আর্যভট্ট

পাটলিপুত্র রাজসভায় তখন উপস্থিত বিদগ্ধ সব পণ্ডিতেরা ! একটু থমথমে ভাব বিরাজ করছে ! তারই মধ্যে থাকা এক পণ্ডিত মাথা নত করে বসে আছেন ! নাম হরিহর শর্মা ! পাটলিপুত্রতে তখন হরিহর শর্মার মত পণ্ডিত কেউ ছিল না ! তিনি গণনা করেই মহারাজকে সূর্যগ্রহনের দিন-ক্ষণ জানিয়েছিলেন ! সেই গণনা মতই রাজা মৃগয়ায় গিয়াছিলেন ! কিন্তু ঘটনাচক্রে সেদিন সূর্যগ্রহণই হল না ! হল ঠিক তার পরের দিন !

গুরুদেবের গণনায় ভুল -এ কি করে হয় ! কিন্তু কেন হল ভুল ? কোথায় হল ভুল ? কিভাবে হল ভুল ? তবে কি জ্যোতির্বিদ্যারই ভেতর কোথাও গনিতের ভুল রয়েছে ? এসব হাজারো প্রশ্ন তার মনকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল !

রাজসভায় গুরুদেব হরিহর শর্মার মহাশয়ের হেঁট হয়ে থাকা মাথা দূর থেকে লক্ষ্য করছিলেন এক তরুন ! একটা অপমানবোধ আর লজ্জা তার গুরুদেবের চোখে মুখে অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল ! তরুণটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন ! গুরুদেবের গণনায় ভুল -এ কি করে হয় ! কিন্তু কেন হল ভুল ? কোথায় হল ভুল ? কিভাবে হল ভুল ?

তবে কি জ্যোতির্বিদ্যারই ভেতর কোথাও গনিতের ভুল রয়েছে ? এসব হাজারো প্রশ্ন তার মনকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল ! হেঁট হওয়া মাথা তার হৃদয়ে এতটাই ব্যাথার সঞ্চার করেছিল যে সে মনে মনে ঠিক করলেন -এর সংশোধন তাকে করতেই হবে !

বিভিন্ন প্রশ্ন মনে তোলপাড় হতে হতেই তরুনটি ভাবলেন এর জন্য তার কিছু বলা দরকার ! কিন্তু মহারাজ যদি রুষ্ট হন ! তবুও গুরুদেবের সন্মানের কথা ভেবে তিনি এগিয়ে এসে বললেন- “মহারাজ ; আমি গুরুদেবের এক নগন্য শিষ্য ! নাম আমার আর্যভট্ট ! গুরুদেবের গণনায় কোথায় ভুল আছে তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন!

গুরুদেব নির্ভুল গণনা করতেই সক্ষম এবং তা বুঝতে পারবেন পরবর্তী চন্দ্রগ্রহনের দিনই ! প্রথমে মহারাজ বিস্মিত হলেন এবং পরক্ষনেই একটু সংযত ও বেশ উৎসাহিত হয়ে বললেন “বেশ ! তবে তাই হোক ! নতুন গণনা সেদিনই পরীক্ষিত হবে !”

গুরু সত্যিই তাকে চিনতেন, তার প্রতিভাকে জানতেন ও বিশ্বাসও করতেন ! তাই তিনি সেদিন এত বড় কথা ও এত বড় বোঝা তার মাথাতে চাপাতে পেরেছিলেন ! উপযুক্ত শিষ্য চেনার দূর-দর্শিতা সত্যিই গুরুদেবদের থাকে !

বাইরে বেরিয়ে এসে বিমর্ষ গুরুদেবকে আর্যভট্ট বললেন, আপনি আকুল হবেন না গুরুদেব ! আমরা আবার সঠিক গণনার মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করব এবং আগামীদিনে জ্যোতির্বিদ্যাকে আরও শক্তিশালী করব ! বিমর্ষ গুরুদেবের মনে যেন প্রাণসঞ্চার ঘটল ! তিনি অত্যন্ত তুষ্ট হলেন এবং আর্যভট্টকে বললেন, তুমিই পারবে আর্যভ (এই নামেই ডাকতেন ), আর তোমার হাত ধরেই ঘটবে জ্যোতির্বিদ্যার নব সূচনা !

