জন্মন্তরবাদ চুরাশির ফেরে পুনজর্ন্ম

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

‘জন্মান্তরবাদ’

‘আমি কে’ ‘জন্মের উদ্দেশ্য কি’ ‘জন্মের আগে কোথায় ছিলাম’ ‘জন্মের পর কোথায় এলাম’ ‘আবার মৃত্যুর পর কোথায় যাব’ এই প্রশ্নগুলো জগতের আত্মানুসন্ধানী প্রশ্নের অন্যতম। এইসব প্রশ্ন যখন সাধকের মনে জাগ্রত হয় তখন সে বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝদিয়ে যে একটা অদৃশ্য চোরাগলি এঁকেবেঁকে চলে গেছে তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে পরে।

তবে বেশিভাগ মানুষ এমন কোনো গলিপথের অস্থিত্ব রয়েছে তা স্বীকার করতে চায় না। বলে এসব অবান্তর ভাবনা। গাঁজাখুরি কথা। তবে যাদের মনে এই প্রশ্ন প্রতিনিয়ত করা নেড়েই চলে… নেড়েই চলে… তারা ডান-বাম না দেখে ঠিকঠিক এই পথের সন্ধানে নেমে পরে।

প্রচলিত চিন্তাধারা এই মত-পথকে না মানলেও, যারা এ পথের সন্ধান সত্যি সত্যি পেয়েছেন বলে দাবিদার তারা এর নাম দিয়েছেন ‘আধ্যাত্মিকতা’। তাদের বেশিভাগ এই পথে প্রবেশের পর এর মহিমায় এমন লীন হয়ে যান যে আর কিছু ব্যক্ত করার অভিপ্রায়ই খুঁজে পান না; আবার কেউ কেউ এ পথের চমৎকারিত্যে মুগ্ধ হয়ে এর গুণগান গাইতে শুরু করেন।

কেউ কেউ বাঁধে গান আবার কেউ বিলায় জ্ঞান। তাদের প্রায় সকলেই এ কথা বলেন যে, এ পথে লীন হলে যে ভাবের উদয় হয় তা প্রত্যেককে নিজেকেই ডুবে তবে অনুধাবন করতে হয়। এই লীলা কেউ কাউকে পরিস্কার করে কিছুই বোঝাতে পারে না। এ বর্ণনার অতীত। সর্বোচ্চ প্রকাশের ইচ্ছা থাকলেও এর সামান্যও প্রকাশ করা অসম্ভব প্রায়।

অনেক দর্শন-ধর্ম-বিশ্বাস-মত-পথ এই ‘জন্মান্তর’কে বিশ্বাস করে আবার অনেকে করে না। অনেকে জোড়ালো যুক্তি দিয়েছে এর পক্ষে। অনেকে আবার বিষয়টাকে মোটেও পাত্তা দেননি। আবার এটাও দেখা যায় যে, একই দর্শন-ধর্ম-বিশ্বাস-মত-পথের কিছু মানুষ একই শাস্ত্র থেকে এর পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান আবার অরেক পক্ষ এর বিরোধীতা করেন।

কারণ এই ভাব অনুধাবনের অনুভব ব্যক্ত করা অসম্ভব। যারা এই জাতীয় কথা বলে, সমাজ তাদেরকে সহজে মেনে নেয়নি কখনো। তাদের পদ্য-গান-জ্ঞান সমাজ গ্রহণ করলেও তাদেরকে বা তাদের মত-পথকে সমাজের মূলধারা মেনে নেয়নি কখনো। সভ্য সমাজের চোখে তারা পরিত্যাজ্য পাগল হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে বরাবর।

বিজ্ঞান যেমন প্রমাণের সত্য, ধর্ম বিশ্বাসের সত্য, তেমনি আধ্যাত্মিকতা হলো অনুভবের অনুধাবনের সত্য অর্থাৎ অনুধাবনের গভীর অনুভবই আধ্যাত্মিকতা। সৃষ্টিচক্র সঞ্চালনের প্যারামিটারের সাথে নিজের প্যারামিটারকে একই সমীকরণে আনতে পারলেই সেই মত অনুধাবন করা যায় বলে সাধুগুরুরা মনে করেন।

