ! শুধু জ্যোতির্বিদ হিসাবেই নয় একজন গণিতজ্ঞ হিসাবেও তার খ্যাতি ছড়াল

বেশ কিছুদিন পর গুরু-শিষ্য এলেন ! বললেন, “মহারাজ,আগামী সপ্তাহের বৃহস্পতিবার রাতে দ্বিতীয় প্রহরের সমাগত লগ্নে চন্দ্রগ্রহণ হবে !” সেদিন সকাল থেকেই রাজপুরী তে সাজসাজ রব ! সভায় সকলে উদগ্রীব ও অপেক্ষামান ! আর্যভট্ট উঠে দাঁড়ালেন ও গ্রহণএর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন ! অবশেষে উক্ত দিনে সঠিক সময়ে শুরু হল চন্দ্রগ্রহণ ! ছিল নিখুঁত হিসাব ! প্রণাম করলেন আর্যভট্ট তার গুরুদেব হরিহর শর্মাকে ! অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা গুরুর চোখে এল জল, একরাশ গর্ববোধ করে তাকে আশির্বাদ করলেন !

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!