গুরু সত্যিই তাকে চিনতেন, তার প্রতিভাকে জানতেন ও বিশ্বাসও করতেন ! তাই তিনি সেদিন এত বড় কথা ও এত বড় বোঝা তার মাথাতে চাপাতে পেরেছিলেন ! উপযুক্ত শিষ্য চেনার দূর-দর্শিতা সত্যিই গুরুদেবদের থাকে !

তাই পৃথিবীও একটি গ্রহ ! ক্রমশ এসব তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ! তাই শুধু নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য এসমস্ত তিনি নথিবদ্ধ করতে লাগলেন !

এরপর আর্যভট্ট হিসাব কষতে কষতে দেখলেন একজায়গায় গানিতিক ভুল রয়েছে ! আর এই জন্যই গ্রহণের সময়কাল নির্ণয়ে কিছু ত্রুটি থেকেই যাচ্ছে ! সব কিছুর মূল উৎস এই ব্রহ্মসিদ্ধান্ত বা বেদাঙ্গ-জ্যোতিষ ! তাই অত্যন্ত প্রাচীন এই গ্রন্থগুলির সংশোধন প্রয়োজন না হলে ঘটবে বারবার ভুল !

এরপর আর্যভট্ট ডুবে গেলেন গবেষনায় ! দেখলেন সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে আছে সূর্য আর তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে সবকিছু ! তাই পৃথিবীও একটি গ্রহ! ক্রমশ এসব তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ! তাই শুধু নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য এসমস্ত তিনি নথিবদ্ধ করতে লাগলেন !

গুরুদেবের অপমান, ব্যাথা এসবকে তিনি অস্ত্র বানিয়ে এক নিক্ষেপ করলেন তার গবেষনায় ! দিন বয়ে চলল, রাত বয়ে চলল তিনি লিখেই চলেছেন তার বই! সূর্যকেন্দ্রিক সৌরমণ্ডল, পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য দিনরাত্রি- এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করে চলেছেন ! কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগছে, এসব তত্ত্ব যদি কেউ না মানে ? দ্বিধাগ্রস্ত হলেও তিনি ঠিক করলেন তার আবিষ্কৃত সত্যকে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরবেন !

সেদিন সকাল থেকেই রাজপুরী তে সাজসাজ রব ! সভায় সকলে উদগ্রীব ও অপেক্ষামান ! আর্যভট্ট উঠে দাঁড়ালেন ও গ্রহণএর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন ! অবশেষে উক্ত দিনে সঠিক সময়ে শুরু হল চন্দ্রগ্রহণ ! ছিল নিখুঁত হিসাব ! প্রণাম করলেন আর্যভট্ট তার গুরুদেব হরিহর শর্মাকে !

তার বইয়ের নাম দিলেন “আর্যভটীয়” ! বইটিকে তিনি চারটি খণ্ডতে ভাগ করলেন – দশগীতিকা, গণিতপাদ, কালক্রিয়াপাদ এবং গোলপাদ ! এই বইয়ে তিনি উল্লেখ করলেন পৃথিবীর আহ্নিক গতি, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহনের বৈজ্ঞানিক কারণ ! একটি দিন হয় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪:০৯১ সেকেণ্ড সেটাও উল্লেখ করলেন !

এছাড়া ‘পাই’এর মান, ত্রিকোনামিতির বিভিন্ন সুত্রও তিনি আবিষ্কার করেন ! লিখলেন তিনি বিখ্যাত ‘আর্যসিদ্ধান্ত’ ! ক্রমে ক্রমে আর্যভট্টর নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল ! শুধু জ্যোতির্বিদ হিসাবেই নয় একজন গণিতজ্ঞ হিসাবেও তার খ্যাতি ছড়াল

বেশ কিছুদিন পর গুরু-শিষ্য এলেন ! বললেন, “মহারাজ,আগামী সপ্তাহের বৃহস্পতিবার রাতে দ্বিতীয় প্রহরের সমাগত লগ্নে চন্দ্রগ্রহণ হবে !” সেদিন সকাল থেকেই রাজপুরী তে সাজসাজ রব ! সভায় সকলে উদগ্রীব ও অপেক্ষামান ! আর্যভট্ট উঠে দাঁড়ালেন ও গ্রহণএর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন ! অবশেষে উক্ত দিনে সঠিক সময়ে শুরু হল চন্দ্রগ্রহণ !

ছিল নিখুঁত হিসাব ! প্রণাম করলেন আর্যভট্ট তার গুরুদেব হরিহর শর্মাকে ! অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা গুরুর চোখে এল জল, একরাশ গর্ববোধ করে তাকে আশির্বাদ করলেন !

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!