নিজের সমীকরণ কি করে সৃষ্টিচক্রের সমীকণের সমান্তরালে আনতে হয় তার নানাবিধ মত-পথ সাধুগুরুরা নিজেদের মতো করে ব্যক্ত করে গেছেন। তবে এই মত-পথ বোঝা সাধারণের জন্য সহজ নয়। কারণ রহস্যময় সেই জগতকে সাধুগুরুরা রহস্যময়তার ভেতরেই মুড়ে রেখে গেছেন ব্যক্ততার মাঝেও।

অনেকটাই বলেছেন কিন্তু কি বোঝাতে চেয়েছেন তা বোঝার জন্য যতটা জানতে হয় তার সীমারেখাও পরিমাপ করা সহজ নয়। সাধুগুরুরা বলেন, সাধারণ জ্ঞানে আধাত্মিকতাকে বোঝা সম্ভব নয়; এরজন প্রয়োজন বিশেষ জ্ঞান; যার নাম বিজ্ঞান। প্রযুক্তিনির্ভরতা নয় তবে বিজ্ঞানমনস্ক না হলে আধ্যাত্মিকতাকে বোঝা বেশ দূরোহ।

আধ্যাত্মিকতা মানে অলৌকিকতা নয়; আধ্যাত্মিকতা হলো সাধারণ জ্ঞানের বাইরের জ্ঞানকে ধরার চেষ্টা করা। অন্ধবিশ্বাসে এগিয়ে যাওয়া মানে নয় আধ্যাত্মিকতা; এ যাত্রা হলো অনুভবকে অনুধাবন করতে করতে যদি সত্যকে চিনতে পারা যায় তাহলেই বুঝে বুঝে এগিয়ে যাওয়া। সত্য থেকে চরম সত্যে পৌঁছানোর যাত্রা।

এই আধ্যাত্মিকতাকে বুঝতে গেলে প্রথমে বুঝতে শুরু করতে হয় “আমি কে”; আর এই “আমি কে”। এর স্বরূপ সাধন করতে গেলে প্রথমেই যে কয়টা শব্দকে বুঝে নিলে ভালো হয় তারমধ্যে অন্যতম একটি রহস্যময় শব্দ হলো ‘জন্মান্তর’ বা ‘জন্মান্তরবাদ’।

অনেক দর্শন-ধর্ম-বিশ্বাস-মত-পথ এই ‘জন্মান্তর’কে বিশ্বাস করে আবার অনেকে করে না। অনেকে জোড়ালো যুক্তি দিয়েছে এর পক্ষে। অনেকে আবার বিষয়টাকে মোটেও পাত্তা দেননি। আবার এটাও দেখা যায় যে, একই দর্শন-ধর্ম-বিশ্বাস-মত-পথের কিছু মানুষ একই শাস্ত্র থেকে এর পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান আবার অরেক পক্ষ এর বিরোধীতা করেন।

তবে একথাও ঠিক এই জন্মান্তরবাদ কেউ মানুক বা না মানুক সাধারণ মানুষের কেউই স্বজ্ঞানে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে চান না। আর যখন মেনে নিতেই হয় যে এই দেহ ছেড়ে একদিন যেতেই হবে; তখন ফিরে আসার আকুতিও ফিরে ফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’। এই বাণী যেমন আমরা মনের গহীনে লালন করি তেমনি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলি-

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শংখচিল শালিখের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।
হয়তো বা হাঁস হব- কিশোরীর- ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এই সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমূলের ডালে।
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙ্গা বায়; রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।

এই যে হেয়ালির মাঝে জীবনানন্দের মতো কবি স্পষ্টভাবে ফিরে আসার একটা স্পষ্ট আকুতি প্রকাশ করছেন তা কিন্তু কেবল মানব যোনিতেই সীমাবদ্ধ হয়। প্রকৃতির অন্যান্য প্রজাতির মাঝে হলেও যেনো তাকে ফিরে আসতেই হবে; এর কোনো প্রকার ব্যত্যয় যেন সহ্য ক্ষমতার বাইরে। এ যে এমনি প্রেম, যার জন্য ফিরে আসা যায় যে কোনো রূপে… যে কোনো প্রকারে…।

বাঙালীর অন্যতম প্রাণের কবি জীবনানন্দের এই কবিতার অন্তত কয়েকটি লাইন পড়েনি এবং পড়ার পর নিজের ভেতরের ফিরে আসার আকুতি জেগে উঠেনি এমন বাঙালী খুঁজে পাওয়া শুধু এই কালেই না ভবিষ্যতেও অসম্ভব বলেই মনে করা খুব একটা অন্যায় হবে বলে মনে হয় না।

জন্মান্তর বিশ্বাস না করলেও আবেগের বসে আমরা ‘জন্ম-জন্মান্তরের প্রেম’ বা ‘কত জনমের প্রেম’ ‘আগের জনমে তুই আমার উমুক ছিলি’ ‘পরের জনমে যেনো তোকে পাই’ ‘কত জনম পরে দেখা’ ইত্যাদি বাক্যগুলো হরহামেশাই ব্যবহার করে থাকি দৈনন্দিন জীবনে।

আবার অনেকে অভিশাপও দিয়ে থাকি পরের জন্মের অনিষ্ঠ চিন্তা করে। আবার বিপদ থেকে রক্ষা পেলে অনেকে বলেন আগের জনমের সুকীর্তির ফলেই নাকি এই বিপদমুক্তি। এতো গেলো গুটিকয়েক সাধারণ দৈনন্দিন আলাপচারিতা। তবে এই আলোচনা কেবল সাধারণের মাঝেই সীমাবদ্ধতা নয়। সাধুগুরুরাও এই জন্মান্তর নিয়ে বলেছেন নানান কথা। ভবা পাগলা বলেছেন-

এমন সাধের জনম
আর হবেনা;
বারে বারে আর আসা হবেনা
তুমি ভেবেছ কি মনে
আসিয়া এ ভুবনে
তুমি যাহা করে গেলে
কেউ জানেনা।

তুমি যাহা করে গেলে
আসিয়া হেথায়
চিত্রগুপ্ত লিখে ভরিল খাতায়
বিচার করিবেন ঐ বিধাতায়
তার কাছে ফাঁকিজুঁখি
কিছুই চলেনা।

তুমি যাহা বদনে করোনা প্রকাশ
অপ্রকাশ তার কাছে
কি যে সর্বনাশ?
জুড়িয়া রয়েছে হৃদয়ে আকাশ
মানব কুলে ফাঁকি আর দিওনা।

অন্যদিকে ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

জীব ম’লে যায় জীবান্তরে
জীবের গতি মুক্তি রয় ভক্তির দ্বারে,
জীবের কর্ম বন্ধন না হয় খণ্ডন
প্রতিবন্ধন কর্মের ফেরে।।

ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুত-ব্যোম
এরা দোষী নয় দোষী আদম,
বেহুঁশে খেয়ে গন্ধম
তাইতে এলো ভাবনগরে।।

আত্মা আর পরম-আত্মা
ত্রিসংসারে জগৎকর্তা,
ভুলে আত্মা জগৎকর্তা
লক্ষ যোনী ঘুরে মরে।।

গুরু ধরে জ্যান্তে মরে
বসাও গুরুর হৃদমাঝারে,
সিরাজ সাঁই এর চরণ ভুলে
লালন মিছে কেন বেড়াও ঘুরে।।

আবেগী মানুষ বারবার ধরাধামে ফিরে আসতে চাইলেও সাধুগুরুরা আর ফিরতে চান না নতুন নতুন দেহ নিয়ে। তারা জরা-দু:খ-কষ্ট ভরা এই মানবজনমের বারবার পুনরাবৃত্তি চান না। উৎফুল্লতার মাঝে জীবন কাটিয়ে দেহত্যাগ করতে চান। চান নির্বাণ বা মুক্তি। এই মুক্তি যে কি তাও বোঝা কিন্তু সহজ নয়; এই মুক্তি কেবল দেহ থেকে মুক্তিই নয় এরও রয়েছে গভীর তাৎপর্য। যাক সে কথা।

আধ্যাত্মিকতায় জন্মান্তরবাদ বিশাল জায়গা দখল করে আছে। “জন্মান্তরবাদ কি” এ বড় আজব রহস্যেমোড়া এক জিজ্ঞাসা; অধরের পেছনে যাত্রা। সাধুগুরুরা বলেন, সাধারণ জ্ঞানে বা প্রমাণের সত্যে নয় উপলব্ধির সত্যের ভেতর দিয়ে অনুধাবনের যাত্রা করতে হয় এই রহস্য ছুঁয়ে দেখতে চাইলে।

আসলে জন্মান্তর বুঝতে গেল সবার আগে যা বোঝা প্রয়োজন তা হলো আধ্যাত্মিকতা। আবার অনুরূপভাবে আধ্যাত্মিকতা বুঝতে গেলে বুঝতে হবে জন্মান্তরবাদকে। ধর্ম বা বিজ্ঞান দিয়ে একে বোঝা শক্ত। পাশাপাশি বুঝতে হয় আরো কিছু শব্দগুচ্ছকে গভীর জ্ঞানে। তাড়াহুড়ো করে বোঝা সহজ নয়। এসবই বলে থাকে সাধক শ্রেণীর মানুষ। তবে যুক্তিবাদী বিজ্ঞান চেতনার মানুষ এসব মানতে নারাজ।

অব্যক্ত পরম যখন গাঢ় অন্ধকারের মাঝ থেকে মহাবিস্ফোরণের আলোকবর্তিকার মধ্য দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করলেন। তখন সেই বিস্ফোরণের বিচ্ছুরণের মধ্য দিয়ে তার থেকে সমস্ত সৃষ্টির শুভ বিকাশের সূচনা হতে লাগলো। পরম তার দৃশ্যমানতাকে মাটি-জল-আগুন-বায়ু-আকাশ অর্থাৎ পঞ্চভুতে প্রকাশে মত্ত্ব হলো।

জন্মান্তর শব্দটার একটু গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করলে আরো গুটিকয়েক প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। যেমন- যদি জন্মান্তর থেকে থাকে তাহলে কতবার জন্ম? কোন্ প্রজাতিতে জন্ম? বারবার কি মানুষেই জন্ম? অর্থাৎ কোন যোনিতে কতবার জন্ম। নারীকূলে জন্ম? নাকি নরকূলে? মনুষ্যকূলে জন্ম নাকি পশুকূলে?

এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ না হলেও বিভিন্ন দর্শন-ধর্ম-বিশ্বাস-মত-পথে জন্মান্তরের একটা সংখ্যা পাওয়া যায় তা হলো ‘চুরাশি’। কেউ বলে চুরাশি, কেউ চুরাশি হাজার আবার কেউ চুরাশি লক্ষ। তবে এর মাঝে চুরাশি লক্ষ সংখ্যাটি সবচেয়ে বেশি মত ও পথে পাওয়া যায়। এই লেখা সেই চুরাশির যাত্রাকে নিয়েই।

তবে এর বেশিভাগই এতোটাই গুপ্ত যে তা’ প্রকাশ করা সহজ নয়। তবে যতটা বলা যায় বা বিভিন্ন বিশ্বাসে এ প্রসঙ্গে কি বলেছে সেটা প্রথমে অনুসন্ধান করা যেতে পারে; তারপর এর বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণও করা যেতেই পারে। তবে সবার আগে জানতে হবে জন্মান্তর প্রসঙ্গে কে কি বলেছে বা কে কি মানছে।

ভারতীয় পৌরাণিক মতে, অব্যক্ত পরম যখন গাঢ় অন্ধকারের মাঝ থেকে মহাবিস্ফোরণের আলোকবর্তিকার মধ্য দিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করলেন। তখন সেই বিস্ফোরণের বিচ্ছুরণের মধ্য দিয়ে তার থেকে সমস্ত সৃষ্টির শুভ বিকাশের সূচনা হতে লাগলো। পরম তার দৃশ্যমানতাকে মাটি-জল-আগুন-বায়ু-আকাশ অর্থাৎ পঞ্চভুতে প্রকাশে মত্ত্ব হলো।

কল্পের এই চলমান প্রকৃয়ায় যখন সূর্য তার নিজস্ব রূপে সংগঠিত হলো তখন সৃষ্টিতে প্রাণ বিকাশের সক্ষমতা দেখা দিলো। তারই ধারাবাহিকতায় এই সৌরমণ্ডলের মনুষ্য বাসযোগ্য পৃথিবীর মাঝে প্রাণের সঞ্চার হতে লাগলো। এই ক্রম চলতে চলতেই জলজ প্রাণী থেকে মানুষের বিবর্তন।

প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র বলে, পঞ্চভুতেই ব্রহ্মাণ্ডের সকল কিছুর মতো মানুষও গঠিত। তবে জীবের মাঝে যে চৈতন্য বা প্রাণ তা বিরাজ করে পরমের অংশ হিসেবে। তাই পঞ্চভুত একত্রিত করলেই তা জীবের রূপান্তরিত হয় না। জীবের মাঝে যে চৈতন্য তা পরমের দান। আর তা দিয়েই জীব পরমের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে।

আর জীবের চূড়ান্ত লক্ষ্যও পরমেই ফিরে যাওয়া বা পরমেই লীন হওয়া। জীব যতক্ষণ পর্যন্ত পরমে লীন হতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত জীব জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন দেহ প্রাপ্ত হয়। জীবের এই জন্মজন্মান্তরের গমনাগমন চলতেই থাকে যতক্ষণ না পরমের দর্শন পায়।

পুরাণ মতে, মানব জনমের জন্য ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করতে হয়। এই চুরাশি লক্ষ জন্ম এক প্রজাতির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন প্রজাতির জন্মের মধ্য দিয়ে জীবাত্মা মনুষ্য জন্ম লাভের সুযোগ পায়। এই বিভিন্ন প্রজাতির মাঝে জন্মের ধারাবাহিকতার পরিসংখ্যানও পুরাণে পাওয়া যায়-

  • জলচরকূল (জলজপ্রাণী/জীব): ৯ লক্ষ রকম
  • বৃক্ষকূল (গাছপালা): ২০ লক্ষ রকম
  • কৃমিকূল (কীটপতঙ্গ): ১১ লক্ষ রকম
  • পক্ষিকূল (পাখি): ১০ লক্ষ রকম
  • পশুকূল (পশু) : ৩০ লক্ষ রকম
  • মানবকূল (মানুষ): ৪ লক্ষ রকম
  • মোট ৮৪ লক্ষ রকম

একটু বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, আত্মার প্রাথমিক জন্ম হয় জলচর রূপে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র থেকে পর্যায়ক্রমে জলে ৯ লক্ষবার জন্ম হয় আত্মার। এই সময় জলের মাঝেই তার জীবন অতিবাহিত হয়।

৯ লক্ষবার জলাচরের যোনিতে ভ্রমণের পর আত্মা বৃক্ষযোনিতে ভ্রমণ শুরু করে। এই রূপে তাকে ২০ লক্ষ বার জন্মাতে হয়। এই সময় তাকে স্থির হয়ে এক জায়গায় অবস্থান করতে হয়।

এরপর আত্মার যাত্রা শুরু হয় কৃমি যোনিতে। এইরূপে ১১ লক্ষবার জন্মাতে হয়। এই সময় আত্মা প্রাণ পেয়ে পুনরায় নড়াচড়ার সক্ষমতা অর্জন করে।

এরপর আত্মার যাত্রা শুরু হয় পাখি যোনিতে। এইরূপে আত্মাকে ২০ লক্ষবার জন্মাতে হয়। এই সময় আত্মা প্রাণ পেলে আরো অনেকবেশি সক্ষমতা লাভ করে।

পাখি যোনির পর আত্মা পশু যোনিতে জন্মায়। এইরূপে আত্মাকে ৩০ লক্ষবার জন্মাতে হয়। এই সময় আত্মা প্রাণ পেলে আরো অনেকবেশি সক্ষমতা লাভ করে।

পশু যোনির পর আত্মা মানব যোনিতে জন্মায়। এইরূপে আত্মাকে ৪ লক্ষবার জন্মাতে হয়। এই সময় আত্মার পূর্ণ প্রকাশ পেলেও জন্মজন্মান্তরের মধ্য দিয়ে তার মাঝে মানুষের মনুষত্ব বিকাশ লাভ করে। পূর্ণ মানুষরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

মানবকূলে জন্মালেই আত্মা পরমের দর্শন বা পরমে লীন হওয়ার সক্ষমতা লাভ করে। যা পরম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তা পরমে ফিরে যাবে এটাই স্বাভাবিক প্রকৃয়া। সাধুগুরুরা বলেন, সৎচিদানন্দ অর্থাৎ সর্বদা আনন্দিত মানুষই পারে পরমে লীন হয়ে পরমে ফিরে যেতে।

আরো বলা হয়, মানবকূলে জন্মালেই আত্মা পরমের দর্শন বা পরমে লীন হওয়ার সক্ষমতা লাভ করে। যা পরম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তা পরমে ফিরে যাবে এটাই স্বাভাবিক প্রকৃয়া। সাধুগুরুরা বলেন, সৎচিদানন্দ অর্থাৎ সর্বদা আনন্দিত মানুষই পারে পরমে লীন হয়ে পরমে ফিরে যেতে। তারজন্যও অবশ্য জন্মাতে হয় বহু বহুবার।

তবে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় মত-পথ ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃয়া বা আরাধনা করে থাকে এই বারবার জন্মের সংখ্যা কমানোর জন্য। যাতে নির্বাণ বা মুক্তির পথ সহজতর হয়। বারবার জন্মে জীবকে যে দু:খ-কষ্ট ভোগ করতে হয় তা থেকে মুক্তিই সাধনা। রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যত মত তত পথ।’ আর লালন সাঁইজি বলেছেন-

ভবের গোলা আসমানে।
মুক্তামণি বিকিকিনি মহাজন তার কোনখানে।।

সেই গোলা আসমানে
রসের খেলা রাত্রদিনে,
ধর্মদুষি আর চুরাশী
পরশ হয় তার পরশনে।।

পেলে মন পৈতৃক সে ধন
বিলালো তারে আপন মন,
কারণে করণ যার সে ধরন
দিচ্ছে পুঁজি তাই জেনে।।

সেই ধনের আশায় যারা
ভাব ত্রিপিনে দেয় পাহারা,
পেয়ে মহাযোগ এড়ায় ভবরোগ
লালন ম’ল মনের গুণে।।

এই চুরাশীর ফেরে পরে যে গমনাগমন চলতে যাত্রা শুরু হয় তার শুরুই বা কি? তার অন্তই বা কি? এসব প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তবে জন্মান্তর বা চুরাশির ভেদ না বুঝতে পারলে বাকিটা আরো দুরূহ হবে তাতে সন্দেহ নেই।

(চলবে…)

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………………………..
আরো পড়ুন:
চুরাশির ফেরে: এক
চুরাশির ফেরে: দুই
চুরাশির ফেরে: তিন : আত্মা-১
চুরাশির ফেরে: চার: আত্মা-২
চুরাশির ফেরে: পাঁচ : সৎকার
চুরাশির ফেরে: ছয় : কর্মফল-১
চুরাশির ফেরে: সাত : কর্মফল-২
চুরাশির ফেরে: আট : পরকাল-১
চুরাশির ফেরে: নয় : পরকাল-২

চুরাশির ফেরে: দশ : জাতিস্মর
চুরাশির ফেরে: এগারো : প্ল্যানচেট
চুরাশির ফেরে: বারো : ওউজা বোর্ড
চুরাশির ফেরে: তেরো : প্রেতযোগ
চুরাশির ফেরে: চৌদ্দ : কালাজাদু
চুরাশির ফেরে: পনের: গুপ্তসংঘ–১

চুরাশির ফেরে: ষোল: গুপ্তসংঘ–২
চুরাশির ফেরে: সতের: ইলুমিনাতি

প্রাসঙ্গিক লেখা

4 Comments

  • মিঠু , মঙ্গলবার ৯ জুলাই ২০১৯ @ ৪:২৯ অপরাহ্ন

    খুব ভাল লাগল পড়ে । অনেকের কাছেই জন্মান্তর বিষয় খুব পরিস্কার হয়ে যাবে ।

    • Md. Shahadat Hossain , বুধবার ১০ জুলাই ২০১৯ @ ৪:১৩ অপরাহ্ন

      ভালো লাগলো। এডমিনকে ধন্যবাদ। বিশেষ করে ৮৪ লক্ষের হিসাব সম্পর্কে অনেক সাধুগুরুই অবগত নয়। তারা শুধু লেবাসেই আবদ্ধ।
      পরবর্তী আর্টিকেলের অপেক্ষায় রইলাম।
      আলেক সাঁই

  • যথার্থ গীতা , শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯ @ ৪:৪২ অপরাহ্ন

    হরিঃ ওঁ

    খুব ভাল হয়েছে লেখাটি। আধ্যাত্মিক ব্যাপারগুলো খুবই গোপনীয়।

    • ভবঘুরে , শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯ @ ৫:১২ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ সাধু…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!